শিক্ষকদের ছোটবেলার উপদেশগুলো মনে পড়লে খুব হাসি লাগে, তারা বার বার বলতো পড় পড় পড় জীবনে কিছু করতে হলে বেশি করে পড়তে হবে,যত পড়বে তত জ্ঞান বৃদ্ধি হবে, আমি ভাবতাম তার উল্টো ,কম পড়বো পাশ করবো ছোটখাটো চাকরি করবো বাপের যা আছে তাই দিয়ে কোন রকমে জীবন পার করবো, স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছা কোন দিন মন থেকে হয়নি কিন্তু মাঠে কাজ করার ভয়ে স্কুলে যেতাম আমার বড় ভাই বাবার সাথে মাঠে কাজ করতো কি যে কষ্ট, কখনো খাঁ খাঁ রোঁদে আবার বৃষ্টিতে ভিজে কখনো কনকনে শীতের মধ্যে জলে নেমে কাজ কর, তাই দেখে ভাবলাম স্যারদের প্যানপ্যানানি আর মাঝে মার খাওয়া এর চেয়ে বেশি ভালো ।অবশ্য মার খুব কম খেয়েছি আমাদের মারখুটে স্যারকে আমি বশ করেছি স্যারের গা টিপে দিতাম মাঝে মাঝে পান খাওয়াতাম আর এতেই তিনি আমাকে রেহাই দিতেন, ক্লাসের কারক, সমাস, সন্ধি, অনুবাদ, voice, tense , narration অংক কখনোই আমার মাথায় ঢুকতো না আমার ক্লাসের ফাস্ট বয়কে বসে এনে পরীক্ষায় কোন মতে পাশ করতাম আর এভাবেই আমি এসএসসি পাশ করলাম ভাবলাম রেহাই পেয়েছি , কারণ আমাদের স্কুলের তপন স্যার এসএসসি পাশ, সে তুখোর জ্ঞানী, ইংরেজি বাংলা অংক তার কাছে ডালভাত, কোন ভুল নেই। তিনি আমাদের বলতেন তোরা আমার ছাত্র তোদেরতো আর দেখানো যায় না আমার পাছায় যে কি পরিমাণ দাগ তা দেখলে বুঝতিস পড়ালেখা কারে বলে। আমি তিনদিন বেঞ্চে বসতে পারেনি লক্ষন স্যার এমন মারা আমাকে মেরেছিল তারপর আমার আর পিছুনে ফিরে তাকাতে হয়নি দিনে আট দশ ঘন্টা পড়তাম আর স্কুল তো ছিলোই, আমি চুল বড় রেখেছিলাম রাতে পড়ার সময় ঘরের আড়ার সাথে দড়ি ঝুলিয়ে চুলের সাথে বাঁধতাম ঘুম এলেই চুলে টান লাগতো, আর এভাবেই এসএসসি পাশ করেছি আমাদের থানায় কোন কলেজ ছিল না তাই আর পড়ালেখা হল না। স্যারের কথা শুনে ভাবতাম এর চেয়ে আর কি পড়ার আছে সে তো সব কিছুই জানে। কিন্তু এসএসসি পাশে কোন কাজ হলো না এখন আমাদের থানা শহরে কলেজ আছে ,আমি সেখানে ভর্তি হলাম আবার যন্ত্রনা শুরু পড় পড় পড় স্যাররা নানা বিজ্ঞানী, দারশনিক সাহিত্যিকদের নাম বলতো আর তাদের পরিশ্রমের কতা শুনাতো আমি খুশি হতে পারতাম না কারণ তেমন কিছু হওয়ার ইচ্ছা আমার ছিল না, আমি পাশেই খুশি, কিন্তু হল না এবার একবারে পাশ করতে পারলাম না, এখনকার মত এক বিষয়ে ফেল করলে একটা পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল না, তাই গুষ্টিশুদ্ধ বই আবার পড়তে হলো বহু কষ্টে অনেক অটো নোট মুখুস্ত করে কোন রকমে পাশ করলাম, আমি বহুত খুশি হলাম এবার রেহাই পেয়েছি, আর পড়তে হবে না কারণ এর পর পড়তে হলে জেলা শহরে যেতে হবে বহু খরচের ব্যাপার, তাই বাদ বাড়ি কিছুদিন শুয়ে বসে কাটালাম ,বাবা কিছু একটা করতে বলল কিন্তু কি করবো আমিতো কিছু জানি না, কোন মতে পাশ করেছি বাবা বলল আমি চেয়ারম্যানের সাথে আলাপ করেছি সে বলেছে আমাদের গ্রামে ও আশে পাশে কোন স্কুল নেই তাই একটি প্রাইমারী স্কুল করা যায়, যে ভাবা সেই কাজ আমাদের উত্তর পাড়ার একবিঘা জমি অনেক দিন থেকে পরিত্যাক্ত নিচু জমি তাই ফসল হয় না সেখানে স্কুল করা হবে গ্রামের শিক্ষিত বেকারদের নিয়ে স্কুল শুরু করলাম বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাঁশ সংগ্রহ করা মাটি দিয়ে জমি উচু করা সব হলো ,আমি যেহেতু জমি দাতা তাই হেড মাস্টার আমি, আর তিন জন বিশ হাজার করে টাকা দিল গ্রাম থেকে চাইল,বাঁশ বাজার থেকে টাকা চাঁদা হিসেবে তোলা হল চেয়ারম্যান টাকা নিয়ে আশ্বাস দিল আমি এমপির কাছে শুপারিশ করে স্কুলের বেতনের ব্যবস্থা করবো আমরা মহৎ কাজ করেছি সে অবশ্যই সহযোগিতা করবে । এভাবে পাঁচ বছর চলল তারপর বেতন পেলাম । কোন সমস্যা