somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সকালের গল্প-

৩০ শে জুলাই, ২০১১ বিকাল ৩:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

#
কানের পাশটাতে ফোঁসফোঁস শব্দ হচ্ছে, বিছানায় শুয়েই শান্তনুর মনে হলো তির তির করে ঠান্ডা কিছু একটা তার শরীর বেয়ে উঠে আসছে । একবার ভাবলো সে স্বপ্ন দেখছে, কিন্তু স্বপ্নতো এতটা স্পষ্ট নই, চারপাশটা দেখে মনে হলো সবকিছু স্বাভাবিক,বিছানার পাশে তার পড়ার টেবিল, দরজার উপর ভাসছে ফ্যানের বাতাসে দোল খাওয়া ডিম লাইটের ভৌতিক ছায়া ।কালো রংয়ের ঠান্ডা জিনিসটা এবার কোমর ছাড়িয়ে বুক বরাবরউঠে এলো ।শান্তনু ঘাড় উঁচু করে দেখবার চেষ্টা করতেই খেয়াল করলো তার সমস্ত শরীর অবশ করে হয়ে আছে, সেই সাথে চোখ দু’টো যেন ক্লিপ দিয়ে আটকানো,ইচ্ছে করলেও এই অনাকাঙ্খিত দৃশ্য তাকে দেখতে হবে ।
সাপটা আস্তে আস্তে বুকের উপর থেকে গলার কাছটাই চলে এলো, শান্তনু বুঝতে পারলো বেশ ভারী শক্ত কিছু একটা তার গলা পেঁচিয়ে ধরছে, ক্রমশ তার নিঃশাস ভারী হতে শুরু করল, বুকের ভেতর থেকে যেন বাতাস নয় পাথরের মতো কিছু একটা ঠেলে বেরিয়ে আসবার জন্য ছটফঠ করছে, সে একটু বাতাসের জন্য হাঁসফাঁস করতে লাগলো । তারপর একসময় ফুঁসফুঁসটা একেবারে বায়শূন্য হয়ে পড়লো, কোথা হতে এক অদ্ভুত রকমের হীম শীতল আমেজ ভর করলো শরীরে । এই মুহূর্তে তার মনে হলো সে মৃত্যুর থেকে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে ব্যবধানে দাঁড়িয়ে আছে, সমস্ত শরীর তুলোর মতো হালকা লাগছে, সে খেয়াল করলো তার শরীর বিছানা থেকে বেশ কয়েকফুট উপরে।সে কি ইতোমধ্যে মারা গেছে না বেঁচে আছে সেইটা নিয়ে বেশ দ্বিধা-দন্দেরভেতর পড়লো ।
কিছু একটা বাঁজছে কোথাও, শব্দটা ক্রমশ তিক্ষ্ণ হতে শুরু করেছে, একসময় সেটি কান থেকে মস্তিষ্কের স্নায়ুতে ঢুকে তুমুল বেগে হাতুড়ি পেটাতে শুরু করলো ।
দৃশ্যপটগুলো অতিদ্রুত বদলে যাচ্ছে ,,,,,,, একটা তীব্র ঝোড়ো বাতাস তাকে শুন্য থেকে নিচে ফেলে দিলো।
শান্তনু ধচমচ করে বিছানা থেকে উঠে বসলো ,বালিশের পাশের মোবাইল টা তখনও বেঁজে চলেছে।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো ভোর ৫ টা। এতো সকালে আবার কে ফোন করলো ।মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো ভুলবশ:ত গতরাতে মোবাইলে বিকেল ৫ টায় দিতে গিয়ে ভোর৫ টায় অ্যালার্ম দিয়ে ফেলেছিলো ।ইদানিং অনেক গুরুত্বপূর্নকাজও সে ভূলে যায়, সে কারনে মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়ে রাখে যাতে করে সঠিক সময়ে মনে আসে । আজ বিকেলে একজনের সাথে একটা গুরুত্বপূর্ন আপয়েন্টমেন্ট আছে । সে তাড়াতাড়ি অ্যালার্ম অফ করলো। বুকের ভেতরটা এখনো ধুকধুক করছে, একটু আগের দুঃসপ্নের ঘোরটা এখনো কাটেনি। মনে হলো সাঁপটা এখনো কুন্ডলি পাঁকিয়ে আছে তার গলায় । মানুষ এমনতরো দু;স্বপ্ন দেখে কেন? কিংবা স্বপ্ন দেখার বাহুল্যতাটাই বা কেন আসে ? প্রশ্নগুলো কেমনহিজিবিজি পাঁকিয়ে যাচ্ছে।চেয়ারের সাথে ঝুলিয়ে রাখা শার্টের পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালো ।
