মাঝে মাঝে এরকম হয় মেঘের গর্জণ শুনে চমকে ওঠার আগেই ধোঁয়াটে অন্ধকারের পর্দা নেমে আসে, মেঘেরও কত রকমারী আচরন, কোন মেঘেতে বৃষ্টি হবে কিংবা কোন রংয়ের মেঘে বৃষ্টি হলেও সেটির ঘনত্ব বা স্থায়িত্ব কতটুকু সেটিও এখন মানুষের অনুমান নির্ভরতার কাছে হেরে রুপ নিয়েছে পরনির্ভরশীল অভিযোজনের ।তবুও তার নিজস্বতা আছে, মাঝে মাঝে সেটাকে অস্বীকার করতে পারেনা বলেই বোধহয় অস্বাভাবিক আচরনে উন্মাতাল করে দেয় ঐচ্ছিক নির্দেশনায় বেড়ে ওঠা সজিবতার ছাঁইপাশ, তখনই মানুষ তাকে সংজ্ঞায়িত করে প্রাকৃতিক বৈরিতা বলে । বাস থেকে নেমে আকাশের দিকে তাকিয়ে সজীব বেশ দ্বিধাদন্দের ভেতর পড়ে গেল, কিছুক্ষন পর পরই সশব্দে বাজ পড়ছে ।মনে হচ্ছে বৃষ্টিটা বেশ জোরে সোরেই নামবে।এখান থেকে তার গ্রামে যাওয়ার জন্য একমাত্র যানবাহন হলো ভ্যান, সেক্ষেত্রে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলে যাওয়াটা অনেক কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে। আকাশে কুচকুচে রংয়ের কালো মেঘ, বাবা বলতেন এরকম মেঘে নাকি বৃষ্টি হয়না আবার হলেও খুব বেশিক্ষণ সময় স্থায়ী হয়না। আকাশে ঘোলাটে রংয়ের মেঘ জমলে তবেই সম্ভাবনা থাকে প্রবল বৃষ্টপাতের । তাছাড়া বৈশাখের প্রকাশ বৃষ্টিতে নয় বরং ঝড়ে।অনেকদিন পর অবশেষে বাড়ি ফেরা হচ্ছে, ইচ্ছাগুলো গতকয়েক মাস ধরেই ভেতরে ভেতরে যন্ত্রনা দিচ্ছিল, কিন্তু সময় এবং ব্যস্ততার মিশেলে অবসরটাকে খুঁজে পাওয়াটা নিতান্তই দু:সাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেঘের সাথে সাথে বেশ ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করেছে, সজীব এদিক সেদিক তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নিলো পা বাড়ানোর, কে জানে সামনে কি হতে যাচ্ছে । বাসস্ট্যান্ড এলাকাটা আজ বেশ জমজমাট । রা্স্তার পাশে সারি সারি দোকান পাঠগুলোতে পা ফেলবার জায়গাটুকুও নেই। মফস্বলের চুপচাপ সাদামাটা জীবন যাপনটা ঠিক এইজায়গাতেই তার সমস্ত চঞ্চলতার সরব প্রকাশে মুখরিত হয়ে উঠেছে । ফুটপাতের এদিকে সেদিকে ছড়ানো ছিটানোভাবে ছোট খাটো নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের পসরা সাজিয়ে বসেছে ভ্রাম্যমান কিছু দোকানী। সন্ধার শেষ আলোটা নিভে গেলে দিনের সমস্ত হিসেব চুকিয়ে এরাও ফিরে যাবে গৃহাভিমুখে। শহরের ব্যস্ততার সাথে এখানকার ব্যস্ততার মস্ত বড় একটা ফাঁরাক রয়েছে।সমান্তরালভাবে বয়ে যাওয়া পাশাপাশি দু’টো ব্যবস্থার বৈপরিত্যটাকে খুব সহজেই “প্রান” নামক উপাদানটি দিয়ে পৃথকীকরণ করা যায়।জীবনের পথে পথে ঠোকর খাবার ভয়ে যখন পালিয়ে বেড়াতে হয় শহরের এগলিতে ওগলিতে, এখানকার বাতাস ও মাটিতে মিশে থাকা অদ্ভুত রকমের মাদকতা ঠিক তখনই জোরালোভাবে অনুভব করা যায় ।অবশ্য কথাটা আপেক্ষিক, কেননা যে কখনো স্বর্গে থাকেনি তার পক্ষে স্বর্গের লিলুয়া বাতাসের সত্যিকারের মাদকতা টের পাওয়াটা কিছুটা অস্বাভাবিকই বটে। একারনেই হয়তো ঘোরতর কল্পনাবিলাসীর দল নিজের অপূর্ণতার স্বরুপটা খাতা-কলম কিংবা রং তুলির মুখোশে ঢাকবার অনবরত প্রচেষ্টায় নিজেকে মগ্ন রাখে ।
