somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিবেকানন্দের স্বরূপ

১২ ই জানুয়ারি, ২০১৬ দুপুর ২:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

স্বামী বিবেকানন্দের অনেক সুন্দর সুন্দর বাণী আছে। এক : জীবে প্রেম করে যেই জন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর। দুই : হে ভারত ভুলিও না মেথর, মুচি, চণ্ডাল তোমার ভাই...। তিন : খালি পেটে ধর্ম হয় না...। চার : ভারত বেরুক চাষার কুটির ভেদ করে...
এমনই আরও অনেক বাণী হাজির করা যায়, যে’গুলো সত্যিই ভাল লাগে শুনতে। বিবেকানন্দকে খণ্ডিতভাবে না জেনে সামগ্রিকভাবে জানতে তাঁর ‘বাণী ও রচনা’, ‘পত্রাবলী’, নিবেদিতার লেখা ‘স্বামীজিকে যেরূপ দেখিয়াছি’, শঙ্করীপ্রসাদ বসুর লেখা ‘বিবেকানন্দ ও সমকালীন ভারতবর্ষ’, পড়াটা খুবই জরুরি। এ’সব পড়লে বিবেকানন্দ সম্পর্কে যে ধারণা পরিষ্কার হয়ে ওঠে তা হল- বিদ্যাসাগর বা রামমোহনের মত কালের সীমাবদ্ধতা তাঁর জীবনে আমরা দেখতে পাই না। আমরা যা পাই, তা ভয়ংকর! সোজা-সাপটা স্ব-বিরোধিতা।

বিবেকানন্দ এক দিকে বাণী দিচ্ছেন “জীবে প্রেম করে যেই জন...” পাশাপাশি তিনি বরানগর মঠে পশুবলির প্রবর্তন করেন।

দরিদ্র সেবার ক্ষেত্রেও বিবেকানন্দ ছিলেন পাক্কা হিসেবি। ১৮৯৭ সালে বিবেকানন্দ একটি চিঠি দিয়ে স্বামী ব্রহ্মানন্দকে নির্দেশ দেন, “কলকাতার মিটিং-এর খরচা বাদ দিয়ে যা বাঁচে ঐ famine-এতে (দুর্ভিক্ষে) পাঠাও বা কলকাতা, ডোমপাড়া, হাড়িপাড়া, বা গলিঘুঁজিতে অনেক গরীব আছে তাদের সাহায্য কর ... তারপর লোকের (হিন্দুত্বে) বিশ্বাস হবে, তারপর যা বলবে শুনবে”। (পত্রাবলী, পত্র নম্বর ৩৬৩)
বিবেকানন্দ একদিকে বলছেন, “হে ভারত ভুলিও না...” বলছেন, “নতুন ভারত বেরুক চাষার কুটির ভেদ করে”, তখন তিনি-ই চিঠি লিখে শিষ্যদের নির্দেশ পাঠাচ্ছেন, “ধনী দরিদ্রের বিবাদ যেন বাঁধিয়ে বসো না। ধনীদের আদতে গালমন্দ দেবে না”। (পত্রাবলী, পত্র সংখ্যা ৪৭৬)
‘ব্রহ্ম-বাদিন্‌’ পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যাগুলোতে কী করা উচিত, সে বিষয়ে উপদেশ দিয়ে তাঁর একটি চিঠি- “গত সংখ্যায় ক্ষত্রিয়দের খুব বাড়ান হয়েছে, পরের সংখ্যায় ব্রাহ্মণদের খুব প্রশংসা কর, তারপরের সংখ্যায় বৈশ্যদের”। (পত্রাবলী, পত্র সংখ্যা ২৩৯)

বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে বিদ্যাসাগর ও রামমোহনের মতামত জানি। বিবেকানন্দ এই প্রসঙ্গে বলছেন, “বাল্য বিবাহের ওপর আমার প্রবল ঘৃণা”। (ভারতীয় নারী, প্রকাশক উদ্বোধন কার্যালয়, পৃষ্ঠা ৯০)। তারপর-ই আমরা ভয়ংকর রকমের ধাক্কা খাই, যখন দেখি ‘ভারতীয় নারী’ বইটির ১৫ পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দের একটি মত মুদ্রিত রয়েছে, যেখানে তিনি বলছেন, “কখনও কখনও শিশু বয়সেই আমাদিগকে বিবাহ দেওয়া হয়, কেন না বর্ণের নির্দেশ। মতামতের অপেক্ষা না রাখিয়া যদি বিবাহের ব্যবস্থা করিতে হয়, তবে প্রণয়বৃত্তি জাগ্রত হওয়ার পূর্বে বাল্যকালে বিবাহ দেওয়া ভাল”।

