somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পথভোলা এক বাকহীনের আর্তি

০৫ ই মার্চ, ২০১২ রাত ৮:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
সালেহা ইয়াসমীন লাইলী,
কুড়িগ্রাম-০৫-০৩-২০১

হয়তো বউ অপেক্ষা করে প্রতিদিনের সূর্যের দিকে তাকিয়ে দিন গুনে, রাতের আধাঁরের দিকে তাকিয়ে রাত গুনে। ছেলে-মেয়েরাও অনাহারে- অর্ধাহারে দিনমান পথের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঝাপসা হতে দেখে রোজ দিগন্তের ছায়া। হয়তো, ছানি পড়া চোখে বৃদ্ধা মা অন্য কারো ছেলের চিবুক ছুঁইয়ে আদর করতে করতে বলে, ‘বাবা তুই এত দিন পড়ে এলি? তোর তো এক মাস আগেই আসার কথা ছিল। রোজ রাতে ঘরের চালে বাদুরটার ডানা ঝাপটানোর শব্দে, ভোর বেলা কাকের ডাক শুনলে আমার বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে। তুই না হয় সবার মতো কথা বলতে পারিস না, বুঝতে তো পারিস! তোর বউ, তোর ছেলে মেয়ে, আমি তোর বুড়া মা তোর চিন্তা কত করছি। কেন এত দেরী করলি?’ পরক্ষণে ভুল ভেঙ্গে গেলে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে অজানা আশংখায়। সেই কান্নায় যোগ দেয় তার আত্মার আত্মীয় ,বউ ছেলেমেয়েরা।
গ্রামের আর সবাই কাজ শেষে দল বেধে চলে এসেছে কতদিন আগে, আর এই একজন মানুষ কোথায় গেল? ছেলেমেয়ে, বউ, বৃদ্ধা মা সবাই যারা এসেছে তাদের কাছে গিয়ে খবর জানতে চেয়েছে, পায়নি কোন জবাব। বেচে আছে না মরে গেছে তাও বলতে পারেনি কেউ । বলবেই বা কিভাবে? কাজের অভাবে বউ,ছেলে-মেয়ে, বৃদ্ধা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে গ্রামের অন্য দিনমজুরদের সাথে তিনিও গিয়েছিলেন কাজে। যাওয়ার সময় প্রতিবেশীর কাছ থেকে কিছু কর্জ নিয়ে বউয়ের হাতে কয়টা টাকা ধরিয়ে দিয়ে গেছেন। বউটা চিন্তিত মুখে ফ্যাল ফ্যাল করে চোখের দিকে তাকিয়ে ইশারায় বুঝিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনি কথা বলতে পারেন না, হারিয়ে গেলে কোন ঠিকানা বলতে পারবেন না। তখন বাড়িতে ফিরবেন কিভাবে? বাদ দেন দুরের কাজে যাওয়া। আমরা না খেয়ে মরলেও ছেলেমেয়ে নিয়ে অন্তত একসাথে মরতে পারবো।’ তিনি মুখে কাষ্ট হাসি টেনে ইশারায় বলেছিলেন, ‘কথা বলতে না পারলেও গায়ে তো শক্তি আছে। সেই শক্তি নিয়ে না খেয়ে কেন মরতে হবে? যে কোন কাম- কাজ করতে পারব। গ্রামে কাম কাজ নাই, কয়দিন বাইরে খেটে এলে ছেলে মেয়েদের জন্য কাপড় চোপড়, বউকে দেখিয়ে দিয়ে বলেছিল তোমার পরনের শাড়িটাও ছিঁড়ে গেছে। আর বৃদ্ধা মাকে কতক্ষণ না খাইয়ে রাখি। খুব জলদি চলে আসব। গ্রামের অনেকের সাথে যাচ্ছি তো, সমস্যা হলে তারা তো আছে।’ যাওয়ার সময় শুধু মাকে দোয়া করতে বলে হন হন করে চলে গেছেন পিছনে না ফিরে।

বউয়ের আশঙ্খা আজ সত্যি হয়েছে। তিনি হারিয়ে ফেলেছেন সঙ্গিদের। আর কথা বলতে না পারায় হারিয়ে ফেলেছেন নিজের ঠিকানা, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা, মা ও নিজের নামটাও। তিনি পথ ভুলে চলে এসেছেন কুড়িগ্রামের যাত্রাপুরে। এখানে তিনি খেয়াঘাট এলাকায় ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছেন ২২ দিন ধরে। মানুষের কাছে গিয়ে ইশারায় বলছেন কোন এক ব্রিজের পাশেই তার বাড়ি। নিজের নাম বলতে ও লিখতেও না জানায় কেউ তার কোন ঠিকানার হদিস দিতে পারছে না।

বউ, আপনাকে দেয়া কথা মতো তিনি রঙিন ডুরে কাটা শাড়ি একখান কিনেছেন, ৪/৫ বছরের একটি মেয়ে শিশুর ফুল ছাপার ফ্রকও কিনেছেন, ৭/৮ বছরের এক ছেলে শিশুর নীল গেঞ্জীও একটা তার পুটলীতে। বাড়িতে ধার দেনা হয়েছে বলে তার পুটলির ভিতর থেকে ১৭০০ টাকা সবাইকে দেখিয়ে কান্না কাটি করছেন বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার জন্য। ঘাটে বসা এক বৃদ্ধা ভিখারিনিকে মা বলে ডেকে নিজের মায়ের কাছে যেতে চাচ্ছেন । কিন্তু কিভাবে তাকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া যাবে? তার কান্না, তার ডাক কি পৌছুতে পারবে তার স্বজনদের কাছে?
#
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই মার্চ, ২০১২ রাত ৮:৪৭
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৭



মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭



আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহভঙ্গ!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮



পদ্মা সেতু নিয়ে কত অপবাদই না দেয়া হয়েছিলো! বলা হয়েছিলো- বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প করতে পারবে না। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অথচ শেষ পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×