যেকোন গেরস্থই জানে, ঘরের ভিতে ইঁদুরের গর্তে সাপের খোঁজ পেলে তাকে ঝাড়ে-বংশে নিঃশেষ করতে হয়। এটা কিছুটা নির্মম মনে হলেও পরিজনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই এমন কাজ করতে হয়।
আমাদের ভুল হ'য়েছিলো সেখানেই --- ৭১এর ১৬ই ডিসেম্বরের পরপরই প্রত্যেকটা রাজাকারকে ধরে দ্রুত বিচার ব্যবস্থায় এদের ফাঁসিতে ঝুলানো উচিৎ ছিলো। তা আমরা করিনি, আর সেই ভুলের মাশুল আজকে আমরা দিচ্ছি --- পাকিস্তানি সেনাদের চাকর, জামাতে ইসলামীর "অধ্যাপক" গোলাম আযম ও মতিউর রহমান নিজামীর নেতৃত্বে সংগঠিত আল-বদর নামক গুণ্ডা-বাহিনীর কুকর্মের ফয়সালা করিনি বলেই আজকে তাদের এত আস্পর্ধা! বীরদর্পে আজ তারা বলছে রাজাকার বলে কেউ নেই, কখনোই ছিলোনা; আরো বলছে '৭১এর ওই "গণ্ডগোল" গণহত্যা নয়, ছিল গৃহযুদ্ধ।
শেখ মুজিব কিছু দালালকে ক্ষমা প্রদর্শন করেছিলেন বটে, তবে যারা অত্যাচার, নারী-ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলো তাদের নয়। তাদের বিচার সবে শুরু হ'তে যাচ্ছিলো, কিন্তু ৭৫ সালে কিছু পাকিস্তান-পন্থী সেনা যখন তাদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ শেষে আওয়ামী লীগেরই এক পাকিস্তানী চর ও খুনী খন্দকার মোশতাক আহমেদকে ক্ষমতায় বসালো, তখন এই বিচার প্রক্রিয়ার দফারফা হ'লো। সব রাজাকার মুক্তি পেলো। এর কিছুদিনের মধ্যেই জেনারেল জিয়া, যিনি সব সময়েই যেদিকে হাওয়া বয় সেদিকেই নৌকা বাইবার জন্য বিখ্যাত, নেহায়েতই ঘটনাচক্রে(?) ক্ষমতায় বসে গেলেন। সেই ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে গিয়ে দেশান্তরী গোলাম আযমকে ফিরিয়ে আনলেন, নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিলেন।
গোলাম আযম নিজে হয়তো মানুষ খুন করেন নি। কিন্তু ঘাতক-দালালদের নেতা হিসেবে যেকোন আন্তর্জাতিক আইনেই তাঁর অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য, নতুবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডযোগ্য। একই কথা খাটে নিজামীর বেলাতেও। শেখ মুজিব এদের যথাযথ বিচার না করে গোলাম আযমকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিলেন কেন? শেখ মুজিব আর তাঁর আওয়ামী লীগের সরকার অনেক ভুলই করেছে --- কিন্তু এই ভুলটাই ছিলো সবচেয়ে মারাত্মক। অনেকে বলেন আন্তর্জাতিক চাপের মুখে, বিশেষতঃ ইসলামী ঐক্যজোটের স্বীকৃতি পাওয়ার আশায় তাঁকে এসব করতে হয়েছে। অনেকে বলেন বঙ্গবন্ধুর আসলে ইতিহাস, আইন, সরকার-চালনা, ইত্যাদি বিষয়ে তেমন গভীরভাবে কোন পড়াশোনা ছিলোনা। আর বাঙ্গালীর প্রতি ছিলো তাঁর অতিরিক্ত দরদ। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন এই দালালেরা একদিন নিজেদের ভুল স্বীকার করে নিয়ে আর দশটা নিরীহ নাগরিকের মতই কায়মনে বাঙ্গালী হয়ে জীবন কাটিয়ে দেবে। আর সদ্য-স্বাধীন দেশের নেতা হিশেবে তাঁর বুঝিবা প্রধান দায়িত্ব ছিলো যেকোন মূল্যে দেশবাসীর মুখে ভাত তুলে দেওয়া।
দালালের দল বাঙ্গালী তো হয়ইনি, বরং ওদের পাকিস্তানি ভূত তালেবানী ইসলামী চেহারা নিয়ে ওদের কাঁধে জাঁকিয়ে বসেছে। শুরুতে আরো জুটেছিলো সৌদি ডলার --- এখন এরা বেনামে ব্যাঙ্ক-হাসপাতালের ব্যবসা করেই নাকি সমস্ত বদমায়েশীর পয়সা জোটায়। এরা আরো দাবী করে নিজেদেরকে ইসলামের একমাত্র এজেণ্ট বলে। যদিও এই ইসলাম এমন এক ইসলাম যার সঙ্গে আমাদের কোন পরিচয় নেই। দরকারও নেই। সাচ্চা বাঙলাদেশীরা নাকি তাদের মুসলমান পরিচয়ে গর্ব বোধ করে!
কই, আমিতো নিজেকে মুসলমান বলেই পরিচয় দেই না! আমি কি তাহলে বাঙলাদেশী নই? আর হিন্দু-বৌদ্ধ-পাহাড়ীদের কি অবস্থা হবে? "ধর্মনিরপেক্ষতা মানেই ধর্মহীনতা" এই বুলি আওড়াতে আওড়াতে মুখে ফেনা তুলে এরা শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার মাথায় পর্যন্ত ঘোমটা উঠিয়ে ছেড়েছে!
রাজনীতির অঙ্গনে ধর্মের ব্যবসা জামাতিদের অনেক পুরনো কৌশল --- এদের আদি সংগঠক "মাওলানা" আবুল আ'লা মওদুদী পাঞ্জাবের মতো খাঁটি ইসলামী প্রদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর জন্য ফাঁসীতে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলেন। কিন্তু আরেক সামরিক শাসক তাঁকেও মাপ করে দিয়েছিলো।
'৭১এর ধারা অব্যাহত রেখে এরপর জামাতের অঙ্গ সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির এতদিন ছুরি-কিরীচ-বন্দুক দিয়ে ক্যাম্পাস দখলের রাজনীতি করেছে --- শেষমেষ বিএনপির ঘাড়ে চড়ে সংসদে ঢুকে এখন তারা সবাই স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করছে --- আর কিছু বিভ্রান্ত বাঙ্গালী এরপরও দাবী করবে জামাত একটি সৎ রাজনৈতিক দল? তারা চুরি করেনা; খালি মিথ্যা কথা বলে, মানুষের হাত-পা-রগ কাটে, আর মাঝে-মধ্যে গুলি-বোমাবাজী করে দু'য়েকটা খুন-খারাপী --- কিন্তু তারা তো চুরী করে না!!!
গত ছত্রিশ বছরে সাপের বাচ্চাগুলোরও আরো অনেক বাচ্চা-কাচ্চা হয়েছে --- এদের নিয়ে আমরা এখন কি করি, সেকথা ভাবার আগে সেই আদি সাপের মেরুদণ্ড ভাঙ্গার ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক দেরী হয়ে গেলেও আমাদের সেই আদি ভুল শোধরাতে হবেই। নতুবা বাপ-দাদার বাঙ্গালী বংশ-পরিচয় আর থাকবেনা ।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে অক্টোবর, ২০০৭ সকাল ৮:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


