somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটগল্প প্রস্তাব (বছরের শেষ পোস্ট)

৩১ শে ডিসেম্বর, ২০১৭ দুপুর ২:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



(ফোটো- গুগুল)
বৃষ্টি থেমে গেলেও আকাশটা পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। শ্বাস টানবার সঙ্গে সঙ্গে কেমন ভেজা ভেজা এক রকম অদ্ভুত ঘ্রাণ নাকে এসে লাগে রিয়াজুলের। পথের দুপাশে বেড়ে ওঠা ঝোপঝাড় সকালের দিকে যাবার সময়ও বেশ ধুলোমাখা ছিল। কিন্তু ফিরতি পথে একই দৃশ্য ভিন্ন রকম মনে হয় তার কাছে। ধুলোমাখা ম্লান ঝোপঝাড় বৃষ্টির জলে ধুয়ে মুছে বেশ সাফ-সুতরো হয়ে উঠেছে। তার ইচ্ছে হয় এখানেই কোথাও সবুজ ঘাসের ওপর চিত হয়ে শুয়ে পড়ে আকাশের দিকে চোখ মেলে রাখে। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও তেমনটি করবার কোনো সুযোগ নেই। ফিরে আসবার পথে সাইকেলের পেছনের চাকার টিউব ফেটে গিয়েছে। এটাকে না সারালে ঘরে ফেরাটাই কঠিন হয়ে যাবে। দু হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল চেপে ধরে সাইকেলটাকে ঠেলে ঠেলে পথ চলছিল সে।

পাহাড়ি এলাকার সরু আর আঁকাবাঁকা পথে হেঁটে চলাটা দু সময়ে দু রকম মনে হয় তার কাছে। কোনো একটা কাজে বের হলে পথটা যেন অযথাই দীর্ঘ আর ক্লান্তিকর হয়ে যায়। বিনা কাজে বের হলে যেন সহসাই ছোট হয়ে যায় পথের দৈর্ঘ্য। অকারণ হাঁটাহাঁটিতে তেমন একটা খারাপ লাগে না। সাইকেলটাকে ঠেলে নিয়ে যেতেই যেন রাজ্যের অনীহা ভর করে তার দু পায়ে।

বাঁক পেরুতেই দূর থেকে চোখে পড়ে দেবুর সাইকেল মেরামতের ঘরটি। স্ত্রী আর তিন মেয়ে নিয়ে এখানেই বাস করে দেবু। বাড়ির সামনের অংশটিকে দুভাগ করে একটিতে মুদি দোকান আর অন্যটিতে সাইকেল সারানোর দোকান দিয়েছে সে। সাইকেল সারানোর কাজ খুব একটা না হলেও মুদি দোকানটি চলে ভালোই।

এক সময় এ এলাকায় বাই সাইকেল তেমন একটা চোখে পড়তো না। দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে সমতল থেকে অনেক পেশার মানুষ এসে বসত গড়েছে এখানে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সংগে শুধু সাইকেল নয়, অনেক মোটর সাইকেলও চোখে পড়ে। চোখে পড়ে পোশাক আর ভাষাগত পরিবর্তনও। আগের তুলনায় পাহাড়ি লোকজন অনেক পরিষ্কার বাংলা বলতে পারছে।

মুদি দোকানে দেবুর স্ত্রী ঝুনুকে দেখা যায়। পাশের সাইকেল সারাইর দোকানে কাউকে দেখা যায় না। তবু সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায় রিয়াজুল। ঝুনুর উদ্দেশ্যে বলে, কিরে বউদি, আমার সাইকেল সারাবে কে?
- মানু আছে। একটু থাম। সাইকেল থুইয়া বয়!

বেড়ার গায়ে সাইকেলটাকে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়ে দোকানের সামনে পেতে রাখা বাঁশের মাচায় বসে রিয়াজুল। ঠিক তখনই ঝুনুর কণ্ঠে মানু ডাকটা শুনে বুঝতে পারলেও বাকি কথাগুলো মোটেও বুঝতে পারে না সে। তবে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মানুকে দেখা যায়।

- কিরে মানু, কেমন আছিস?

