somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

৭১ পরবর্তি বাংলাদেশ ( পর্ব ০৮)

০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


মুক্তিযুদ্ধে ‘ত্রিশ লাখ শহিদ হয়েছে'— এই দাবি বিশ্ববাসী প্রথম জানতে পারে ৩ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা ‘প্রাভদা'তে প্রকাশিত এক সংবাদ নিবন্ধে। দু'দিন পর চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদি'তে ‘প্রাদা’র এই সংবাদ নিবন্ধটি বাংলায় ছাপা হয় । রুশ ভাষায় ‘প্রাত্দা'র নিবন্ধটির শিরোনাম ছিল- ‘তারা এটা লুকাতে পারেনি'। সেই নিবন্ধে এক লাইনে লেখা ছিল— ‘সংবাদপত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে ত্রিশ লাখের বেশি মানুষ নিহত, আহত, পঙ্গু ও গ্রেপ্তার হয়েছিল।’ 'প্রাভদা'র নিবন্ধেও কিন্তু নিহতের সংখ্যা ‘ত্রিশ লাখ বলা হয়নি। ত্রিশ লাখ নিহত হওয়ার দাবিটি কোনো শক্ত তথ্যের ভিত্তির ওপরে দাঁড়িয়ে ছিল না। 'ত্রিশ লাখের দাবিকে শেখ মুজিব নিজে সমর্থন করায় এবং এর পক্ষে জোরালোভাবে অবস্থান নেয়ায় ১৯৭১-এর গণহত্যা নিয়ে কোনো তথ্যানুসন্ধান অসম্ভব হয়ে ওঠে। দাবিকৃত সংখ্যার কোনো বিশ্বাসযোগ্য উপাত্ত না থাকায় ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের গণহত্যা দুঃখজনকভাবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি পায়নি।


১০ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত 'স্বাধীন বাংলা বেতার' থেকে প্রচারিত তথ্যে মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা তিন লাখ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। ২
আন্তর্জাতিক মহলেও মুক্তিযুদ্ধে নিহতদের সংখ্যার দাবি নিয়ে নানা প্রশ্ন শুরু হয়। প্রখ্যাত আমেরিকান সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক উইলিয়াম জে ডুমন্ত্ 'লস্ এঞ্জেলস্ টাইম্‌স্'-এ লেখেন- 'বাংলাদেশে আমার অসংখ্য সফরের অভিজ্ঞতায় এবং গ্রামের জনগণের সাথে আলাপের ভিত্তিতে আমি বলতে পারি, ত্রিশ লাখ হত্যার দাবি এত বিপুলভাবে বাড়িয়ে বলা যে, তা অসম্ভব হতে বাধ্য।' উইলিয়াম ড্রমন্ডের এই রিপোর্ট ১৯৭২-এর ৬ জুন ‘গার্ডিয়ান'-এও প্রকাশিত হয়।
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দুই সপ্তাহের মাথায় শেখ মুজিব মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য ১২ সদস্যের একটি তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করেন। পুলিশের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল আবদুর রহিম কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ২৯ জানুয়ারি এই কমিটি গঠন সংক্রান্ত গেজেট নোটিফিকেশন হয়। ৩০ এপ্রিল এই কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেবার সময় বেঁধে দেয়া হয়।
হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ জমা দেয়ার আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেলের অফিসে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে মোট ২০০০ মৃত্যুর অভিযোগ জমা হয়।এই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট কখনো আলোর মুখ দেখেনি। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, এই তদন্ত কমিটি ৫৬,৭৪৩ জনের মৃত্যুর হিসাব করেছিল এবং এই হিসাব পূর্বে ঘোষিত 'ত্রিশ লাখ-এর চাইতে অস্বাভাবিক কম হওয়ায় এই রিপোর্টে উল্লিখিত সংখ্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেননি। তখন থেকেই মক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অমীমাংসিত বিষয় হিসেবেই থেকে যায়।


