somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভ্রাম্যমাণ আদালত না সোনার পাথরবাটি

১৬ ই এপ্রিল, ২০০৬ সকাল ৭:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভ্রাম্যমাণ আদালত অবশ্যই প্রশংসনীয় ভাল কাজ করছে। খবরের কাগজগুলোতে তাদের বিবরণ পড়ে সকলে হাততালি দিচ্ছি এবং তার শব্দের কারণে আমরা সরকারের অযোগ্যতা খতিয়ে দেখতে মনস্ক হচ্ছি না। আগে হাততালি দেয়ার একদিনের ঘটনাগুলো বলা যাক। ওইদিন 12টি ভ্রাম্যমাণ আদালত 127টি মামলায় 12 লাখ 75 হাজার টাকা অর্থদণ্ড করেছে এবং দু'জনকে কারাদণ্ড দিয়েছে। মতিঝিলের একটি রেস্টুরেন্টের মালিককে পোড়া তেল ব্যবহার করার জন্য এবং অপর একটি রেস্টুরেন্টের রান্নাঘরে খোলা টয়লেট থাকার জন্য অর্থদণ্ড করা হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ও বিএসটিআইয়ের মানচিহ্ন না থাকা সস দেয়া পোকাযুক্ত খাবার খোলা অবস্থায় রাখার জন্য পান্থপথের একটি শপিংমলে 7টি ফাষ্টফুডের দোকানের মালিকদেরকে 1 লাখ 65 হাজার অর্থদণ্ড দেয়া হয়। দক্ষিণ নয়া বাজারে লাইসেন্স ছাড়া আইসক্রিম তৈরী করার অভিযোগে একটি কারখানার মালিক অর্থদণ্ড দেন। উত্তর মুগদাপাড়ায় একটি কারখানায় প্রচুর পরিমাণ নষ্ট মিষ্টি পাওয়া গেলে সেগুলো ড্রেনে ফেলে দিয়ে জরিমানা আদায় করা হয়।
কয়েক বছর আগের ঘটনা। অস্ট্রেলিয়ায় গবাদিপশুর খাদ্যের জন্য শনজাতীয় ঝোপ গাছের আবাদ করা হয়। কিন্তু ফুল ফোঁটার আগেই এগুলো গবাদিপশুর খাদ্যে ব্যবহার করা হয়। কারণ এই গাছগুলোর শুঁটি বা লম্বা বীজ কোষের দানা যেগুলো আমাদের দেশের মসুর ডালের মতো কিন্তু সামান্য বড় ও উজ্জ্বল রঙের সেগুলো পশুদের জন্য বিষাক্ত। অথচ সে সময় এগুলো আমদানি করে আমাদের বাজারে মসুরের ডাল হিসেবে বিক্রি হচ্ছিল। তখন কয়েকজন উদ্ভিদতত্ত্ববিদ এই জুয়াচুরি ধরে ফেলায় তার আমদানি ও বিক্রি বন্ধ হয়। এটা অখাদ্য অর্থাৎ নিষিদ্ধ খাদ্য, কুখ্যাদ্য কিন্তু তার চেয়েও ভয়ানক। কারণ এটা যে খাবার অনুপযুক্ত সেটা সব সময় বোঝা যায় না। ভ্রাম্যমাণ আদালতগুলোর কাজে খাদ্য বেপারীদের অসাধুতা প্রমাণে আসায় সরকারের ঘুম ভেঙেছে। সম্প্রতি ভেজাল রোধ আইন পাশ হয়েছে এবং এই আইনটির আওতায় 'পিওর ফুড কোর্ট' স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। এই আইনে প্রথম পর্যায়ে সর্বনিম্ন 2 শত টাকা জরিমানা বা 6 মাসের সশ্রম কারাদন্ড অথবা উভয় দণ্ড এবং সর্বোচ্চ 5 হাজার টাকা জরিমানা ও 1 বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়ার বিধান আছে। অতঃপর দ্বিতীয় পর্যায়ে 2 লাখ টাকা জরিমানা ও 3 বছরের সশ্রম কারদণ্ড দেয়ার বিধান আছে। খাদ্যে ভেজাল রোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে কোনো উৎপাদন প্রতিষ্ঠানে প্রবেশকালে বাধা দিলে এই অপরাধের জন্য এই আইনটিতে সর্বোচ্চ 3 লাখ টাকা জরিমানা ও 3 বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়ার বিধান আছে।
এখন লাখ টাকার প্রশ্নটি হচ্ছে খাদ্যদ্রব্য ভেজালের যে ভয়াবহ কর্মকাণ্ড চলছে তা রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালতগুলোর অভিযান এবং এই আইনটি যথেষ্ট কিনা। খড়ের গাদা থেকে সব সূঁূচ খুঁজে বের করা যেমন সম্ভব নয় তেমনি সব ভয়াবহ কর্মকাণ্ড বের করার ষোল আনা উপায় এগুলো নয়। কিন্তু কেন নয় তার গোড়ার গলদ দুটি আমাদের জানতে হবে।

