বাবা,
আশা করি তুমি ভালো আছো। আমি ভালো নেই। টাইফয়েড নামক রোগটা আমাকে ভয়াবহ দূর্বল করে দিয়েছে। এক সপ্তাহ হয়ে গেলো জাউভাত নামক অতি অখাদ্য এক খাবার ছাড়া আর কিছুই খেতে পারছিনা। একবার অসুখটা সেরে গেলে কি কি খাবো সারাদিন তাই চিন্তা করি। প্রিয় খাদ্যের তালিকায় লবস্টার আসতেই হঠাৎ তোমার সাথে আমার একটা স্মৃতি মনে পড়ে গেল।
আমার মা আর তোমার মাঝে ঝামেলার দিনগুলোতে আমি খুব কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমি সব সময়ই কল্পনা করতাম সব কিছুই একদিন আগের মতো হয়ে যাবে। কিন্তু আমার ধারনা ভূল ছিল, কিছুই আর আগের মতো হয়নি। আমার সব স্বপ্ন ভেঙ্গে দিয়ে একদিন তোমাদের বিচ্ছেদ হয়ে গেল। হঠাৎ করে আবিস্কার করলাম আমার সমস্ত পৃথিবীটা যেন ধ্বংস হয়ে গেছে যা আমি আর কোনদিন ফিরে পাবোনা।
আমি নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করছিলাম। আমার মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল তোমাকে আমি আর কখনো বাবা হিসেবে কাছে পাবোনা। কিছুদিন পর হঠাৎ একদিন তুমি আমাকে বাজার থেকে বিশাল লবস্টার কেনার খবর পাঠালে এবং তোমার বাসায় একসাথে খাওয়ার আমন্ত্রণ জানালে। কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব! আমরা দুজনেই জানতাম এটা সম্ভব না। রোম যখন পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে তখন জেনেশুনে আমরা নিরো সেজে মধুর বাঁশি বাজাতে পারিনা। কি আশ্চর্য! কিছুক্ষন পর দারোয়ান চাচা এসে জানালেন তুমি দরজার বাইরে আস্ত একটা লবস্টার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো! আমি হতবাক আর বিস্মিত হয়ে দ্রুত নিচে নেমে আসলাম। তুমি বললে “বাবা, তোমার সাথে লবস্টার ভাগাভাগি করে খাওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল, বুঝতে পারছি এই মূহুর্তে ব্যাপারটা সম্ভব না। আমি কিন্তু সবসময় তোমার জন্যে অপেক্ষা করব। একদিন তুমি চাইলে হয়তো আবার আমরা একসাথে চমৎকার কিছু সময় কাটাবো। আপাতত তুমি এটা রাখো।” আমি তোমার হাতের বিশাল জীবন্ত লবস্টারের দিকে তাকালাম। গোল গোল চোখের অসম্ভব কুৎসিত সেই প্রাণীটাকেই তখন কি যে সুন্দর লাগছিল! কারন ততক্ষণে আমি জেনে গিয়েছি আমার বাবা কখনোই আমাকে ভুলে যাবেনা।
তোমার পাশে যতোটা থাকা উচিৎ ছিলো তা কখনোই আমি থাকতে পারিনি। যখন তোমাকে খুব কাছে চাইতাম, তোমাকে পেতাম না। আবার তুমি যখন আমাকে খুঁজতে আমি নিজের মধ্যেই গুটিয়ে থাকতাম। কি করব বাবা আমি তো তোমার মতো কথাশিল্পী নই! তুমি যখন অপারেশনের আগে শেষবার ঢাকায় এলে তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করত। কিন্তু প্রতিবারই তোমার দরজায় আমাকে নিরাপত্তারক্ষীর অজস্র প্রশ্নের মুখে পড়তে হতো। এটা যে ছেলে হিসেবে কতটা যন্ত্রণার সেটা কি তুমি জানো! এখন মনে হচ্ছে এগুলো আসলে আমি চিন্তা করে করে অজুহাত বানাচ্ছি, এই দুঃসময়ে সবসময় তোমার পাশে আমার থাকা উচিৎ ছিলো। বাবা, আমার কেবলই মনে হচ্ছে অনেক বড় একটা ভুল করে ফেলেছি। আমি যে তোমাকে কতটা মিস করি সেটা তোমাকে কখনো বলা হয়নি। তোমাকে কাছে না পেয়ে আমার ভেতরটা যে কিরকম দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে তা কি তুমি জানো বাবা? তোমাকে দেয়ার মতো আমার কিছুই নেই, মনে করো এই চিঠিটাই তোমার জন্যে আমার লবস্টার।
(প্রিয় বাবাকে নুহাশের লেখা চিঠি অবলম্বনে)
আসল চিঠিটি এখানে - An unsent letter
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা আগস্ট, ২০১২ ভোর ৫:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


