১৯৮৭ সালের ৩১ শে আগষ্ট, দিনটি ছিল সোমবার। দিনশেষের রাতে আমার জন্মদাত্রিকে কষ্টের চূড়ান্ত দিয়ে আমার জন্ম হয়েছিল। জন্মদিনে এই মানুষটার প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা বোধ করি, জন্ম দেয়ার সময় থেকেই জ্বালানো শুরু করেছি, অথচ কি আশ্চর্য্য…আমার জন্যে তাঁর ভালবাসার কোন শেষ নেই! তাঁর এই ঋণ কিভাবে শোধ করব তা ভেবে মাঝে মাঝে খুবই বিচলিত বোধ করি। আবার ভাবি ঋণ শোধ করারই বা দরকার কি! থাকুক কিছু ঋণ, কারো কারো কাছে ঋণী হয়ে থাকাতেই অধিক আনন্দ।
প্রতি জন্মদিনেই আমার কিছু অদ্ভুত অনুভূতি হয়। অনুভূতিগুলো লিখে ফেলতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু লিখতে গেলেই খুব অসহায় বোধ করি এবং বুঝতে পারি এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো শক্তিশালী প্রতিভা দিয়ে আমাকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়নি। কিছু কিছু মানুষের এই প্রতিভা আছে দেখে খুবই ঈর্ষা বোধ করি। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এরকম একজন অতি ভাগ্যবান মানুষ কিভাবে যেন তার একটা লেখার কিছু অংশে আমার অনুভূতিগুলো হুবহু প্রকাশ করে ফেলেছেন। কাজেই অনুভূতি প্রকাশে লেখাটার সাহায্য নিলাম। লেখকের নাম বলার প্রয়োজনবোধ করছিনা, লেখাই লেখকের পরিচয় প্রকাশ করবে।
আমার আপন আঁধার
তীব্র যন্ত্রনায় ঘুম ভাঙল। মনে হল সারা গায়ে কাঁটা ফুটে গেছে। নির্ঘাত কোন দুঃস্বপ্ন। ইদানীং ভয়ংকর সব দুঃস্বপ্ন দেখছি। আমি চোখ মেলে দেখি – দুঃস্বপ্ন নয়, আসলেই কাঁটা ফুটেছে। বিছানাময় গোলাপ ফুল। পাশ ফিরতেই গায়ে গোলাপের কাঁটা বিঁধল। ব্যাপার বুঝতে বেশি সময় লাগল না। আজ আমার জন্মদিন। আমার কন্যারা তাদের উদ্ভাবনী শক্তি প্রয়োগ করে বিছানাময় কাঁটাসুদ্ধ গোলাপ বিছিয়ে রেখেছে। ফুলের কাঁটাই বিঁধেছে। ফুলশয্যা সবসময় আনন্দময় নয়।
আমি আবার চোখ বন্ধ করে ফেললাম। এখন জেগে উঠা যাবে না। আমার কন্যারা নিশ্চয় আমাকে জাগাবার জন্যেও কোন বিশেষ ব্যবস্থা করে রেখেছে। ওদের বঞ্ছিত করা ঠিক হবেনা। কাঁটার ঘা শরীরে নিয়ে গভীর ঘুমের ভান করলাম।
বিকট শব্দে রেকর্ড প্লেয়ার বেজে উঠল। এই হচ্ছে আমাকে জাগাবার কৌশল। কয়েকদিন ধরে যে গানটি বাজাচ্ছি কন্যারা সেই গানটি ফুল ভল্যুমে দিয়ে দিয়েছে। কানের পর্দা ফেটে যাবার অবস্থা। আমি বিছানায় উঠে বসলাম। তিন কন্যা একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলো-“হেপি বার্থ ডে”। বড় কন্যার হাতে একটা ট্রে। সেই ট্রে’তে একটা কাপ। কানায় কানায় ভর্তি চা। চায়ে দুধের সর ভাসছে। মনে হচ্ছে কন্যারা তাদের সমস্ত প্রতিভা ব্যয় করে চা বানিয়েছে।
আমি বিছানায় গোলাপ দেখে বিস্মিত হবার ভান করলাম, আমার প্রিয় গানটি বাজছে দেখে মহা আনন্দিত হবার ভান করলাম। ওদের বানানো হিমশীতল সরবত সদৃশ চা মুখে দিয়ে তৃপ্তির ভান করলাম। ছোট মেয়ে বলল, আব্বু, তোমার কী খুব আনন্দ হচ্ছে?