- ভালা আছি। তুমি ভালা তো আংকেল?

- ভালো আর থাকলাম কোথায়? পেছনের টিউবটা গেছে।

- আমি দেখি আগে। তাপ্পি দিয়া চললে লাগাইয়া দিবো। বলতে বলতে মানু সাইকেল টানতে টানতে দোকানের ভেতর নিয়ে যায়।

- খরচ যেইটাতে কম হয় সেইটাই কর!

সাইকেলটাকে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে হাতে ডালি নিয়ে চাকা খুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে মেয়েটা। এমনিতে ক্লাস নাইনে পড়ে সে। স্কুল আর পড়াশোনার বাইরে সাইকেল সারাইর কাজ নয়তো মুদি দোকানে বসে। অন্য মেয়ে দুটি ঘর সামলানো আর রান্নাবান্নার কাজগুলো দেখে হয়তো।

- দেবু কোথায়রে?

ঝুনু দোকান থেকে উত্তর করে, বাজারে গেছে। টাউনেও যাইতে পারে।

রিয়াজুলের চোখ মানুর দুটো ব্যস্ত হাতের ওপর। কেমন ঝটপট চাকাটাকে খুলে নিয়ে একটি চ্যাপ্টা মাথার লোহা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে টায়ারটা খুলে ফেলে টিউবটা খুলে নিয়ে একবার দৃষ্টি বুলায়। তারপর রিয়াজুলের উদ্দেশ্যে বলে, তাপ্পি লাগাইলেই চলবো আংকেল। টিউব ভালা আছে।

- আচ্ছা তাই কর। আমাকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে।

- আইজ হইবো না। গাম নাই।

- তাইলে নতুন টিউবই দিয়া দে!

- তাও নাই। বলে হেসে ওঠে মেয়েটি। তারপর আবার বলে, বাবু বাজার থাকি ফিরা আসুক। সাইকেল কাইল নিয়া যাও।

আশপাশে সাইকেল সারাইর আর কোনো দোকান নেই বলে মানুর কথা মেনে নিতেই হয় রিয়াজুলকে। সাইকেল ছাড়া অতটা পথে হেঁটে যাওয়ার কথা ভাবতে পারে না সে। কিন্তু এ ছাড়া বিকল্প পথ তেমন একটা নেই। টাউন থেকে মাঝে মধ্যে দু একটা মোটর সাইকেল এলেও উলটো পথে যেতে চাইবে না কেউ। আর কোনোভাবে সম্মত হলেও টাকা চাইবে বেশি। তার কাছে অত টাকা নেই।

নদী-ভাঙা মানুষ রিয়াজুল। এ অঞ্চলে এসে জমি লিজ নিয়ে নিজের একটা মাথা গোঁজার ঠাই করে নিতে পারলেও জীবনে এখনো থিতু হয়ে বসতে পারেনি। হতে পারেনি সংসারী। এ নিয়ে অবশ্য তার অতটা তাড়া ছিল না কখনো। লিজ নেয়া জমিতে ঘর তুলবার পর বাকি অংশটাতে কাজি পেয়ারার চারা এনে লাগিয়েছিল। ফলন মোটামুটি ভালো হলেও নিজের আর্থিক অবস্থা নিয়ে তেমন একটা সন্তুষ্ট নয় সে।অবশ্য দেবু একবার বলেছিল, মাস্টর, একদিকে বাগান আরেকদিকে টুশানি, কাজ কামাই তো ভালাই হয়। বিয়াটা কইরা ফালাও না কেন?

- আমারে মেয়ে দিবে কে? তা ছাড়া আমি হইলাম একা মানুষ। থাকা-খাওয়ার ঠিক নাই।

- আমার মাইয়া দুইটারে পার করতে পারলে কিছুডা পাতলা হইতাম।

- সমন্ধ আসে না?

- না। ওঝা কয় কেউ তুকতাক কইরা বন্ধ রাখছে। কিন্তু আমি বুঝি না এমন দুশমন কে আমার!