প্রণয়বৃত্তি বা প্রেম সম্বন্ধে বিবেকানন্দের মতামতে চোখ রাখি আসুন। তিনি বলছেন, “যে কাউকে ইচ্ছামতো পতি বা পত্নীরূপে গ্রহণের স্বাধীনতা দেওয়া যায়, যদি ব্যক্তিগত সুখ এবং পাশবপ্রবৃত্তির পরিতৃপ্তির চেষ্টা সমাজে বিস্তার লাভ করে, তার ফল নিশ্চয় অশুভ হবে- দুষ্টপ্রকৃতি, অসুর ভাবের সন্তান জন্মাবে”। (বিবেকানন্দ ও সমকালীন ভারতবর্ষ, ৩য় খণ্ড, শঙ্করীপ্রসাদ বসু, পৃষ্ঠা ২৬৪) ‘প্রেম’ বিষয়ে এমন মতকে আমরা কোন্‌ যুক্তির নিরিখে প্রগতিশীল বলব?

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে নিবেদিতপ্রাণ অনেক দেশপ্রেমীর কাছে বিবেকানন্দ ছিলেন আদর্শ। ১৮৯৭-এর ২৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতা-অভিনন্দনের উত্তর দিতে গিয়ে বিবেকানন্দ আবেগের সঙ্গে বলেছিলেন, “ইংরেজদের সম্বন্ধে যে ঘৃণার হৃদয় নিয়ে আমি ইংলন্ডের মাটিতে পদার্পণ করেছিলাম, কোনও জাতি সম্বন্ধে তার থেকে অধিক ঘৃণার ভাব নিয়ে সে দেশের মাটিতে আর কেউ কখনও নামেনি”। বিবেকানন্দের এই বক্তব্যকে অনেকেই তুলে ধরে প্রমাণ করতে চান তাঁর ইংরেজ বিদ্বেষ। কিন্তু আসলে এটা বিবেকানন্দের বক্তব্যের অংশ বিশেষ। “কেউ কখনও নামেনি”-র ঠিক পরেই বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “এই সভামঞ্চে যেসব ইংরাজ বন্ধু উপস্থিত আছেন, তাঁরাই সে-বিষয়ে সাক্ষ্য দেবেন। কিন্তু যতই আমি তাদের মধ্যে বাস করতে লাগলাম, তাদের জাতীয় জীবনযন্ত্র কিভাবে কাজ করছে দেখতে পেলাম, তাদের সঙ্গে মিশে জানলাম কোথায় রয়েছে তাঁদের জাতির হৃৎস্পন্দন- ততই আমি তাদের ভালবাসতে লাগলাম। তার ফলে, হে ভাতৃগণ, এখানে এমন কেউ নেই যিনি আমার থেকে ইংরেজদের বেশি ভালবাসেন”। (বিবেকানন্দ ও সমকালীন ভারতবর্ষ, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২) বিবেকানন্দের ‘বাণী ও রচনা’ ৯ম খণ্ডের ২৫৩ পৃষ্ঠায় বিবেকানন্দ বলছেন, “সকল কথার ধুয়ো হচ্ছে- ‘ইংরেজ আমাদের দাও।’ বাপু আর কত দেবে? রেল দিয়েছে, তারের খবর দিয়েছে, রাজ্যে শৃঙ্খলা দিয়েছে, ডাকাতদের দল তাড়িয়েছে, বিজ্ঞান শিক্ষা দিয়েছে। আবার কী দেবে? নিঃস্বার্থভাবে কে কী দেয়? বলি ওরা তো এতো দিয়েছে, তোরা কী দিয়েছিস?”
বিবেকানন্দের এই সব বক্তব্য তুলে বলতে চাইছি, বিবেকানন্দকে পুরোপুরি ইংরেজ বিদ্বেষী বলে বর্তমানে যেভাবে চিত্রিত করা হয়, সেটা ঠিক নয়। তিনি তাঁর স্বভাব বৈশিষ্ট্য অনুসারে কখনও ইংরেজ-প্রেম, কখনও ইংরেজ-বিদ্বেষ প্রকাশ করেছেন।

