ছোট্ট একটা দু’তলা পাচিলঘেরা বাড়ি আশেপাশে বেশ অনেকদূর পর্যন্ত আর কোন বাড়ি নেই। দ্বিতীয় তলায় বড় একটা ব্যালকনি, ব্যালকনির উপর খোলা আকাশ। ব্যালকনিতে ছোট ছোট টবে অনেকগুলো ফুলগাছ, কিছু ক্যাকটাসও। বাড়ির সামনে বড় একটা লন, গোটা লন সবুজ ঘাসে ছেয়ে আছে, তার মাঝে একটা পিচ ঢালা পথ সোজা মেইন গেইট পর্যন্ত লনের সবুজকে দুইভাগে ভাগ করে। পথের শুরুতে একটা ছোট্ট ফোয়ারা মানব-মানবীর এক যুগলবন্দী মূর্তিকে স্নান করিয়ে চলেছে। বাড়ির ঠিক পাশেই এক কৃষ্ণচূড়া গাছ, লাল লাল ফুলে ছেয়ে আছে, যেন আগুন লেগেছে। দুটো চড়ুই পাখি গাছের ডালে, পুরুষ চড়ুইটা মেয়ে চড়ুইটার মনোযোগ আকর্ষণের জন্য অনেক কসরত করছে, কিন্তু মেয়ে চড়ুইটার সেদিকে দৃষ্টি নেই। সে দেখছে ব্যালকনিতে বসে থাকা তরুণীকে।
বসন্তের শেষ বিকেল, গরম এখনও পড়তে শুরু করেনি, বসন্তের হৃদয় জুড়োনো বাতাস সে সুযোগ দেয়নি। সূর্যটা পশ্চিম আকাশের এক কোণে হেলে পড়েছে, রোদ মরে এসেছে, সেই রোদ এসে পড়েছে তরুণীর খোলা চুলে, যেন আরেকটু দুঃসাহসী হয়ে চুলের আড়ালে থাকা তরুণীর গাল ছুঁয়ে দিতে চায়। সাদা শাড়িতে হালকা সুতোর কাজ, আর লাল পাড়, বাতাসে শাড়ির আঁচল সামলে রাখা মুশকিল। তবু সামলে রাখতে রাখতেই তরুণী একটু আনমনা, তাকিয়ে আছে কৃষ্ণচূড়ার লাল আগুনের দিকে, কিন্তু দেখছে না। গার্ডেন চেয়ারে বসে, এক হাতে কফির মগ ধরে আছে, মাঝে মাঝে চুমুক দিচ্ছে, আরেকটা হাত অলস কোলের উপর ফেলে রাখা। বেশিক্ষণ অলস রাখা যাচ্ছে না অবশ্য, বাতাস দুষ্টু প্রেমিকের মতো তরুণীর খোলা চুল নিয়ে খেলছে, মুখে এসে পড়ছে বাতাসের ঝাপটায়, আর তাতেই ব্যস্ত হয়ে উঠছে অপর হাতটা। কৃষ্ণচূড়ার দিকে তাকিয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু মাঝে মাঝে মেইন গেইট এর দিকে নজর দিতেও ভুলছে না।
একটু পর এক তরুণকে দেখা গেল গেইট-এ। কালো স্যুট পরা, সাদা শার্টের উপর টাই টা একটু ঢিলে করা, চাকাওয়ালা গেইটটা একপাশে ঠেলে সরিয়ে গেইটের বাইরে থামানো গাড়িতে উঠে বসল, চালিয়ে ভিতরে ঢুকে আবার গাড়ি থেকে নেমে গেইট লাগিয়ে দিল। দারোয়ানটা বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ, হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে, তাই নিজেদেরই করতে হচ্ছে এই কাজ। তারপর আবার গাড়িতে উঠে চালিয়ে এনে পার্ক করলো একেবারে বাড়ির সামনে, কিন্তু গ্যারেজে ঢুকালো না।
ততক্ষণে তরুণী চলে এসেছে নিচতলার দরজায়, এখন আর আগের মতো অন্যমনস্ক নেই, একটু ছটফট করছে, যদিও তা চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা আছে। চোখমুখ ২০০ ওয়াটের বাল্বের মতো উদ্ভাসিত, কিন্তু রিডিং লাইটের মতো তাতে শেড চাপানোর চেষ্টা। তরুণ গাড়ি থেকে নেমে লক করে ব্যাগ হাতে দরজার সামনে দাঁড়ালো, কলিং বেল-এ হাত রাখলো, ভিতরে টুংটাং আওয়াজ করে বেল বাজলো, তরুণী দরজার কাছে, কিন্তু দরজা খুলছে না, লুকিং গ্লাস দিয়ে তাকিয়ে দেখছে তরুণকে, তরুণ ধীরে ধীরে অধৈর্য হয়ে উঠছে, সেটা উপভোগ করছে। বেশ কিছুক্ষণ পর খুললো দরজা।
তরুণ তরুণীকে দেখে একটু থমকে গেল, ”ও, তুমি চলে এসেছ! তা এত দেরি হলো দরজা খুলতে? কাজের মেয়েটা কই?”
