somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মহা নির্বাণ

১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ সকাল ১০:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ডাক্তারের চেম্বারে বসে আছে রফিক সাহেব।মাথায়
হাজারো টেনশন ঘুরপাক খাচ্ছে।ডাক্তার টেস্ট এর
রিপোর্ট গুলো পড়ছে,কপালে চিন্তার রেখা ফুটে
উঠছে।রফিক সাহেবের আরো মনটা খারাপ হয়ে যায়
.
-আপনার সাথে কি আর কেউ আসেনি?
.
-না ডাক্তার,আমি একাই এসেছি।
.
-কিছু কথা বলার ছিল,অন্য কেউ হলে খুব ভাল হত।
.
রফিক সাহেবের ভিতরটা আবার মোচর দিয়ে উঠে।
'
-কি ডাক্তার?খারাপ কিছু?আপনি আমাকেই বলতে
পারেন,আমি সবকিছু শুনার জন্য প্রস্তুত আছি।
.
-রফিক সাহেব,আপনাকে কথা গুলো সরাসরি বলা
উচিৎ না,তারপরেও অন্য কেউ না থাকার কারনে
কথা গুলো আপনাকেই বলতে হচ্ছে।
.
-ডাক্তার,যা বলবেন প্লীজ তাড়াতাড়ি বলে ফেলুন।
.
-রফিক সাহেব,আপনার ব্রেণ টিউমার হয়েছে এবং
বর্তমানে তা খুবই নাজুক অবস্থায় পৌছে গেছে।
'
ডাক্তারের কথা শুনার পর রফিক সাহেবের মাথা
ঘুরতে লাগলো।চাঁরপাশে অন্ধকার দেখতে লাগলো।
'
রফিক সাহেব বললো...
.
-এর কি কোন প্রতিকার নেই?
.
-একমাত্র অপারেশন এর প্রতিকার,কিন্তু বর্তমানে
আপনার টিউমারের যে অবস্থা তাতে অপারেশনে
আপনার বাঁচার সম্ভাবনা মাত্র ৫%।আর এই
অপারেশনে প্রচুর টাকা প্রয়োজন।
.
রফিক সাহেব আর কিছু বললেননা,ডাক্তারের সাথে
হ্যান্ডসেক করে চেম্বার থেকে বেরিয়ে পড়লেন।আর
বাসার দিকে হাটা দিলেন।
'
.
বাইরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে,সাথে হালকা বাতাস।
সাথে ছাতা নেই,তাই বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য একটা
চায়ের দোকানে আশ্রয় নেয় রফিক সাহেব।
.
-এক কাপ চা দাওতো
'
-কি চা দিমু স্যার?রং চা না দুধ চা?
.
রফিক সাহেব পকেটে হাত দেয়,খুচরো টাকা খুব
বেশি নেই।তাই রং চা দিতে বললো।
.
রফিক সাহেবের হাতে ধুমায়িত চা,চায়ের ধুয়া গুলো
বাতাসের সাথে মিশে যাচ্ছে।রফিক সাহেব আয়েশ
করে চা-য় চুমুক দেয়।ভাবতে থাকে অনেক কিছু।
.
২৫ বছর আগে....
.
নতুন বিয়ে করেছে রফিক সাহেব,খুব সুন্দর একটা
মেয়ে।আগের দিনে আজকের মত অবস্থা ছিলনা।
বিয়ের দিন কণের মুখ দেখেছিল,এর আগে আর
দেখেনি।প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়ে গিয়েছিল।খুব
সুন্দর ভাবেই তাদের সংসার চলছিল।কোন কিছুর
অভাব ছিলনা তাদের।ভালবাসায় ভরপুর ছিল
তাদের দুজনের ছোট্র সংসার।
.
কিন্তু এত সুখের মাঝেও একটা ছোট্র কষ্ট তাদের
দুজনকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল।তাদের বিয়ের ৬ বছর
পূর্ণ হয়ে গেছে অথচ তাদের কোন সন্তান এখনো
তাদের মুখ আলো করেনি।অনেক ডাক্তার দেখিয়েও
এর কোন সুফল পায়নি রফিক সাহেব।
.
একদিন সকালে রফিক সাহেব অফিসে যাচ্ছেন।
অফিস বাসা থেকে খুব কাছে।তাই হেটে হেটেই
যাচ্ছিলেন।রাস্তার পাশে এক জায়গায় অনেক মানুষ
জড়ো হয়ে দাড়িয়ে আছে।দূর থেকে দেখলে মনে হবে
হয়তো তারা সার্কাস দেখছে।রফিক সাহেব নিজের
কৌতুহল মেটানোর জন্য ভিড় ঠেলে সামনে গেলেন।
.
রফিক সাহেবের ধারণা সম্পূর্ন ভুল প্রমাণিত হল।
তিনি মনে করেছিলেন হয়তো সার্কাস বা ম্যাজীক
দেখানো হচ্ছে।কিন্তু না,এখানে সাদা কাপড় জড়ানো
