বাংলাদেশের ভেতরেই এমন কিছু এলাকা আছে, যেগুলোকে অনেকেই আড়ালে–আবডালে “দেশের ভেতরে আরেক দেশ” বলে উল্লেখ করেন। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর তারই একটি উদাহরণ। দীর্ঘদিন ধরে দুর্গম পাহাড়ি এই অঞ্চলটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে ধীরে ধীরে সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল।
সম্প্রতি চার হাজারের বেশি সদস্য নিয়ে পুলিশ, সেনাবাহিনী, র্যাব ও বিজিবির যৌথ অভিযান যেন সেই অন্ধকার বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। ভোর থেকে শুরু হওয়া এই অভিযান ছিল অনেকটা সিনেমার মতো রুদ্ধশ্বাস—সব প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া, তল্লাশি চৌকি বসানো, আকাশপথে ড্রোন ও হেলিকপ্টারের নজরদারি, আর মাটিতে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডগ স্কোয়াডের অনুসন্ধান। উদ্দেশ্য একটাই—এলাকার সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
কিন্তু প্রশ্নটা এখানেই—কীভাবে একটি এলাকা বছরের পর বছর ধরে এমনভাবে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেল?
জঙ্গল সলিমপুরের বাস্তবতা বুঝতে হলে এর পেছনের অদৃশ্য শক্তিগুলোর দিকে তাকাতে হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এখানে দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি শক্তিশালী সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় ছিল—ইয়াসিন গ্রুপ, রোকন গ্রুপ ও রিদোয়ান গ্রুপ। পাহাড়ি দুর্গম এলাকা হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রবেশ সবসময় সহজ ছিল না। সেই সুযোগে অপরাধীরা ধীরে ধীরে নিজেদের শক্ত ঘাঁটি তৈরি করে।
কিন্তু শুধু ভৌগোলিক দুর্গমতাই এই অবস্থার জন্য দায়ী নয়। এর ভেতরে জড়িয়ে আছে স্থানীয় রাজনীতি, অবৈধ জমি দখল, মাদক ব্যবসা এবং দুর্নীতির জটিল চক্র। ২০০৩ সাল থেকেই একটি প্রভাবশালী চক্র সরকারি নিয়মকানুন উপেক্ষা করে সেখানে অবৈধভাবে জমি দখল ও কাগজপত্র তৈরি করে বসতি গড়ে তোলে। আজ সেই এলাকাতেই প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার বাড়ি এবং অন্তত এক থেকে দেড় লাখ মানুষের বসবাস।
সময়ের সাথে সাথে এই বসতিগুলোর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হাতে। তারা শুধু এলাকায় আধিপত্যই কায়েম করেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের মতো করে শাসনব্যবস্থাও তৈরি করেছিল। কারা কোথায় বসবাস করবে, কে জমি কিনতে পারবে, কোন ব্যবসা চলবে—এসব সিদ্ধান্ত অনেক সময় তাদের হাতেই ছিল।
এই অস্বাভাবিক বাস্তবতার সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি সামনে আসে গত জানুয়ারিতে, যখন অভিযানে গিয়ে র্যাবের এক কর্মকর্তা সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হন। ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, রাষ্ট্রের আইনকে চ্যালেঞ্জ করার মতো সাহস ও সংগঠিত শক্তি সন্ত্রাসীরা তৈরি করে ফেলেছিল।
অবশেষে সাম্প্রতিক এই বড় অভিযানের মাধ্যমে জঙ্গল সলিমপুরে রাষ্ট্রের উপস্থিতি জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে শুধু অভিযান চালিয়েই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সুশাসন এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা।
কারণ ইতিহাস বলে—যখন রাষ্ট্রের নজরদারি দুর্বল হয়, তখনই অপরাধীরা সেই শূন্যস্থান পূরণ করে নিজেদের “ছোট রাষ্ট্র” গড়ে তোলে। জঙ্গল সলিমপুরের গল্প তাই শুধু একটি এলাকার নয়; এটি আমাদের প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সমাজের অন্ধকার দিকগুলোরও একটি প্রতিচ্ছবি।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ৮:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


