
নিঃসন্দেহে আমাদের সবার জীবনের অন্যতম সময় হচ্ছে শৈশব । জীবনের এই একমাত্র সময় যখন থাকেনা কোন চিন্তা ভাবনা দুঃখ কষ্ট । জীবন মানেই তখন শুধু খেলাধুলা আর বাবা মার কাছে করা ছোট্ট ছোট্ট আবদার । আমরা সবাইই আমাদের বাবা মার ও অন্য বড়দের কাছে থেকে নিজেদের শৈশবের অনেক গল্প শুনি । আমার শৈশবেরও আছে এমন কিছু মজার গল্প যেগুলো আমার নিজের মনে নেই কিন্তু আমার বাবা মা এর মুখে শুনেছি অনেকবার, এখনও শুনি ।
১। প্রবাদ আছে "মর্নিং শোস দা ডে" । যদিও আমি আহামরি তেমন ভালো কোন ছাত্রী ছিলাম না তবে পড়াশোনা আমার বরাবরই ভালো লাগে । আমার বাবা মাও মনে হয় বিষয়টি আমার ছোটবেলাতেই বুঝতে পেরেছিল । তখন আমি সবেমাত্র বর্ণমালা শিখতে শুরু করেছি । একদিন নাকি আমাকে খুজে পাওয়া যাচ্ছিলো না । আমাদের পাশের বাসার এক চাচ্চু আমাকে ধরে নিয়ে এসেছিলো বাসা থেকে একটু সামনে এক জায়গা থেকে । আমি নাকি আমার লেখার বই আর খাতা নিয়ে হাঁটা দিয়েছিলাম স্কুলের উদ্দেশে অথচ স্কুল কোথায় আমার জানা ছিলনা । ওই চাচ্চু আমাকে রাস্তায় দেখতে পেয়ে ধরে নিয়ে এসেছিল বাসায় ।
২। আমি ছোটবেলাতে খুব খাবো খাবো করতাম মানে এটা খাবো ওটা খাবো ওইরকম
৩। নানুর বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম । গ্রামের বাড়িতে তখন বিয়ে হলে অন্য বাড়ীর মেয়ে বউরা যেতো নতুন বউ দেখতে । তো এমনই একদিন আমার মা ও খালা ও আরও আন্টিরা গিয়েছিল এক বাড়িতে বউ দেখতে। বিয়ে বাড়িতে ঢুকবার আগে আমাকে লক্ষ্মী মেয়ের মত মা বোঝাচ্ছিল "আম্মু এই বাসায় কিন্তু পোলাও রান্না হয়েছে তুমি কিন্তু খেতে চাইবেনা" । ওমা মেয়ে বুঝবে কি, উল্টো পোলাও এর নাম শুনেই আমি পোলাও খাবো খাবো বলে কান্না । আমার বেচারি মা পাঁজি মেয়েটাকে নিয়ে আর কি করে, বাসায় চলে আসে
৪। আমাকে যারা ব্যক্তিগত ভাবে চিনে তারা জানে আমি একটু টিউব লাইট টাইপের
৫. গ্রামের সব বাচ্চারাই মাটি দিয়ে খেলে কম বেশী তবে আমি একটু বেশী খেলতাম মাটিতে । আমার এক নানা ভাই একবার আমাদের বাসায় বেড়াতে এসে আমাকে কোলে নিয়ে বলেছিল "নানু ভাই তুমি এত মাটি মেখে আছ যে তোমাকে চুমু দিয়ে আদর করার মতও একটু জায়গা নেই"
৬. আমি নাকি ছোটবেলায় খেলতে খেলতে গাছের নিচে ঘুমিয়ে পড়তাম
৭. আমার দাদা ভাই যখন নামাজে সিজদা দিত আমি তখন তার মাথার টুপি নিয়ে দৌড় দিতাম ।
৮. আমার দাদা বাড়িতে অনেক বড় একটা সবেদা ফল গাছ ছিল । যখন ফলগুলো বড় হত তখন দাদু সেগুলো গাছ থেকে পেড়ে ছালায় ভরে খাটের নিচে রেখে দিতো। ওগুলো একটু পাকলেই আমি নাকি খাটের নিচে ঢুকে ইদুরের মত চুপি চুপি বসে সেগুলো খেতাম ।
উপরের যে ঘটনাগুলোর কথা বললাম সেগুলোর একটাও আমার মনে নেই সব আমার বাবা মার মুখ থেকে শোনা ।

এ ছাড়াও আমার শৈশবের মধুর কিছু স্মৃতি আছে যেগুলো বাবা মার মুখে শোনা না আমার নিজেরই মনে গেথে আছে