একটি বাচ্চা শুয়ে আছে।রফিক সাহেবের মনটা
মোচর দিয়ে উঠে।কষ্টে তার বুক থেকে আহ শব্দ
বেরিয়ে আসে।যারা এমন কাজ করতে পারে তারা
মানুষ নয়।মানুষ নামের অমানুষ।
.
রফিক সাহেব সেখান থেকে বাচ্চাটাকে তুলে বাড়িতে
নিয়ে আসে।রফিক সাহেবের স্ত্রী বাচ্চাটাকে পেয়ে
অনেক খুশি।বাচ্চাটার নাম রাখে আনন্দ।ছেলেটাকে
কুড়িয়ে আনার তাদের সংসার আনন্দে ভরে উঠছিল
.
কিন্তু তাদের খুশি বেশিদিন স্থায়ী হলনা,আনন্দের
বয়স যখন ৪ বছর,হঠাত একদিন রাত্রে প্রেসার উঠে
মারা যায় রফিক সাহেবের স্ত্রী।ভেঙে পড়েন রফিক
সাহেব।কষ্টে চুরমার হয়ে যায় তার মন।
.
কিন্তু ছেলের দিকে চেয়ে তার ভবিষ্যতের চিন্তা করে
নিজেকে সামলে নেন রফিক সাহেব।রফিক সাহেবের
স্ত্রীর ইচ্ছে ছিল ছেলেকে অনেক বড় ডাক্তার
বানাবেন।স্ত্রীর ইচ্ছেকে পূরণ করার জন্য কাজে
লেগে যান রফিক সাহেব।ছেলেকে ভাল করে পড়াতে
শুরুকরেন রফিক সাহেব।তার ছেলে অনেক মেধাবী।
.
বৃষ্টি থেমে গেছে,রফিক সাহেব চায়ের বিল মিটিয়ে
হাটতে শুরু করেন বাসার দিকে।বাসায় আসা মাত্র
আনন্দ জড়িয়ে ধরে তার বাবাকে।
.
-কি ব্যাপার?আজ তোর এত খুশি কেন?
.
-বাবা,তোমার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে।
.
-তাই নাকি?কোন স্বপ্নের কথা বলছিস?
.
-বাবা,আমি মেডিকেলে চান্স পেয়েছি।তোমার ছেলে
ডাক্তার হবার জন্য এক ধাপ এগিয়ে গেছে।
'
রফিক সাহেবের মনটা আনন্দে নেচে উঠে।পরক্ষনেই
সেটা বিষাধে রূপ নেয়।
.
-বাবা তুমি এই সংবাদে খুশি হওনি?
'
রফিক সাহেব বিষাধ লুকিয়ে মুখে হাসিয়ে ফুটিয়ে
বলেন,আমার ছেলে ডাক্তার হবে,আমি খুশি না হলে
আর কে খুশি হবে?আজ আমি অনেক খুশি।এই
কথা বলে রফিক সাহেব তার ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন
.
গভীর রাত,এক খাটে বাবা আর ছেলে শুয়ে আছেন।
আনন্দ ঘুমুচ্ছে।আর রফিক সাহেবের ঘুম আসছেনা।
অনেক চেষ্টা করেও ঘুমুতে পারছেননা।এই মুহুর্তে
কি করবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেননা তিনি।
.
রফিক সাহেব বিছানা থেকে নেমে ড্রয়ার থেকে টেস্ট
এর রিপোর্ট গুলো বের করলেন।আর ভাবতে শুরু
করলেন।আমার অপারেশন করলে বাঁচার চান্স মাত্র
৫%।আর অপারেশন করতে অনেক টাকা দরকার।
.
এদিকে ছেলেকে মেডিকেলে ভর্তি করাতে হবে।
এখানেও ভর্তি করতে অনেক টাকার দরকার।এখন
নিজের অপারেশন করবেন নাকি ছেলেকে ভর্তি
করাবেন?গভীর ভাবনায় হারিয়ে যান রফিক সাহেব।
.
অবশেষে ছেলেই জয়ী হল,ছেলের জন্য নিজের
জীবনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিলেন রফিক সাহেব।
টেস্ট এর রিপোর্ট গুলো ছিড়ে টুকড়ো টুকড়ো করে
বাতাসের সাথে উড়িয়ে দিলেন।
.
রফিক সাহেব বিছানায় চলে এলেন,আনন্দ এখনো
ঘুমুচ্ছে।সে ঘূর্ণাক্ষরেও জানতে পারলনা তাকে
ডাক্তার বানানোর জন্য নিজের জীবনকে বিসর্জন
দিলেন তার বাবা।
.
এখন আর কোন টেনশন নেই রফিক সাহেবের।
নিশ্চিন্তে ঘুমের দেশে হারিয়ে গেলেন তিনি।একদিন
হয়তো এমন ভাবেই মৃত্যুর দেশে চলে যাবেন সবকিছু
মহানির্বাণ করে,মানে সবকিছুর বন্ধন ত্যাগ করে।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ সকাল ১০:১৭
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গল্প - অভাগীর সুর ব্যঞ্জনা – পর্ব ১ -