নেই আমি কিছুই পড়াই না শুধু স্কুলে যাই আর বসে থাকি খাতা কলম নাড়াচাড়া করি, এর ফলে যা জানতাম তাও ভুলে গেলাম ,তাই ছাত্র-ছাত্রীদের থেকে দূরে থাকি, যদি কোন প্রশ্ন জানতে চায় তো মান-সম্মানের ব্যাপার , একদিন দেখি আমাদের অংক স্যার রোদে বসে আছে এক ছাত্র এসে স্যারকে বলল স্যার এই অংকটা করে দেননা আমি পারছি না, স্যার বলল লাঠি আনো সে লাঠি আনলো স্যার ছেলেটির পাছায় কষে দুই বাড়ি দিলেন আর বললেন এবার পারবা ? ছেলেটি বলল স্যার পারবো পারবো, আমি দেখে হাসলাম আমার কিছু করার নেই কারণ আমিও অংক পারবো না, আমার স্যাররা স্কুলে যে অংক করারে তা আগেরদিন মুখস্তো করে আসে স্কুলে এসে কোন কথা কারো সাথে বলে না আগে বোর্ডে অংক করে, কোন প্রশ্নের উত্তর দেয় না অংক করার পর ছাত্র-ছাত্রীদের বলে খাতায় তুলে মুখস্তো কর। এভাবেই তারা অভ্যাস্ত। আমারা শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে পৌছে দিয়েছি তাই সরকারের কাছে জোর দাবী জানালাম স্কুল সরকারি কর, সরকার আমাদের দাবী পূরণ করলো এখন আমরা সরকারি শিক্ষক । এখন শেষ বয়সে চাকরি থেকে অবসর নিয়ে পেনশন তুলবো আর খাবো কিন্তু আমার বন্ধুদের কথা মনে পড়ে সে আজো কৃষক ফাস্ট বয় টাকার অভাবে আর পড়তে পারেনি কোন চাকরিও পায়নি কিন্তু সে আমার চেয়ে ভাল জানে কিন্তু লাভ কি ? মাঝে মাঝে ভাবি আমি কাজটা ঠিক করলাম ,দেশের সবথেকে গুরুত্বপূণ প্রাথমিক শিক্ষাটাকে নড়বড়ে করে দিলাম না ? আমাদের শিক্ষদের মত কি কাউকে শিখাতে পেরেছি এই কষ্ট আমার সব সময় কিন্তু অন্যদের অবস্থা যেহেতু একই তাই কষ্টটা কম লাগে , তবে আমি শিক্ষক হয়ে কিছু উপদেশ দিচ্ছি মানা না মানা সরকারের কাজ
1. ভাল ছাত্র হলেই ভাল শিক্ষক হওয়া যায় না, পড়া বোঝানোর ক্ষমতা সকলের এক হয় না তাই শিক্ষার্থীদের দিয়ে শিক্ষক নির্বাচন করতে হবে, পাঁচ জন শিক্ষক একটি বিষয়ে দুটি ক্লাস নিবে সেখান থেকে শিক্ষার্থীরা শিক্ষক বাঁছাই করবে।
2. শিক্ষকদের প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা দিতে হবে বেতন ভাতা বৃদ্ধি ও প্রতি জেলা,উপজেলায় শিক্ষক দের জন্য উন্নতমানের আবাসিক এলাকা করতে হবে।হাসপাতাল সহ সেবা ক্ষেত্রে কোটা সংরক্ষ করতে হবে।
3. কোনভাবেই যোগ্যতার ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া চলবে না ,কিছুদিন আগে মেয়েরা এসএসসি পাশ করে আর পুরুষরা ডিগ্রিপাশ করে শিক্ষক পদে যোগদান করেছে. মেয়েরা জন্ম থেকে বেশি জানে?
4. স্কুল সীমিত করতে হবে এখন যত স্কুল আছে তার অর্ধেক বাদ দিলে খরচ কম হবে শিক্ষকদের সুবিধা বাড়নো যাবে, দেশের বড় এক স্কুল যদি একহাজার শিক্ষার্থী পড়াতে ও মান ধরে রাখতে পারে তো ইউনিয়ন,উপজেলায় কি পাঁচশত শিক্ষার্থী পড়ানো যায় না ?
5. শ্রেষ্ঠ শিক্ষক পদক প্রদান ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
6. স্কুলের পরিবেশ উন্নত ও যাতায়াত, ও বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে, শিক্ষা ক্যালেন্ডারে এখন 85 দিন ছুটি আছে সেটা কমাতে হবে।
এখন যারা সফল তারা কোন কিন্ডারগার্টেন বা কোচিং এ পড়েনি তারা আজ আমলা সচিব, ব্যাংকার ,শিক্ষক তারা কিভাবে শিক্ষালাভ করেছে তা থেকে জ্ঞান লাভ করে প্রয়োগ করতে হবে।
লেখাটি কোনভাবেই কাল্পনিক নয় বরং বাস্তবিক চাইলে প্রমাণ দিতে পারবো এখনই যদি ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয় সামনে খারাপ অবস্থা অপেক্ষামা
বি:দ্র: মেধাবী আদর্শ শিক্ষকরা কষ্ট পাবেন না আপনারা আছেন বলে প্রদীপটা এখনো দুকে ধুকে জ্বলছে
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মার্চ, ২০১৫ বিকাল ৪:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




