somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মানুষ খেকো র‌্যাব: লিমন সন্ত্রাসী হলে কি তার পা খাওয়া জায়েজ হয়ে যেত?

০৯ ই এপ্রিল, ২০১১ দুপুর ২:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

র‌্যাবের গুলিতে পা খোয়ানো নিরীহ লিমনের জন্য গ্রামবাসী কাদছে, আমরা কাদছি, সারা দেশবাসী কাদছে। কাদতে কাদতে আমাদের পাষাণ ফ্যাসিস্ট হৃদয় একটু নরম হয়েছে ধরে নিয়ে সাহস করে একটা প্রশ্ন তুলছি... আচ্ছা লিমন যদি সন্ত্রাসী হতো, যদি র‌্যাবের দাবী মতো কুখ্যাত সন্ত্রাসী মোরশেদের সহযোগীই হতো কিংবা যদি সে খোদ মোরশেদই হতো তাহলে কি র‌্যাবের কাজ জায়েজ হয়ে যেত? এই প্রশ্নটা মোকাবিলা করা জরুরী কারণ মানুষ খেকো র‌্যাব কর্তৃক লিমনের পা খাওয়ার সাথে এর সম্পর্ক আছে। বলা যায় রাষ্ট্র র‌্যাবকে মানুষ খেকো হিসেবে পয়দা করার সাথে এর সম্পর্ক আছে। মানুষ খেকো একবার রক্তের স্বাদ পেলে সে মানুষ খেতেই থাকে। র‌্যাব শুরু থেকেই তো মানুষ খাচ্ছে, পূর্ব বাংলা সর্বহরা পার্টি কিংবা অন্যান্য জনযুদ্ধের লাইনের নেতা-কর্মীদের খেয়েছে, আমরা কিছু বলিনি। আজকে যে আলু পত্রিকা লিমনের হয়ে দাড়িয়েছে সেও কিন্ত তখন র‌্যাবের সহোযোগী হিসেবে কাজ করেছে.. একটার পর একটা চরমপন্থী সনাক্তকরণ অনুসন্ধানী রিপোর্ট ছেপেছে আর র‌্যাব তাদেরকে সাবাড় করেছে... আমরা স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলেছি- যাক সন্ত্রাসীদের হাত থেকে বাচা গেছে! র‌্যাব গডফাদারদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ছিচকে সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন লেবেল লাগিয়ে, কালা-ধলা-মুরগী ইত্যাদি নানান শব্দ জুড়ে দিয়ে খতমের রাজনীতি করেছে, আমরা খুশি হয়েছি কারণ আমাদের কাছে “সন্ত্রাসীর আবার মানবাধিকার কি?”

আমরা কি কখনও প্রশ্ন তুলেছি- আচ্ছা র‌্যাব যে এদেরকে সন্ত্রাসী বলে ক্রসফায়ার করে দিচ্ছে, এরা কি আসলেই সন্ত্রাসী? নাকি কারো শ্রেনী ঘৃণা কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্রের শিকার? আমাদের ধরেই নিয়েছি র‌্যাব মানে ফেরেস্তা বাহিনী, ফেরেস্তারা কখনো ভুল করতে পারে না, ব্যাক্তিগত-রাজনৈতিক-শ্রেণীগত অসুয়া বাস্তবায়নের হাতিয়ার হতে পারে না। আমরা কি কখনো প্রশ্ন তুলেছি, আচ্ছা এভাবে কি সন্ত্রাস নির্মূল করা যায়? বিষবৃক্ষের গোড়া অক্ষুণ্ন রেখে বার বার ডালপালা ছাটলে যে বিষবৃক্ষ মরে না, বরং নতুন নতুন শাখা প্রশাখা গজায় সে কথা কি আমরা জানতাম না?