বিয়ে নিয়ে আর কোনো আলোচনা এগোয়নি সেদিন। পেয়ারা ব্যাপারী বিশু স্যাটেলারদের একটি মেয়ের আলাপ নিয়ে এসেছিল একবার। কিন্তু একেবারে নিরক্ষর মেয়েকে বিয়ে করে জীবন পার করার কথা কল্পনাতেও ঠাই দিতে পারে না রিয়াজুল। ব্যাপারটা তাই সেখানেই মুলতবি হয়ে গিয়েছিল। তারপর পেরিয়ে গেছে একটি বছর। এর ভেতর কারো মুখে বিয়ের কোনো সংবাদ শোনা যায়নি।

হাঁটতে হাঁটতে দেবুর পাড়া ছেড়ে অনেকটা পথে চলে আসে রিয়াজুল। হঠাৎ বাঁক পেরুনোর আগে একবার পেছন ফিরে তাকায় সে। সাইকেল সারাইর দোকানটার সামনে তিনজন মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। কিন্তু মুহূর্তকাল মাত্র। দুটি মেয়ে চট করেই যেন দোকানের ভেতর অদৃশ্য হয়ে যায়। বাকি মেয়েটি পেছন ফিরে কিছুক্ষণ হয়তো রিয়াজুলকেই দেখে। তারপর আস্তে ধীরে দোকানে ঢোকে। মেয়েটি হয়তো মানু। রিয়াজুলের তেমনটিই মনে হয়।

সে আর দাঁড়ায় না। বাঁক পেরিয়ে রাস্তার ঢাল বেয়ে নেমে পড়ে। সামনের পাহাড়টাকে আড়াআড়ি পাড়ি দিতে পারলেই বাজারের মুখটাতে গিয়ে পড়বে সে। এমন পথে সাইকেল নিয়ে যাওয়া যায় না। দুটো মানুষ একে অন্যকে পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাও অনেক কষ্টের। তাই হয়তো এ পথে লোকজনের গতায়াত কম।

বাজারের ভেতর ঢুকে চায়ের দোকানে বসে একটি চায়ের কথা বলেই রিয়াজুল দেখতে পায় রিজুকে। আর সঙ্গে সঙ্গেই ভেতরে ভেতরে চুপসে যেতে থাকে। এখনো হাতে তেমন টাকা পয়সা আসেনি। তখনই রিজুর কণ্ঠ ফ্যাসফ্যাস করে ওঠে, খবর কি মাস্টার?

কী বলবে ভেবে পায় না রিয়াজুল। নির্বিঘ্নে বসবাসের জন্য স্থানীয় একটি দুষ্টচক্রের হাতে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা তুলে দিতে হয়। নয়তো দৈনন্দিন জীবন যাপন ভারসাম্যহীন করে দিতে তাদের তেমন একটা বেগ পেতে হয় না। রিজু সে চক্রের একজন।
- তিনমাস তো হইল।

খানিকটা সময় নিতে রিয়াজুল বলল, চা দিতে বলি? খুব তাড়াতাড়িই হয়ে যাবে। এই দু-চারদিন।

- যত তাড়াতাড়ি পার টোকেন নিয়া যাইও।

রিজু আর দাঁড়ায় না।

রিয়াজুলও যেন দম ফেলবার সুযোগ পায়। চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভাবে এ অঞ্চলে না সরকার না প্রশাসন কোনো মূল্য আছে। এখানকার প্রধান ভাষা হচ্ছে অস্ত্র। আর তার বলী হচ্ছে নিরস্ত্র কিছু মানুষ। এবার কি তাহলে সে নিজেই বলি হয়ে যাবে? যদিও বিশু ব্যাপারী কথা দিয়েছে দু-তিনদিনের ভেতর টাকা দিয়ে যাবে, তারপরও নানা সমস্যার কারণে কথা ঠিক নাও থাকতে পারে। এ অঞ্চলে কাছের মানুষ বলতে একমাত্র দেবুকেই জানে সে। কিন্তু দেবু তার জন্যে কতটা করতে পারবে তারও তেমন একটা নিশ্চয়তা নেই। তারপরও ব্যাপারটা নিয়ে দেবুর সঙ্গে আলাপ করবার জন্য অধীর হয়ে ওঠে সে।