আমি বললাম, হচ্ছে। এত আনন্দ হচ্ছে মনে হয় চোখে পানি এসে যাবে।
‘আমাদেরো খুব আনন্দ হচ্ছে। কারন আজ আমরা কেউ স্কুলে যাচ্ছি না। সারাদিন ঘরে থাকব।’
‘খুব ভাল কথা।’
‘আজ আমরাই তোমার জন্যে রান্না করব।’
‘তোমরা কি রান্না জান?’
‘না, জানি না – মা দেখিয়ে দেবে।’
‘খুব ভাল।’
‘আমাদের চা কেমন লাগল বাবা?’
‘অসাধারন লাগল। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সেরা চা খাচ্ছি।’
‘আরেক কাপ বানিয়ে নিয়ে আসব?’
‘না, আর আনতে হবে না।’
‘জন্মদিনে তোমার জন্যে আমরা উপহার কিনেছি। শার্ট কিনেছি।’
‘বাহ বাহ – কোথায়?’
তিন কন্যার কিনে আনা উপহার গায়ে দিলাম। পৃথিবীর সমস্ত মেয়েরাই মনে করে তাদের বাবা বিশালকায় একজন মানুষ। আমার মেয়েরাও যে তার ব্যতিক্রম না তাদের কেনা শার্ট গায়ে দিয়ে পরিস্কার বোঝা গেল। শার্ট পাঞ্জাবীর চেয়ে লম্বা। কাঁধের ঝুল নেমে এসেছে কনুই-এ।
মেজো মেয়ে শংকিত গলায় বলল, শার্টটা কী তোমার একটু বড় বড় লাগছে?
‘না তো। গায়ে খুব ভাল ফিট করেছে। আজকাল লম্বা শার্ট পরাই ফ্যাশন।’
হাজী সাহেবের লম্বা কুর্তার মত শার্ট গায়ে দিয়ে বারান্দায় এসে দেখি মেঝেময় ভাঙা কাচের টুকরো। ফুলদানিতে ফুল রাখতে গিয়ে কন্যারা দুটো ফুলদানি ভেঙেছে। কাজের মেয়েকে ভাঙা কাঁচ সরাতে দেয়া হচ্ছে না-কারণ এই বিশেষ দিনে আমার তিন কন্যাই না-কি ঘরের সব কাজ করবে।
বারান্দায় এসে বসলাম। রবীন্দ্র সংগীত বন্ধ হয়েছে বলে খানিকটা স্বস্তি পাচ্ছি। দিনের শুরুতে রবীন্দ্র সংগীত শুনতে আমার ভাল লাগে না। এক কাপ চা খেতে ইচ্ছা হচ্ছে। বলার সাহস পাচ্ছি না। বলামাত্রই তিনজন ছুটে যাবে রান্নাঘরে। আগুন টাগুন ধরিয়ে একটা কান্ড করবে।
মেজো মেয়ে বলল, বাবা, তোমার কেমন লাগছে?
‘খুব ভাল লাগছে, মা।’
‘আনন্দ হচ্ছে?’
‘অসম্ভব আনন্দ হচ্ছে।’
‘তোমাকে দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে না।’
আমি আনন্দিত হবার ভান করলাম, অভিনয় খুব ভাল হল না। বড় মেয়ে বলল, বাবা গান দেব?
‘গান থাক মা।’
‘তোমার সব প্রিয় গান ক্যাসেট করে রেখেছি।’
‘তাহলে দাও।’
প্রথম গানটি কী কাকতালীয় ভাবেই মিলে গেল-অরুন্ধতী হোম গাইছেন,
“সখী বহে গেল বেলা, শুধু হাসি খেলা।
একি আর ভাল লাগে?”
