মুস্তাফা জামান আব্বাসী
চোরে ভরে গেছে দুনিয়া, যে দিকে তাকাই ওরাই, এদের মধ্যে আমিও। ধর্মের কথা বললেই ব্যাজার। ট্রেনে বসে আছি একদিন, কয়েকজন উৎসাহী গান শুনতে চাইল। টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠিত গায়ক, ঘটনাচক্রে না হয় ১১১ নম্বর ক্লাশে বসে আছি, তাই বলে গান শোনাতে হবে? বললাম, শোনাব, আমার কথা শুনলে, শুরু করলাম কেচ্ছা যা শুনে
গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবে, এমন অবস্থা যে গান তো দূরের কথা, ট্রেন থেকে লাফ দিয়ে ছুটে প্রাণ রক্ষা করবেন। লক্ষ্য করি, কাজ হয়েছে এতে। কেউ ভাবছেন ঈশ্বর প্রেরিত পুরুষ কিছু বলতে চাইছেন, শুনেই দেখি কি বলেন।
প্রথম কথা, যা বলতে চাই তার জন্যে তৈরী করতে হবে উৎসাহ, নইলে কাজ হবে না। শুনবে না, শুনলেও এক কান থেকে প্রবেশ করে আরেক কান দিয়ে বের করে দেবে। ধর্মের কথা মস্তিষ্কে প্রবেশ করার আগেই ভন্ডুল হয়ে যাচ্ছে। বললাম, আত্মার রহস্য নিয়ে চিত্তাকর্ষক কথাবার্তা স্বপ্ন বিবরণ সংগৃহীত শত গ্রন্থ থেকে, 'কিতাবুল মানামাত',
'কিতাবুল বুসতান', শুনবেন?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, শুনব। হজরত মুহম্মদ ইবনে হোসেন [রা] হজরত আবু ইসহাক [রা] থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বললেন, একটি মৃতকে গোসল দেওয়ানোর জন্যে আমাকে ডাকা হল। যখন তার মুখ থেকে চাদর সরালাম দেখতে পেলাম একটি বড় সাপ তার গলা লেপটে আছে। তাকে গোসল না দিয়েই চলে এলাম। লোকেরা বলল, সাহাবায়ে কেরামকে গালাগালি করায় তার এ অবস্থা। এরপর শোনালাম বিবরণী, যার মধ্যে প্রতিবেশিকে গালাগাল করা, আঘাত করা, কিছু খেতে না দেয়া, তার প্রতি ভালবাসার দৃষ্টি প্রক্ষেপ না করা, তাকে পর মনে করা। সবকিছুর জন্যে এমন শাস্তি যা শুনলেই যে কোন জীবিত মানুষের রক্ত যাবে হিম হয়ে।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসুদ [রা] বলছেন জান্নাতিদের কথা। শহীদের আত্মা হবে সবুজ পাখির মত। যারা জান্নাতি তাদের সামনে সকাল সন্ধ্যে জান্নাত হবে উপস্থাপিত, যারা জাহান্নামের তারা ঐ ছবিই দেখবে। তাহলে সকাল সন্ধ্যা জান্নাতের ছবি দেখাই ভাল, তাই নয় কি? জান্নাতের ছবি কি? সবার জন্যে নরম হওয়া, কাউকে গালি না দেওয়া, চুরি না করা, কাউকে অসম্মান না করা, সবাইকে মূল্য দেয়া, উপকার করা, এগুলোই জান্নাতের ছবি। আর দোজখের ছবি কি? অন্য মানুষকে হেয় করা, তাকে ঠকান, তাকে গালি দেয়া, তার দ্রব্য চুরি করা, এগুলো হল দোজখের ছবি। সোজা হিসেব।
চার পাশ থেকে ক্রমেই ওরা ঘিরে ধরল, যেন গল্পদাদুর আসর, দাদু, ওরা নাতি নাতনি। ধীরে উন্মোচিত কাহিনী, যা শুনে ওরা বিস্ময়াবিষ্ট, কেউ হাত ধরতে চাইল, হাত ধরে চুম্বন করল, কয়েকটি টাকাও সামনে মেলে ধরল। মনে মনে হাসলাম। বাগদাদে বড় পীর সাহেবের মাজারের সামনে কোরান শরিফ তেলাওয়াত করতাম, বিধবা মহিলারা যাদের ছেলে ইরান-ইরাক যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছে, অনেক মুদ্রা দিয়ে যেত। খরচ করিনি, এখনও সঞ্চয়ে।
