তুমি কি বাংলাদেশী?
প্লেনে বসে জানালা দিয়ে মেঘের অপরূপ দৃশ্য দেখছিলাম। পাশের সিটের লোকটার প্রশ্নে সম্বিত ফিরে পেয়ে তাকালাম। ভদ্রলোক থুত্থুুড়ে বুড়ো। তাই যথেষ্ট বিনয়ের সাথে তার কথার উত্তর দিলাম।
হ্যা, আমি বাংলাদেশী।
বাড়ি কোথায়? রশিদপুর চা বাগানে?
বাংলাদেশে এতো জায়গা থাকতে লোকটা রশিদপুরের মতো অজানা একটা চা বাগানের নাম কেন বলল বুঝলাম না।
বললাম, না। আমি ঢাকায় থাকি।
ও ঢাকায়? আই সি। ওকে কোন প্রবলেম নাই। তুমি ঢাকায় থাকলেও আমার কাজ চলবে।
লোকটি বলে কী! চিনি না, জানি না লোকটার কাজ আমাকে দিয়ে হয়ে যাবে! আমিও আগ্রহী হলাম।
তোমাকে একটা যুদ্ধের গল্প বলি। আমি তখন একজন গর্বিত মিলিটারী অফিসার। তাই দেশ মাতাকে শত্রু মুক্ত করতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে কুন্ঠা বোধ করলাম না। যে দল নেতৃত্ব করার দায়িত্ব পড়ল আমার হাতে সে দলের প্রায় সবাই অকুতোভয় বীর সেনানী। আমরা একের পর এক জনপদ আগুনে পুড়িয়ে ভস্ম করতে করতে এগুতে থাকলাম। যে ঘটনার কথা তোমাকে বলতে চাই সেটা ঘটেছিল একটা চা বাগানের মধ্যে। বাগানটার নাম রশিদপুর।
বাগানটিতে দু-একটা পাকা বাড়ি ছাড়া সবগুলো বাড়িই মাটির। আমরা বাড়ি বাড়ি ঢুকে যুবক পোলাপান আছে কি না যাচাই করছি। তেমনি একটা ঘরের উঠোনে যাওয়া মাত্রই জীর্ণশীর্ণ এক বৃদ্ধা বের হয়ে আসলেন। বললেন, তিনি একাই ঘরটিতে থাকেন। তবু দলের আরো দুজনকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলাম। আমি এগিয়ে গেলাম রান্নাঘরটির দিকে। বৃদ্ধা আমার পথ আগলে ধরলেন। বললেন, খাবার সব সামনের ঘরেই আছে। এটা ঠিক যে আমার তখন ভীষন ক্ষুধা। তারপরও বৃদ্ধার পথ আগলে ধরার ভঙ্গিতে মনে হল যেন রান্নাঘরের ভেতর কেউ আছে। তাই বুড়িটাকে সরিয়ে সতর্ক পায়ে এগুতে থাকলাম। রান্নাঘরে ঢুকেই দেখি একটা মেয়ে এক কোনায় জড়োসড়ো হয়ে মুখ ঢেকে বসে আছে। আমি মেয়েটির দিকে এগুতে থাকলে বৃদ্ধা আমার পায়ে ধরে চিৎকার করতে লাগলেন। বাপ-মা মরা মেয়েটাকে যেন রেহাই দেই। বৃদ্ধাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলাম। চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ব্যাটালিয়ানের অন্যান্যরাও তখন রান্নাঘরে। তাদের নির্দেশ দিলাম বৃদ্ধাকে বের কের রান্নাঘরের দরজা বাইরে থেকে লাগিয়ে দিতে। পেটের ক্ষিধা থেকে তখন অন্য ক্ষিধাটা মুখ্য হয়ে উঠেছে। মেয়েটির কাছে গিয়ে তার হাত দুটি মুখ থেকে সরিয়ে দিতেই আমার চোখ দুটো যেন কোথায় হারিয়ে গেল। এই চা বাগানের ছোট্ট একটা ঘরে এমন পরীর মতো দেখতে একটি মেয়ে আছে এটা ভাবাও যায় না। আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। দরজায় ক্ষুধার্ত সব জাওয়ানদের তাড়া দেয়া চিল্লাচিল্লিতে বাস্তবে ফিরে এসে মেয়েটার চোখে তাকালাম। মেয়েটার ঘৃণা ভরা চোখ তখন। কিন্তু সেটা টের পাওয়ার মতো মন তো আমার ছিল না। ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়া মেয়েটার থরথর কাঁপন টের পাওয়ার মতো ক্ষমতাটাও আমার ছিল না। বুঝোই তো, সৈনিক মানুষ। মাসের পর মাস ঘর বাড়ি থেকে বাইরে। তৃষ্ণায় শরীর-মন পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছিল। এখন আমি ঠিক ঠিক বুঝতে পারি মানুষ হিসেবে কোনটা করা উচিত আর কোনটা অনুচিত। