somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

(গল্প) এবং ছায়াবৃত্ত

০৭ ই জুন, ২০১৬ রাত ১১:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আকাশটা এত বেশি উজ্জ্বল যে চোখ কড়কড় করে ওঠে। বেশিক্ষন তাকিয়ে থাকা যায় না। দিনের প্রথম আকাশের এই ব্যাপারটা আগে খেয়াল করিনি। ভোরে বের হওয়ার এই এক মজা- প্রতিদিনই নতুন কিছু না কিছু চোখে পড়ে। এজন্যই সকালের ক্লাসের ব্যাপারটিও খুব একটা খারাপ লাগে না ইদানিং। ঘুম থেকে উঠতে যদিও ঝামেলা, তবু এই ক'দিনে অভ্যাস হয়ে গেছে। প্রথম প্রথম বিরক্ত লাগতো, এখন ভালোই লাগে। সকালটা দেখা যায়। চারিদিক কেমন শান্ত, স্নিগ্ধ- একটা আরামদায়ক শীতল পরিবেশ।

পাখিরা ডাকছে। কিচকিচ কিচমিচ, ঠুঠুঠু। ঘুরেফিরে একই অর্থহীন কিছু শব্দ- কোনো নতুনত্ব নেই। অথচ শুনতে ভারী মিষ্টি লাগে। না চাইতেও ঠোঁটের কোণ বেয়ে ছোট একটা হাসি ঝুলে পড়লো। বুকের কাছে একটা 'সুখের মতো চিনচিনে ব্যথা' লাগে। কখনো কখনো এমন হয়। সবকিছু ভালো লাগে। আনন্দ যেন বাচ্চাদের মতো ছোট ছোট দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরতে চায়।

গলিটা ছেড়ে বড় রাস্তায় আসতেই কিছু স্বাস্থ্যসন্ধানী মানুষের সাথে দেখা। সামনে পার্ক। হাঁটতে বের হয়েছে তারা। দিন দিন শহরের ভোরে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কেউই মরতে রাজী না- সবাই আরো কিছুদিন বাঁচতে চায়। আস্তে ধীরে তাদের পেছনে হাঁটতে থাকি। হাতে অনেকটা সময় নিয়েই বের হই আমি। কোনো তাড়াহুড়ো নেই।

একজোড়া বৃদ্ধ দম্পতি হাঁটতে বেরিয়েছেন। দু'জনের পরনেই সাদা পোশাক। তাদের মধ্যে বোধহয় কিছু একটা নিয়ে মৃদু কথা কাটাকাটি হচ্ছে। ভদ্রমহিলা মৃদু স্বরে কিছু একটা বলছেন। ভদ্রলোক হেসে প্রতিবাদ করলেন। তাদের পাশ কাটিয়ে যাবার সময় শুধু শেষের কথাটা কানে আসলো-
'আরে আমি মিষ্টি খেতে যাবো কেন?'
নিশ্চয়ই রাতে ফ্রীজ খুলে কাণ্ডটা ঘটিয়েছেন। কিন্তু গিন্নীর চোখ ফাঁকি দেয়া কী এত সোজা। সকালে ঠিক ঠিক ধরা পড়েছেন। এখন চলছে আত্নপক্ষ সমর্থন। যদিও লাভ হবে না। দুপুরের আগে রাগ পড়বে না বোঝা যাচ্ছে।

আরো কিছুটা এগোতেই রাস্তার পাশে একটা ডাস্টবিন এসে হাজির হলো। সকালের ডাস্টবিনগুলোও অতটা নোংরা থাকে না। সেখানে আরেক মজাদার দৃশ্য অপেক্ষা করছে। কিছু কাক চোখ-মুখ শুকনো করে বসে আছে। তাদের মাঝে কেমন একটা চাপা উত্তেজনার ভাব। দূর থেকে দেখলে মনে হয় কোন গোপন সভা বসেছে।

কাকগুলো কিছু একটা ঘিরে আছে। একটা পুঁটলি বা এই ধরনের কিছু। ডাস্টবিনে এরকম বস্তু হরহামেশাই দেখা যায়। কিন্তু ভালো করে খেয়াল করে দেখতে গিয়েই ধাক্কাটা খেলাম। কাপড়ের পুঁটলির ভেতর থেকে একটি অপরিণত মৃত শিশু উঁকি দিয়ে চিৎকার করে উঠলো। দেখে গায়ে কাঁটা দেয়। ততক্ষনে চমৎকার ভোরের পবিত্রতা গলায় আটকে গেছে।

এরকম অনাকাঙ্খিত শিশুদের কথা কখনো যে শুনিনি তা নয়। শহরে বিচক্ষন বাবা-মায়েদের সংখ্যা বাড়তির দিকে। কিন্তু একটি জলজ্যান্ত মৃত শিশু যে কোন সকালে এসে এভাবে গলা চেপে ধরবে- কখনো কল্পনায় আসে নি।

