দীর্ঘমেয়াদি একটি রূপরেখা নিয়ে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে মহাজোট সরকার। নির্বাচনী ইশতেহারেও বেশ কিছু আশাব্যাঞ্জক তথ্য ছিল। যেগুলোর বাস্তবায়নের জন্য তিন বছর কম সময় নয়। কিংবা রূপরেখা যাকে আমরা ভিশন ২০২১ বলি, সে লক্ষ্য অর্জনের পথে হাঁটার ভিত্তি তৈরির জন্যও তিন বছর যথেষ্ট সময়। যদিও এক-এগারোর একটি অগণতান্ত্রিক ও অনির্বাচিত সরকার দেশকে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার পথে এগিয়ে দিয়েছিল। তথাপি মহাজোট সরকারের তিন বছরের অর্জন যা হবার কথা ছিল তা হয়নি। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে আগের চেয়ে নেতিবাচকই হয়েছে।
গভীর ভাবে বিশ্লেষণ করতে দেখা যাবে, এবারে ব্যবস্থাপনা সংকট ছিল প্রকট। অর্থনীতির নানা চ্যালেঞ্জগুলো দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করার মত পরিকল্পনা নেয়া সম্ভব হয়নি। বরং কিছু পদক্ষেপ সার্বিকভাবে ভারসাম্যহীন করে তোলে অর্থনীতিকে। এ অবস্থায় আগামী দিনগুলো কেমন যাবে, অন্তত ২০১২ সাল কেমন যাবে এমন প্রশ্ন অবান্তর নয়। বর্তমান তৈরি করে দেয় আগামীর ভিত। দেশের অর্থনীতির সেই ভিত কি মজবুত আছে? উত্তর হ্যাঁ কিংবা না, কোনটাই না দিয়ে আমরা প্রেক্ষাপটটা বোঝার চেষ্টা করি।
দেশের ব্যালেন্স অফ পেমেন্ট চাপের মুখে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে। বেড়েছে আমদানি। উচ্চ হারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির রেশ থামছে না। বৈদেশিক ঋণ সহায়তাও বন্ধ। এ অবস্থায় ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ না নিয়ে বিকল্প ছিল না সরকারের সামনে। টাকা ছাপিয়ে কিংবা ব্যাংক থেকে টাকা ধার করে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি না হয় সামাল দেয়া গেল। কিন্তুু ব্যালেন্স অফ পেমেন্ট ভারসাম্য হবে কিভাবে?
বাধ্য হয়ে সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে একশ’ কোটি ডলার ঋণসহায়তা দাবি করে। আইএমএফও এই সহায়তা করতে সম্মতি দিয়েছে। আইএমএফের প্রতিনিধিরা কয়েক দফায় বাংলাদেশে এসে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। এসব বৈঠকে বেশ কিছু শর্ত,-সংস্কারের কথাও তারা বলেছে। এরমধ্যে অন্যতম হচ্ছে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়। ব্যাংক ঋণের সুদের হারের নির্ধারিত সীমা প্রত্যাহার করা।
দুটি কাজ সরকার করেছে। এতে করে একশ’ কোটি ডলারের ঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তুু অভ্যন্তরীণভাবে এর নেতিবাচক দিগুলো কি বিবেচনা করা হয়েছে? যেমন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালে পরিবহন ভাড়া থেকে শুরু করে সর্বস্তরে এ ধরণের প্রভাব পড়ে। বেড়ে যায় ব্যয়ভার। ফলে, উৎপাদিত পণ্য কিংবা সেবার মূল্যও বেড়ে যায়। যা সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যায়।
দ্বিতীয়ত, ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়ানো। সুদের হার সিঙ্গল ডিজিটে নিয়ে আসার বহু চেষ্টা হয়েছে। এসব চেষ্টা যখনি সফলকাম হতে চলেছে, তখনি উল্টো বাধা এসে হাজির। ফলে, ব্যাংক ঋণের সিঙ্গল ডিজিটে নিয়ে আসার স্বপ্ন আপাতত আরো বেশি দুরূহ হয়ে পড়েছে সর্বশেষ সিদ্ধান্তে। ১৩ শতাংশের মধ্যে ব্যাংক ঋণ দেয়ার সীমা প্রত্যাহার করার ফলে এখন ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদের হারে কোন নিয়ন্ত্রণ থাকলো না। এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকগুলো প্রায় ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ হার সুদে আমানত নিয়ে তা ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ কিংবা তারও বেশি হারে লগ্নি করবে। ব্যাংক ঋণের উপর সুদের সর্বোচ্চ সীমা বা ল্যান্ডিং ক্যাপ (খবহফরহম পধঢ়) প্রত্যাহার করে নেয়ায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মূলতঃ সুদ ব্যবসায়ের দিকেই ঝুঁকবে বেশি। সেক্ষেত্রে বেশি হারে সুদ দিয়ে শিল্প খাতে বিনিয়োগের সাহস পাবেন না বিনিয়োগকারীরা। যেখানে গ্যাস-বিদ্যুত সংকট বিদ্যমান। উৎপাদনশীল খাতে না গিয়ে অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ চলে যেতে পারে। যার প্রভাব আগামীতে ব্যাংকগুলোর মুনাফার উপরও পড়বে। ফলে সেখান থেকে সরকারও রাজস্ব হারাবে। তাহলে সরকার কেন এটি করলো?
আমরা প্রায় খবর শুনি, ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমান ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি ২০১১-১২ অথবছরের বাজেটে সরকারের ব্যাংক ঋণের প্রাক্কলন ছিল ১৮ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসেই ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমান দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৩২১ কোটি টাকা। দেখা যাচ্ছে ব্যাংক হতে ঋণ গ্রহণের সীমা লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। তারপরও পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাচ্ছে না বিধায় সরকার বেসরকারী খাতে ঋণ প্রবাহ কমানোর কৌশল গ্রহণ করে। সেই কৌশলের অংশ হিসাবেই সুদের হার বাড়ানো হয়। এতে করে বেসরকারি খাতে অর্থায়ন দূর্বল হয়ে পড়বে, শিল্পায়ন হবে না যা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে। তাছাড়া দেশে বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান বাড়বে না । শুধু সুবিধা হবে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি পরিমানে টাকা ধার করতে পারবে। এই সুবিধার বিপরীতে মূল্যস্ফীতিও বাড়বে। জানা কথা যে, সরকারের অতিমাত্রায় ঋণ নিলে তা মূল্যস্ফীতিকে বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। এমনিতেই মূল্যস্ফীতির যাঁতাকলে অতিষ্ট দেশের জনগণ। গত বছর (২০১১) এর মার্চে প্রথম বারের মত বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয় ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। পরিসংখ্যান ব্যুরো সর্বশেষ গত নভেম্বরে যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতেও গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। বর্তমানে কেউ কেউ বলছেন মূল্যস্ফীতি ১৩ শতাংশ অতিক্রম করেছে। এতে করে থমকে গেছে অর্থনীতির অন্যান্য সূচক। বাংলাদেশ আমদানি নির্ভর দেশ হওয়ায় এ মূল্যস্ফীতির কারণে অর্থনীতিতে ভয়াবহ বিপর্যয় আসতে পারে। সে পরিস্থিতি এড়ানোর প্রস্তুুতি কি আমাদের আছে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