প্রথমতঃ আমরা ধরে নিচ্ছি অসাধু খাদ্য বেপারিরা কুখাদ্য তৈরি করতে থাকবে এবং তাদেরকে ভ্রাম্যমাণ আদালতগুলো দ্বারা ভেজাল রোধ আইন দিয়ে শায়েসত্দা করা হবে। এটা ভুল ধারণা। পুষ্টিমানসম্মত নির্ভেজাল খাদ্য পাওয়া জনগণের একটি মৌলিক অধিকার। এই অধিকারের স্বীকৃতিস্বরূপ ইংল্যান্ডে 1987 সালে 'দি কনজিউমার্স প্রটেকশন অ্যাক্ট' (ভোক্তাদের স্বার্থ সংরৰণ আইন) সে দেশের পার্লামেন্ট কর্তর্ৃক প্রণীত ও পাশ হয়। যে কোনো একজন নাগরিক এই আইনের বলে ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ আদালতে মোকদ্দমা করতে পারেন যদি তার কাছে কোনো খাবার ত্রটিযুক্ত কিংবা ত্রটিপূর্ণ মনে হয় এবং মোকদ্দমার বাদি সরাসরি ওই খাবারের খরিদ্দার কিংবা ব্যবহারকারী নাও হতে পারেন তবুও আদালতের বিচারে খাদ্যবস্তুটি ত্রটিযুক্ত সাব্যসত্দ হলে ওই আইনে বাদিকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিধান আছে আর বাদি যদি নিজে খরিদ্দার কিংবা ব্যবহারকারী হন সেক্ষেত্রে তো প্রশ্নই ওঠে না। মনে করা যাক একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুত একটি পানীয় ত্রম্নটিযুক্ত। সে ক্ষেত্রে যদি শতাধিক ব্যক্তি আদালতে মোকদ্দমা করেন, তা হলে তাদেরকে ক্ষতিপূরণ দিতে ওই ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যাবে। ইউরোপের অধিকাংশ দেশে অনুরূপ আইন আছে এবং কোনো কোনো দেশে বৃহৎ শপিংমলগুলোর ভেতরেই কনজিউমার্স কোর্ট আছে। এই একটিমাত্র কারণে বিদেশে কোনো কোম্পানীই তাদের তৈরি কোনো খাদ্যবস্তু কিংবা প্রসাধন সামগ্রী ত্রম্নটিপূর্ণ করতে সাহস পায় না।
বিদেশে উপরোক্ত আইনটি পাস করার পেছনে যে মূলনীতি কার্যকর সেটা হচ্ছে একটি গণপ্রজাতন্ত্রী দেশের সরকার, শুধু জনগণের নয় জনকতৃত্বের হতে হবে। গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে কেবল ভোট দেয়ার সমান অধিকার নয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনেও সব মানুষের প্রয়োগিক কতর্ৃত্ব থাকতে হবে। সংসদীয় গণতন্ত্রের দুর্বলতম দিক হচ্ছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কতর্ৃত্ব প্রয়োগ করার ক্ষমতা কিছু লোকের হাতে থাকে। যাদের মধ্যে অসাধু খাদ্য ব্যবসায়ীরাও থাকার সম্ভবনা থাকে। একটু লক্ষ্য করলে, প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, সহজেই বুঝতে পারবেন ইংল্যান্ডের 'ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ আইনটিতে জনগণের উপস্থিতি আছে কিন্তু বাংলাদেশের ভেজাল রোধ আইনে জনগণের কোনোই ভূমিকা নেই তারা দর্শক মাত্র। আমার জানা মতে গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইনমন্ত্রণালয় 'দি কনজিউমার্স অ্যাক্টের' খসড়া 'ল' রিফর্ম কমিশনের কাছে পর্যালোচনার জন্য পাঠিয়েছিল। ফাইলটি সম্ভবতঃ সেখানে অথবা আইনমন্ত্রণালয়ে এখন পোকায় কাটছে।