শিশুটিকে ঘিরে কাকদের বার্ষিক বনভোজন চলছে। তার ছোট দেহটা আকাশের দিকে মুখ করে কুঁকড়ে আছে। চারিদিকে চাপ চাপ জমাট বাঁধা কালচে রক্ত। খুবলে খাওয়া পেটের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে অনন্ত ক্ষুদা। তার চোখগুলো জায়গামতো নেই- কাকগুলো ঠুকরে নিয়েছে। চোখের মনি দু'টোর শূন্যস্থান ভর্তি একটা তরল অনন্ত অন্ধকার।

বীভৎস দৃশ্যটা মাথার ভেতর ডিগবাজী খায়। মাথাটা ফাঁপা লাগে। মনে হচ্ছে পেটের ভেতর থেকে কিছু একটা উঠে এসে গলা চেপে ধরতে চাইছে। রাস্তার মাঝেই বসে পড়তে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখনই কাকগুলো কা কা করে কিছুটা দূরে সরে যায়। আর কোত্থেকে একটা কালো কুকুর এসে হাজির হয়। তড়িঘড়ি করে বাচ্চাটাকে মুখে নিয়ে সে পেছনের একটা ডোবার দিকে ছুট লাগালো। সেই অর্ধেকটা শরীর থেকে তখনো এক-দুই ফোঁটা করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।

এবার আর সম্ভব হলো না। মুখ চেপে বসে পড়লাম। মনে হচ্ছিলো মরে যাবো। কিছুক্ষন পর পেটের কিছু বিষ উগড়ে দিয়ে যখন উঠে দাঁড়ালাম, প্রচন্ড পরিশ্রমে চোখগুলো ভিজে লাল হয়ে গেছে। শরীর ভীষন ক্লান্তিতে ভেজা। বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে।

একটু সুস্থির হয়ে ডাস্টবিনটার উল্টোপাশের ফুটপাতে পা ছড়িয়ে বসলাম। হুট করে একসাথে এত কিছু ঘটে গেলো যে এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারছি না। একটু আগের ঘটনাটা তার সহস্র শুঁড় নিয়ে মাথার ভেতর কিলবিল করে। পৃথিবীর আলো বেড়ে যাচ্ছে। যেকোন সময় টুপটাপ রোদ শুরু হবে।

কুকুরটার চোরের মত সরে পড়ার দৃশ্যটা মগজে হুল ফোটাচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে তা আরো ভেতরে গেঁথে যায়। তাতে শুরুর বিষ্ময়, মন খারাপ ভাবটা ঝাপসা হয়ে তার বদলে একটুকরো অচেনা ঘৃণা মনের ভেতর মুক্তোর মতো দানা বাঁধতে থাকে।

আশেপাশের সবাই যার যার মতো চলছে। কেউ ব্যাপারটা খেয়ালই করলো না। অথচ আমার কাছে মনে হচ্ছে- তারা ইচ্ছা করেই এড়িয়ে গেছে, খেয়াল করার প্রয়োজন মনে করে নি। এটা ভাবতেই একটা চিকন ক্রোধ মাথার ভেতর চিড়িক দিয়ে উঠলো। শক্ত হয়ে ওঠা চোঁয়াল নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। এখন আমি জানি কি করতে হবে। চোখ সরু হয়ে এলো। একটা সামান্য কুকুরের এতো সাহস।

'শুয়োরের বাচ্চা'
বিড়বিড় করে রাস্তার পাশ থেকে একটা বড়সড়ো ইটের টুকরো তুলে নিলাম। মাথায় খুন চেপে বসেছে। অচেনা একটা রাগে আঙ্গুলের ডগা পর্যন্ত কাঁপছে। খানিক আগে কুকুরটা যে পথে গেছে, ডাস্টবিনের পাশ দিয়ে দ্রুত পায়ে সেদিকে এগোলাম। হাতে পৃথিবীর আদিমতম অস্ত্র।

বাঁক ঘুরতেই কিছুটা দূরে শয়তান কুকুরকে দেখা গেলো। চুপচাপ বসে আছে। তার ঠিক সামনেই বিক্ষত অর্ধেক দেহটা পড়ে আছে। সেটাকে এখন আর শিশুর দেহ বলে চেনার তেমন কোন উপায় নেই। ইটটা তুলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তার পাশে থাকা আরেকটি কুকুরের ওপর নজর পড়তেই কেমন যেন হাত জমে যায়। একটা সাদা-কালো ফুটকিওয়ালা কুকুরের বাচ্চা নিয়মিত বিরতিতে তার ছোট লেজ নেড়ে যাচ্ছে।

