মুক্তিযুদ্ধে ‘ত্রিশ লাখ শহিদ হয়েছে'— এই দাবি বিশ্ববাসী প্রথম জানতে পারে ৩ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা ‘প্রাভদা'তে প্রকাশিত এক সংবাদ নিবন্ধে। দু'দিন পর চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদি'তে ‘প্রাদা’র এই সংবাদ নিবন্ধটি বাংলায় ছাপা হয় । রুশ ভাষায় ‘প্রাত্দা'র নিবন্ধটির শিরোনাম ছিল- ‘তারা এটা লুকাতে পারেনি'। সেই নিবন্ধে এক লাইনে লেখা ছিল— ‘সংবাদপত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে ত্রিশ লাখের বেশি মানুষ নিহত, আহত, পঙ্গু ও গ্রেপ্তার হয়েছিল।’ 'প্রাভদা'র নিবন্ধেও কিন্তু নিহতের সংখ্যা ‘ত্রিশ লাখ বলা হয়নি। ত্রিশ লাখ নিহত হওয়ার দাবিটি কোনো শক্ত তথ্যের ভিত্তির ওপরে দাঁড়িয়ে ছিল না। 'ত্রিশ লাখের দাবিকে শেখ মুজিব নিজে সমর্থন করায় এবং এর পক্ষে জোরালোভাবে অবস্থান নেয়ায় ১৯৭১-এর গণহত্যা নিয়ে কোনো তথ্যানুসন্ধান অসম্ভব হয়ে ওঠে। দাবিকৃত সংখ্যার কোনো বিশ্বাসযোগ্য উপাত্ত না থাকায় ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের গণহত্যা দুঃখজনকভাবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি পায়নি।

১০ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত 'স্বাধীন বাংলা বেতার' থেকে প্রচারিত তথ্যে মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা তিন লাখ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। ২
আন্তর্জাতিক মহলেও মুক্তিযুদ্ধে নিহতদের সংখ্যার দাবি নিয়ে নানা প্রশ্ন শুরু হয়। প্রখ্যাত আমেরিকান সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক উইলিয়াম জে ডুমন্ত্ 'লস্ এঞ্জেলস্ টাইম্স্'-এ লেখেন- 'বাংলাদেশে আমার অসংখ্য সফরের অভিজ্ঞতায় এবং গ্রামের জনগণের সাথে আলাপের ভিত্তিতে আমি বলতে পারি, ত্রিশ লাখ হত্যার দাবি এত বিপুলভাবে বাড়িয়ে বলা যে, তা অসম্ভব হতে বাধ্য।' উইলিয়াম ড্রমন্ডের এই রিপোর্ট ১৯৭২-এর ৬ জুন ‘গার্ডিয়ান'-এও প্রকাশিত হয়।
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দুই সপ্তাহের মাথায় শেখ মুজিব মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য ১২ সদস্যের একটি তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করেন। পুলিশের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল আবদুর রহিম কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ২৯ জানুয়ারি এই কমিটি গঠন সংক্রান্ত গেজেট নোটিফিকেশন হয়। ৩০ এপ্রিল এই কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেবার সময় বেঁধে দেয়া হয়।
হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ জমা দেয়ার আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেলের অফিসে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে মোট ২০০০ মৃত্যুর অভিযোগ জমা হয়।এই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট কখনো আলোর মুখ দেখেনি। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, এই তদন্ত কমিটি ৫৬,৭৪৩ জনের মৃত্যুর হিসাব করেছিল এবং এই হিসাব পূর্বে ঘোষিত 'ত্রিশ লাখ-এর চাইতে অস্বাভাবিক কম হওয়ায় এই রিপোর্টে উল্লিখিত সংখ্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেননি। তখন থেকেই মক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অমীমাংসিত বিষয় হিসেবেই থেকে যায়।

২৮ এপ্রিল ১৯৭৩-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে লেখা একখানি চিঠি দিয়ে বিশেষ দূত হিসেবে এম আর সিদ্দিকীকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব। সেই চিঠিতে অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে তিনি গণহত্যায় 'আমার দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছে' মর্মে উল্লেখ করেন। কিন্তু 'ত্রিশ লাখ হত্যার দাবি করেননি
মিলিশিয়া গঠন নিয়ে পিলখানা, ইপিআর-এ ব্যাপক গোলাগুলি
৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় সারা দেশ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের পিলখানায় আসা। উদ্দেশ্য ছিল, ইপিআর এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে জাতীয় মিলিশিয়া গঠন করা; যেই মিলিশিয়া বাহিনীর প্রধান কার্যালয় হবে পিলখানাতেই। মিলিশিয়ার পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান সেক্টর কমান্ডার কর্নেল এএনএম নূরুজ্জামান । ইপিআরের বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে অংশ নিলেও কিছু জেসিও ও এনসিও পাকিস্তানি বাহিনীর অধীনে কাজ করে। ইপিআরের মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর অনুগত অ-মুক্তিযোদ্ধা ইপিআর সদস্যদের নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলতে থাকে। এই প্রশ্নগুলো ফয়সালার জন্য একটা স্ক্রিনিং কমিটি গঠন করা
হয়।
এদিকে ওই জেসিও এবং এনসিওদের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে। ১৬ ফেব্রুয়ারি সকালে নূরুজ্জামান পিলখানায় গেলে ইপিআর সদস্যদের একটা অংশ তার উপর চড়াও হয়। এক পর্যায়ে তারা নুরুজ্জামানকে কিল-ঘুষি মারতে থাকে। ব্যারাকে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা এই খবর পেয়ে নুরুজ্জামানকে উদ্ধারের জন্য অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসে। ইপিআরের হামলাকারী সদস্যরা এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা গুলিবর্ষণ করে। প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে ব্যাপক গুলিবিনিময় চলে। মুক্তিযোদ্ধারা নূরজ্জামানকে হামলাকারীদের কবল থেকে উদ্ধার করে।
নূরুজ্জামানের আক্রান্ত হবার খবর দ্রুত ওসমানীর কাছে পৌছে যায়। এমনকি শেখ মুজিবের কাছেও এই সংবাদ পৌঁছতে সময় লাগেনি। না লাগারই কথা! পিলখানায় আধা ঘণ্টা ধরে গোলাগুলি হলে সারা শহরে খবর রটে যাওয়াটা স্বাভাবিক। ওসমানী সংঘাত ঠেকানোর জন্য সেখানে গেলেও পিলখানায় ঢুকতে
পারেননি বা ঢোকার সাহস পাননি। কালবিলম্ব না করে শেখ মুজিব নিজেই চলে আসেন পিলখানায়। গোলাগুলি বন্ধ হয়ে যায়। পিলখানার এই ঘটনার পর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, সীমান্ত রক্ষার জন্য 'বিডিআর' এবং অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে আলাদা বাহিনী তৈরি করা হবে।
এই আলাদা বাহিনীই পরে 'রক্ষীবাহিনী' হিসেবে সংগঠিত হয় এবং হত্যা- অত্যাচার-নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়ঙ্কর ইতিহাস তৈরি করে। আর সেই ইতিহাস দুর্ভাগ্যজনকভাবে চাপা পড়ে যায় ।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




