
সালটা নব্বই এর কাছাকাছি। কয়েকদিন ধরেই বৃষ্টি। একদম মুষলধারে বৃষ্টি। ঘর থেকে বেরোবার কায়দা নেই। বিশেষ কাজে বন্ধু রাজ্জাক আর আমার জামালপুর শহরে যাওয়া জরুরি। কয়েকদিন বৃষ্টির কারণে পিছিয়েছি কিন্তু আজ না গেলেই নয়। তাই দুপুরের পর দেখলাম আকাশটায় একটু হালকা বৃষ্টি সেই ফাকে ঝটপট ছাতা মাথায় বেরিয়ে পরলাম দু’জন।
লঞ্চ ঘাটটা ছিলো দফাদার বাড়ির কয়েক হাত দক্ষিণে। সেখানে গিয়ে দেখলাম কোন লঞ্চ নেই। যে গুলো যাওয়ার সব চলে গেছে। কিন্তু উপায়? কে একজন বললেন, উক্কুন কানার ডিংগি নৌকা আছে বলে দেখো যেতে পারে। তাকে কোথায় পাবো জানতে চাইলে বললেন, বাজারের ভিতর দিয়ে যাও সোজা খেয়া খাটের সাথেই একটা গাছের সাথে দেখবা নৌকা বাধা আছে আর উক্কুন কানা ছৈ এর ভিতরে ঘুমাচ্ছে।
তো যথারীতি কিছুটা টেনশন দুই বন্ধু বাজারের ভিতর দিয়ে ঘাটের কাছে গেলাম। স্কুল ফিল্ডের দক্ষিন পূর্ব কোনায় বর্তমান ব্রীজটা যেখানে সেখানেই। দেখা হলো আয়না কাকার সাথে। হ্যা আয়না কাকা বর্তমান আমাদের পরপর কয়েকবারের ইউনিয়ন পরিষদের সন্মানিত চেয়ারম্যান। উনারও জরুরি প্রয়োজন জামালপুর যাওয়া। যাহোক কাকার সহিত কথার বিনিময় হলো। বললাম কাকা, আপনি উক্কুন কানাকে যদি একটু বলেন তবে যাওয়াটা মনে হয় আমাদের সহজ হবে।
কাকা আমার কথাটা বিবেচনায় নিলেন এবং নৌকার কাছে গেলেন। ডাক দিলেন কিরে উক্কুন, উক্কুন? ঘুমাস নাকি?
এমনিতেই আমরা জানি উক্কুন কানা উনি কানেও কম শুনেন চোখেও কম দেখেন তার উপর আবার অনবরত বৃষ্টি।
উক্কুন, এই উক্কুন? কিরে ঘুমাস?
আয়না কাকার কয়েক ডাকেও যখন না শুনছিলো তখন আমি রাজ্জাক দু’জনেই নৌকার রসিটা ধরে নৌকাটাকে টেনে পাড়ের কাছে আনলাম। কাকা এবার একটু ধমকের সাথেই বললেন, কিরে উক্কুন শুনশ না?
ধুচমুচ করে ছৈ থেকে উক্কুন বেরিয়ে এলো। গতরে চাদর। দুই চোখ কচলাতে কচলাতে বলে উঠলো ক্যাড়া, ক্যাড়া তুমি?
আয়না কাকা: আমি আয়না
চল, শ্যামগঞ্জ কালিবাড়ি যামু।
সব কথা ফাইনাল। আমরা ছৈ এর ভিতরে ঢুকলাম। কাকাকে আমরা আগে থেকেই যথেষ্ট সমীহ করতাম। এখনো তার কমতি নেই। তো লজ্জা করে বেশ দূরে দুইবন্ধু পেছনে বসলাম আর কাকা সামনের দিকটাতে বসে গায়ে অফ হোয়াইট রংগের একটা চাদর মুড়িয়ে হাতে দেখেছিলাম একটা বই তিনি বইয়ের পাতায় চোখ বুলাতে লাগলেন আর আমরা দুজনে গল্পে গল্পে।
তো যে কারণে গল্পটা লেখা আর গল্পের রোমান্টিকতা। উক্কুন কানা দাড়ের কাছে হাল ধরে আছে। আয়না কাকা মাঝে মাঝে ডাক দিচ্ছে, কিরে উক্কুন?
ঠিকঠাক চলছেতো?
উক্কুন কানা: হহ, সব ঠিক।
আয়না কাকা: নৌকা এখন কই!
উক্কুন কানা:
দক্ষিনপাড়া ঘাটে।
আয়না কাকা ফের বইয়ের পাতায় চোখ বুলিয়ে যায়। আমরা দুই বন্ধু চুপচাপ বসে। ভয়ও পাচ্ছি আবার আনন্দও পাচ্ছি। কিন্তু অন্ধকার প্রকৃতির সাথে বৃষ্টি কিছুই আচ করতে পারছিনা।
এবার বেশক্ষন পর কাকা ফের ডাক দিলেন, উক্কুন?
উক্কুন কানা: কউ?
আয়না কাকা: কইরে এখন?
উক্কুন কানা: এই জাংগাইলের কাছাকাছি হমু।
আকাশটা শেষ বিকেলে একটু আলোকিত হয়েছে। কাকা ছৈ থেকে সামনে বের হলেন। এদিক সেদিক তাকালেন। হঠাৎ শক্ত কন্ঠে গর্জণ দিয়ে উঠলেন।
আয়না কাকা: কিরে?
তোর নৌকা দেখি ঘাটেই বাধা। তুই এতক্ষণ কি কইলি।
হায়! হায়!! দ্রুত ছৈ থেকে বের হলাম আমি রাজ্জাক। সত্যিই দেখি তাই। নৌকা যেখানে বাধা ছিলো সেখানেই রইছে।
উক্কুন কানা: ধ্যুতরি! শালার কি যে কানা বল্লাই ধরছেনা আইজ!!
দেখলাম গাছের সাথে বাধা দড়িটা ফের খুলছে সে। কাকাও তাকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখলেন। আমারদের দিকে একবার তাকালেন একটু মৃদু হাসি হাসলেন। আমরাও হাসলাম। তারঃপর আর কি। ফের যাত্রা শুরু।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা আগস্ট, ২০২১ সকাল ৮:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