কিন্ত আমরা কেন এমনটা ধরে নিলাম? কেন আমাদের মনে একটুও দ্বিধা কাজ করলো না? কেন একটু সন্দেহও আমরা পোষণ করলাম না? তবে কি আমরা ‘যে কোন মূল্যে’ স্বস্তি পেতে চেয়েছি? আমরা কি ধরে নিয়েছিলাম “যে কোন মূল্য”টা সব সময়ই অন্য কেউ দেবে.. আমাদেরকে কখনই দিতে হবে না?

এই ব্লগেই আমি অনেককে দেখেছি র‌্যাবের অপরিহার্যতা নিয়ে কথা বলতে, আমি নিশ্চিত এখনও অনেককে পাওয়া যাবে, যারা মনে করে “সন্ত্রাসীদের”কে ধরে ধরে মেরে ফেলাই সন্ত্রাস নির্মুলের শ্রেষ্ঠ ও কার্যকর উপায়, সেই সাথে তারা এও বলবে, যে র‌্যাব হাজার হাজার “সন্ত্রসী” নির্মুল করেছে তাদের একটু আধটু ভূল তো হতেই পারে সেটা নিয়ে এতো হইচই করার কি আছে! তারা কখনও প্রশ্ন তুলবে না মানুষ খোকো র‌্যাব কেন বরাবার গরীবের ভাঙা ঘরেই হানা দেয়, কেন কোন গড ফাদার রথী মহারথিকে ক্রশফায়ার করা হয় না? এই যে শেয়ার বাজারের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হলো, সালমান এফ রহমান সহ ৬০ জনের কারসাজির কথা জানা যাচ্ছে, কই এদেরকে তো কখনও ক্রশফায়ার করা হবে না! হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট কারীদের এমনকি বিচারের আগে নাম না প্রকাশ করার কথা বলা হচ্ছে অথচ লাখ টাকার চাদাবাজদের ধরে নিয়ে ক্রশফায়ার করে দিয়ে সমাজ থেকে সন্ত্রাস নির্মুলের অভিনয় হচ্ছে! কি মজার ব্যাপার! আগুনে পুড়িয়ে শ্রমিক মারলে তো গার্মেন্টস মালিককে ক্রশফায়ারে দেয়া হয়না, দশট্রাক অস্ত্রমামলার ব্রিগেডিয়ার-কর্ণেল আসামীদেরও তো ক্রশফায়ার হতে দেখলাম না, দেশের তেলগ্যাস সম্পদ বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার নায়ক তৌফিক ইলাহি কিংবা মাহমুদুর রহমানদের তো ক্রশফায়ার হয় না!যদি সত্যিকার অর্থে সমাজকে থেকে সন্ত্রাস-দুর্নিতী-লুটপাট নির্মুল করার উদ্দেশ্যেই র‌্যাব দিয়ে ক্রশফায়ার করানো হতো তাহলে তো শুরুতে বড় বড় গড ফাদারদেরকে ক্রশফায়ার করাটাই স্বাভাবিক ছিল না? তা না করে, দেশের মধ্যে অস্ত্র কিংবা মাদক আমদানির মূল হোতাদের কে না ধরে, সীমান্তেই মাদক-অস্ত্র আসা বন্ধ না করে, ছোট খাট অস্ত্রবাজ/মাদক ব্যাবসায়ীদের ক্রশফায়ার করা হলো... এতে লাভ বহুবিধ:

এক. অবাধ্য ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ছিচকে সন্ত্রাসীদেরকে ঠান্ডা করা করা

দুই. গ্রেফতার করে বিচার করলে নাটের গুরুদের নাম-পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়ার যে ঝুকি থাকে, নাটের গুরুদেরকে সেই ঝুকি থেকে মুক্ত করা

তিন. শাসক শ্রেণীর সন্ত্রাস দমণের বাহবা নেয়া

এখন শ্রেণী শত্রু খতমের লাইনের সর্বহারা পার্টির নেতাকর্মীদের নির্মুল করার জন্য যে ক্রশফায়ার চালু করা হলো সে ক্রশফায়ার কি নিজেই “শ্রেণী শত্রু” খতমের লাইন না - যার মাধ্যমে এলিট মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত সমাজে শান্তির সাথে বসবাস ও লুটপাট চালাতে পারে?