কিন্তু দেবু কখন ফিরবে কে জানে? মানু বা ঝুনুও তেমন কিছু বলতে পারলো না। দোকানের জন্য আর সাইকেলের যন্ত্রাংশ, টায়ার-টিউব একবারেই অনেকগুলো কেনে সে। সে সব মালামাল নিয়ে ফিরতে সময় মতো গাড়ি না পেলে কখনো পরদিন দুপুরও পার হয়ে যায়। এ এলাকায় মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক তেমন ভালো নয়। বারবার লাইন কেটে যায় নয়তো সংযোগ পাওয়া যায় না। ভাগ্য ভালো হলে দু একটা কথা বলা যায়। তাই ফোনের ওপর দেবুর তেমন ভরসা নেই বলে সঙ্গে ফোন নেয় না। কথাটা একদিন আলাপে আলাপে বলেছিল সে। চা খাওয়া শেষ করে ফের দেবুর দোকান বাড়িতেই ফিরে যাবে বলে ঠিক করে সে। দেবু যতক্ষণে ফিরে আসে আসুক। প্রয়োজনে তার ফিরে আসবার অপেক্ষায় রাত পোহালে পোহাবে। তবু তার সঙ্গে কথা বলাটা খুবই জরুরি। অন্তত চাঁদার টাকাটা যদি তার মাধ্যমে পাওয়া যায় তো কিছুদিনের জন্য হলেও প্রাণে বেঁচে যাবে সে।

পথ চলতে চলতে আবার বাতাসের ভেজা ভেজা ঘ্রাণটা অনুভব করে সে। যা কিছুক্ষণ আগেও ছিল না। আকাশটাও কেমন ভার হয়ে আছে। যে কোনো সময় বৃষ্টি শুরু হতে পারে। কিন্তু তার আগেই তাকে ফিরে যেতে হবে দেবুর দোকান-বাড়িতে। বৃষ্টিতে ভিজলে পাহাড়ি হাওয়ার দাপটে কাঁপুনি শুরু হয়ে যাবে। হয়তো পথের ওপরই তাকে অচল হয়ে পড়তে হবে। দুর্যোগের সময় কে কার খোঁজ রাখে? হয়তো দেবুর পরিবারের কেউ তার ফিরে যাবার কথা ঘুণাক্ষরেও মনে করবে না। দ্রুত পথ চলতে গিয়ে বার দুয়েক হোঁচট খেয়ে পড়েছে সে। প্যান্টের পেছনে মাটি লেগে খারাপ হয়ে গেল কি না তা নিয়ে মোটেও ভাবে না সে। বৃষ্টি শুরুর আগেই যেভাবে হোক তাকে পৌঁছে যেতে হবে দেবুর দোকান-বাড়িতে।

রিয়াজুল এবার দৌড়াতে আরম্ভ করে। কিন্তু বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। ভেজা পথে তেমন জোরে ছুটতে পারে না। পুরোপুরি ভিজে যায়। তবে সে পৌঁছে যায় দোকান-বাড়িটায়। মুদি দোকানটা বন্ধ বলে সাইকেল সারানোর ছাউনিটার নিচে গিয়ে দাঁড়ায়। বেড়ার গায়ে ঠেস দিয়ে রাখা সাইকেলটার পাশে মানুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। হয়তো দেবু ফিরে এসেছে। হয়তো টিউবে তাপ্পি মেরে ঠিক করে রেখেছে মেয়েটা।

ভেজা চুপচুপে রিয়াজুলকে দেখে কেমন অবাক হয়ে মানু বলে, বাবু ফিরছে জানলা কেমনে? কথা হইছে?

- না। এমনিই আবার এলাম। একটা জরুরি কাজে।

- ও। তাপ্পি মারছি। হাওয়া করছি। কিন্তু এই সময় সাইকেল নিবা নাকি নিজেরে বাচাইবা?