আজ এদের সামনে 'কিতাবুল মানামাত' থেকে স্বয়ং আল্লাহতা'য়ালার ক্ষুদ্র প্রতিনিধি হিসেবে যেন আবির্ভুত, নিশ্চয়ই তাই, যদিও গুণাহের উপাদান দিয়ে প্রস্তুত আমি। এদের মধ্যে একজন জানালেন, স্বপ্নের কথা অনেক শুনলাম, এবার বাস্তবের কথা বলুন। স্বপ্নের কথা শুনে কি লাভ, ওর সঙ্গে জীবনের নেই কোন সংযোগ।
প্রসঙ্গ বদলে দিলাম। বলি, গত রাতে ভূমিকম্প টের পেয়েছ? কেউ হ্যাঁ, কেউ না বলল। বললাম, সুনামী ধেয়ে আসছে। গত ১১ই এপ্রিল সুমাত্রা উত্তরে ৮.৭ এমডাব্লিউপি আকারে ভূমিকম্প যখন আঘাত দেয়, শুধু ওখানকার নয়, সারা অঞ্চলের মানুষের মাথা ঘুরে গেছে। 'ক্লাইমেট ডেস্কে' বসে আছেন 'দি গার্ডিয়ান' পত্রিকার বিল ম্যাকগুয়ার। লিখেছেন: 'জলবায়ূ পরিবর্তন এখন এমনি একটা ব্যাপার, যা যে কোন সময় পৃথিবীর যে কোন প্রানকেন্দ্রে আঘাত হানার জন্যে প্রস্তুত। আগ্নেয়গিরি অগ্বুৎপাত, সমুদ্রের ফুঁসে উঠা, পর্বতের দেবে যাওয়া, এখন আর কোনক্রমেই দূরবর্তী বিপদ
সংকেত নয়, বরং খুবই কাছের'। শ্রীলঙ্কা থেকে আমার বন্ধু দয়া দেশনায়ক, [বয়স বাহাত্তর],[[email protected]] মেইল পাঠিয়েছেন যা পড়ে সবারই পিলে চমকে যাবে। মাস আটেক আগে গিয়েছিলাম শ্রীলঙ্কার গালে, তিরিশ ফুট উঁচু হয়ে যেখানে সুনামী আঘাৎ হেনেছিল, পঞ্চাশ হাজার লোক যেখানে মারা গিয়েছে। দক্ষিণতম গালে শহরের সমুদ্র সৈকতে সারাদিন মাছ ধরা খেলায় মত্ত, বালুকাবেলা থেকে খানিকটা সমুদ্রের দিকে লম্বা বাঁশের চাং, সেখানে ঝুলে থাকে জেলেরা। হাতে বড়শী, উঠছে ছোট, মাঝারি মাছ। সামান্য একটু জমি, আর সবই গেছে ঋণে। ২৫শে ডিসেম্বর ২০০৪ 'ইনসাইট রিসোটর্' -এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর খ্রিস্টমাস উপলক্ষে মেন্দিস আপ্পুকে কিছু টাকা দিয়ে বললেন : প্রিয় মানুষদের একজন তুমি, তোমাকে ভুলিনি। আপ্পু গভীর রাত অবধি কারণবারির আশ্রয়ে বাঁশের চাংয়ে বসেছিল। পরদিন ভোরবেলা সুনামির প্রবল উচ্ছ্বাসে মেন্দিস আপ্পুকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এটাই একজন বৌদ্ধের সবচেয়ে বড় চাওয়া। নির্বান। মধুর বংশীর আহ্বানে।
আমরা ভুলেই আছি যে কঠিন মৃত্তিকার উপরে আমাদের বাস তা হল একটি অত্যন্ত পাতলা চাদর, টেকটনিক প্লেটগুলো ক্রমশঃই এদিক ওদিক চলাফেরা করছে, মৃত্তিকা ধরণী সয়ে আছে যেন অনেক কষ্ট সহ্য করে, কখনও বা তা ফেটে পড়ছে গভীর আক্রোশে। যেমন একটি কুকুর মৌমাছি দংশিত হলে ভীষণভাবে শরীরটাকে নাড়াতে থাকে, কখনও নদীতে গিয়ে পড়ে ঝাঁপিয়ে। কুকুরের মালিক এ অবস্থা দেখে অনেক সময় কেমিক্যাল দিয়ে মাছিগুলোকে দমন করতে চায়। পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আমরা এ পরিবর্তনগুলো আলাদাভাবে দেখি, পরিপূর্ণ ছবিটি থাকে চোখের ও মনের আড়াল, যাকে ডক্টর জেমস লাভলক বলছেন 'গেইয়া' [gaia] তার নতুন গ্রন্থ 'এ নিউ লুক অন আর্থ' -এ।
এই যে ট্রেন কমপার্টমেন্টের বড় আসনে আভিজাত্যের মধ্যে কালাতিপাত করছি, নিজকে ভাবছি যা নয় তাই, এ দিন টিকবে না। তার চেয়ে ভাল এই নকল জলসা ছুঁড়ে ফেলে দি', খুঁজে নি' যার যার আসল ঠিকানা।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে এপ্রিল, ২০১২ বিকাল ৩:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