কোন সমাজে-রাষ্ট্রে সন্ত্রাস দুর্নীতি আকাশ থেকে পড়ে না, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যাবস্থার সাথে এর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। মানুষ মায়ের পেট থেকে সন্ত্রাসী হয়ে পয়দা হয় না, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যাবস্থাই তাকে সন্ত্রাসীতে পরিণত হতে বাধ্য করে। যে ব্যাবস্থা নাগরিকের খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-কর্মসংস্থান-শিক্ষা-চিকিতসা ইত্যাদির কোন দায়দায়িত্ব নেয় না, যে ব্যাবস্থায় গুটি কয়েক মানুষ বেশির ভাগ মানুষের শ্রম শোষণ করে আরামে আয়েশে থাকে, যে ব্যাবস্থায় আইন-কানুন-পুলিশ-প্রশাসন গুটি কয়েকের স্বার্থ রক্ষা করে, যে ব্যাবস্থায় পুজি যার মুল্লুক তার, সে ব্যাবস্থা সন্ত্রাস দুর্নীতির জন্ম দেবেই। এই ব্যাবস্থা বা সিস্টেমের প্রোডাক্ট/বাই প্রোডাক্ট “সন্ত্রাস-দুর্নীতি” এমনিতে ব্যাবস্থার নাটের গুরুদের জন্য কোন সমস্যা না যতদিন না সেটা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সেটার জন্য তো একটা রেডিমেড ব্যাবস্থা থাকা লাগে: র‌্যাবের ক্রশফায়ার হলো সেই রকমই একটা ব্যাবস্থা। সন্ত্রাস-দুর্নিতীতে জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে গোটা সিস্টেমটাকে যেন টালমাটাল করে না দেয় তার জন্য সিস্টেমরই একটা রক্ষা কবচ এই ক্রশফায়ার সিস্টেম। আমরা যতদিন এই সত্যটা বুঝে সত্যিকার অর্থে র‌্যাব ও তার ক্রশফায়ারের বিরুদ্ধে রুখে না দাড়াবো, ততদিনই “যে কোন মূল্যে” তথাকথিত সন্ত্রাসী দমন চলবে। এর আগে এর আগে এই “যেকোন মূল্য” সর্বহারা মোফাক্খারুল-টুটুলরা দিয়েছে, এখন দিচ্ছে নিরীহ দিনমজুর লিমনরা, কিন্তু একদিন ব্লগার-লেখক-ভিন্নমতাবলম্বীরা, সুশীল সমাজের ধারকরা, নিরাপদে থাকা কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী সহ গোটা দেশের মানুষকে এর চরম মূল্য দিতে হবে, ফ্যাসিবাদী ইতিলী জার্মানি কিংবা ৬০-৭০ দশকের ল্যাটিন আমেরিকায় ঘটা “ক্রশফায়ার”এর ইতিহাস কিন্তু সেই সতর্ক ঘন্টাই বাজিয়ে যাচ্ছে।
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনব প্রতারনা - ডিজিটাল প্রতারক

লিখেছেন শোভন শামস, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:১৮



একটি সাম্প্রতিক সত্য ঘটনা।
মোবাইল ফোনে কল আসল, একটা গোয়েন্দা সংস্থার ছবি এবং পদবী সহ। এই নাম্বার সেভ করা না, আননোন নাম্বার। ফোন ধরলাম। বলল আপনার এই নাম্বার ব্যবহার করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আগে নিজেকে বদলে দিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪১



"আমার স্বামী সংসারের কুটোটাও নাড়ান না। যেখানকার জিনিস সেখানে রাখেন না। মুজা খুলে ছুঁড়ে যেখানে সেখানে ফেলে দেন। নিজেকে পরিষ্কার রাখতে বারবার ভুল করেন! এতো বছর বিবাহিত জীবন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×