somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দেশের ভেতরে আরেক দেশ: জঙ্গল সলিমপুরের অন্ধকার বাস্তবতা

১০ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ৮:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলাদেশের ভেতরেই এমন কিছু এলাকা আছে, যেগুলোকে অনেকেই আড়ালে–আবডালে “দেশের ভেতরে আরেক দেশ” বলে উল্লেখ করেন। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর তারই একটি উদাহরণ। দীর্ঘদিন ধরে দুর্গম পাহাড়ি এই অঞ্চলটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে ধীরে ধীরে সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল।

সম্প্রতি চার হাজারের বেশি সদস্য নিয়ে পুলিশ, সেনাবাহিনী, র‍্যাব ও বিজিবির যৌথ অভিযান যেন সেই অন্ধকার বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। ভোর থেকে শুরু হওয়া এই অভিযান ছিল অনেকটা সিনেমার মতো রুদ্ধশ্বাস—সব প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া, তল্লাশি চৌকি বসানো, আকাশপথে ড্রোন ও হেলিকপ্টারের নজরদারি, আর মাটিতে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডগ স্কোয়াডের অনুসন্ধান। উদ্দেশ্য একটাই—এলাকার সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।

কিন্তু প্রশ্নটা এখানেই—কীভাবে একটি এলাকা বছরের পর বছর ধরে এমনভাবে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেল?

জঙ্গল সলিমপুরের বাস্তবতা বুঝতে হলে এর পেছনের অদৃশ্য শক্তিগুলোর দিকে তাকাতে হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এখানে দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি শক্তিশালী সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় ছিল—ইয়াসিন গ্রুপ, রোকন গ্রুপ ও রিদোয়ান গ্রুপ। পাহাড়ি দুর্গম এলাকা হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রবেশ সবসময় সহজ ছিল না। সেই সুযোগে অপরাধীরা ধীরে ধীরে নিজেদের শক্ত ঘাঁটি তৈরি করে।

কিন্তু শুধু ভৌগোলিক দুর্গমতাই এই অবস্থার জন্য দায়ী নয়। এর ভেতরে জড়িয়ে আছে স্থানীয় রাজনীতি, অবৈধ জমি দখল, মাদক ব্যবসা এবং দুর্নীতির জটিল চক্র। ২০০৩ সাল থেকেই একটি প্রভাবশালী চক্র সরকারি নিয়মকানুন উপেক্ষা করে সেখানে অবৈধভাবে জমি দখল ও কাগজপত্র তৈরি করে বসতি গড়ে তোলে। আজ সেই এলাকাতেই প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার বাড়ি এবং অন্তত এক থেকে দেড় লাখ মানুষের বসবাস।

সময়ের সাথে সাথে এই বসতিগুলোর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হাতে। তারা শুধু এলাকায় আধিপত্যই কায়েম করেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের মতো করে শাসনব্যবস্থাও তৈরি করেছিল। কারা কোথায় বসবাস করবে, কে জমি কিনতে পারবে, কোন ব্যবসা চলবে—এসব সিদ্ধান্ত অনেক সময় তাদের হাতেই ছিল।

এই অস্বাভাবিক বাস্তবতার সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি সামনে আসে গত জানুয়ারিতে, যখন অভিযানে গিয়ে র‍্যাবের এক কর্মকর্তা সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হন। ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, রাষ্ট্রের আইনকে চ্যালেঞ্জ করার মতো সাহস ও সংগঠিত শক্তি সন্ত্রাসীরা তৈরি করে ফেলেছিল।

অবশেষে সাম্প্রতিক এই বড় অভিযানের মাধ্যমে জঙ্গল সলিমপুরে রাষ্ট্রের উপস্থিতি জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে শুধু অভিযান চালিয়েই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সুশাসন এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা।

কারণ ইতিহাস বলে—যখন রাষ্ট্রের নজরদারি দুর্বল হয়, তখনই অপরাধীরা সেই শূন্যস্থান পূরণ করে নিজেদের “ছোট রাষ্ট্র” গড়ে তোলে। জঙ্গল সলিমপুরের গল্প তাই শুধু একটি এলাকার নয়; এটি আমাদের প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সমাজের অন্ধকার দিকগুলোরও একটি প্রতিচ্ছবি।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ৮:২৫
৭টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একটা অপরাধ দশটা অপরাধের সুযোগ করে দিতে পারে ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


রাড্ডা হাসপাতালে লুটপাট
ঢাকার মিরপুর এক নম্বরে রাড্ডা ক্লিনিকের ওপর দিয়ে যেন টর্নেডো বয়ে গেছে! গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতের অন্ধকারে ১৫০-২০০ জন দুর্বৃত্ত রাড্ডা ক্লিনিকের ভেতরে প্রবেশ করে রীতিমতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিজন দাদা, হারালে কোথায় ?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


নিত্য নতুন পোস্টের ভিড়ে
সেই চেনা মুখটি আজ আর দেখি না
কোথায় হারালে বিজন দাদা
ব্লগের উঠোনে তোমার সেই ছায়াটি আর মেলে না।

কোনো লেখা যখন সদ্য প্রসবের ব্যথায়
শব্দেরা যখন খুঁজত একটু... ...বাকিটুকু পড়ুন

সক্রেটিস ঈশ্বরের বাণী প্রচার করতেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১৫



সক্রেটিস মানুষের সাথে কথা বলতে ভালোবাসতেন। তিনি যখনই সময়ে পেতেন, মানুষের সমাগম যেখানেই হতো, সেখানেই তিনি বক্তব্য দিতেন। সেই বক্তব্যগুলো ছিলো, সক্রেটিসের ভাষায়, 'দৈব বাণী' বাঁ 'ঈশ্বরের বাণী'। এজন্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

লাল বদর, কালা বদর এবং ছাপরি.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১১

লাল বদর, কালা বদর এবং ছাপরি.....

লাল বদরঃ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া একটি নতুন ও রাজনৈতিক কটূক্তিবাচক শব্দ বা স্লোগান। কোটা সংস্কার আন্দোলন ও সরকার পতনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সর্ব্বহারা

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫০



দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়।
১৯৪৩ সালে জাপান ভারতে আচমকা বেশ কিছু বোমা হামলা করে। সম্ভবত হিটলারকে খুশি করতেই জাপান এই কাজ করে। একের পর এক বোমা ফেলে মাদ্রাজে (বতর্মান... ...বাকিটুকু পড়ুন

×