জালিয়াতি করে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে কয়েকটি গ্রুপ প্রায় ৩ হাজার ৭শ’ কোটি টাকা তুলে নেয়ার ঘটনায় এখন সারাদেশ তোলপাড়। দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই জালিয়াতির ঘটনায় শুধু হলমার্ক নামের একটি গ্রুপই তুলে নিয়েছে ২ হাজার ৬শ’ কোটি টাকা। এঘটনা প্রথম সংবাদমাধ্যমে আসার পর সবাই এখন ঝাপিয়ে পড়েছে সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের উপর। কেন যেন মনে হচ্ছে এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের আড়াল করতেই পরিকল্পিতভাবে শুধু পরিচালনা পর্ষদকে টার্গেট করা হয়েছে।
এমনটি মনে করার কারণ: সংবাদমাধ্যমগুলোতে বার বার বলা হচ্ছে এটি ঋণ কেলেংকারি। অর্থাৎ সোনালী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত দিচ্ছেনা হলমার্ক গ্রুপ। এটি প্রতিষ্ঠা করা গেলে এর যাবতীয় দায়দায়িত্ব পরিচালনা পর্ষদের উপর বর্তাবে। কারণ ঋণের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় পরিচালনা পর্ষদ। কিন্তু হলমার্ক কেলেংকারি পরিচালনা পর্ষদে যাওয়ার মত কোন ঋণের ঘটনা নয়। তাহলে এটি কী ?
প্রতিটি ব্যাংকের প্রধান দৈনন্দিন কার্যক্রম হচ্ছে আমদানি-রপ্তানী-ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অর্থায়ন করা। এটি অনেকটা গ্রাহককে আজ টাকা দিয়ে কাল বা পরশু তা আদায় করে নেয়ার মত। কোন গ্রাহক প্রতিষ্ঠান দেশের ভেতরে বা বিদেশে যে পণ্য কেনা-বেচা করে তাতে কয়েকদিনের জন্য অর্থায়নের মাধ্যমে কমিশন আদায় করে ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটি ঋণপত্র (এলসি) খোলে এবং ইনল্যান্ড বিল বিক্রি করে ব্যাংকের কাছ থেকে অল্প কয়েকদিনের জন্য টাকা নেয়। ব্যাংক যখন এই বিল কেনে তখন একে বলে ইনল্যান্ড বিল পারচেজ বা আইবিপি। এলসি কিংবা আইবিপি’র টাকা সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে ব্যাংককে পরিশোধ করে দিতে হয়। এই সময়টুকুর জন্য সর্বোচ্চ হারে সুদের পাশাপাশি কমিশনও দিতে হয়। এজন্য বড় ও ভাল প্রতিষ্ঠানের আইবিপি কেনা ব্যাংকগুলোর জন্য খুবই লাভজনক ব্যবসা। একইসাথে এটি ব্যাংকের দৈনন্দিন বাণিজ্যিক কাজ।
ব্যাংক একটি গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের জন্য কত টাকার এলসি খুলবে বা কত টাকার আইবিপি কিনতে পারবে তা ব্যাংক কর্মকর্তাদের উপরই নির্ভর করে। এজন্য একেক ব্যাংকের একে নিয়ম। সোনালী ব্যাংকের বেলায় এই নিয়মটি ছিল একজন জেনারেল ম্যানেজার বা ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার কোন একক গ্রাহকের জন্য যত ইচ্ছা টাকা’র এলসি খোলা বা আইবিপি কেনার ক্ষমতা রাখতেন। সহকারি জেনারেল ম্যানেজারের জন্য এই ক্ষমতা ছিল কোন একক বেসরকারি গ্রাহকের জন্য সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা।
সোনালী ব্যাংক রুপসী বাংলা হোটেল শাখার ম্যানেজার আজিজুর রহমানের পদবী ছিল ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার। তিনি কোন একক গ্রাহকের জন্য যত টাকার ইচ্ছা এলসি খুলতে পারতেন, কিনতে পারতেন যত খুশি তত আইবিপি।
এই ক্ষমতা পেয়েই ম্যানেজার আজিজুর রহমান সাহেব হলমার্কসহ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে দেদারসে এলসি খুলে টাকা দিয়েছেন, নগদ টাকায় এসব প্রতিষ্ঠান থেকে ইচ্ছামত কিনেছেন আইবিপি। প্রতিষ্ঠানগুলো ৯০ দিনের মধ্যে এলসি বা আইবিপি’র টাকা পরিশোধ করলো কিনা সেদিকেও ভ্রুক্ষেপ করেননি তিনি। আর করবেনই বা কেন, এযে ছিল ব্যাংক থেকে টাকা বের করে ভাগাভাগি করে নেয়ার সমঝোতা!
