somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যেভাবে কয়েকটি সংখ্যার মানে বদলে গেল-

২০ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ রাত ২:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


40 মানে -- পঞ্চাশ এখনও যার দশ ঘর দূরে। আর পঞ্চাশ? সে তো হাফ-সেঞ্চুরি। "এক' মানে হল সবকিছুর শুরু। কেউ কেউ অবশ্য বলেন, সব কিছু শুরুর মূল দাবিদার "শূন্য'।

এ সবই সংখ্যাগুলোর নিজস্ব ও স্বাভাবিক অর্থ। এ নিয়ে কারও দ্বিমত নেই।

আচ্ছা, একুশ মানে কী? অথবা 52? বা 69, 71? কিংবা 90? মনে হতেই পারে এই অনর্থক প্রশ্নের মানেটা কী? এসব ও তো কিছু সংখ্যা-ই!

হুমম। খুবই সত্যি কথা। এরাও কয়েকটি সংখ্যাই বটে। তবে এদের অর্থ কেবল কিছু সংখ্যাই নয়, আমাদের কাছে এদের অর্থ আরও অনেক অনেক ব্যাপক। শুধুমাত্র বাংলাদেশে জন্মেছি বলেই কয়েকটি সংখ্যার মানে আমাদের জীবনে আশ্চর্যজনকভাবে পাল্টে গেছে।

আমরা বাংলাদেশি বলেই, বাহান্ন বা একুশ শুনলে, 5-এর পরে 2 অথবা 2-এর পরে 1 বসিয়ে দুটো সংখ্যাই কেবল মনে হয় না আমাদের কাছে -- 52 বা 21 মানে -- আমাদের কাছে -- নিজের ভাষার জন্যে বুক ভরা ভালবাসা। যে ভালবাসার টানেই আমাদের ভাষা-শহীদদের আত্মত্যাগ।

1952 সালের 21 ফেব্রুয়ারির কথা বাঙালি মাত্রেরই জানা। আর কিছু নয়, নিজের ভাষার কথা বলবার অধিকারও যে প্রাণ দিয়ে আদায় করে নিতে হবে, এই দিনটির আগে কেউ কি তা কল্পনাও করেছিলেন? এই যে আমি এখন অবলীলায় গড় গড় করে বাংলায় লিখে চলছি, খেলার মাঠে নিজের প্রিয় দলকে চিৎকার করে "সাবাস সাবাস' বলে উৎসাহ দিচ্ছি, অথবা বন্ধুদের সঙ্গে দিচ্ছি প্রাণ খুলে আড্ডা। গলা ছেড়ে কখনও গেয়ে চলেছি বুকের গভীর থেকে উঠে আসা গান -- "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ....'। অথবা জ্বরার্ত কণ্ঠে কখনও অস্ফুটে আমার ডেকে ওঠা -- "মা ...'! এ সবেরই পেছনে ঐ একটি দিনেরই পূর্ণ অবদান।

এরপর 69-এর গণ-অভ্যুত্থান। ভাষার অধিকার আদায়ের পর আমাদের স্বাধীনতার দাবিকে আরও জোরালো করা হল যে ছয় দফা আন্দোলনের মাধ্যমে, 1969 এই হয়েছিল তা। পরাধীনতা ভেঙে ফেলে, নিজেদের একটি ভূখণ্ডের স্বপ্নের শুরুও এই সময়েই।

তারপর, 71। চোখ বুজে শুধু 71 বললেই মাতৃভূমির কথা মনে পড়ে যায় আমাদের। 1971 সালটিই এদেশের জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। 25 মার্চ রাতের নৃশংস গণহত্যা, তারপর 26শে মার্চ আমাদের স্বাধীনতা ঘোষণা। এরপর একেকটি সংগ্রামমুখর দিনের মধ্য দিয়ে -- অনেক আত্মত্যাগ আর বিসর্জনের নয় মাস পর -- সেই 71-এরই ডিসেম্বরে অর্জিত হয় আমাদের বিজয়। যে বিজয়ের ফলে বিশ্ব-মানচিত্রে আমরা একটি স্বাধীন জাতি হিসাবে জায়গা করে নিয়েছি। স্বাধীন একটি দেশ হিসাবে আমাদের অস্তিত্বের ঘোষণা আর তার বাস্তবায়ন হয়েছিল 1971-এ। এ কারণেই মনে হয় যেন -- 71 সংখ্যাটিই আমাদের স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করে আছে।

90-এরও রয়েছে আলাদা তাৎপর্য। স্বৈরাচার বিরোধী গণ-আন্দোলনের তরতাজা স্মৃতিময় 1990-এর উত্তাল দিনগুলো। আরও একবার পুরো দেশের মানুষের মিলেমিশে এক হয়ে যাওয়া! অবশেষে গণতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আবারও আমাদের মুক্তি।

