
রতন নিতান্তই দরিদ্র পরিবারের ছেলে। বয়স একেবারেই কম। সারাদিন রাস্তাতেই থাকে। বাপ রমিজ মিয়া রিক্সা চালায়। মা সালেহা বিবি অন্যের বাসায় কাজ করে। বাপে আরেকটা বিয়ে করার পর থেকে রতন বাপের সাথে খুব একটা কথা বলে না, মিশেও না। বস্তিতেই তাদের বাসা। বাঁশের চাটুলী দিয়ে মোড়ানো শাপুড়েদের মত ক্ষনস্থায়ী একটি ঘর পেতে তার মাঝখানে কাপড়ব ঝুলিয়ে দিয়ে দুইটা রোম বানাইছে। নিতান্ত অসহায়দের ফুটপাতের উপর যেরুপ থাকার জায়গা হয়। এক রোমে রতন ও তার মা সালেহা বিবি শয়ন করে আরেক রোমে রতনের বাবা রমিজ মিয়া নতুন বউকে নিয়ে শয়।
সারাদিন মানুষের বাসায় কাজ করে সালেহা বিবি যে টাকা পায় স্বামী রমিজ মিয়া প্রায় সব টাকাই প্রতিনিয়ত নিয়ে নেয়। সেচ্ছায় না দিতে চাইলে চলে তার উপর অমানবিক নির্যাতন। তাও আবার টাকাটা যদি সংসারের কোন কাজে খরচ হতো তাতেও সালেহা বিবির কোন আপত্তি থাকতো না। সে টাকায় বাহারী রঙের শাড়ি, চুড়ি নতুন বউ মরজিনার জন্য নিয়ে আসে। এমন দৃশ্য কিভাবে সহ্য করে সালেহা বিবি।
একদিকে স্বামী থেকেও না থাকার নির্মম যন্ত্রণা। চোখের সামনে রতন তার বাবা থেকেও বাবার আদর হতে বঞ্চিত। সারাদিন মাথার ঘাম পায়ে ঝরিয়ে যা উপার্জন করে তাও সে গ্রাস করে নেয়। এত সব কষ্ট সালেহা বিবিকে প্রতিনিয়ত কুরে কুরে বিনাশ কর্তে থাকে। মাঝে মাঝে সালেহা বিবি জীবনের প্রতি ভীষণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠে ভাবে গলায় দড়ি জীবনটাকে শেষ করে দেই কিন্তু পরক্ষণই অসহায় রতনের কথা মনে পড়লে সীদ্ধান্তটা পাল্টায়। নতুন বিয়ের পর থেকেই রমিজ মিয়া রতনদের কোন খরচপাতি দেয় না বরং যা পায় তাও রমিজ মিয়া কেড়ে নেয়। একবারও ভাবে না রতন তারই সন্তান সে কি খায় কিভাবে দুজনে চলে কোনই মাথা ব্যথা যেনো নেই তার। তাই প্রতিনিয়তই কেদে কেদে সালেহা বিবি উপরওয়ালার কাছে আঁচল পেতে শপে।
শুধু সালেহা বিবি কেন এই সমাজে লক্ষ লক্ষ অবহেলিত সালেহা বিবি আছে যাদের করূণ কাহিনী সিনেমাকেও হার মানায়। এদের দুর্দশা দেখে যদি সুশীল সমাজ এগিয়ে আসতো লক্ষ প্রাণের আশীর্বাদে দেশ বলেন সমাজ বলেন শত ভাগ এগিয়ে যেতো। মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য। আমাদের মানুষের প্রাণ কেন হবে নিরেট পাষাণ। এতো সবের পরেও একমাত্র সন্তান রতনের মুখপানে চেয়ে সালেহা বিবি যেন কোন দিন-ই প্রতিবাদী হয়নি। নীরবে নিভৃত্যে শুধু চোঁখের জল ফেলেছে। সরলতা বাঙ্গালী নারী চরিত্রের ধর্ম। এ সরলতার গুনেই তারা আজন্ম স্বামীর ঘর করে। স্বামীকে দেবতা জ্ঞানে পুজো করে। মৃত স্বামীর কবরগাত্র যেনো এদের কাছে কাবা। স্বামীর চাওয়া পাওয়ার মাঝেই এরা পূর্ণতার পথ খোঁজে।
রতন বড় হয়েছে। ভালমন্দ এখন সে সবই বুঝে। বুঝে মায়ের কষ্ট আর অমানবিক যন্ত্রণার কথা। কিন্তু মায়ের অনুনয় বিনয়ে আর কড়া নিষেধের কাছে হার মেনে থাকে রতন। সেও নীরবে বাবার দেওয়া সকল কষ্ট সহ্য করে চলে। দিন যাচ্ছে দুঃখকে সাথী করেই বড় হচ্ছে রতন। পড়ালেখা কি জিনিস জানে না। তবে বুঝে স্কুল বলতে একট কিছু আছে। সুন্দর জামা কাপড় পরে জোতা, টাই ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে শিশু ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায়। রতন ভাবে ওরা সব বড় লোকের ছেলে মেয়ে। পড়ালেখা শুধু ওদের জন্যই। তাই তাঁদের প্রভুর মত সমীহ করে।