অবশ্য শুধু রুপসী বাংলা হোটেল শাখা নয়-সোনালী ব্যাংকের আরো কয়েকটি শাখার ম্যানেজারগণ এই কাণ্ড করেছেন। তবে তাদের কারোই আজিজ সাহেবের মত ‘বুকের পাটা’ ছিলনা। আজিজ সাহেব বিশ্বাস করেন ‘মারিতো গণ্ডার, লুটিতো ভাণ্ডার’। তিনি সোনালী ব্যাংকের ভাণ্ডার লুট করতেই নেমেছিলেন, ‘ছুচো মেরে হাত কালা’ করতে রাজী নন তিনি।
আজিজ সাহেব এমন ‘সাহসী’ হলেন কিভাবে ? কারণ তার সাথে ব্যাংকের আরো লোকজন ছিল। গোয়েন্দা কাহিনীতে অপরাধী যেমন অপরাধের কোন না কোন ক্লু রেখে যায়, তেমনি আজিজ সাহেবের সঙ্গীরাও ‘ক্লু’ রেখে গেছেন। সোনালী ব্যাংকের কাগজপত্র বলছে: একই গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেদের মধ্যে পণ্য কেনাবেচার আইবিপি কিনে আসছিলেন রুপসী বাংলা হোটেল শাখাসহ বেশ কয়েকটি শাখার ম্যানেজারগন। এটি গোচরে আসার পর চলতি বছর ২রা জানুয়ারি পরিচালনা পর্ষদের সভায় একই গ্রুপভূক্ত প্রতিষ্ঠানের পরষ্পরের ড্র করা ইনল্যান্ড বিল না কেনার নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু এনির্দেশের থোড়াই কেয়ার করেছেন রূপসী বাংলা শাখার ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার আজিজুর রহমান। তিনি যে এই নির্দেশ মানছেন না, সেজন্য তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেননি তার উর্ধতন কর্মকর্তারা। এরা যে তার ‘মহৎ কর্মের’ সঙ্গী!
শুধু তাই নয়, ফেব্রুয়ারি মাসের ১৪ তারিখ পর্যন্ত ১৪টি শাখার ইনল্যান্ড বিল কেনার দায় দাঁড়ায় এক হাজার ৭০২ কোটি টাকা। এরমধ্যে শুধু রূপসী বাংলা শাখার দায় ছিল ৫৭৩ কোটি টাকা। এই তথ্য গোচরে আসার পর পরিচালনা পর্ষদ এবার শাখা ম্যানেজারদের বেসরকারি একক গ্রাহকের ইনল্যান্ড বিল কেনার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেয় ৩০ কোটি টাকা। আগে যার সীমা ছিল যেকোন পরিমাণ।
সর্বোচ্চ সীমা কিভাবে ফাঁকি দিতে হয় সেই পদ্ধতি জানেন ডিজিএম আজিজুর রহমান। এই ‘মেধাবী’ কর্মকর্তা একদিনেই হলমার্ক গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৩০ কোটি টাকা করে চারশ’ কোটি টাকারও বেশি ইনল্যান্ড বিল কিনেছেন!
