somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অক্ষমতার লজ্জা - প্রথম পর্ব

১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ ভোর ৪:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কাশবনের মধ্যে দৌড়াতে গিয়ে প্রথমে ই কনুই থেকে কব্জী পর্যন্ত সরলরেখার মতো দাগ পড়লো, এর পরেই ঘামের বেয়ে আসা ধারায় হালকা জ্বলুনী। হাসিব কে কিন্তু তারপরেও ধরতে পারলাম না। এখন না পারলে আর পারা সম্ভব ও না। কারন সামনে চরের বালির বিস্তৃতি। ওখানে দৌড়ানো আমার কাজ না। মশা - হাসিব কে আমরা ছোটবেলা থেকে এ নামেই ডাকি, আমাদের নিয়ে এসেছে ওর নানাবাড়ীতে। এসেই প্রথম কাজ, অনেক দিনের পুরোনো পরিকল্পনা মোতাবেক পাটখড়ি জ্বালিয়ে বড়দের মতো সিগারেট টানা।

তখন তো আর এখনকার মতো এত "সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরন" লেখা থাকতো না সিগারেটের প্যাকেটে। আর পাট-শলা তো প্যাকেটেও থাকতো না। কাজেই দম বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত সেই যে বড়দের মতো ভঙ্গী করে কাশতে কাশতে ঐ ধুয়া গেলা - এখনো হাসি সে দিনগুলোর কথা ভেবে। আমি ভোটেবাবু - কিঞ্চিত নাদুস নুদুস ছিলাম বটে, মশা - হাসিব আর গাতক - আবীর এই তিনজনে মিলে প্রতিযোগিতা টা ছিলোই সবকিছু তে। ওরা দুজন ততক্ষনে অনেক এগিয়ে চরে এই দৌড় প্রতিযোগিতায়। কি আর করা, উচু একটা ঢিবি দেখে বসে পড়লাম। শ্রান্তি তে চোখ বুজে আসছে।

আচমকা "me go to school tomorrow, vaiya go, why me stay home" শুনে তন্দ্রার রেশ টা কেটে গেলো। দেখি আমার ছোটছেলে বড়ভাই এর সবগুলো ক্লাস ওয়ার্ক এর খাতা ছিড়ে কাগজগুলো আমার হাতে দিয়ে আদরের সাথে প্রস্তাব টা পেশ করে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। তন্দ্রার ঘোর কাটতেই টের পেলাম ছোটজনের কপালে আজ মার আছে। মা এর কাছে খাবে সলিড "মাইর" আর বড়জনের কাছে চিপা "মাইর"। তিন বছর হয় নি শুভ্রর এখনো, কিন্তু সৌরভের দেখাদেখি স্কুলে যাবার প্রবল একটা ইচ্ছা। ওদের এ সময়টাতে আমি কি করেছিলাম? নাহ, তিন বছরের সময়টাকে মনে করতে পারি না এখন।

যদিও দুই বছরের একটা স্মৃতি এখনো চোখে ভাসে। সাইরেন বাজার সাথে সাথে মা আমাকে কোলে করে এক নিঃশ্বাসে খালার সাথে বাঙ্কারের মতো গর্তের ভেতরে চলে এলেন। সাথে সাথেই মাথার ওপরে উড়োজাহাজের শব্দ, দূরে কোথায় যেন বোমা ফোটার শব্দ। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বলতে এইটুকুই। ছোট রাজপুত্রের কান্না শুনে আবারো বাস্তবে ফিরে এলাম। এটা তার ভয়ের কান্না, শুভ্রর অভ্যাস এটা। অপকর্ম করবে নিঃশঙ্ক চিত্তে, কিন্তু ফলাফল অনুধাবনে সচেতন হলে আগেই কান্নাকাটি করে সবার সহানুভুতি আদায়ে সচেষ্ট হবে। আজকালকার বাচ্চাদের আই কিউ নিয়ে আমার কিছু পর্যবেক্ষন আছে, যা সাধারনভাবে খুবই আশাব্যঞ্জক, কিন্তু ঠিকভাবে পরিচালিত না করতে পারলে ভয়ের কারন ও হতে পারে।

ইদানিং এই একটা বদ-অভ্যাস হয়ে গেছে। চিন্তাগুলো এলোমেলো হয়ে যায়। হবেই না বা কেন? জীবনের হিসেব যে মেলে না। প্রতিদিন যা ভাবি, হয় তার অর্ধেক ও সত্যি হয় না, কিংবা বেশীর ভাগই অন্য ফলাফল দেয়। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে কাজে যাবার সময় ভাবি, আজ এটা করবো, ওটা করবো। বেশীর ভাগ ভাবনাই পুর্নতা পায় না। কেন জানি না, আজ মশার কথা খুব মনে পড়ছে। মশা, আমার ছোটবেলার বন্ধু হাসিব। ডায়েরীটা খুলে আমাদের ত্রিমুর্তির গ্রুপ ছবিটা আবার ও দেখলাম। হাসিব আর ফিরে আসবে না, মন খারাপ হবার বদলে আবারো রাগ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো।

