পড়ালেখার সুবাদে এক বছর সাউথ আফ্রিকায় ছিলাম, ঐ সময় ডায়রির মত করে অনেক কিছু লিখেছিলাম। ঐগুলাকে কিছুটা সাইজ করে একটা ওয়েব ম্যাগাজিনে ছাপাও হইছিলো।
সামহোয়্যারইন ব্লগটা দিন দিন এত প্রিয় হয়ে উঠছে যে এখানকার সবার জন্যে ঐ লেখাগুলো আবার তুলে দেবার লোভ সামলাতে পারলাম না।
কয়েক কিস্তি চলবে এটা। জনতা বিরক্ত হলে আওয়াজ দিয়েন, থেমে যাবো। না হলেও দিয়েন- উৎসাহ পাবো।
ঈশ্বরের রংধনু দেশে
----------------
শূন্য।
'কোন দেশ থেকে এসেছ তুমি?'
'বাংলাদেশ।'
প্রশ্নকর্তার নাম প্যাট্রিক ম্যান্ডেলা কাও। আমার ক্লাশমেট। উত্তর শুনে একটু অসহায় দেখালো, খানিকটা দোনোমনা করে জিজ্ঞেস করলো, কোথায় যেন দেশটা?
এই প্রশ্নটা পছন্দ হলো না আমার। বাংলাদেশ কোথায় এটা জানবেনা কেন? তবু ভালো করে অবস্থানটা বোঝালাম তাকে। আমার কণ্ঠে মনে হয় উষ্মা প্রকাশ পেয়েছিলো, কাও হেসে বলল, " তুমি রাগ করেছ? কিন্তু আমার কেন জানি মনে হচ্ছে তুমিও আমার দেশের নাম শুনোনি কখনো। আমার দেশের নাম লিসোথো , শুনেছ আগে?''
সত্যিই, আগে শুনিনি এর নাম। কেনিয়া , জিম্বাবুয়ে, নামিবিয়া এবং আরো কিছু আফ্রিকান দেশের নাম শোনা থাকলেও লিসোথোর নাম শুনিনি কখনো। মাথা নেড়ে জানালাম সেটা। ও এইবার দন্ত বিকশিত একটা হাসি দিল, যার অর্থ 'হু হু, দেখলে!''
লিসোথোর ম্যাপ দেখেছিলাম পরে, সাউথ আফ্রিকার ঠিক মাঝখানে দেশটা। ঠিক করে বলি আরো, বাংলাদেশের ম্যাপে ঢাকার অবস্থান যেখানে, সাউথ আফ্রিকার ম্যাপে লিসোথোর অবস্থান ঠিক সেখানেই। অথচ পুরো আলাদা একটা স্বাধীন দেশ! আমি কখনো ভাবিইনি এভাবে কোন দেশের মধ্যিখানে আলাদা একটা দেশ থাকতে পারে।
এক।
আরো অনেকের কাছেই আমাকে বলতে হয়েছে পরে বাংলাদেশ কোথায়। কিছুদিন পরে বুঝলাম, যারা ক্রিকেট দেখে তারাই শুধু জানে বাংলাদেশের নাম। জনপ্রিয়তার হিসেবে ক্রিকেটের অবস্থান এখানে রাগবি বা ফুটবলের অনেক অনেক পেছনে। তাই বাংলাদেশকে চিনে বা জানে এমন লোকের সংখ্যাও আসলে অনেক কম। তবু যে চিনে, তার পুরোটা কৃতিত্ব চোখ বুজে আমাদের ক্রিকেট টিমকে দিয়ে দেয়া যায়।
ধন্যবাদ হাবিবুল বাশার এন্ড কোং!
দুই।
পুরো ক্যামপাসে আর কোন বাংগালি নেই। ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদের বেশির ভাগই আশপাশের াফ্রিকান দেশগুলোর। চীনের আছে কিছু, কয়েকজন জাপানের, আর কিছু ইউএসএ আর কানাডার।
জাপানি দুজনের সাথে বেশ খাতির আমার। একজনের নাম তাকাশ, আরেকজনের নাম হিশা। তাকাশ আমাকে দেখলেই বলে ওঠে- হ্যাল্লো এশিয়ান ব্রাদার। এমনিতে দুজনেই বেশ ঠান্ডা মানুষ, শুধু উইক-এন্ডগুলোয় দু'জনেই বেশ কয়েক বোতল বিয়ার খেয়ে হল্লা করে শুধু। তাকাশ কেন খায় জানি না, শুধু শুধুই বোধহয়, তবে হিশারটা জানি। কিছুদিন আগেই গার্লফ্রেন্ডের সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে ওর।
অল্প কিছুদিন আগেই হঠাৎ করেই মালদ্্বিপের একজনের সাথে পরিচয় হলো। সুমাইস নাম। ঐ সময় মালদ্্বিপ শুিেন মনে হলো কত কাছের একজন। আমি জানতাম না, মালদ্্বিপ থেকে প্রতি বছরই বেশ কিছু ছেলে মেয়ে পড়তে আসে এখানে। এই ভার্সিটিতে আছে তিনজন। কাছাকাছি টাইপের চেহারা হওয়ায় বেশ আপন আপন লাগে ওদের।
অবশ্য প্রচুর ইন্ডিয়ানও আছে এখানে। পুরো সাউথ আফ্রিকায় ডারবানেই বোধহয় ইন্ডিয়ানদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ইন্ডিয়ান মানেই যে এরা সবাই ইন্ডিয়া থেকে পড়তে এসেছে এরকম নয়। মানে হলো এরা ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভূত।
মোট চার রকমের বর্ণ আছে এখানে। সাদা, কালো, ইন্ডিয়ান আর সাদা কালোর মিশেল যারা, মানে 'কালারড"।
এত রকম বর্ণের জন্যেই এদের 'রেইনবো নেশন' বলে বোধহয়।
তিন।
প্রথমদিকে আমার নাম নিয়ে খুব ঝামেলা হচ্ছিলো। কোন এক অদ্ভূত কারনে আমার 'তারেক' নামটার মত সহজ একটা শব্দ ওরা কিছুতেই উচ্চারণ করতে পারে না। আমি কিছুতেই এর সঠিক কারন আজো ভেবে পাই নি। দুজনের নাম জানি আমি, Nski Umangjao আর Sthebain Npuma । এরকম কঠিন সব নাম ওরা অবলীলায় উচ্চারণ করে, কিন্তু তারেক বলতে গিয়ে সবার যেন শ্বাস আটকে যায়!! ডেরেক, টারাক, ঠারিক এরকম নানা কিম্ভূত শব্দ পার হয়েও ওরা কেু তারেক পর্যন্ত পৌছাতে পারে নি। শেষ মেষ আমি ক্ষেপে গিয়ে বললাম, হয় ঠিক করে ডাকতে হবে, নতুবা কিছুই ডাকা চলবে না। অবশষে ওরা নিজেরাই একটা সমাধান বের করে ফেলল, আমাকে বাংলাদেশ বলে ডাকা শুরু করলো। আমি প্রথমত থতমত খেয়ে গেছিলাম। বাংলাদেশ তো শুধুই একটা শব্দ নয় আমাদের কাছে। তবে ওদের জোরাজুরিতে অবশেষে রাজি হয়েছি, যখন অবাক হয়ে মনের মধ্যে একরাশ আনন্দ নিয়ে দেখি, আমার দেশের নামটা ঠিকমতই উচ্চারন করছে সবাই।
(ক্রমশ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