এমনি করে, 21, 52, 71 বা 90, এই সাল বা তারিখগুলো কয়েকটি সংখ্যার রূপ ধরে আমাদের কাছে অন্যরকম মানে নিয়ে আসে। অন্য যে কোনও সংখ্যার চেয়ে তাই এ সংখ্যাগুলৈ আমাদের কাছে বেশি আপন মনে হয়, বেশি মহিমান্বিত। কালো কলম দিয়ে কালো হরফে লিখছি ওদের, তবু যেন মনে হয়, তাদের র ং আসলে লাল -- রক্তেভেজা লাল।

এ সংখ্যাগুলো প্রতিবার উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গীত হয়ে বেজে উঠে আমাদের মনে। প্রতিবার লিখবার সময় দেখতে পাই -- আরও বেশি সৌন্দর্যমন্ডিত হয়ে উঠেছে যেন ওরা। যতবারই ভাবি ওদের; ভাষা হয়ে, ভালবাসা হয়ে রক্তের মাঝে চঞ্চলতা বাড়ায় এরা। প্রতিবার শুনতে গিয়ে তাই মনে হয়, আলাদা করে কিছু সংখ্যা নয় -- যেন একটিই শব্দ শুনছি বারে বারে -- "বাংলাদেশ'!

আজ তাই এত বছর পরেও আমরা, নতুন প্রজন্মের গর্বিত মানুষেরা, বিজয়ের এই মাসে সেই বীর শহীদদেরকে বুকের গভীর থেকে জানাই শ্রদ্ধা ও ভালবাসা -- যাদের কারণে নিজের ভাষাকে আপন করে নিতে পেরেছি আমরা। জন্মের সংগে সংগেই পেয়েছি একটি পতাকা, নিজের একটি দেশ, আর দেশেরই প্রতিধ্বনি করা ভালোবাসাময় কয়েকটি সংখ্যা।

-----------
2004 এর ডিসেম্বরে লেখা।
প্রথম প্রকাশ: evsjvjvBf
ছবি: [link|http://www.un.org/events/UNART/walkingtheworld/images/bangladesh.jpg|m~
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ রাত ২:০১
১৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হযরত আলী (রা.) ও হযরত মুয়াবিয়ার (রা.) যুদ্ধের দায় হযরত আলীর (রা.) হলে আমরা হযরত মুয়াবিয়াকে (রা.) কেন দোষ দেব?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৭ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:৪৪



সূরাঃ ৯ তাওবা, ৬০ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬০। সদকা বা যাকাত ফকির, মিসকিন, এর কর্মচারী, মোয়াল্লাফাতে কুলুব (অন্তর আকৃষ্ট),দাসমুক্তি, ঋণ পরিশোধ, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরের জন্য। এটা আল্লাহর বিধান।... ...বাকিটুকু পড়ুন

তোমাকে ভালোবাসি I love you

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ২৭ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৩:০২

তোমাকে ভালোবাসি বাতাসের মতো,
যেমন শিশুর কাছে বালি একটা খেলনা,
অথবা ঝড়ের মতো, যাকে কেউ বোঝে না।

I love you like the wind,
Playing like a child in the sands,
Or a storm that no... ...বাকিটুকু পড়ুন

গর্ব (অণু গল্প)

লিখেছেন আবু সিদ, ২৭ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:৪০

একটা সরকারি প্রাইমারি স্কুল। ক্লাস শুরু হয়েছে বেশ আগে। স্কুলের মাঠে জন মানুষ নেই। কয়েকটা গাছ, দু'একটা পাখি আর চিরসবুজ ঘাস তাদের নিজের মতো আছে। একান্ত চুপচাপ একজন মানুষ শিক্ষক-রুমে... ...বাকিটুকু পড়ুন

দায় নেওয়ার কেউ নেই ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৭ শে এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৫


বাংলাদেশের ব্যাংকিং সংকট নিয়ে যত আলোচনা হচ্ছে, যত টকশো হচ্ছে, যত বিশেষজ্ঞ মতামত দিচ্ছেন, তার কিছুই ব্যাংকের সামনে লাইনে দাঁড়ানো মানুষটার কাজে লাগছে না। তিনি জানতে চান একটাই কথা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্য ধর্মের মানুষদের মাঝেও 'উত্তম মানুষ' আছেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৭ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:৪৭



পবিত্র কোরআনে অসম্ভব সুন্দর একটি আয়াত আছে। মহামহিম খোদাতায়ালা পুরো বিশ্বের মানুষদের দিকে একটি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে পবিত্র কোরআনে জিজ্ঞাসা করেছেন - "আর ঐ ব্যক্তি থেকে কে বেশি উত্তম... ...বাকিটুকু পড়ুন

×