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র তো আসলে কোন নিয়ম কানুনের ধার ধারে না, তাই না? যা খুশি তাই করা যায় তখন। অস্ত্র হাতে থাকলেই হল। তাই আমিও আমার খুশি মতো মেয়েটির দিকে হাত বাড়িয়ে দিতে চাইলাম। আমার তখন অবাধ স্বাধীনতা। আমার হাতেই তখন ঐ চা বাগানের ছোট্ট বাড়িটার সর্বময় কর্তৃত্ব। কর্তা যা খুশি তাই করতে পারেন। আমি মেয়েটির দিকে তাকাতে থাকলাম। তাকে জানালাম, তার সৌন্দর্য্যের তুলনা হয় না। তাই তাকে সুবর্ণ একটা সুযোগ দিলাম। হয় সে আমাকে খুশি করে দেবে, নয়তো তাকে ব্যারাকে নিয়ে যাওয়া হবে। দুটার একটা তাকে পছন্দ করতে বললাম। জানি না মেয়েটা তখন আমার কথা শুনার মতো মানসিক অবস্থায় ছিল কি না। তবে আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে। হঠাৎ করে মেয়েটার গায়ে কিভাবে জানি অশুরের শক্তি নেমে আসল। সে আমাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। কিছু বুঝে উঠার আগেই তার পাশে রাখা ছুরিটা হাতে নিয়ে নিজের বুকের মধ্যে বসিয়ে দিল। সবকিছু কেমন মুহুর্তের মধ্যে ঘটে গেল। আত্মহত্যা যে এতো সহজে কেউ করতে পারে তা আমার জানা ছিল না। এর আগে অনেক লোককে নিজের হাতে শুট করে মেরেছি। অনেক রক্ত দেখেছি। কিন্তু এমন মৃত্যু কখনো দেখিনি। এতো সুন্দর একটা মেয়ে এভাবে হুট করে চরম একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নেবে ভাবতে পারি নি। এমন সুন্দরকে যুদ্ধের ডামাডোলে হাতের কাছে পেয়েও হারাবো ভাবিনি কখনো। আমার ব্যারাকের সৈন্যদলও বিষয়টা মানতে পারছিল না কিছুতেই। লোভাতুর সেই সৈন্যরা, অকুতোভয় বীর সেই সেনানীরা কিছুতেই মানতে পারল না আমার কারনণ এমন মূল্যবান এক রত্ন হারাবে যে কি না যুদ্ধের বাকি দিনগুলোতে তাদের চরম আনন্দের উৎস হতে পারত। তাই তারা আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল। আমার অধীনস্তরা আমার হাত পা বেঁধে আমার বিচার করা শুরু করল। বিচারের রায়ে আমাকে গুলি করে আহত করা হল। আহত করে তারা আমাকে অকেজো হিসেবে হ্যাড কোয়ার্টারে পাঠিয়ে দিল। আমার যুদ্ধজীবন এভাবেই শেষ হল।
বুড়ো এতোক্ষণে থামল। বুঝতে পারলেও জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কোন দেশের মানুষ; কোন যুদ্ধের কথা বলছেন।
তিনি জানালেন, তিনি একজন পাাকিস্তানী। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের কথাই বলছিলেন এতোক্ষণ।
পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কারো সাথে আমার দেখা হবে- এ কখনো ভাবিনি। হানাদার বাহিনীর একজনের মুখে এমন গল্প শুনার দুর্ভাগ্য আমার হবে- এটাও ভাবিনি। তার চোখের দিকে সরাসরি তাকালাম। তীব্র ঘৃণায় মুখে থু থু চলে আসল।
তিনি বললেন, যুবক, তোমার চোখের ঘৃণা আমি বুঝতে পারছি। আমি বা আমরা পাকিস্তানীরা যে কাজ করেছি তা সত্যিই ঘৃণা করার মতো। এ গল্পটা এর আগে কখনো কাউকে বলিনি। নিজেরই নিজের প্রতি ঘৃণা আসে। তোমাকে পেয়ে গল্পটা বললাম, আমার পরিচয় দিলাম, তোমার কাছে ক্ষমা চাইব বলে। এভাবে এর আগে কখনো কোন বাংলাদেশীকে পাই নি। তাই গল্পটা এতোদিন জমিয়ে রেখেছিলাম। যুদ্ধের সময় আমি যেসব কাজ করেছি তা ক্ষমারও অযোগ্য। তবু আমি ক্ষমা চাইছি তোমার কাছে, তোমার দেশের কাছে। আমি মনে করি, আমার দেশেরও তোমাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।
আমার মুখ দিয়ে কোন কথা বেরুচ্ছিল না।
তিনি তার হ্যান্ড-ব্যাগ খুলে একটি ছুরি বের করলেন। বললেন, দেখো এই সেই ছুরি যেটা ছুরি দিয়ে মেয়েটি আত্মহত্যা করেছিল।
আপনি এটা সাথে নিয়ে ঘুরেন?
হু। সাথে নিয়ে ঘুরি সবসময়। সাথে রাখি পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য। খুব ইচ্ছে করে আমি নিজেও এই ছুরি দিয়েই আত্মহত্যা করব। কিন্তু পারি না। মানুষ তো। খুব ভয় করে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