সেদিন অনেক রাত হয়েছে। মা সালেহা বিবির বাসায় ফেরার নাম নেই। রতন ভীষণ চিন্তিত হয়। মায়ের এহেন না ফেরর কষ্টে রতন ছটফট করতে থাকে। সারাঘর পায়চারি করতে দেখে সৎ মা স্বামী রমিজ মিয়াকে উস্কানী দিয়ে বলে, ছেলেতো না যেনো একটা বিচ্ছু জন্ম দিছো। ছিঃ ছিঃ লজ্জার মাথা খেয়েছে কেমন করে উঁকিঝুঁকি মারছে দেখো। রমিজ মিয়া নালিশ পেয়েই রতনকে ইচ্ছেমত গালমন্দ এবং কি লাঠি দিয়ে বেদম প্রহার করে। রতন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বেশক্ষণ কাদে। কেদে কেদে অস্থির হয়ে উঠে। প্রহারের ব্যথা যতটা না তাকে কষ্ট দেয় তার চেয়ে বেশি কষ্ট দেয় মায়ের না ফেরার যন্ত্রণায়।কি করবে সে ভেবে পায় না।
রতন এখন অনেকটাই বড় হয়েছে এখন সবই সে বুঝে। বাবার আদর, বাবার শাসন, বাবার অত্যাচারের মাত্রাও এখন সে পরিমাপ করতে পারে। শুধু মুখ বুঝে সহ্য করে যায়, কিছু বলেনা। কারণ মা কষ্ট পাবে বলে। চোখের সামনে বাবার আদরকে জলাঞ্জলি, মায়ের অমানবিক কষ্ট কথা, জীবন ধারণে কি নির্মম গতি এসব মোকাবেলা করতে গিয়ে রতন অনেকটাই রুক্ষ মেজাজের হয়েছে।
গভীর রাত হয়েছে মা সালেহা বিবির ফেরার নাম নেই। রতনের দুচোখ গড়িয়ে নীরবে জল ঝরতে থাকে। বাবা রমিজ মিয়ার যেন এতোটুকুও টেনশন নেই। সৎ মায়ের হাত ধরে হাসি খুশির বন্যা বহাইতেছে রতন রুক্ষ মেজাজে তা লক্ষ করে। রতনের ধৈর্যের বাঁধ যেন এবার ভাঙ্গার উপক্রম। রক্ত চোখে টগবগ করে এদিক সেদিক তাকাতে রতন। কিন্ত মা আসছেনা সে কথা ভাবতেই মনটা পাথর হয়ে যায়।
এতো রাত। মা কেন আসছেনা কি হলো তাহলে, মাকে তো কোন দিনই এতোটা রাত করে ফিরতে দেখেনি রতন। নাকি রাস্তায় ছিনতাই কারীদের কবলে পড়লো। মায়ের কাছেতো তেমন কোন টাকা পয়সাও থাকেনা। মোবাইলও নেই। স্বর্ণলঙ্কার তো দুরের কথা। তাহলে ছিনতাকারীরা মাকে ধরবেইবা কেনো। নানা প্রশ্ন রতনের মনকে অস্তির করে তোলতে থাকে। বস্তির গলিতে প্রায়ই নারী কেলেঙ্গকারীর ঘটনা ঘটে থাকে। রতন সে বিষয়টাও ভাবতে থাকে। কি করবে এখন সে কিছুই যেনো ভেবে পায় না। তিমির রাত। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎও চমকাচ্ছে। তবু মায়ের টানে মায়ের মমতায় ছোট হোক বড় হোক কোন সন্তানই পারে না নীরব থাকতে। বাবার কথা ভাবে রতন। কত বড পাষন্ড পিতা তার একবারও মা টার খবর নিলোনা। এমন বাপকে কি করা উচিত। সব চেয়ে বেশি রাগান্নিত হয় সৎ মায়ের উপর। এই ডাইনীটাই যত অশান্তির মুল। এর কারণেই আজ আমার মায়ের বোক ভরা যন্ত্রণা। একদিনতো অনেক সুখ ছিলো এই সংসারে মায়ের মুখেতে হাসিও ছিলো বেশ। আর আজ সেই কতটা বছর মাকে একটু হাসতেও দেখিনা। চোখ ভরা জল আর বোক ভরা দীর্ঘশ্বাস শুধু বয়েই চলেছে। অথচ ডাইনী কি দিব্বি হেসে খেলে দিন কাটাচ্ছে।