বাসস্ট্যান্ড থেকে একটু সামনে গেলেই চার রাস্তার মোড় ।এখান থেকে পশ্চিমে বাঁক নিয়ে যে রাস্তা চলে গেছে সেদিক দিয়ে মিনিট পাঁচেক হাঁটলেই চোখে পড়ে ভ্যানস্ট্যান্ড।এই জায়গাটার আমেজটা পূর্বের থেকে একটু ভীন্ন রকমের, গ্রামের ভেতরের নির্মল বাতাসের গন্ধটা এখানে দাঁড়ালে স্পষ্টরকমভাবে অনুভব করা যায়। চুপচাপ পরিবেশের আবহমান নিরবতা ভেঙ্গে দেয় সাইকেল কিংবা ভ্যানের টুং টাং শব্দ । রাস্তার দু’পাশে একটি চালাঘরের মতো চায়ের দোকান । রাস্তার পাশে কালের সাক্ষী হয়ে থাকা বর্ষীয়ান বটগাছের নিচে সারি সারি কয়েকটা ভ্যান ।কিছুক্ষণ পরপরই ভ্যানওয়ালার কন্ঠস্বর হাক শোনা যায় যায় “ঐ পুরোন বাখরবা, সান্দিয়াড়া যাবে কারা কারা??” সেই সাথে বেলের অনবরত টুং টাং আওয়াজ । ঠিক ২২ বছর আগে এই একই পথ ধরে বাবার সাথে সাইকেল চেপে সে বাজারে আসতো । মাথার চুলটা একটু বড় হলেই মোস্তফা নাপিতের ঘরে চুল কাটানোর জন্য বাবা তাকে বাজারে নিয়ে আসতো, ছবিগুলো এখনো তরতাজা হয়ে চোখের কার্নিশে দোল খায়। সাইকেলের সামনে রডের উপর বসবার জন্য কাঁপড় পেচিয়ে দিতেন মা ।তারপর চুল কাটানো শেষ হলে কেষ্টো ময়রার দোকানের রসগোল্লা ।
হাঁটতে হাঁটতে বটগাছটার নিচে আসতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।সজীব তাড়াতাড়ি দৌঁড় দিয়ে চায়ের দোকানটার ভেতর গিয়ে দাঁড়ালো। দোকানটা সাথে বাড়তি কয়েকটা টিনের চাল দিয়ে বারান্দার মতো করে করা, তিন দিকে তিনটা বেঞ্চ পেতে মানুষজনের বসার জন্য জায়গা করা হয়েছে।বেঞ্চ ছাড়াও এদিক সেদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে গোটা বিশেক মানুষজন,দোকানের ভেতরের দিকে একটি চৌকির উপর টুল পেতে চল্লিশোর্ধ্ব একজন দোকানী চা বানাতে ব্যস্ত। তার ঠিক পেছনে একটি চেয়ার দিয়ে উঁচু করে একটি টেলিভিশান রাখা হয়েছে। মানুষগুলোর কোনদিকে কোনদিকে কোন খেয়াল নেই, সবার সনির্বদ্ধ চোখ টেলিভিশানটার দিকে। সেখানে বহুদিনের পুরোনো একটি ছায়াছবি চলছে।বর্ষণের মাত্রাটা ক্রমশই বাড়তে শুরু করেছে,সজীব ভালো রকমের দুশ্চিন্তাই পড়ে গেল।বৃষ্টির যে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছেনা কয়েক ঘন্টার ভেতর থামবে। এখানে দাঁড়িয়ে সে চেষ্টা করলো টেলিভিশনটার দিকে মনোনিবেশ করবার।প্রায় আধাঘন্টা সময় ধরে তোলপাড়ের পর অবশেষে বৃষ্টির চোখেমুখে একটু ক্লান্তির ছাপ দেখা গেল।সজীব কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা দোকান থেকে বেরিয়ে একটি ছইদেওয়া ভ্যানের ভেতর উঠে বসল,কারন পুরোপুরিভাবে বৃষ্টি থামার জন্য অপেক্ষা করলে হয়তো আজকের দিন পার হয়ে যাবে । এদিকে প্রায় বিকেল হয়ে আসছে, ভ্যানের ভেতর আগে থেকেই দু’জন বসে ছিল।সজীব উঠে বসবার পর ভ্যানওয়ালা আরও কযেকবার প্যাসেঞ্জারের জন্য হাঁক দিলো কিন্তু কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে তিনজনকে নিয়েই প্যাডেল চালাতে শুরু করলো। বৃষ্টি আটকানোর জন্য ভ্যানের দু’দিকে পলিথিনের কাগজ নিয়ে ঘেরা হয়েছে, কিন্তু তাতে খুব বেশি লাভ হচ্ছেনা।বৃষ্টির সাথে সাথে দমকা হাওয়ার কারনে মাঝে মাঝে বৃষ্টির ছাট এসে ভেতরটাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। তবে অনুভূতিটা খারাপ লাগছে না ।