”কাজের মেয়েটাকে একটু ছুটি দিয়েছি, ওর বাবা এসেছিল, নিয়ে গিয়েছে।”
”গেল, এইতো ঝামেলায় পড়ে গেলে, এখন কবে ফিরবে তার তো ঠিক নাই। তুমি তো গ্যাড়াকলে পড়লে।”
তরুণীর একটু মন খারাপ হলো, সারাদিন পর বাসায় এসে প্রথমেই কাজের মেয়েকে নিয়ে আলোচনা, একটু শুকনো গলায় বলল,”হুঁ। তুমি আছ না প্রক্সি দিতে।”
এবার তরূণ জিজ্ঞেস করলো,”তা তুমি আজ এত আগে আগে চলে আসলে বুটিক থেকে?”
”এই, এমনিতেই, ভাল লাগছিল না আজ কাজ করতে।”
”ও, আচ্ছা, আমি দোতলায় যাচ্ছি, ফ্রেশ হয়ে নামছি।” তরুণ চলে গেল সিড়ি বেয়ে।
তরুণী একটু চেয়ে থাকলো, দেখল তরূণকে দোতলায় উঠে যেতে। ও একটু ঝুঁকে হাঁটে সামনের দিকে, লম্বা মানুষদের মতো, যদিও ও লম্বা না, ছেলেদের তুলনায় শর্ট-ই বলা যায়, সেই অভ্যাসটা এখনও বদলায়নি। আগে দাঁত দিয়ে নখ কাটতো, বলে বলে সেই বদভ্যাসটা দূর হয়েছে, তাও মাঝে মাঝে ঝগড়া হলে ইচ্ছে করে কাটে, খেপানোর জন্য। বদের সেরা।
মন খারাপ হয়ে গেল তরুণীর। আজ একটা বিশেষ দিন ছিল, আজকের দিনেই ও প্রথম প্রপোজ করেছিল তরুণীকে, কোন ফর্মাল ডে না, কিন্তু ফর্মাল ডে’র থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বুটিকের এত কাজ ফেলে রেখে চলে আসলো, কতগুলো অর্ডারের ব্যাপারে ইন্সট্রাকশন দেয়া বাকি ছিল, দু’জন গুরুত্বপূর্ণ ক্লায়েন্ট-এর সাথে মিটিং ক্যানসেল করে। অথচ লোকটা বেমালুম ভুলে বসে আছে, বিয়ের মাত্র পাঁচ বছরের মাথাতেই এই অবস্থা। অথচ এক সময় কত কি করেছে.... একটা দীর্ঘশ্বাস পড়লো তরুণীর। আজকে হালকা করে সেজেছেও, ছোট্ট একটা টিপ দিয়েছে দুই ভ্র“র মাঝখানে, হালকা ন্যাচারাল কালারের লিপস্টিক বুলিয়েছে ঠোঁটে, কানে ছোট্ট রূপোর ঝুমকো পরেছে, নাকে নাকফুল পরেছে,সব সময় পরে না, আজ বিশেষ উপলক্ষ্যেই পরেছে, হাতে শাড়ির সাথে ম্যাচ করে সাদা আর লাল কাচের চুড়ি পরেছে। এই সাদা শাড়িটা বিয়ের আগের, নিজের ডিজাইন করা, অনেকদিন পরা হয়নি। যখন প্রথম পরেছিল, ও মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল, বলেছিল, ”তোমাকে তো চুরি করে বুকের ভিতরে ঢুকিয়ে রাখতে ইচ্ছে করছে, যাতে আর কেউ দেখতে না পায় আমার বউটাকে, অথচ আজ খেয়ালই করলো না কিছূ। মনটা অভিমানে আরও ভারি হয়ে গেল।
ডাইনিং টেবিলে কয়েকটা ফল গুছিয়ে নিয়ে অপেক্ষা করছে তরুণী, আজ কাজের মেয়েটা নেই, অন্যদিন সে-ই করে। যাক, এসব চিন্তা করতে করতে আরও মেজাজ খারাপ হয়ে গেল, কখনোই কি ও আরেকটু মনোযোগী হবে না? ফল প্লেটে সাজিয়ে ডাইনিং টেবিলে রেখে তরুণী উপরে চলে আসলো, ওকে নিচে পাঠিয়ে দিবে, আর নিজে একটু বিশ্রাম নিবে, জানে ও একা একা খেতে পছন্দ করে না, কিন্তু আজ এটা ওর শাস্তি। আচ্ছা এত দেরি করছে কেন ও? সেটাও তো দেখা দরকার, ফ্রেশ হতে কি এতক্ষণ সময় লাগে নাকি!
