রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে পলিথিনে মোড়ানো যুবকের কাটা হাত-পা উদ্ধারের ঘটনাটি কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং আমাদের সময়ের এক ভয়াবহ মানসিক সংকটের দলিল। রুমমেটের কটূক্তিতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা এবং তারপর ঠান্ডা মাথায় তার দেহ খণ্ডবিখণ্ড করে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া—এই নৃশংসতা প্রমাণ করে যে, মানুষের ভেতরের আদিম পশুত্ব আজ কোনো সামাজিক শৃঙ্খলাই মানছে না। শাহীন আলমের মতো তরুণদের এই ভয়াবহ রূপ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, আধুনিক নাগরিক জীবনের চাকচিক্যের আড়ালে এক নিঃশব্দ হাহাকার আর অস্থিরতা জমাট বাঁধছে।
বর্তমান সমাজে মানুষের সহ্যক্ষমতা এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। যে কথা বা অপমান একসময় মানুষ এড়িয়ে যেত কিংবা যুক্তিতে মেটাতো, আজ তা সরাসরি প্রাণের বিনিময়ে শোধ করার এক দানবীয় প্রবৃত্তি তৈরি হয়েছে। আমরা এখন এক 'তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার' যুগে বাস করছি। ডিজিটাল দুনিয়ার দ্রুতগতি আমাদের ধৈর্য কেড়ে নিয়েছে। প্রতিটি মানুষ আজ নিজের একটি কাল্পনিক জগতের সম্রাট; সেখানে সামান্য আঁচ লাগলে কিংবা কেউ তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করলে, সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চরম প্রতিশোধ নিতে উদ্যত হয়। ওবায়দুল্লাহর পরিবার নিয়ে করা কটূক্তি হয়তো শাহীনের কাছে অসহনীয় ছিল, কিন্তু সেই ক্ষোভ মেটানোর ধরনটি বলে দেয়—মানুষ হিসেবে অন্য মানুষের প্রতি আমাদের যে নূন্যতম মমতা বা 'এম্প্যাথি' থাকার কথা ছিল, তা আজ প্রায় বিলুপ্ত।
শহরের এই যান্ত্রিক জীবনে মানুষ ক্রমশ একা হয়ে পড়ছে। হাজারো মানুষের ভিড়ে মেস বা ফ্ল্যাটে পাশাপাশি থেকেও আমরা কেউ কারো মনের খবর রাখি না। দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আর একাকীত্ব মানুষকে মানসিকভাবে অসুস্থ করে তোলে। শাহীনের এই বিকৃত অপরাধের ধরনটি ইঙ্গিত দেয় যে, পপ-কালচার বা অপরাধমূলক বিনোদনের প্রভাবে মানুষের কাছে এখন 'লাশ গুম' করা কেবল একটি কারিগরি কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরাধ করার সময় বিবেক নয়, বরং ধরা না পড়ার চতুরতা বড় হয়ে উঠছে।
মানুষের এই বিচিত্র মানসিকতার পেছনে পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব এবং মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি চূড়ান্ত অবহেলা বড় ভূমিকা রাখছে। আমরা শরীর নিয়ে যতটা চিন্তিত, মন নিয়ে তার ছিটেফোঁটাও নই। ফলে তুচ্ছ কারণে রক্তপাত এখন ডালভাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বাস আর নিরাপত্তার যে দেয়ালগুলো আমাদের সমাজকে ধরে রেখেছিল, তা আজ লোভে আর ক্ষোভে ধসে পড়ছে। শাহীন ও ওবায়দুল্লাহর এই করুণ পরিণতি আমাদের এই বার্তাই দিয়ে যায় যে, যদি আমরা এখনই মানুষের ভেতরে সহনশীলতা আর নৈতিকতা ফিরিয়ে আনতে না পারি, তবে আধুনিকতার এই জঞ্জালে আমরা সবাই একেকজন সম্ভাব্য খুনি কিংবা শিকারে পরিণত হবো।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা মার্চ, ২০২৬ দুপুর ২:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