এখন দ্বিতীয় গলদটি বলছি এবং হ্যারল্ড জে. সাইমনের লেখা 'জীবাণু ও মানুষ' বইটি থেকে উদ্ধৃতি দিতে হয়ঃ "সংক্রমণের পরিবাহক হিসেবে খাবারও কাজ করতে পারে। সংক্রমিত ব্যক্তি স্পর্শ করলে খাবার দূষিত হতে পারে। অনেক সংক্রমিত ব্যক্তিকে দেখলে অসুস্থ মনে হয় না। এই উৎস থেকে সংক্রমণের বিসত্দার বন্ধ করার একমাত্র উপায় হচ্ছে, খাবার তদারককারীদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সম্পর্কে শিক্ষাদান করা এবং তাদের দেহে প্রচ্ছন্ন বিপজ্জনক জীবাণু আছে কিনা তা মাঝে মাঝে পরীক্ষা করে দেখা। অনেক খাদ্য যেমন মোরগ-মুরগি সাধারণতঃ জনগণের চাহিদা অনুযায়ী প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন করা হয়। এদের মধ্যে একটি সংক্রমিত থাকলে বিরাট পরিমাণ সরবরাহের সবটাই দূষিত হতে পারে। মাটিতে বটিউলি নামে অবায়ুজীবী থাকে। এরা বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করে- যা মানুষের জন্য বিষাক্ততম পদার্থের অন্যতম একটি। বাণিজ্যিক খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা এই জীবাণু ও এদের অনুবীজকে ধ্বংস করে। কিন্তু গৃহজাত খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা কিংবা পানি থেকে খাদ্যদ্রব্য এরা সংক্রমিত হতে পারে। এই কলুষিত খাবার সিদ্ধ করা হলেও অধিবিষ নষ্ট হয় না। হিমায়ন ব্যবস্থায় মাংস যেমন প্রত্যক্ষ সংরক্ষিত হয়, তেমনি অনেক সংক্রামক বাহকও পরোক্ষ সংরক্ষিত হয়। যদি মাংস খুব সামান্য বা মাঝারি রান্না করা হয়, তবে তার ফলে খাদ্য বিষাক্তকরণ হতে পারে। এই সম্ভাবনা রোধ করতে অনেক উৎপাদনকারী মাংসের সঙ্গে জীবাণুনাশক দেন। কিন্তু তাতে রোগসৃষ্টিকারীরা যে ধ্বংস হবে তা নিশ্চিত বলা যায় না। দ্বিতীয়তঃ মাংসে দেয়া জীবাণুনাশক ওষুধ মানুষের শরীরে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে।" এই সব মারাত্মক কারণে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলোতে 'পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড' (দূষিকরণ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা) আছে যেটা আমাদের দেশের সরকারের ধারণায় সম্ভবত নেই। প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, আশা করি আজকের লেখার শিরোনামের সমর্থনে উপরোক্ত যুক্তিগুলো সঠিক বলে আপনি বিবেচনা করবেন।
[ মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী : অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, আপীল বিভাগ, সুপ্রিম কোর্ট]

ঃঃ দৈনিক ইত্তেফাক ঃ 16.04.2006ঃঃ
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ছবি ব্লগ

লিখেছেন সামিউল ইসলাম বাবু, ০৬ ই মে, ২০২৬ ভোর ৫:৩৫

আমার ভালোলাগা কিছু ছবি নিচে শেয়ার করা হলো। একটা আায়াত জানলেও তা অপরের কাছে পৌঁছে দাও(আল-হাদিস

পৃথিবীতে কেও আপন নয়। একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালা ব্যতিত। তাই ভালো মন্দ সকল বিষয়েই কথা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার বেঁচে আছে?

লিখেছেন শূন্য সারমর্ম, ০৬ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১:০২





আপনার মা/বাবা বেঁচে থাকলে আপনি এখনো সৌভাগ্যবান -এরকম ভাবনা হয়তো ৯৮ ভাগ মানুষ ভাবে। মা/বাবা নিয়ে মানুষের ইমোশন, সংগ্রাম নিয়ে সবাই কিছু কিছু লিখতে পারবে, বা মুখে বলতে পারবে। গোর্কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়: সব কিছু ভেঙে পড়ে

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৬ ই মে, ২০২৬ দুপুর ২:২৮


"তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও - আমি এই বাংলার পারে
র’য়ে যাব; দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে;
দেখিব খয়েরি ডানা শালিখের..."

জীবনানন্দ দাশ ''রূপসী বাংলা'র কবিতাগুলো বরিশালে তাঁর পৈতৃক বাড়িতে বসে লিখেছিলেন। জীবনানন্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার কারণে দিদি হেরেছন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৬ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩




আপা এপারের হিন্দুদেরকে স্নেহ করতেন তাতে ওপারের হিন্দু খুশী ছিল। আপা ভারতে বেড়াতে গেলে মোদীর আতিথ্যে আপা খুশী। কিন্তু আপার আতিথ্যে দিদি কোন অবদান রাখলেন না। তাতে হিন্দু... ...বাকিটুকু পড়ুন

লেখালিখি হতে পারে আপনার বিক্ষিপ্ত মনকে শান্ত করার খোরাক।

লিখেছেন মাধুকরী মৃণ্ময়, ০৬ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৪:২৯

এই যেমন আমি এখন লিখতে বসছি। সর্বশেষ লিখেছি ২০২১ সালে জুলাই এর দিকে। লিখতে গিয়ে আকাশে বাতাসে তাকাচ্ছি, শব্দ, বিষয় খুজছি। কিন্তু পাচ্ছি না। পাচ্ছি যে না , সেইটাই লিখছি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×