বলতে বলতে মানু বাড়ির ভেতরে কোথাও যায় হয়তো। তখনই দেবুকে দেখা যায়। বলে, মাস্টর ভিজা গেলা দেখি। তারপরই নিজের ভাষায় কারো উদ্দেশ্যে কিছু বলে দেবু। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তার মেয়ে মাচু অথবা মারু শুকনো কাপড় নিয়ে আসে।

বুঝতে পেরে রিয়াজুল নিজেই হাত বাড়িয়ে শুকনো কাপড়গুলো নেয়। গামছার মতো একটি মোটা কাপড়ে মাথা গা হাত মোছে। ভেজা শার্ট খুলে বেড়ার গায়ে ঝুলিয়ে দিয়ে শরীর মুছে নিয়ে সেটাই লুঙ্গীর মতো করে পরে নেয়। শীতশীত বোধ হচ্ছিল বলে বাকি শুকনো কাপড়টা চাদরের মতো গায়ে জড়িয়ে নেয়। তারপর ভেজা প্যান্ট বেড়ার গায়ে ছড়িয়ে দিয়ে বলে, তুমি আজকে তাড়াতাড়ি ফিরলা মনে হয়?

- হ। রজবরে পাইয়া গেছিলাম। তার মোটর সাইকেলে গেলাম। ফিরলাম তারই লগে।

তারপরই রিয়াজুলের একটা হাত ধরে দেবু বলল, ভিতরে আস। বস। বিশ্রাম কর। অনেক কথা আছে তোমার লগে।

রিয়াজুল বুঝতে পারে না কী বিষয়ে কথা বলবে দেবু। শান্তিবাহিনীর লোক বা রিজুর সঙ্গে হয়তো কথা হয়েছে দেবুর। চাঁদার ব্যাপারেই হয়তো কিছু বলবে তাকে।

দেবুর ভেতর বাড়িতে আগে কখনো প্রবেশ করেনি রিয়াজুল। নানা রকম গাছপালাতে ঠাসা। যে সব গাছের অনেকটাই বাইরে থেকে দেখা যায়। কিন্তু ভেতরে কী আছে তার কিছুই বাইরে থেকে অনুমান করা যায় না। কোথাও কোথাও তরকারির মাচা দেখা যায়। দেখা যায় বিভিন্ন শাকসবজির বীজতলাও। পূব আর পশ্চিম ভিটায় বাঁশ-বেত দিয়ে মাচার ওপর ছবির মতো দুটি ঘর। মাঝখানে উঠোনের মতো বেশ কিছুটা ফাঁকা জায়গা।

দেবুর পেছন পেছন হেঁটে পূব দিকের ঘরটির সামনে বারান্দার মতো জায়গাটিতে গিয়ে বসে। পাশে বসে দেবু মাচু-মারু বলে কিছু বলতেই পশ্চিম ভিটের ঘরের দরজায় তাদের দেখা যায়। একই সঙ্গে দুজনই হাত জোড় করে নমস্কার জানায়। প্রত্যুত্তরে কেবল মাথা দোলায় রিয়াজুল। তারপর দেবুকে বলে, আমি কেবল মানুকে চিনি। ওদের কে বড় কে মেজ?

দেবু কেমন স্বপ্নে পড়া মানুষের মতো দু মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, ডাইনে মাচু বড়। তার ডাইনে মারু মেজ।

রিয়াজুল দু বোনের দিকে ভালো করেন তাকালেও তাদের বয়স অনুমান করতে পারে না। আর এমনিতেও সমতলের মানুষদের মতো পাহাড়ি মানুষের মুখ দেখে বয়স অনুমান করা যায় না। চল্লিশেও আঠাশ-ত্রিশ বলে মনে হয়। দেবু নিজের বয়স বলে ষাট। যা বিশ্বাস করতে মন সায় দেয় না রিয়াজুলের।

দেবু হাত ইশারায় দু মেয়েকে যেতে বললে তারা দরজা থেকে সরে গিয়ে ঘরে আড়াল নেয়। তখনই কেমন কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে দেবু বলে, মাস্টার, একটা কথা কইতাম। কিন্তু কইতে শরম পাই। কিন্তু তার পরেও কথাটা আমারে বলতে হইব।

- কী কথা, আমি এখনো চাঁদা দেই নাই সেইটা? রিজু কিছু বলছে? কথা বলতে লজ্জার তো কিছু দেখি না আমি।

