দীর্ঘ দিনের অদৃশ্য বাবাকে প্রায় ভুলেই গেছি। কখনো কখনো বাবার কথা মনে পড়লে আমাদের খুলনার বাড়িটার কথা মনে পড়ে বর্ষার দিনে যার চারপাশ জল থৈ থৈ। বাড়ি থেকে রাস্তায় উঠার জন্য একটা বাসের সাঁকো ছিলো। ছুটির দিনে ছুটির দিনে বাবা সাঁকোটা মেরামত করতেন হাটু পানিতে নেমে। আমাদের বাসার সামনে ছিল একটা তাল গাছ । পানিতে টুপ টুপ শব্দ করে তাল পড়তো । সারা বাড়িতে শুধূ তাল তাল গন্ধ। অার একটা টানা বারান্দা যার এককোনে বসে আমরা দুই ভাই-বোন খেলছি আর খেলেই চলছি। বর্ষার পানিতে মাছ কিলবিল করে। উদাস চোখে তাকিয়ে থাকি মাছেদের দিকে। নতুন চোখে পৃথিবীর তুচ্ছ উপাদানও আনন্দ দেয়। রিকসা বেলের টুংটাং শুনলে ছুটে যেতাম- বাবা এসেছে বাবা এসেছে । আমাদের মা মৃদু আলোয় বসে উল বুনছেন আর আমরা সেই উলগুটি নিয়ে লোফালুফি করছি। আমার পছন্দ ছিলো গোলাপী রংয়ের নরম গুটিটা ।্একদিন ওটা হারিয়ে ফেললাম যেমন করে হারিয়ে ফেলেছি আমাদের তালগাছওয়ালা বাড়িটা। প্রিয় জিনিষগুলো হয়তো তাড়াতাড়িই হারিয়ে যায়।
এক রৌদ্রোজ্বল সকালে আমরা ঢাকায় চলে এলাম। এখানে বাবা প্যাকটিস শুরু করলেন আর আমাদের জন্য বানালেন নতুন বাড়ি । বাড়ির সামন অনেকখানি খোলা জায়গা । সেখানে শুরু হলো সব্জি চাষ। সারাদিন পর কোর্ট ফিরে এসে চলতো তার বাগান পরিচর্যার কাজ। পরিশ্রমের ফল মিললো দ্রুতই। সবুজ লতাপাতায় ছেয়ে গেলো আমাদের কাঠের বাড়িটা। বেশি পরিশ্রমের জন্যই হয়তোবা বাবা অসুস্থ হয়ে ভর্তি হলেন হাসপাতালে। আমারা চলে এলাম নানু বাড়ি যেখানে সারাদিন উংসব উংসব ভাব। নানা নানু খালা মামাদের সাহচর্যে এসে বাবার কথা মনেই হতোনা প্রায়। অকস্মাৎ এক দুসংবাদ মনে করিয়ে দেয় আমাদেরও বাবা নেই।ঘটনা হচ্ছে -
একদিন কলেজে গিয়ে শুনি আমাদের বন্ধু রুবিনার বাবা মারা গেছেন। খবরটা শুনে মন খারাপ হলো খুবই। রুবিনার বাবাক আমরা ডাকতাম কাকু বলে। দেখা হলে কী মিষ্টি করে যে কথা বলতেন। আর রুবিনার আমাদের জন্য যে সব মজার মজার বই স্প্লাই দেয় সেগুলো ওর বাবার লাইব্রেরীর । ওদের বাড়িতে এখানে ওখানে বুকসেল্ফ , সেগুলো আবার বই দিয়ে ঠাসা। রুবিনা আমাদের সঙ্গে যেসব গ্লপ করতো তার বেশিরভাগই ছিলো বাবাকে নিয়ে। এত প্রিয় বাবাকে হারিয়ে ওরা কেমন আছে জানতে ছুটে যাই ওর কাছে। এত বড় কষ্টের খবর না জানানোর কারন জানতে চাইলে
আমাদের রুবিনা সেদিন কি বলেছিলো জানেন?
- ' আব্বা নেই বললেই সবাই কেমন যেন করুনার চোখে তাকায় - উহ আহ করে । আমার ভাল্লাগেনা। অসহায় লাগে নিজেক। কারো বাবা মরে গেলে বোধহয় সামাজিক মর্যাদার পারদটা অনেকখানি নিচে নেমে যায়। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি 'বাবা নাই 'এটা কাউকে বলবোনা।'
সেদিন অনেক দিন পর বাবাকে মনে পড়ে অন্যরকম ভাবে। বাবাদের অত তাড়াতাড়ি চলে যেতে নেই!
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুন, ২০১০ বিকাল ৪:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