হাসিবের কি দোষ ছিলো? ওর স্ত্রী, শান্তার কি দোষ ছিলো, ফূটফুটে একটা মেয়ে লাবনী, ওর কি দোষ ছিলো। কাকে প্রশ্ন করবো? উত্তর যেখানে মরিচীকা, প্রশ্ন তো মরুভুমিকেই করতে হয়। অনেক করেছি এই প্রশ্ন। নিজের কাছে করেছি, মনে মনে করেছি, জানাজা পড়তে আসা রাজনৈতিক নেতাদের কাপুরুষের মতো পালিয়ে যেতে দেখে তাদের উদ্দেশ্যে সরোষে করেছি, আরেক জানাজায় দাঁড়িয়ে হাসিবের এক বন্ধু কে জড়িয়ে ধরে কেদে কেদে করেছি। বৃথাই চেষ্টা, আজ পর্যন্ত কোন সদুত্তর পাই নি। হাসিবের বাবা আজো সজল চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। হাসিব কে হারিয়ে তিনি শান্তা কে নিজের মেয়ের মতো করে পেয়েছেন। কিন্তু হাসিব যে আর ফিরে আসবে না সেটা চরম সত্য বলে জেনেও কেন যে আকাশের দিকে চেয়ে থাকেন। তবে আমি নিশ্চিত যে তিনি বিচার চান না। এই একটি কথা আজো চাচার মুখে শুনি নি।

বাবা মারা যাবার পর ওনার কাছেই ছুটে গিয়েছি কারনে অকারনে। বাবার ভালো বন্ধু ছিলেন, সেজন্য কিনা জানি না, হাসিব আর আমাকে কখনো খুব একটা আলাদা করে দেখেন নি। এই বৃদ্ধের অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি নি আজো। বাবার বন্ধু পিতৃসম এই আশরাফ চাচার একটা কথা খুব কানে বাঁজে। অনেক কথা শোকে বিহ্বল হয়ে বলেছিলেন " বাবা, বলোতো, ছেলেকে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার না বানিয়ে সেনাবাহিনী তে পাঠিয়ে কি ভুল করেছিলাম? যুদ্ধের ময়দানে শহীদ হলে ধরে নিতাম আমি সক্ষম পিতা, ড্রেনের পাইপ থেকে টেনে তোলা লাশ আমার ছেলেটা কি এতোই অক্ষম ছিলো নিজেকে রক্ষা করতে? নাকি আমি ই অক্ষম পিতা, এতো কিছু থাকতে কেন ছেলেকে দেশরক্ষা করতে পাঠিয়েছিলাম" আবার ও চিন্তায় ছেদ পড়লো, সৌরভ আর শুভ্র র চিপা "মাইর" আর কান্নার শব্দে। ঊঠে যেতে যেতে ভাবছিলাম, আশরাফ চাচার এই অক্ষমতার মধ্যে আমার ভুমিকা কতটুকু, কি করেছি, কি করতে চেয়েছি, চাইলেও পেরেছি কিনা?

অক্ষমতার এই লজ্জার দায় কি আমি এড়াতে পারবো? যতবার ই চিন্তা করি, সব ভাবনা গুলো জট পাকিয়ে যায়। কেন এর উত্তর পাই না? কিন্তু হাল ছেড়ে দিতে ও মন চায় না। এর উত্তর আমাকে বের করতেই হবে ....................

[ক্রমশ...]
৭টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনব প্রতারনা - ডিজিটাল প্রতারক

লিখেছেন শোভন শামস, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:১৮



একটি সাম্প্রতিক সত্য ঘটনা।
মোবাইল ফোনে কল আসল, একটা গোয়েন্দা সংস্থার ছবি এবং পদবী সহ। এই নাম্বার সেভ করা না, আননোন নাম্বার। ফোন ধরলাম। বলল আপনার এই নাম্বার ব্যবহার করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আগে নিজেকে বদলে দিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪১



"আমার স্বামী সংসারের কুটোটাও নাড়ান না। যেখানকার জিনিস সেখানে রাখেন না। মুজা খুলে ছুঁড়ে যেখানে সেখানে ফেলে দেন। নিজেকে পরিষ্কার রাখতে বারবার ভুল করেন! এতো বছর বিবাহিত জীবন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×