দেবুকে সাহস জোগাতেই যেন কথাগুলো বলে সে। তবু দেবুর ফর্সা মুখ কেমন লালচে দেখায়। দেবুর অন্তর্গত সংকট বা লজ্জার হেতু জানে না বলেই সে দেবুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

- না না। সেই কথা না। রিজু বেশি চাপাচাপি করলে আমিই দিয়া দিবো। তুমি পরে এক সময় দিলেই হইব। তুমি তো জানো যে, আমার টাকা-পয়সার তেমন অভাব নাই।

দেবুর কথা শুনে অত্যাসন্ন আর্থিক সংকটের ভয় কাটলেও নিজের বিয়ের কথাটা কীভাবে পাড়বে, নিজের মুখে কীভাবে একটি মেয়ে দেখে দেবার কথা বলবে তা নিয়েই দোটানায় ভুগছিল সে। কিন্তু তার আগেই দেবু ফের বলে, পবন একবার মাচুর লগে তোমার বিয়ার কথা বলছিল। কিন্তু ঝুনু অমত করছিল। বলছিল বাঙ্গালের কাছে মাইয়ার বিয়া দিব না। পবনেরও দেখা পাই না অনেকদিন হইয়া গেল। মাইয়া দুইটারে নিয়া অনেক কষ্টে আছি। রাইতে ঘুম হয় না।

- তুমি বললে মেয়েদের জন্য আমি ছেলে দেখবো।

- সেই কথা না মাস্টার। গেছে দিন ঝুনু বলতাছিল, মাচুরে বিয়া করতে তোমার অমত আছে নাকি নাই, সেই কথাটা যেন একবার জিগাই।

- এইটা কেমন কথা বললা দেবু?

মনেমনে খুশি হয়ে উঠলেও রিয়াজুল বলে, দেখ, তোমারে আমি দাদা ডাকি। তোমার বউরে ডাকি বউদি। মানু আমারে ডাকে আংকেল। এমন একটা সম্পর্কের ভিতর দিয়া বিয়া-শাদি হইলে কি ভালো দেখাবে? তা ছাড়া মানুষে কী বলবে? তোমার জ্ঞাতিরাই বা ব্যাপারটা কোন চোখে দেখবে?

- মাস্টার, আমার জ্ঞাতিরা ভালো আছে। তাগো মনে এত প্যাচ নাই। অত ভালো-মন্দ বিচারের কী আছে? একটা সময় মায়-পোলায়, বাপে-মাইয়ায়, ভাই-বোনে বিয়া হইত। সেই সময় কি সম্পর্ক আছিল না? আমাদের সম্পর্ক যেমন আছে থাকুক। কে কারে কী বইলা ডাকি তাতে কী আসে যায়? তোমার সমাজের কথা ধইরা বলি, আমি তোমার মায়ের পেটের ভাই না। সমস্যা আছে কোনো?

- সমস্যা নাই। নিজের মানুষের কাছে দেইখা শুইনা মাইয়াটারে বিয়া দিতে পারতা।

- তোমার অমত হইলে আরেক কথা। কিন্তু তোমারে যতটা জানি, মাচুরে তুমি নিলে আমি কিছুটা শান্তি পাইতাম।

রিয়াজুল খানিকটা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে দেবুর মুখের দিকে। কী অদ্ভুত ভাবে বিয়ের ব্যাপারটা সামনে চলে এলো আর সমাধানও হয়ে গেল। সে তো অনেক আগে থেকেই মাচুকে পছন্দ করে। কিন্তু সম্পর্কের জটিলতায় তা ভাবতেও সংকোচ বোধ করতো। তারপরও দেবুর কথায় সরাসরি হ্যাঁ বলতে পারে না সে। খানিকটা ঘুরিয়ে বলে, আমার অমত সে কথা বলি না। বলি তোমার জ্ঞাতি হলে ভালো হতো।

- ভালোমন্দ আমারে বুঝতে দাও মাস্টার। মাইয়াগুলার বাপ আমি, তুমি না!

