হয়তোবা তিনি আত্মীয়বাড়ির উদ্দেশে পা বাড়িয়েছিলেন পথে, নয়তোবা তিনি অন্য অসংখ্য দুস্থদের মতোই জাকাত পাবার আশায় ঘুরছেন বিত্তবানদের দ্বারে দ্বারে। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল সড়কে মসজিদের পাশে তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। তাকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলেন। জ্ঞান আর ফিরলো না। হাসপাতালের বারান্দায় পড়ে থেকে তিনি তিন দিনের মাথায় মারা গেলেন। অজ্ঞাত পরিচয়ের লাশ হিসেবেই দাফন হলো। গতকাল দৈনিক মাথাভাঙ্গা পত্রিকায় এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন বেশ গুরুত্বসহকারেই প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনের একটি স্থানে অবশ্য কিছু প্রশ্ন তুলে ধরা হয়েছে, বলা হয়েছে- আনুমানিক ৬০ বছর বয়সী বৃদ্ধ অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে পড়ে প্রাণ হারালেন না তো? এ প্রশ্নটি সঙ্গত হলেও পোশাক ও শরীরে দারিদ্র্যের ছাপ অবলোকনে অনেকেরই অভিমত, তিনি দারিদ্র্যেরই কষাঘাতের নির্মম শিকার।
সম্প্রতি দৈনিক মাথাভাঙ্গা পত্রিকায় জাকাত পাবার আশায় দুস্থ নারী-পুরুষ ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা কষ্টের, যন্ত্রণার। জাকাত পাবার আশায় অলিতেগলিতে বিত্তবানদের বাড়ির বারান্দায় দুস্থদের ভিড়, ইফতারির উচ্ছিষ্টের জন্য অপেক্ষা, বহিরাগতদের রেলওয়ে স্টেশনে আশ্রয় গ্রহণ এবং অন্ধকার নোংরার দিকে তাদের ঠেলে দেয়ার বিবেকহীন বাস্তবতা। এসব করুণ কষ্টের ছবিকে তো কোনোভাবেই সমাজ অস্বীকার করতে পারে না। এরকম তো হওয়ার কথা ছিলো না! অনগ্রসর মানুষগুলোকে এগিয়ে নেয়ার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। কাড়িকাড়ি টাকার বরাদ্দ দেয়া হয়। অনগ্রসরদের ভাগ্যের চাকা ন্যূনতম ঘোরে না। ঘুরছে না। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা মুন্সিগঞ্জ স্টেশনের নিকটস্থ জমিতে বসবাস করেন এক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা দম্পতি। তাদের দু’সন্তান। মেয়ের বিয়ে হয়েছে। গেছে স্বামীর ঘরে। ছেলে বিয়ে করে নিজের মতো সংসার করছে। পিতা-মাতাকে দেখে না। পিতারই প্রশ্ন ছেলেরই চলে না, আমাদের দেখবে কীভাবে? পিতা ছিলেন দরিদ্র। ছেলেকে সামনে রেখেই তিনি সচ্ছলতার স্বপ্ন দেখতেন। ছেলের ভাগ্যেও জুটলো না দিনমজুরি বা ভ্যান চালানো ছাড়া অন্য কোনো কাজ। এরকম অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে চুয়াডাঙ্গাতেই। এই যদি বাস্তবতা হয় তা হলে প্রশ্নতো উঠবেই স্বাধীনতা অর্জনের পর আমরা সম্ভাবনার পথে এগিয়েছি না-কি পিছিয়েছি? দুস্থদের ভিড় দেখে এক প্রবীণ দুস্থ আক্ষেপ করে বলেছেন, গরিব মানুষ এতো বেড়েছে, বড়লোকরা আর ক’জনকেই বা জাকাত দেবে? এ প্রশ্নের মধ্যেই স্পষ্ট যে বিষয়টি, তা হলো দিন দিন দরিদ্র দুস্থ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। দেশে দুস্থ দরিদ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াকে কি দেশের উন্নয়ন বলা যায়?