সময়টা বেশ কয়েকদিন খুব একটা ভালো যাচ্ছেনা । যতই সময় গড়াচ্ছে ফ্রাস্ট্রেশানটা ততই বাড়ছে । কিচ্ছু ভালো লাগেনা আজকাল, গন্তব্যের পথ থেকে ছিটকে পড়বার ভয়টা দিন দিন গাঢ় হচ্ছে । গত কয়েকদিনথেকে প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করছে জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে । যতই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা ততই যেন একের পর এক প্রশ্নেরা দাঁনাবেধে ওঠে মস্তিষ্কের গহ্বরে । কোন সমাধান নেই । মাঝে মাঝে মনে হয় এতো প্রশ্ন করেই বাকি লাভ কিংবা তার উত্তর থাকা না থাকায় কিইবা যায় আসে । জীবনের কাছে অস্তিত্ত্বের আদৌ কোন দায়ভার আছে কিনা সেটাও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেনা। সেক্ষেত্রে ধার্মিকদের অনেক সুবিধা, নিজের সমস্ত ব্যর্থতা সফলতার হিসাব নিকাশ মেলাতে না পারলে, অদৃশ্য সত্ত্বার কাছে নিশ্চিন্তে ঢেলে দেয় সমস্ত দায়ভার । তারপর ইচ্ছেমতো নিজেকেপ্রবোধ দেবার যথেচ্ছা উপকরন তৈরি করে সেগুলোকে শুন্যের কাছ থেকে সত্যায়িত করে নেয় , বেশ চমৎকার ।
এক কাপ চা খেতে পারলে মন্দ হতোনা, কিন্তু এখনো বাইরে বেশ অন্ধকার ।শান্তনু খেয়াল হলো বাসা থেকে বেরিয়ে মিনিট ১৫ হাঁটলেই চৌরাস্তার মোড়টা পাওয়া
যাবে, সেখান থেকে ঠিক ডানে গোরস্থানের পাশে একটা টংয়ের মতো দোকান আছে, সেটা অনেক ভোরে খোলা পাওয়া যায়। শান্তনু বিছানা ছেড়ে উঠে লাইটটা অন
করলো।তারপর ব্রাশে টুথপেষ্ট লাগিয়ে বাথরুমে ঢুকলো । অনেকদিন পর সকালে ঘুম থেকে ওঠার আমেজটা বেশ লাগছে।
বাসা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে দেখলো যতটুকু ভেবেছিলো তার থেকেও অনেক বেশি অন্ধকার।বেশ কিছুদুর এগোতেই মসজিদ থেকে আজান ভেসে এলো ।
রাস্তাঘাট একদম ফাঁকা , কোথাও কোন জনমানুষের সাড়া শব্দ নেই । সারাদিন রিকশার টুং টাং শব্দ, বাস ট্রাকের হর্ণকে পাশ কাটিয়ে শুধু মাত্র এসময়টাতে শহরটা একটু অবসর পায় জিরোবার। জেলা শহর হিসাবে ঝিনাইদহের ব্যপ্তিটা খুব বেশি বড় না হলেও অনেক গোছালো ।
এখানে থেকে মোটামুটি শহুরে আমেজের প্রায় সবটুকুই পাওয়া যায় ।
কয়েকটা কুকুর রাস্তার উপর এলোপাথাড়িভাবে শুয়ে আছে, ভাবখানা দেখে মনে হয় দিনের এইসময়টাতে পুরো শহরের মালিকানা তাদের । শান্তনুকে দেখে কয়েকটা কুকুর রাস্তা থেকে উঠে ড্যাবড্যাবে চোখে তার দিকে তাকালো । হঠাৎ করে একটা ঘেউ করে ডেকে উঠলো , সংগে সংগে বাকিগুলান যেন ঢাক পড়বার মতো একসাথে জেগে উঠলো এবং তুমুল বেগে ডাকতে ডাকতে তার দিকে এগিয়ে এলো । শান্তনু মোটামুটি নিশ্চিত যে তাকে আজ কুকুরের কামড় খেতেহবে, হয়তোবা ওরা তাকে চোর ভেবেছে ।সে তার হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলো,খেয়াল করলো তার আশপাশে ৮-১০ কুকুরও তাকে অনুসরণ করছে ।শান্তনু কোন কিছু না ভেবে হঠাৎ করে ঐখানেই দাঁড়িয়ে গেলো ।