১। তখন আমি ক্লাস ফোরে পড়ি, ধানমন্ডির কামরুন নেসা স্কুলে । বাসা ছিল ধানমন্ডির, মধুবাজারে। সকালে বাবা অফিস যাওয়ার সময় স্কুলে দিয়ে যেতো আর দুপুরে খালা আফটারনুন শিফটে খালাতো বোনকে স্কুলে দিয়ে আমাকে বাসায় নিয়ে আসতো । একদিন কোন কারনে খালার আসতে দেরী হয়েছিল । আমি তখন একা একাই স্কুল থেকে মধুবাজার বাসায় চলে গিয়েছিলাম হেটে হেটে । এখনও আমি রাস্তা পার হতে ভয় পাই অথচ ওই বয়সে আমি কিভাবে একা হেটে হেটে রাস্তা পার হয়ে রাস্তা চিনে বাসায় ফিরেছিলাম আসলেই আমার কোন ধারনা নেই সে সম্পর্কে
২। বিকেলবেলা খেলছিলাম তখন এক মামা বললো বাইকে ঘুরাবে , আমি আর আমার সমবয়সী ছোট যে মামা দুইজনকে । ছোট মামা বসলো বাইকের সামনে আর আমি পেছনে বসে বড় মামাকে দু হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলাম । আমার হাত ছিল মাটি মাখা আর মামার ছিল সাদা পাঞ্জাবী । যখন বাইক থেকে নামলাম তখন দেখি মামার সাদা পাঞ্জাবীতে আমার ময়লা মাখা দুই হাতের ছাপ স্পষ্ট
৩। আমার খুব গাছে চড়তে মজা লাগতো ছোটবেলায় । প্রায়ই আমি বাড়ীর এ গাছ ও গাছে উঠার চেষ্টা করতাম । একদিন কিভাবে কিভাবে যেন একটা বড় পিসফল গাছের খুব উপরে উঠে গিয়েছিলাম কিন্তু তারপর আর নামতে পারছিলাম না
৪। আমাকে গোসল করিয়ে মেঝেতে দাড় করিয়ে রেখে মা গিয়েছিল তোয়ালে আনতে । মেঝে ছিল ভেজা তাই মা বলেছিল সেই জায়গায়ই যেন দাড়িয়ে থাকি । কিন্তু আমি কি শুনি মা এর কথা । একটু দেরী দেখে দিলাম একটা দৌড় । আর ওমনি গেলাম পিছলে পরে । ফলাফল, আইব্রোর ওখানে গেল কেটে । ডাক্তার বলেছিল সেলাই করতে কিন্তু বাবা রাজী হয়নি শুধু ব্যান্ডেজ করে দিয়েছিলো । কিন্তু এখনও সেই কাটা জায়গায় আমার কোন আইব্রো নেই
৫। আমার আপন নানা ভাই এর ভাই আমার আরেক নানা ভাই । কেন যেন তিনি আমাকে অন্যদের চেয়ে একটু বেশী আদর করতেন । যখনই তিনি আমার সাথে থাকতেন দুইটা গান গাইতেন সবসময় "তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ" "বসে আছি পথ চেয়ে ফাগুনেরও গান গেয়ে, যত ভাবি ভুলে যাবো মন মানেনা" । আমার বয়সী আমার এক মামাও ছিল যে কিনা ওই নানা ভাই এর খুব বাধুক ছিল । নানা ভাই কোথাও বেড়াতে গেলেই আমাকে নিয়ে যেতো আর মামা যেতে চাইলে তাকে ভাগিয়ে দিত । একবার সেই নানার মেয়ের বাসায় গেলাম। খালামনি চিপস আর আঙ্গুর খেতে দিয়েছিলো । খালামনির ছোট ছেলেটি টপাটপ আঙ্গুর গুলো খেয়ে ফেলছিল । আমি খাচ্ছি না দেখে নানা ভাই চিপস গুলো একটার উপর একটা গুছিয়ে আমার মুখে গুজে দিচ্ছিল আর দেখলাম এক ফাকে সবগুলো আঙ্গুর তার পকেটে ভরলো । যখন বাসায় ফিরছিলাম তখন নানা ভাই আঙ্গুরগুলো বের করে আমার হাতে দিয়ে খেতে বললো । এখনও ভাবলে অবাক লাগে নানা ভাই আমাকে এত আদর করতো যে তার নিজের নাতীকে খেতে না দিয়ে সে আমার জন্য পকেটে করে আঙ্গুর গুলো নিয়ে এসেছিল । উল্লেখ্য ইনিই আমার সেই নানা ভাই যে আমাকে চুমু দেওয়ার জন্য মুখে কোন পরিষ্কার জায়গা খুজে পায়নি
বিঃ দ্রঃ আমার প্রিয় সহব্লগারদেরও নিশ্চয় তাদের শৈশবের এমন কিছু মজার মজার ঘটনা ও স্মৃতি আছে। আমার এখন তাদের শৈশবের স্মৃতি ও জানতে খুব মন চাইছে ।
(ছবির মেয়েটিকে নিশ্চয় আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জানুয়ারি, ২০১৯ দুপুর ২:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



