একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার মাঝরাতে বিমানবন্দর থেকে বাসায় ফিরছিলেন। জাতীয় দলের জার্সি পরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন, অসংখ্য মানুষ তাকে চেনে। অথচ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে নিজের পরিচয় প্রমাণ করতে হয়েছে, শুনতে হয়েছে—“তুই আসামি, তুই চুপ থাক।”
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে জাতীয় দলের অফ স্পিনার Nayeem Hasan সংবাদমাধ্যমের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার কণ্ঠে উচ্চারিত একটি বাক্যই পুরো ঘটনাটির সবচেয়ে গভীর দিকটি তুলে ধরে—
“আমি ক্রিকেটার বলে বেঁচে গেলাম। সাধারণ মানুষ হলে কী হতো?”
প্রাপ্ত বর্ণনা অনুযায়ী, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের খেলা শেষে বিমানে চট্টগ্রাম ফিরে গভীর রাতে সিএনজিতে করে বাসায় যাচ্ছিলেন নাঈম। লালখানবাজার এলাকায় টহল পুলিশ তার গাড়ি থামায়। তিনি নিজের পরিচয় দেন, জাতীয় দলের পরিচয়পত্র দেখান এবং ব্যাগ তল্লাশির অনুমতিও দেন। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, পরিচয় যাচাইয়ের আগেই তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এখানেই ঘটনাটি কেবল একজন ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত দুর্ভোগের গল্প থাকে না; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিক সম্পর্কের একটি বড় প্রশ্ন হয়ে ওঠে। কারণ নাঈম শেষ পর্যন্ত পরিচিত একজন মানুষ। তার জন্য ফোন করার লোক ছিল, তার পরিচয় নিশ্চিত করার মতো মানুষ ছিল, সংবাদমাধ্যম ছিল। কিন্তু যাদের কিছুই নেই?
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, স্থানীয় লোকজন নাঈমকে চিনে ফেলার পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বরং ঘটনাটি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে নাঈম নিজেই নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরে থানায় নেওয়ার পরও তিনি কাঙ্ক্ষিত সম্মান বা সহমর্মিতা পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।
অবশ্য পুলিশ বলছে, একটি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালিত হয়েছিল এবং দায়িত্ব পালনে ভুল হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ভুল স্বীকার করা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ভুলের শিকার যদি একজন জাতীয় ক্রিকেটার হতে পারেন, তাহলে একজন সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে এমন ভুলের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে?
ব্যঙ্গ করে বলা যায়, দেশে হয়তো এখন নতুন এক ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু হয়েছে—আপনি যদি জাতীয় দলের ক্রিকেটার হন, তাহলে কয়েক ঘণ্টা পরে আপনার পরিচয় যাচাই হতে পারে; কিন্তু আপনি যদি সাধারণ মানুষ হন, তাহলে পরিচয় প্রমাণের সুযোগটুকুও নাও পেতে পারেন।
একসময় কমনওয়েলথ গেমসে স্বর্ণজয়ী শুটার Asif Hossain Khan নানা অবহেলা ও অপমানের গল্পের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। আজ নাঈম হাসানের চোখের জল আমাদের আবার মনে করিয়ে দিল, দেশে প্রতিভা অর্জনের চেয়ে কখনো কখনো নিজের মর্যাদা রক্ষা করাটাই কঠিন হয়ে পড়ে।
নাঈমের কান্না একজন ক্রিকেটারের কান্না নয়। এটি সেই অগণিত মানুষের নীরব প্রশ্ন, যাদের নাম আমরা জানি না, যাদের পাশে সংবাদমাধ্যম দাঁড়ায় না, যাদের জন্য প্রভাবশালী ফোন আসে না।
কারণ শেষ পর্যন্ত ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ পুলিশ, ক্রিকেট বা নাঈম নন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সেই প্রশ্নটি—
“আমি ক্রিকেটার বলে বেঁচে গেলাম। কিন্তু সাধারণ মানুষ হলে কী হতো?”
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া না গেলে, উদ্বেগ শুধু একজন ক্রিকেটারের জন্য নয়; পুরো সমাজের জন্য।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