২৮ এপ্রিল ১৯৭৩-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে লেখা একখানি চিঠি দিয়ে বিশেষ দূত হিসেবে এম আর সিদ্দিকীকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব। সেই চিঠিতে অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে তিনি গণহত্যায় 'আমার দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছে' মর্মে উল্লেখ করেন। কিন্তু 'ত্রিশ লাখ হত্যার দাবি করেননি
মিলিশিয়া গঠন নিয়ে পিলখানা, ইপিআর-এ ব্যাপক গোলাগুলি
৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় সারা দেশ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের পিলখানায় আসা। উদ্দেশ্য ছিল, ইপিআর এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে জাতীয় মিলিশিয়া গঠন করা; যেই মিলিশিয়া বাহিনীর প্রধান কার্যালয় হবে পিলখানাতেই। মিলিশিয়ার পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান সেক্টর কমান্ডার কর্নেল এএনএম নূরুজ্জামান । ইপিআরের বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে অংশ নিলেও কিছু জেসিও ও এনসিও পাকিস্তানি বাহিনীর অধীনে কাজ করে। ইপিআরের মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর অনুগত অ-মুক্তিযোদ্ধা ইপিআর সদস্যদের নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলতে থাকে। এই প্রশ্নগুলো ফয়সালার জন্য একটা স্ক্রিনিং কমিটি গঠন করা
হয়।
এদিকে ওই জেসিও এবং এনসিওদের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে। ১৬ ফেব্রুয়ারি সকালে নূরুজ্জামান পিলখানায় গেলে ইপিআর সদস্যদের একটা অংশ তার উপর চড়াও হয়। এক পর্যায়ে তারা নুরুজ্জামানকে কিল-ঘুষি মারতে থাকে। ব্যারাকে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা এই খবর পেয়ে নুরুজ্জামানকে উদ্ধারের জন্য অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসে। ইপিআরের হামলাকারী সদস্যরা এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা গুলিবর্ষণ করে। প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে ব্যাপক গুলিবিনিময় চলে। মুক্তিযোদ্ধারা নূরজ্জামানকে হামলাকারীদের কবল থেকে উদ্ধার করে।
নূরুজ্জামানের আক্রান্ত হবার খবর দ্রুত ওসমানীর কাছে পৌছে যায়। এমনকি শেখ মুজিবের কাছেও এই সংবাদ পৌঁছতে সময় লাগেনি। না লাগারই কথা! পিলখানায় আধা ঘণ্টা ধরে গোলাগুলি হলে সারা শহরে খবর রটে যাওয়াটা স্বাভাবিক। ওসমানী সংঘাত ঠেকানোর জন্য সেখানে গেলেও পিলখানায় ঢুকতে 
পারেননি বা ঢোকার সাহস পাননি। কালবিলম্ব না করে শেখ মুজিব নিজেই চলে আসেন পিলখানায়। গোলাগুলি বন্ধ হয়ে যায়। পিলখানার এই ঘটনার পর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, সীমান্ত রক্ষার জন্য 'বিডিআর' এবং অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে আলাদা বাহিনী তৈরি করা হবে।
এই আলাদা বাহিনীই পরে 'রক্ষীবাহিনী' হিসেবে সংগঠিত হয় এবং হত্যা- অত্যাচার-নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়ঙ্কর ইতিহাস তৈরি করে। আর সেই ইতিহাস দুর্ভাগ্যজনকভাবে চাপা পড়ে যায় ।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৬
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Epstein File-মানবতার কলঙ্ক

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:০৮

গত ৩০ জানুয়ারি Epstein Files এর ৩ মিলিয়নেরও বেশি পৃষ্ঠার নথি, ২,০০০ অধিক ভিডিও এবং ১৮০,০০০টি ছবি প্রকাশিত হয়েছে। আমেরিকা ও ইসরায়েলের সব কুকর্ম ফাঁস করা হয়েছে!
যারা মানবতা, সভ্যতা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

রোজার ২৪ আধুনিক মাসআলা, যেগুলো জেনে রাখা প্রয়োজন সকলেরই - রিপোস্ট

লিখেছেন নতুন নকিব, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৪০

রোজার ২৪ আধুনিক মাসআলা, যেগুলো জেনে রাখা প্রয়োজন সকলেরই - রিপোস্ট

ছবিঃ অন্তর্জাল।

পবিত্র মাহে রমজান খুবই নিকটবর্তী। আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজাবা ওয়া শা'বান, ওয়া বাল্লিগনা রমাদান। হে আল্লাহ,... ...বাকিটুকু পড়ুন

জামায়াতের আমিরের একাউন্ট হ্যাক আওয়ামী লীগের হ্যাকাররা করে থাকতে পারেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:৫৮



নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লিখছি। গত বছর, লন্ডন থেকে আমার এক আত্মীয় হঠাত একদিন আমাকে জানান যে, 'গ্রামের রাজনীতি' নামক এক ফেসবুক পেইজে আমার উপরের ছবি দেওয়া হয়েছে। আমি হতবাক!... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একটি জোনাক প্রহর দেবে আমায়=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৩৮


গাঁয়ের বাড়ি মধ্যরাতে
জোনাক নাকি বেড়ায় উড়ে,
ঝিঁঝি নাকি নাকি সুরে
ডাকে দূরে বহুদূরে?

মধ্যরাতের নীল আকাশে
জ্বলে নাকি চাঁদের আলো!
রাতে নাকি নিরিবিলি
বসে থাকলে লাগে ভালো?

শিয়াল ডাকে হুক্কা হুয়া;
কুকুর ডাকে একা ঘেউ ঘেউ;
মধ্যরাতে গাঁয়ে নাকি
ঘুমায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাকিস্তানের বির্যে জন্ম নেয়া জারজরা ধর্মের ভিত্তিতে, বিভাজিত করতে চায় বাংলাদেশের নাগরিকদের ‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:২৯



বাংলাদেশী ধর্মান্ধ মুসলমান,
বাঙালি পরিচয় তোমার কাছে অপ্রয়োজনীয় বাহুল্য।
তুমি কি দেশে দেশে Ehtnic Cleansing এর ইতিহাস জানো? জাতিগত নিধন কী বোঝো?
বাঙালি জাতি নিধনের রক্ত-দাগ প্রজন্ম থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×