রতনের প্রতিহিংসার আগুনটা যেনো প্রজ্জলিত হতে থাকে যা শুধু মারাত্মকই নয় যেন মরন কামড়ের রুপ নেয়। চোখের সামনে এতো বড সুখকে কি ভাবেইবা সে জলাঞ্জলি দিয়ে বাঁচে। এভাবে আর বাঁচতে চায়না রতন। সেই থেকে বেশক্ষণ যেনো মায়ের কথা ভাবছে না। ভাবছে শুধু নাক ডেকে ঘুমিয়ে থাকা বাবা আর পাশের সৎ মা ডাইনীটার কথা। সমস্ত ঘর অন্ধকার। অন্ধকারেই রতন কি যেন খুঁজছে। কিছুক্ষণ পর একটা শক্ত লাঠি খোঁজে পায়। এদিক সেদিক চুপচাপ তাকিয়ে কি যেনো দেখে নেয়। কিছু একটা ভেবে আবার লাঠিটা লোকিয়ে রাখলো। ফের কি জানি খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠলো। এরপর একটা ধারালো ছুরির খোঁজ পেলো। ছুরিটা পাওয়ার পর রতনের চেহারাটা যে কিরুপ হয়ে উঠেছিলো তার বর্ণনা করা মুশকিল। চোখ দু’টিতে যেন আগুনের স্ফুলিঙ্গ বইছে। সমস্ত শরীর দিয়ে ঘাম টপটপ করে ঝরছে। সত্যিই রতনের মাথায় আজ খুন চেপেছে। তার জ্বালাময়ী চেহারাটাই বলে দেয় রতন ভয়ানক কোন রক্তক্ষয়ী কাজের দিকে হাত বাড়াচ্ছে। হায়রে খোদা! এ এমনই একটা মুহুর্ত এখানে না আছে কেহ পাশে তাকে এতটুকু শান্তনা দিয়ে ফিরাবে। হায়রে বিধি! এতটুকু শিশু মানষী ছেলেটার বোকে কি আগুনই না তুমি জ্বালিয়ে দিয়েছো যে আগুনের দাহ আপন জীবনের মায়াকেও জলাঞ্জলি দিয়ে হয়ত কোন এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড করার প্রয়াসে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে।
ঠিক তাই হলো। পরনের হাফ প্যান্টটাকে ভালভাবে পুনরায় চেক করে নিলো। কোমরে ঝুলে থাকা রশিটা দিয়ে ফের শক্ত করে প্যান্টটাকে বেধে নিলো। টার্গেট কাকে জানিনা। হয়তোবা বাবা রমিজ মিয়া নয়ত সৎ মা দুজনের একজন তো বটেই। লাঠিটা বাম হাতের কব্জিতে শক্ত করে ধরলো আর ডান হাতে ধরলো ধারালো ছুরিটা তারপর দুই রোমের মাঝের পর্দাটা সরিয়ে একবার উঁকি দিয়ে কি যেনো দেখে নিলো রতন। বাবা রমিজ মিয়া সজোরে নাক ডাকছে সৎ মা বাম দিকে চিৎ হয়ে সেও বিভোর ঘুমে আচ্ছন্ন। রাত তখন অনেক হয়েছে। তিমির কালো রাত মা সালেহা বিবি তখনও বাসায় ফিরেনি। মায়ের না ফেরার কথা যেনো রতনের একটুও মনে নেই। তার মাথায় ভর করেছে কেবল হত্যা, খুন, মার্ডার। রতন যেনো খুনের মাঝেই সকল যন্ত্রনার অবসান দেখছে চায়। হায়রে নিয়তি! এমন একজন মানুষ নেই যে তাকে থামাবে।
শক্ত করে ছুরিটা ধরে অমারম বাবার মাথার উপর দন্ডায়মান হয়। তবে কি বাবাকেই সে খুন করবে। এত বড পাপ কাজ সে করবে। মুখ দিয়ে বিরবির করে রতন বাবার উদ্যেশে বেশ কিছু কথা বলে তবে কি কথা জানিনা তারপর দৃষ্টিটা বাম দিকে ঘুরায়ে নেইয় এবং ব্যগ্রতার সাথে একেবারে দক্ষ খুনির মতো ধারালো ছুরিখানা সৎ মায়ের গলায় পরপর কয়েক বার বসিয়ে দেয়। মরণ চীৎকারে রমিজ মিয়ার ঘুম ভাঙ্গে। ততক্ষণে রতন ছুরিটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে দৌড়ায়ে পলাতে থাকে। রমিজ মিয়াও হাতে রক্তাক্ত ছুরিটা নিয়েই রতনের পিছে পিছে দৌড়াতে থাকে। তারপর কি হয়েছে জানিনা। হয়তোবা রতনকে খোজে পেয়ে রমিজ মিয়াও রতনের মত দাগী খুনী ফেরারী আসামী সেজেছে নয়তোবা…।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা আগস্ট, ২০২১ সকাল ৮:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