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:০৮


শহরটা রাতে কখনও পুরো ঘুমোয় না। কেউ প্রেমে জাগে, কেউ স্বপ্নে, কেউ অপরাধবোধে।আর কেউ কেউ জেগে থাকে অভাবে। তিনতলার ছোট্ট ভাড়া-বাড়িটির জানালার পাশে বসে শিরীন হারমোনিয়ামের রিডে আঙুল রাখল।

বাইরে তখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিল সিমন্স একটি নাম একটি ইতিহাস

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:১৮



"ফিল সিমন্স একটি নাম একটি ইতিহাস"

একটা সময় ছিল, যখন বাংলাদেশ ক্রিকেটে "কোচ" শব্দটা মানেই ছিল ঝড়!

রাসেল ডোমিঙ্গো, হাথুরুসিংহে-
Phil Simmons (2024–present)
Chandika Hathurusingha (2014–2017, 2023–2024)
Russell Domingo (2019–2022)
Steve Rhodes... ...বাকিটুকু পড়ুন

জন্মদিনে তাহাদের জন্য শুভকামনা। আমার জন্মদিনের স্মৃতি...

লিখেছেন করুণাধারা, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৫৬



একেকটা জন্মদিন পার করা মানে জীবন বইয়ের একেকটা পৃষ্ঠা পড়ে ফেলা, কয়েক বছর পরপর সেই বইয়ের একেক অধ্যায় শেষ হয়! বইটা ট্রাজেডি না কমেডি, একেবারে শেষ পর্যন্ত না পৌঁছালে তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

চুপ - একদম চুপ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



আমরা শুধু চুপ থাকবো -
আমাদের কথা বলার মুখ নেই
আমাদের দেখার মতো চোখ নেই
আমাদের শোনার মতো কান নেই
মনে হয়, মনে হয় -
আমাদের হাত-পাও নেই।

আমাদের বিবেক নেই
আমাদের চিন্তা-চেতনাও নেই
আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০২





হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

...................................................................
মানচিত্রের আঁকাবাঁকা রেখায় তারে পাবেনা,
সে নদী তো চেনা কোনো ঠিকানায় যাবে না।
তার কোনো কূল নেই, নেই কোনো ঘাট,
সে বয়ে চলে একা, বুক জুড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×