বাচ্চা কুকুরটি নাক নামিয়ে মায়ের এনে দেয়া অচেনা খাবারটি শুঁকছে। মাঝে মাঝে আড়চোখে মায়ের দিকে তাকায়। মায়ের এদিকে নজর নেই দেখে কুঁই কুঁই করে শরীরের সাথে শরীর ঘষে, আবার মাংসপিন্ডটার কাছে যায়। দেখে মনে হয় এটাকে সে নতুন একটা খেলা হিসেবে নিয়েছে।

পৃথিবীতে এখনো কুকুর সভ্যতার বিকাশ হয়নি। ভাগ্যিস হয়নি। তা না হলে এই কুকুর শিশুটিও হয়ত জন্মের পরই খুন হতো। বঞ্চিত হতো এই চমৎকার খেলা থেকে। এখানে এখন সভ্যতার দামে জীবন বিক্রি হয়।

কখন যে হাতের মুঠো শিথিল হয়ে গিয়েছিলো জানি না। হঠাৎ ঝুপ শব্দ শুনে বুঝলাম হাত থেকে ঢিলটি আলগা হয়ে মাটিতে পড়ে গেছে। সেই শব্দে মা কুকুরটি চট করে আমার দিকে তাকায়। সেই জ্বলজ্বলে চোখে একটা বিদ্রূপমাখানো দৃষ্টি যেন খিলখিল করে ওঠে। মানুষ হিসেবে এর আগে কারো সামনে নিজেকে এতটা ছোট মনে হয় নি। অপমান আর লজ্জায় চোখে পানি এসে যায়।

মা কুকুরটি উঠে দাঁড়ায়। মাথা দুলিয়ে আস্তে করে অন্যদিকে হাঁটা দিলো। বাচ্চাটি মানুষের শরীরটাকে শেষ বারের মতো শুঁকে রেখে ছোট ছোট পা ফেলে মায়ের পিছু পিছু দৌড়ায়। ঝাপসা চোখে দেখি তাদের পেছনে পড়ে আছে একটি মনুষ্য সন্তান।

দিশেহারার মতো লাগে। চারিদিকে সাপের ফনার মতো রোদ ছড়িয়ে পড়েছে। ভীষন অশুভরকম একটা অনুভূতি কানের কাছে ফিস ফিস করে চলে। বার বার মনে হচ্ছে পালাতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুন, ২০১৬ ভোর ৪:৫২
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইউনূস স্যার ক্ষমতায় থাকলে রোহিঙ্গারা এই বছর ঈদ করত মিয়ানমারে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৭ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৮:০৭


সেদিন উখিয়ার তপ্ত বালুর ওপর দাঁড়িয়ে প্রফেসর ইউনূস যখন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক টানে ঘোষণা করলেন—"তোয়ারা আগামী ইঁদত নিজর দেশত ফিরি যাইবা", তখন মনে হচ্ছিল মুহূর্তের জন্য পুরো বিশ্বটা বুঝি স্ট্যাচু... ...বাকিটুকু পড়ুন

সজিব কখনো তারেক নয়॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১৮ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ৯:০০



বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয় নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছে।এর মধ্যে একটি বহুল আলোচিত মিথ্যা প্রোপাগান্ডা হচ্ছে - সজীব ওয়াজেদ জয় কি সার্চ ইঞ্জিন আবিষ্কার... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার কি ভালো লাগে, ভূত না জ্বীন?

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৮ ই মার্চ, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



হ্যা ভূতের গল্প ভালো লাগে।
নলে অবাক হবেন, আমি নিজেও ভূতের কবলে পড়েছি অনেকবার। অথচ জ্ঞানীগুণীরা বলেন, ভূত বলতে কিছু নেই। এই আধুনিক যুগে আমি নিজেও বিশ্বাস করি ভূত... ...বাকিটুকু পড়ুন

শামস সুমন: এক মধ্যবিত্ত অভিনেতার নিঃশব্দ রুচিকর প্রস্থান

লিখেছেন শরৎ চৌধুরী, ১৮ ই মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭

শামস সুমন বিষয়ক সংবাদটি যখন স্ক্রীণে পৌছালো ততক্ষণে আমরা ঋদ্ধি ক্যাফেতে, মিরপুর। বসে আছি মাঝখানের টেবিলে। আমি দরজামুখি, ওপাশে রমিন এবং তার পাশে আরো দশ মিনিট পরে এসে বসবে ফরহাদ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার একটু ঘুম দরকার

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ১৮ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৮:০৭


আমার একটু ঘুম দরকার—
শান্তির, স্বস্তির গভীর এক ঘুম।
গা এলিয়ে, পা ছড়িয়ে দিয়ে
নিবিড়, নির্বিঘ্ন এমন এক ঘুম;
যে ঘুম পশুপাখির ডাক, মেঘের গর্জন,
বা বাঁশির সুরেও কখনও ভাঙবে না।

প্রভাত থেকে নিশীথ—বিরামহীন পথচলা,
ভাবনারা অহর্নিশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×