এই লেখকের একটি বিনীত অনুরোধ,
বিবেকানন্দের কিছু ভালো বাণী পড়ে খণ্ডিত বিবেকানন্দকে না জেনে সম্পূর্ণ বিবেকানন্দকে জানতে আন্তরিকতার সঙ্গে প্রয়োজনীয় বই-পত্তর আদ্যন্ত পড়ুন। দেখতে পাবেন, বিবেকানন্দের সতীদাহের প্রতি সমর্থন থেকে বিধবা বিবাহ বিরোধিতার সম্পূর্ণ চিত্র। দেখতে পাবেন বিবেকানন্দের স্ব-বিরোধিতার নানা দিক।
সুতরাং তাঁর প্রগতিশীল বাণীগুলোই শেষ কথা নয়।
বিদ্যাসাগর, রামমোহন শিক্ষা প্রসারে সমাজ সংস্কারে ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। শিক্ষা বিষয়ে বিবেকানন্দের মত ছিল একটু ভিন্ন রকম। তাঁর কথায়, “এইসব বই, এইসব বিজ্ঞান আমাদিগকে কিছুই শিখাইতে পারিবে না। বই পড়িয়া আমরা তোতাপাখী হই, বই পড়িয়া কেহ পণ্ডিত হয় না। ... বই যত কম পড়েন ততই ভাল। ... গ্রন্থ দ্বারা জগতের ভাল অপেক্ষা মন্দ অধিক হইয়াছে”। (বাণী ও রচনা, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৫, ৯৯ এবং ১০৯) সমাজ সংস্কার সম্বন্ধে বিবেকানন্দের স্পষ্ট অভিমত, “সমাজ সংস্কার ধর্মের কাজ নয়”। (পত্রাবলী, পত্র সংখ্যা ৮৩)
যে মতামত, আদর্শ ও আন্দোলনের জন্য বিদ্যাসাগর, রামমোহনকে আমরা শ্রদ্ধা করি, সেই মতামতের, আদর্শের বিরোধী চরিত্রকে আমরা শ্রদ্ধা জানাবো কী করে? এতে আমাদের স্ব-বিরোধিতা, ভণ্ডামী, অজ্ঞতা-ই কি প্রকাশিত হয় না?
আমরা কী করবো, আমাদেরই ঠিক করতে হবে। আমজনতার আবেগে গা ভাসাবো, না কি যুক্তি-বুদ্ধিকে শাণিত করতে সচেষ্ট হবো?
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জানুয়ারি, ২০১৬ দুপুর ২:১৯
৫টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দশ বছরের ব্লগিং—মিষ্টি মুখ হোক সবার

লিখেছেন কাওসার_সিদ্দিকী, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৯

আজ আমার ব্লগিং যাত্রার দশ বছর দুই মাস পূর্ণ হলো। এই দীর্ঘ সময়ে পাঠকদের ভালোবাসা, মন্তব্য আর সমর্থন আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

এই আনন্দ ভাগাভাগি করতে চাই আপনাদের সবার সাথে—তাই আজকের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেতন বৃদ্ধি পাওয়ায় এত উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:০২


নতুন পে স্কেল নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। বেতন কত বাড়বে এবং নতুন কাঠামো বাস্তবে কেমন হবে, এসব প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে। নতুন বেতন কাঠামোয় ১ থেকে ১১... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্ব চিঠি দিবস ২০২৬: সম্পর্কের মাঝে আবারও চিঠির অনুভূতি।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:২৮



বিশ্ব চিঠি দিবস ২০২৬: সম্পর্কের মাঝে আবারও চিঠির অনুভূতি

বিশ্ব চিঠি দিবস উপলক্ষে এবার বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের কয়েকজনকে নিজের হাতে চিঠি পাঠালাম। ডিজিটাল যোগাযোগের এই সময়ে একটি চিঠি যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ অদৃশ্য পাতায় লেখা ছিল যে

লিখেছেন সামিয়া, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:২১



আমি একটা বায়িং হাউসে চাকরি করতাম। তখন জীবনটা খুব সাধারণ ছিল। সকালবেলা অফিস, সারাদিন কাজের চাপ, সন্ধ্যায় বাসায় ফেরা। ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা ছিল না। বিয়ে নিয়ে তো... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্যাস বিদ্যুৎ সংকট ও বিএনপি কি একে অপরের পরিপূরক?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৩৭


গ্যাস নাই ,বিদ্যুৎ নাই। নিত্যদিনের নানা সংকটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠছে। এভাবে মানুষ বিএনপিকে কতদিন সহ্য করবে? মানুষ সহ্য করতে করতে যখন ধর্যের বাধ সহ্যের বাধ ভেঙ্গে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×