কুকুরগুলোকে এবার বেশ চিন্তাগ্রস্থ মনে হলো, কেননা চোর হলেতো দৌড় দিতে, কিন্তু লোকটার ভেতর সেরকমকোন উদ্দেশ্য দেখা যাচ্ছেনা ভেবে হয়তো তারা হতাশ হলো । কয়েকটা কুকুর এগিয়ে এসে তার চারপাশ একবার চক্কর দিয়ে পেছন দিকে হাঁটতে শুরু করলো ।বাকিগুলানের কয়েকটাকে তাদের অনুসরণ করতে দেখা গেলো,আর কয়েকটা ঐখানেই শুয়ে পড়লো । শান্তনুর হাসি পেল, জন্তু জানোয়ারকে বোকা বানানোর ভেতরে এক অদ্ভুত রকমের আনন্দ আছে।
দোকানের কাছে পৌছতে পৌছতে বেশ সময় লেগে গেলো ততক্ষনে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছ । গতরাতের ঘোর এখন পুরোপুরি উধাও, সমস্ত মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি বিরাজ করছে । এই মুহূর্তে বাবাকে ভীষন মনে পড়লো,সকালে ঘুম থেকে দেরী করে উঠবার জন্য প্রায়ই বাবা তাকে বকাবকি করতো, তিনি বলতেন সকালের হাওয়াটা শরীর মন উভয়েরজন্যই অত্যন্ত জরূরী ।বহুদিন উপলব্ধিটা আসেনি ,আজ মনে হলো চলে গেলেই বুঝি ফেলে আসা কথা কিংবা অসতিত্ত্বের গুরুত্বটা বোঝা যায় । দোকানী আরও কিছু আগে এসে পৌঁছেছে, দোকানের সামনে বসবার জন্য দু’দিকে দুটো বেঞ্চ পাতা তাতে অনায়াসে ৮-৯ জন বসা যায় । শান্তনু একটি বেঞ্চের এককোনায় বসে দোকানীর এটা সেটা গোছানোর দৃশ্য মনোযোগ সহকারে দেখতে লাগলো । অত্যন্ত সাধারন জিনিস দেখার ভেতরেওযে এতো বেশি আনন্দ থাকতে পারে আগে কখনো খেয়াল করা হয়নি। সে দোকানদারকে চায়ের অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো।বেশ কিছুক্ষণ পর মর্নিংওয়াক করতে আসে কয়েকজন ষাটোর্ধ্ব পৌঢ় দোকানে এসে বসলো, তাদের ভেতর কয়েকজনের মাথায় সাদা ক্যাপ ও পায়ে স্নেকার। ইতোমধ্যে সবাই বেশ উৎফুল্ল ভঙ্গিতে গল্প জুড়ে দিয়েছে । গল্পের বিষয়বস্তুও বহুমাত্রিক , এই যেমন- রাজনীতি, দৈনন্দিন যাপিত জীবন।
দোকানী চা বানানো শেষ করে তার দিকে এগিয়ে দিলো, শান্তনু বেশ তৃপ্তি নিয়ে চা’টা শেষে করলো । তারপর চায়ের দাম মিটিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে বাসার দিকে হাঁটতে শুরু করলো।
ইতোমধ্যে রাস্তায় যানবাহন চলাচল শুরু হয়েছে। রিকশার টুং টাং,মন্থরভাবে ছুটে চলা ভোরের বাসের আওয়াজ, আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে ওঠা মানুষের আরও একটি সজীব দিনের সূচনা, জীবনটাকে তার এই মুহূর্তে অনেক অদ্ভুত রকমের সুন্দর মনে হলো। হঠাত পেছনের দিক থেকে ছুটে আসা একটা আওয়াজে সে সম্ভিত ফিরে পেয়ে দ্রুত রাস্তা থেকে সরে একপাশে গিয়ে দাঁড়ালো ,লোকটা বেশ বিরক্ত ভঙ্গিতে তার দিকে তাঁকিয়ে বললো “ ভাইজান, মনডা কি পকেটে নিয়ে হাঁটেন? এখনিতো গাড়ি চাপা পড়েছিলেন”।শান্তনু পাশ ফিরতেই দেখলো একটি ট্রাক অতি দ্রুত তার পাশ কাটিয়ে চলে গেলো ।
“নাহ্ যখন মৃত্যুটাই অবোধ্য,তখন বেঁচে থাকাটা আসলেই জরূরী, অন্ত:ত এমন একটি সুন্দর সকালের জন্য” ।
সে সাবধানে রাস্তাটা পার হয়ে বাসার দিকে হাঁটতে শুরু করলো ।
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×