somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নওগাঁর শালবনে আলতাদিঘি

১১ ই জুলাই, ২০১১ বিকাল ৪:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হাফিজুর রহমান চৌধুরী
নওগাঁর বালুডাব্দা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে চেপেছিলাম সকাল ৭টায়। প্রায় ৫৪ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম ধামইরহাট সদরে। পৌঁছতে লেগে গেল প্রায় দেড় ঘণ্টা। সেখান থেকে যাব ৬ কিলোমিটার দূরে ধামইরহাট-জয়পুরহাট সড়ক থেকে উত্তরের শালবন আর আলতাদিঘি। রিকশায় সামান্য পাকা রাস্তা আর বাকিটা লালমাটির রাঙা পথ পেরোতেই চোখে পড়ল শালবন। ঠাঠা বরেন্দ্রভূমিতে যেন একচিলতে মরূদ্যান। এ প্রাকৃতিক বনভূমি আর দিঘি দেখতে প্রতিদিন আসেন শত শত প্রকৃতিপ্রেমী।
বনের দিকে যতই এগিয়ে চলেছি ততই যেন রোমাঞ্চিত হচ্ছি। পথের ধারে মাঝেমধ্যে ছোট্ট ছোট্ট পাড়া। বেশিরভাগই ওঁরাও আদিবাসীর বসবাস। এরপর হঠাত্ করেই যেন শুরু বন, চারদিকে শুধু উঁচু উঁচু শালগাছ। সকালের সোনারোদ শালগাছের পাতায় আছড়ে পড়ছে। সেই রোদের আলোছায়া বাতাসের দুলনিতে মাটিতে পড়ে নানান ছবি আঁকছে। সর্পিল পথ ধরে গহিন শালবনে প্রবেশ করার সময় এমনিতেই অজানা ভয়ে গা ছমছম করে উঠছে। তবুও প্রকৃতির হাতছানি নিয়ে যাচ্ছে নির্জন বনের গহিনে। মাঝেমধ্যে পাখির আচমকা ডাকে চমকিত শরীরে শিহরণ জাগাচ্ছে। শালপাতার ফাঁকে ফাঁকে আলোছায়ার লুকোচুরি তার সঙ্গে বাতাসের খেলা দেখতে দেখতে দুচোখ জুড়িয়ে গেল। বুনোপথ ধরে কিছুটা এগিয়ে যেতে পেয়ে গেলাম শালবনের মধ্যে বিশাল টলটলে জলের আলতাদিঘি।
কথিত আছে পাল যুগে পাল বংশের কোনো এক রানী এই শালবন দেখতে আসেন। রানীমাকে কাছে পেয়ে জলকষ্টের কথা জানায় সেখানকার প্রজারা। কোমলপ্রাণ রানী প্রজাদের ওই কষ্টে ব্যথিত হন। তিনি প্রজাদের বলেন, ‘আমি যতদূর পর্যন্ত হাঁটতে থাকব ততদূর পর্যন্ত দিঘি খনন করা হবে। আমার পা থেকে যতক্ষণ না রক্ত ঝরবে আমি ততক্ষণ হাঁটতে থাকব।’ রানী হাঁটতে শুরু করলেন। রানীর ওই কষ্টে পরিচারিকারা বিচলিত হয়ে উঠল। এ সময় তাদের কাছে থাকা আলতা রানীর পায়ে ছুড়ে দিয়ে তাকে জানানো হয়, তার পা দিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করেছে। রানী হাঁটা বন্ধ করলেন। রানীর হাঁটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খনন করা হয় বিশাল এ দিঘিটি।
দিঘির মিষ্টি শীতল পানিতে হাত-মুখ ধুয়ে নিলাম। ক্লান্তি চলে গেল অনেকটাই। আবারও বুনোপথে হাঁটা শুরু। শালবনের ভেতরে মাঝেমধ্যেই লাল রংয়ের বিশাল বিশাল উইপোকার ঢিবি। শালগাছকে জড়িয়ে উঠে গেছে হিংলোলতা, গুরঞ্চলতা, অনন্তমূল, ঝারিশত, বনবরইসহ নানা লতাগুল্ম আর বনফুল। মাঝেমধ্যে ঘন বেতবন।
ভারত সীমান্তঘেঁষা এ বন আর দিঘি। প্রায় ১০০ একরের দিঘি আর ৩০০ একরের রিজার্ভ ল্যান্ড ফরেস্ট। এ বনে আছে সাপ, শিয়াল, খরগোশ, বাঘডাসা, বনবিড়াল, বনরুই, বেজি, গুইসাপসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী আর পাখি। একটা গাছের ওপর দেখতে পেলাম বকের বাসায় অদ্ভুত শব্দ করে মাকে ডাকছে বকছানা। পাশ দিয়ে ছুটে গেল একটি বেজি। মনে হয় বকছানার লোভে কোথাও ওতপেতে ছিল, মানুষ দেখে চম্পট দিল। বনের ভেতর শিশুকে কাপড় দিয়ে পিঠের সঙ্গে বেঁধে রেখে কাঠ সংগ্রহ করছে কয়েকজন ওঁরাও নারী। পথ যেখানে শেষ, সেখানেই ভারত সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া। ওপারে ভারতের মানুষ জমি চাষ করছে, বিএসএফ টহল দিচ্ছে। আবার ফিরে এলাম বনে।
দুপুর গড়িয়েছে। এ বনভূমিতে কোনো বিশ্রামাগার নেই। বনের উত্তর ধারে অনেকটা ফাঁকা জায়গা। যারা বেড়াতে এসেছেন সেখানে বসে সবাই সঙ্গে নিয়ে আসা খাবার খাচ্ছেন। আমিও তাদের মতোই মাটিতে বসে পড়লাম নওগাঁ থেকে সঙ্গে আনা খাবারগুলো সাবাড় করতে। নিঝুম নিস্তব্ধ বন। মাঝেমধ্যে পাখি ডাকছে। সময় যে কীভাবে কেটে গেল তা বুঝতে পারলাম না। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে। ফেরার তাগিদ অনুভব করলাম। দুচোখে শুধুই সবুজ আর সবুজ মাখিয়ে একগুচ্ছ স্মৃতি নিয়ে ফিরে এলাম শালবন আর আলতাদিঘিকে বিদায় জানিয়ে।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আমি ক্রিকেটার বলে বেঁচে গেলাম” — নাঈম হাসানের কান্না এবং সাধারণ মানুষের প্রশ্ন

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ১৩ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:১৯

একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার মাঝরাতে বিমানবন্দর থেকে বাসায় ফিরছিলেন। জাতীয় দলের জার্সি পরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন, অসংখ্য মানুষ তাকে চেনে। অথচ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে নিজের পরিচয় প্রমাণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্রাজিলের ম্যাচগুলো কবে কখন কোথায় এবং কার সঙ্গে?

লিখেছেন শিমুল মামুন, ১৩ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:১৪


একনজরে ব্রাজিলের গ্রুপ পর্বের ফিক্সচার (Brazils Group Stage Fixtures at a Glance)
প্রথম ম্যাচ (প্রতিপক্ষ মরক্কো): ১৪ জুন ২০২৬। বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১

কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাগরিকের অপমান ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির সংকট: ক্রিকেটার নাঈম হাসানের ঘটনা

লিখেছেন নতুন নকিব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪০

নাগরিকের অপমান ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির সংকট: ক্রিকেটার নাঈম হাসানের ঘটনা

ক্রিকেটার নাঈম হাসানের ছবিটি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

ক্রিকেটার নাঈম হাসানের সঙ্গে পুলিশের আচরণ নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×