বলেই হাহা করে হেসে ওঠে দেবু। ঠিক তখনই মাচু একটি থালায় করে কিছু ভাজা মাংস আর কাটা ফল নিয়ে আসে। খানিকটা ঝুঁকে দুজনের সামনে থালাটা নামিয়ে রাখতেই সহাস্যে দেবু মেয়েটাকে কিছু বলে। আর বাপের কথা শুনেই হয়তো তার মুখটা কেমন লাল হয়ে যায়। তখনই সে চকিতে একবার রিয়াজুলের দিকে তাকায়। তারপর দ্রুত ফিরে গিয়ে আরেকটি থালায় করে চোলাই ভর্তি দুটো গ্লাস নিয়ে আসে। থালাটা নামানোর আগেই একটি গ্লাস হাতে নিয়ে বাড়িয়ে ধরে রিয়াজুলের দিকে।

মাচুর হাত থেকে গ্লাস নিতে নিতে রিয়াজুল ভাবে যে, এটাই মাচুর সম্মতির চিহ্ন হতে পারে।

রিয়াজুলের হাতে গ্লাস তুলে দিয়েই যেন ত্রস্ত হরিণী মাচু ঘরে ফিরে যায়।

দেবু হঠাৎ রিয়াজুলের হাঁটুতে হাত রেখে নিচু স্বরে বলে, তাইলে তোমার মত আছে এইটাই ধইরা নিবো? তুমি হ কইলে আমি বিয়ার জোগাড় করি। ওঝারে খবর দিয়া দিন তারিখ ঠিক করি?

- তুমি যেইটা ভালো মনে কর!

বলেই, গ্লাসের তরলে একটি দীর্ঘ চুমুক দিয়ে খকখক করে তুমুল কেশে ওঠে রিয়াজুল। আশপাশে দৃষ্টি বুলাতে গিয়ে দেখতে পায়, দরজায় দাঁড়িয়ে এদিকেই তাকিয়ে আছে মাচু। যার দৃষ্টিতে লেপটে আছে একরাশ লজ্জার ধূসরতা।

(সমাপ্ত)


সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জানুয়ারি, ২০১৮ রাত ৮:০৫
২১টি মন্তব্য ১৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মানবতা, সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে জাতীয় কবি নজরুলের চিরন্তন আহ্বান

লিখেছেন মোঃ ফরিদুল ইসলাম, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:০৪

বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এমন এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি একই সঙ্গে কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংগীতজ্ঞ, দার্শনিক ও সমাজসংস্কারক। তাঁকে শুধু “বিদ্রোহী কবি” বললে তাঁর পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না;... ...বাকিটুকু পড়ুন

Humans are (not) from Earth- তবে কি আমরা মহাবিশ্বের ভৃত্য?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৫৫

Humans are not from Earth: A Scientific Evaluation of the Evidence বইটির লেখক ডক্টর এলিস সিলভার (Dr. Ellis Silver)-এর ব্যক্তিগত ও একাডেমিক জীবন নিয়ে মূলধারার তথ্যমাধ্যমে এক ধরনের রহস্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ-পর্ব ২

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৫ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৭:০১


বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ: মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর রেমিট্যান্স কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ও টেকসই উন্নয়নের বিকল্প কৌশল
একটি অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ফিজিবিলিটি স্টাডি ।

একটি ধারাবাহিক গবেষনামুলক পোস্ট
[link|https://www.somewhereinblog.net/blog/ali2016/30393976|প্রথম পর্বে থাকা গবেষনাটির পটভুমির লিংক – পর্ব... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা ইতিহাসের ছিন্নপত্র...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৫ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:০৩



আমরা ইতিহাসের ছিন্নপত্র...

২০১০, এক-এগারোর পর থেকে ৩৬ জুলাই পর্যন্ত- যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে দাঁড়িয়েছিল, যারা গুম, নির্যাতন, কারাবাস, মামলা, চাকরি হারানো, পরিবার ভেঙে যাওয়া- সবকিছুর মূল্য দিয়েছে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৭


আজ দেশজুড়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। ২৪ -এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিভ্ন্নি সময়ে বহু নিরীহ প্রাণ অকালে ঝরেছে। আবু সাঈদ, মুগ্ধ ছাড়াও নাম জানা-অজানা হাজারো ব্যাক্তি তাদের প্রাণ হারিয়েছেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×