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন অজ্ঞাত পরিচয়ের বৃদ্ধ। অভিযোগ উঠেছে তিনি ঠিকমতো চিকিৎসা পাননি। হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডের বারান্দায় তার ঠাঁই মিলেছিলো। ভর্তি না করলেই নয়, তাই ভর্তি করা হয়, ওষুধ না দিলেই নয়, তাই একটি স্যালাইন আর ক’টা বড়ি দেয়া হয় বলেও জানা যায়। আমাদের সরকারি হাসপাতালগুলোর বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ওষুধপথ্যই রোগী সাধারণকে বাইরে থেকে কিনতে হয়। বরাদ্দপ্রাপ্ত ওষুধ কোথায় যায়? ও প্রশ্ন মাঝে মাঝে দানা বাধে। সমাজের বিত্তবান দানশীলদেরও তেমন কাউকেই অজ্ঞাত পরিচয়ের বৃদ্ধের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়াতে দেখা যায়নি। দেখা যাবে কীভাবে? ওরকম ঘটনা তো মাঝে মাঝেই ঘটে। ক’জনকেই আর সহযোগিতা করা যায়? এরপরও বৃদ্ধের মৃত্যু আমাদের জন্য কলঙ্কের। তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ার পর হাসপাতালে ঠাঁই পেয়েছিলেন। বমি করেছিলেন। কয়েকদিনের অভুক্তের পর তিনি হয়তো এমন কিছু খেয়েছিলেন যে, তাতেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। হয়তোবা তাই, হয়তো তা নয়। সংজ্ঞাহীন বৃদ্ধের জ্ঞান না ফেরার কারণে তার নিকট থেকে তার পরিচয় জানা যায়নি। পত্রিকায় ছবিসহ তার প্রতিবেদন প্রকাশেও কেউ শনাক্ত করতে এগিয়ে আসেনি। ফলে ধরেই নেয়া যায় তিনি বহিরাগত দুস্থদের একজন ছিলেন। তার মৃত্যুর পর হাসপাতাল থেকে পুলিশে জানানো হয়। পুলিশ দায়সারাগোছের বলে দেয়, বেওয়ারিশ লাশ যারা দাফন করে তাদের দিয়ে দিতে। অবশেষে তারাই দাফন করেন। পুলিশের কি দায়িত্ব ছিলো না যে, অজ্ঞাত পরিচয়ের বৃদ্ধের বর্ণনা রেকর্ড করে দেশের সকল থানায় বার্তা প্রেরণের? এমনও তো হতে পারে বৃদ্ধের সন্তানেরা দেশের কোনো এক থানায় নিখোঁজ ডাইরি করে রেখেছেন। তারা তাদের পিতাকে না পেয়ে হয়তোবা হয়রান হচ্ছেন, আর এদিকে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন হয়ে গেলেন বৃদ্ধ।
এভাবে দুস্থ বৃদ্ধদের আর কতো মরতে হবে? কতোটা মানুষ দারিদ্র্যের কষাঘাতে প্রাণ হারানোর পর দেশের অনগ্রসরদের এগিয়ে নেয়ার বাস্তবসম্মত কর্মসূচি হাতে নিয়ে বরাদ্দের বাস্তব প্রতিফলন ঘটবে? দুস্থদের এক দু’বেলা দু’মুঠো সস্তায় খাবারের ব্যবস্থা করার চেয়ে তাদের কর্মসংস্থান গড়ে তোলার বাস্তবমুখি পদক্ষেপ নিতে হবে। দক্ষতা বৃদ্ধিতে আনাচেকানাচে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এছাড়া বিত্তবানদেরও শুধু এক দু’টি শাড়ি-লুঙ্গি বা দান দয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। পিছিয়ে পড়া নিকট কোনো আত্মীয়কে টেনে তোলার মতো সহযোগিতা করতে হবে। দুস্থ প্রতিবেশীদের দমিয়ে রাখা আর রমজান এলে তাদেরকে গণজাকাতের কাতারে দাঁড় করানোর পুরোনো হীনমানসিকতা পরিহার করতে হবে। প্রতিবেশীর ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর মতো সহযোগিতা করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। পিছিয়ে পড়াদের এগিয়ে নিতে পারলে সমাজের চিত্রটাই বদলে যাবে। মানুষ তো মানুষেরই জন্য।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