বেডরুমে এসে ঢুকলো। কোথাও কেউ নেই। কি ব্যাপার, গেল কই, বাথরুমে নাকি! না সেখানেও নেই, বাথরুমের দরজা খোলা, তাহলে গেল কই! সন্ধ্যা হয়েছে, ঘরে ডিম লাইটও জ্বালিয়েছে, কিন্তু কোথায় গেল! যাক গে যেখানে খুশি, হয়তো ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েছে। তরুণী বিছানার দিকে এগুলো, সাদার উপর সাদা সূতোর নক্শা করা চাদর বিছিয়েছিল আজ। ধ্যেৎ!
বিছানার কাছে এসে হঠাৎ চোখ পড়লো, আরে নীল র্যা পিং পেপারে মোড়া একটা চৌকো বাক্স বিছানার উপর, তার পাশে সাতটা টকটকে লাল গোলাপ, পরিপূর্ণ পরিস্ফুট, একটার এক পাশে আবার ভাঁজ খেয়ে আছে, মনে হয় লুকিয়ে নিয়ে এসেছে কোটের ভিতরে করে, তখন চাপ খেয়েছে। এতক্ষণে মিষ্টি একটা ছোট্ট হাসি ফুটলো তরূণীর ঠোঁটের কোণে, ”আস্ত পাগল একটা, একটা কাজও যদি ঠিকঠাক মতো করতে পারে!” মনে মনে ভাবল। বাক্সটা আর ফুলগুলো উঠিয়ে ঘুরেছে মাত্র, আর বাঁধা পড়লো তরুণের শক্ত আলিঙ্গনে, সামনাসামনি। ঠোঁটের লিপস্টিক উবে গেল এক লহমায়, কিছুক্ষণ কোন কথা নেই। তারপর তরূণীর গলা শোনা গেল,”ছাড়ো, ছাড়ো, লাগছে তো, বদের সেরা, কোথায় ছিলে এতক্ষণ?”
”ঐ যে, দরজার আড়ালে অপেক্ষা করছিলাম কতক্ষণে আসো, তার জন্য। আর মশারা মহা উৎসব করেছে আমাকে নিয়ে।”
”ঠিক হয়েছে, এতক্ষণ আমাকে জালিয়েছো কেন? একটু তো কষ্ট করতেই হবে। উফ্ফ, ছাড়ো না, লাগছে তো।”
”না, কোন ছাড়াছাড়ি নাই, আমার বউকে আমি ধরেছি, তাতে কার কি!”
”আচ্ছা ঠিক আছে, ছেড়ো না, খবরদার যদি ছেড়েছো, তাহলে তোমার খবর আছে।”
”হুঁ, তাই তো। তা আমি জালিয়েছি মানে কি? আমি আরও এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি কখন আমার রাজকন্যা আসবে, তারপর ঠোঁট টিপে ঐ হাসিটা দিবে, আর আমি তাকে আমার বুকের মাঝে পাবো। তো যেই আয়নার মধ্য দিয়ে দেখলাম হাসিটা, ব্যাস।”
”হ্যাঁ, জালাওনি, আসার পর তো এমন একটা ভাব করলে যেন মনেই নেই, আমি এত কষ্ট করে সাজগোজ করলাম, তারও কোন কথা নাই, যেন খেয়ালই করেনি।”
”এখন ঐটুকু একটু না করলে হয় বলো! একটু আধটু ত্যাঁদড়ামি তো করতেই হয়, তাই না!”
”হ্যাঁ, হ্যাঁ, আস্ত ত্যাঁদড় একটা। বাচ্চাকাচ্চাদের নিয়ে এই হচ্ছে মুশকিল, সুযোগ পেলেই খালি ত্যাঁদড়ামো শুরু করে দেয়।”
”এহহহ, বাচ্চা-কাচ্চা, তাই না! চাকরি করি এখন, কত বড় হয়ে গিয়েছি, তোমাকেই বরং বাচ্চা বাচ্চা দেখায় এখনো। ভিকারুন্নেসায় টেস্ট দিলে আবার নিয়ে নিবে।”
”হ্যাঁ, বলেছে তোমাকে।”
”বলেছেই তো। চলো, রাতে বাইরে খেয়ে আসি, ............ রেস্টুরেন্টে টেবিল রিজার্ভেশন দিয়ে এসেছি।”
”ওরে বদ, তলে তলে এত!” তরুণীর মুখ এখনো উদ্ভাসিত, তবু একটু অভিমান মিশিয়ে, ”এখনো তো কিছু বললে না!”