আজিজ সাহেবের এমন কর্মকান্ডের কথা অনেক আগেই সোনালী ব্যাংকের হেড অফিসের কর্মকর্তারা জেনে গিয়েছিলেন। তাকে ঠেকাতে চেষ্টা করেন দু’একজন কর্মকর্তা, রূপসী বাংলা শাখায় অডিট করার জন্য ব্যাংকের এমডি’র অনুমোদনও আদায় করেন তারা। কিন্তু বাধ সাধেন উপব্যবস্থাপণা পরিচালক (ডিএমডি) মাইনুল হক সাহেব। জানুয়ারিতে অডিটের অনুমোদন পেয়েও ডিএমডি’র ধমকে এপ্রিলেও অডিট শুরু করতে পারেননি এসব কর্মকর্তা। এমনকি এপ্রিলের শুরুতে এই অডিট টিম রূপসী বাংলা শাখায় যাওয়ার জন্য রওয়ানা দিলে তাদেরকে সেখানে না গিয়ে হেড অফিসে ফিরে আসার নির্দেশ দেন ইন্সপেকশন এন্ড মনিটরিং সেলের জেনারেল ম্যানেজার। এসব বিষয় এমডি’র নজরে এলেও ‘নির্বিকার দর্শকের’ ভূমিকা নেন তিনি। দুর্জনেরা বলেন, তাকেও ম্যানেজ করেছিলেন আজিজ-মাইনুল চক্র।
এপ্রিলের ১৬ তারিখে রূপসী বাংলা শাখা পরিদর্শন করেন একজন জেনারেল ম্যানেজার। তার রিপোর্টে উঠে আসে ইনল্যান্ড বিল কেনায় অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারের ভয়াবহ চিত্র। ১৪ই ফেব্রুয়ারিতে এই শাখার ইনল্যান্ড বিল কেনার দায় যেখানে ছিল ৫৭৩ কোটি টাকা, মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ১২ই এপ্রিল এই দায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় এক হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। এর প্রায় পুরোটাই ছিল হলমার্ক গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়।
আইন-কানুন আর চক্ষু লজ্জা বলে একটা কথা আছে। তাই এই পরিদর্শন রিপোর্টটি ১৮ এপ্রিল পরিচালনা পর্ষদে উপস্থাপন করে রূপসী বাংলা শাখা প্রি-অডিটের জন্য কর্মকর্তা নিয়োগের অনুমতি চান ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন কবির। এই অনুমতি দেয়ার পাশাপাশি রুপসী বাংলা শাখায় সকল ইনল্যান্ড বিল মঞ্জুরি স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয় পরিচালনা পর্ষদ।
কিন্তু পরিচালনা পর্ষদকে পাত্তা দেয়ার পাত্র নন ডিএমডি মাইনুল হক, রূপসী বাংলার ডিজিএম আজিজুর রহমান ও তাদের সহযোগীরা। এই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই হলমার্কসহ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের এলসি খোলা ও ইনল্যান্ড বিল কেনার কাজ ‘বীর বিক্রমে’ চালিয়ে যান তারা। এভাবে আর মাত্র দুই মাসে রুপসী বাংলা শাখা থেকে বের হয়ে যায় আরো আড়াই হাজার কোটি টাকা। সবমিলিয়ে এই শাখা থেকে লোপাট হয়ে যায় ৩ হাজার ৭শ’ কোটি টাকা, যার মধ্যে ২ হাজার ৬শ’ কোটি টাকাই হাতিয়ে নেয় হলমার্ক গ্রুপ।
প্রথমে এই গ্রুপভূক্ত প্রতিষ্ঠানের পরষ্পরের বিল না কেনার নির্দেশ, পরে বিল কেনার সীমা নির্দিষ্ট করে দেয়া এবং এপ্রিলে সকল বিল কেনার উপর নিষেধাজ্ঞা-পরিচালনা পর্ষদের এমন তিনটি সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করার ‘হিম্মত’ কোথায় পেলেন আজিজুর রহমান ও তার সঙ্গীরা। ডিএমডি মাইনুল হকের বাড়ি শরিয়তপুর আর ডিজিএম আজিজুর রহমানের বাড়ি গোপালগঞ্জ। দুর্জনেরা বলে, আজিজুর রহমানের কাছেই নিয়মিত যাতায়াত করতেন প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা। শুধু তাই নয়-আজিজুর রহমান নিজেও সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি ‘তাকে মাঝে-মধ্যেই ডেকে পাঠান’ কিংবা সাথে শীর্ষ ব্যক্তির সাথে ‘ব্রেকফাস্ট’ ‘ডিনার’ করার গল্প শোনাতেন সহকর্মীদের। এজন্যই আজিজ সাহেব তিন বছরের অতিরিক্ত আরো দুই বছর একই শাখায় থাকলেও তাকে বদলী করার সাহস দেখাননি কেউ। ওয়ান-ইলেভেনের সময় ট্রুথ কমিশনের কাছে নিজের দুর্নীতির কথা স্বেচ্ছায় স্বীকার করলেও ডিএমডি মাইনুল হকের বিরুদ্ধে কেউ কোন কথা বলেননি।
বর্তমানে গণমাধ্যমে এই আজিজ-মাইনুল’দের কথা যতটা না জোর দিয়ে বলা হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার পরিচালনা পর্ষদকে ‘ধরার’ জন্য। অথচ পরিচালনা পর্ষদ অন্তত কাগজে-কলমে হলেও জালিয়াতি করে ব্যাংকের টাকা তুলে নেয়ার প্রবণতা ঠেকানোর চেষ্টা করেছে। পর্ষদের যেকোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব ব্যবস্থাপণা কর্তৃপক্ষের, কিন্তু পর্ষদের তিন তিনটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যবস্থাপণা কর্তৃপক্ষ কোন উদ্যোগই নেয়নি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