আচ্ছা, আজ আমার হয়েছেটা কী? এত চেনা গান অচেনা লাগছে কেন? কত অসংখ্যবার এই গান শুনেছি, কই কখনো তো এত বিষন্ন বোধ করি নি? কেউ যেন কানের কাছে গুনগুন করে বলছে-না চাইতেই তুমি অনেক পেয়েছ। এই জীবনে তুমি দেখেছ ৫১৬টি ভরা পূর্ণিমা। তুমি পার করেছ ৪৩টি বর্ষা। এত সৌভাগ্য ক’জনের হয়!
বাবা-মা’র যে ভালোবাসায় আমার জন্ম, তাতে মনে হয় কোন খাদ ছিল না। দীর্ঘ ৪৩ বছরে একদিনের জন্যেও আমার মনে হয়নি বৃথাই এই পৃথিবীতে জন্মেছি। প্রচন্ড দুঃসময়েও বেঁচে থাকার আনন্দ অনুভব করেছি। বৈশাখ মাসে যখন আকাশ অন্ধকার করে কালবোশেখী আসে, তখন মনে হয়, কী ক্ষতি ছিল পৃথিবীটা যদি আরেকটু কম সুন্দর হত। এত সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে যাব কী করে!
একবার নর্থ ডাকোটা থেকে গাড়িতে করে সিয়াটল যাচ্ছি, পথে মন্টানায় রাত্রিযাপনের জন্য থামলাম।চারদিকে পাহাড়ঘেরা সমতলভূমি। বাচ্চাদের হোটেলে শুইয়ে বাইরে এসে দাঁড়াতেই প্রচন্ড ধাক্কা খেলাম। রূপার থালার মত প্রকান্ড চাঁদ উঠেছে। অপূর্ব জোৎস্না। জোৎস্না ভেঙে আলো-আধারের অপূর্ব নকশা তৈরি হয়েছে পাহাড়ের গায়ে। আমি স্তব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। মহান সৌন্দর্যের মুখোমুখি হলে এক ধরনের তীব্র হাহাকার মনের ভেতর আপনা-আপনি জন্মায়-সুন্দরের উৎস সন্ধানে ব্যাকুলতা জাগে।
সৌন্দর্য দেখে দেখে জীবন কাটিয়ে দিলাম, এই সুন্দরের জন্ম কোথায়, কোন দিন তার খোঁজ করলাম না। এই জীবনে সম্ভব হল না-হায়! অন্য কোন জীবনও তো নেই, থাকলে চেষ্টা করা যেত।
ছোটবেলায় আমাদের মীরাবাজারের বাসায় একজন হিন্দু ব্রাহ্মণ বেড়াতে আসতেন। আমার বাবা-মা দু’জনই ছিলেন তাঁর ভক্ত। এই চিরকুমার মানুষটে নাকি মহাপুরুষ পর্যায়ের। ঘুরে বেড়াতেন খালি পায়ে, অতি তুচ্ছ বিষয়ে হা-হা করে হাসতেন। তখন আমার ধারনা হল-মহাপুরুষদের খালি পায়ে থাকতে হয়, অকারনে হাসতে হয়। এক সন্ধার কথা-তিনি বেড়াতে এসেছেন। মা বললেন-আপনি খুব ভালো দিনে এসেছেন, আমার কাজলের জন্যে একটু প্রার্থণা করুন। আজ কাজলের জন্মদিন।তিনি আমাকে টেনে কোলে তুলে বললেন-গা দিয়ে ঘামের গন্ধ বেরুচ্ছে, কী রে বেটা, গায়ে ঘামের ঘন্ধ কেন? এই বলেই চোখ বন্ধ করে প্রার্থণা করলেন, পরম করুণাময়, এই ছেলের অন্তর থেকে তুমি অন্ধকার দূর কর।
তাঁর প্রার্থণা ঈশ্বর গ্রহন করেন নি। আমার অন্তরে এমন সব অন্ধকার আছে যা দেখে আমি নিজেও মাঝে মাঝে ভয়ে চমকে উঠি। কাউকে সেই অন্ধকার দেখতে দেই না। আলোকিত অংশটাই দেখতে দিই, কারণ এই আধাঁর আমার আপন আধাঁর। আমার নিজস্ব অনন্ত অম্বর।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