মাথার ভেতর কাব্যগুলো বুনো মোষের মতো দাঁপাতে শুরু করেছে।বৃষ্টি মানেই মাথার ভেতর অজস্র নষ্টালজিয়ার ছটফটানি, বৃষ্টি মানেই ছেলেবেলায় বইগুলোকে শার্টের ভেতর গুজে ভিজতে ভিজতে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরা,বৃষ্টি মানেই ফুটবল, ডাঙ্গুলী, গাঁদন খেলা । ভ্যানের ভেতরের দু’জন তুখোড় আলাপ আলোচনায় মত্ত্ব । এই বৃষ্টিতে ফসলের লাভ-ক্ষতির মাত্রাটা কতটুকু এটাই তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু ।এদের ভেতর একজন বেশ বয়স্ক,বয়স প্রায় ৬৫-৭০ এর কাছাকাছি । তাকে বেশে দু:চিন্তাগ্রস্থ মনে হলো, সজীব লোকটির চোখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে ভাবতে লাগলো মানুষগুলো এতটা নিখুতভাবে মাটি-ফসলকে কিভাবে ভালোবাসতে পারে।প্রশ্নটা শুধু বেঁচে থাকার নয়, এর বাইরেও কি যেন একটা আছে যে জটিলতাটা শুধু এদের মতো সরল মানুষের পক্ষেই ধারন করা সম্ভব ।লোকালয় ছেড়ে ভ্যান একেবারে মেঠোপথ দিয়ে চলতে শুরু করেছে । অবশ্য মেঠোপথ বলতে কাঁচারাস্তা নয়, বছর দুয়েক হলো বর্তমান সরকারের কল্যানে মাটির পথ থেকে পিচের রাস্তা হয়েছে । তবে রাস্তার প্রস্থ এতটাই সরু যে পাশপাশি দুইটা ভ্যান একসাথে চলতে গেলে যেকোনো একটিকে ছিটকে পড়তে পারে পাশের ধানক্ষেতে ।অন্যান্য জায়গার মতো এখানে বাড়িঘর নেই বললেই চলে , ছইয়ের ফাঁক দিয়ে যতদুর চোখ যায় ততদুর দিগন্ত বিস্মৃত সবুজ ধানক্ষেত চোখে পড়ে। ভ্যানের হালকা দুলুনির সাথে সাথে সজীবের দু’চোখে ঘুম জড়িয়ে আসতে লাগলো ।
পাশে থেকে একটি ভাঙ্গাচোরা কন্ঠের ডাকে হঠাৎ করেই সজীবের ভাবনায় ছেদ পড়লো । ঘোর ছুটতেই দেখলো একটা তিন রাস্তার মোড়ে ভ্যানটি দাঁড়িয়ে আছে ।সজীব বাইরে তাকিয়ে দেখলো বৃষ্টি একদম থেমে গেছে,কিন্তু বাতাসে বৃষ্টির ভেজা গন্ধটা এখনো বেশ প্রবল ।রাস্তার পাশের ডোবা থেকে বাঙ্গের ডাক শোনা যাচ্ছে, মাঝে মাঝে এদিক সেদিক থেকে কয়েক রকমের পাখির ডাক ভেঁসে আসছে । সজীব ভ্যান থেকে নেমে ভ্যানওয়ালার ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করলো।বেশ কিছুদুর হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়লো বেশ কয়েকজন লোক লাইন ধরে পশ্চিমের পথ ধরে সামনে এগুচ্ছে, সবার মাথায় সাদা টুপি। সামনে দিকের কয়েকজনকে মনে হলো কিছু একটা কাঁধে করে নিয়ে আসছে । সজীব ভালো করে খেয়াল করে দেখল কাকে যেন গোরস্থানে সমাহিত করতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে । বুকের ভেতর কেমন যেন ধ্বক করে উঠলো, এতগুলো চমৎকার দৃশ্যকল্পের ভেতর চরম বেমানান দৃশ্যটি না এলে কি এমন হতো ।পরক্ষনেই মনে হলো পাশাপাশি বেশকতগুলো স্বাভাবিক দৃশ্যকল্পের মাঝে অস্বাভাবিকতার আকস্মিক উপস্থিতিটাই ভীষন রকমের স্বাভাবিক, তানাহলে প্রকৃতির মারপ্যাঁচের ক্ষেত্রটা একেবারেই শূন্য হযে যেত । সজীবের মাথাটা ক্রমেই ভারী হয়ে আসতে লাগলো,বুঝতে পারলো ভাবনাটাকে পশ্রয় দিলে অচিরেই এটি মস্তিষ্কে তার দখলদারিত্ত্ব বাড়াবে । কোনদিকে না তাকিয়ে সে তার হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলো।
২৩.০৫.২০১১ অফিস (মহাখালী )

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