”কি!”
”থাক হয়েছে, আর বলতে হবে না।”
”আরে পাগলী!” তরুণ আবার কাছে টেনে নেয় তরুণীকে, ”সুন্দর লাগছে তো, এখন কি আর মুখে বলতে হয়! এখন তো কাজ করে বুঝিয়ে দিতে হয়, আর দিলামও তো এইমাত্র, এইযে, বের হওয়ার সময় তোমাকে আবার লিপস্টিক দিতে হবে, বিয়ের আগে তো আর এই ভাষা ব্যবহার করতে পারতাম না, তখন কথায় বলতে হতো। তাই না?” একটু হেসে আবার যোগ করল, ”সেই দিন কি আর আছে? দিন বদলাইছে না!”
”হয়েছে হয়েছে, খালি উল্টাপাল্টা কথা”, একটু রক্তিম আভা দেখা দিল তরুণীর গালে, ”যাও, বের হবে তা রেডি হবে না? যাও যাও, শিগগির যাও।”
”হুমম, তারপর,তো আবার......” তরুণ একটু রহস্য করে।
”কি, তারপর আবার কি?” তরুণী জিজ্ঞেস করে।
”ঐ আর কি! ডিনার করে আবার লংড্রাইভে যেতে হবে মনে হয়।”
”তা তো অবশ্যই যাবে, ঐটাও আবার বলে দিতে হবে নাকি!”
”না ঠিক আছে, বলে না দিলেও চলবে, তো দয়া করে এক ফ্লাস্ক কফি নিয়ে নিলে বোধহয় খারাপ হতো না, বাই চান্স হাইওয়েতে কোন চায়ের দোকান না পাওয়া গেলে! আর আজ আবার পূর্ণ চন্দ্র উঁকি-ঝুকি মারছে আকাশে।”
”হুমম, তা খারাপ হয় না, তাহলে যাও, আগে কফি বানিয়ে ফ্লাস্কে ভরে তারপর রেডি হও।”
”মানে কি? আমি বানাবো?”
তরুণীর ঠোঁটে এবার দুষ্টুমির হাসি, ”অবশ্যই তুমি বানাবে, আমি এই যে এত কষ্ট করে সেজেছি না! আমার কাজ শেষ। এখন কফি বানানোর দায়িত্ব তোমার।”
”ইসসস, সাধ করে যে কি খান্ডারণী বিয়ে করলাম একটা, খাটিয়ে মারলো একদম, আচ্ছা আচ্ছা, যাচ্ছি। আর আমার একটা সাদা পাঞ্জাবি বের করো।”
”সাদা তো অনেকগুলো, কোনটা?”
”যেটা পরলে আমাকে রাজকন্যার সাথে ড্রাইভারের মতো লাগবে না, সেরকম যে কোন একটা হলেই হলো।”
হেসে ফেলল তরুণী। ”আচ্ছা।” আলমারি থেকে পাঞ্জাবি পাজামা বের করে খাটে রাখলো। দেখে তরুণ তখনো দাঁড়িয়ে। ”কই তুমি যাওনি এখনো?”
তরুণ মুখটা একটু কাঁচুমাচু করে মাথা চুলকিয়ে বললো, ”যাচ্ছি তো, তা আমি একলা একলা বানাবো নাকি! তুমি একটু আসো না সাথে!”
তরুণী কৃত্রিম চোখ পাকিয়ে তাকালো।
তরুণ বলে উঠলো, ”মানে আমিই বানাবো, তুমি সাথে থাকলে আর কি!”
”না।”
”প্লিজ, চলো না।”
”উফফ, বাচ্চাকাচ্চাদের নিয়ে এই হচ্ছে সমস্যা। আচ্ছা চলো।”
টীকা:
এই কাহিনীর কোন চরিত্রই কাল্পনিক নয় (চড়ুই পাখি দুটো ছাড়া)। কারও সাথে অভিপ্রেত কোন মিল পাওয়া গেলে লেখক এককভাবে দায়ী হবেন। তবে ঘটনাটা কাল্পনিক, লেখকের উর্বর(!) মস্তিষ্কের ফসল, অবশ্য বলা যায় না কখনো হয়তো সত্যি হয়েও যেতে পারে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


