somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জেমসের আজকের জেমস হয়ে ওঠার গল্প

০৪ ঠা জুন, ২০১৩ বিকাল ৫:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


পুরো নাম ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস। ছোট থেকেই হয়তো বাউন্ডেলে পেয়ে বসেছিল তাকে। উত্তরবঙ্গের এই ছেলে নওগাঁর পত্নীতলায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন সরকারি চাকুরিজীবি, সেই সুত্রে ছোট বেলা থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে বাবার সাথেই ঘুরে বেড়াতে হত । বাবা চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারমান হলেন আর তাকেও থাকতে হলো চট্টগ্রামে সেখান থেকে মাথায় উঁকি দিলো নতুন পাগলামী। আর এই পাগলামীই আজ তাকে বিশ্বের মাঝে তুলে ধরেছে

সংগীত নিয়ে পাগলামী যথারীতি শুরু হলো । মন কোনদিকেই নেই সারাদিন আর হুল্লোড়। নাইনে পড়া অবস্থায় তার বাবা যখন বুঝলো ছেলের দ্বারা পড়াশোনা সম্ভব নয় তখন ঘর থেকে তাকে বের করে দেয়া হলো । ঠাই হলো চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিং এ । আর এই আজিজ বোর্ডিং হয়ে উঠে তার গানের জগত। আজিজ বোর্ডিং জেমসের জীবনে বিশাল স্মৃতিময় রেখা আলোকপাত করে গেছে। যার কারনে জেমস এখনো স্মৃতিকাতর হন তার অতীতের সে সময়কে নিয়ে।


আসিফ ইকবালের লেখা 'অনন্যা' জেমসের প্রথম একক এলবাম। যেটা বের হয় ১৯৮৭ সালে। যার প্রতিটি গানই অসাধরণ। বিশেষ করে 'অনন্যা' কিংবা 'ওই দূর পাহাড়ে' গানগুলো বুকের মাঝে সত্যিই কাঁপন জাগায়। তবে এই গান শুনে কারো পক্ষে ধারনা করা সম্ভব হবে না যে গানটি জেমস গাইছেন। ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রামের জনপ্রিয় ব্যান্ড 'ফিলিংস' এ যোগ দেন। 'ফিলিংস'এর ভোকাল ছিলেন আরেক অসাধারণ প্রতিভাধর কন্ঠের অধিকারী পাবলো । সে সময় ঘর ছাড়া জেমস ও' ফিলিংস' ব্যান্ড যাদের অনুশীলন থেকে শুরু করে থাকা ,খাওয়া সব হতো সেই “আজিজ বোর্ডিং” এর এক কামরায়। সেই কামরায় তাঁদের কত বিনিদ্র রাত কেটেছে শুধু গান তৈরির নেশায়।



১৯৮৯ সালে বের হয় ফিলিংস এর ব্যানারে প্রথম অ্যালবাম 'স্টেশন রোড'। 'ঝর্না থেকে নদী' , 'স্টেশন রোড' অপুর্ব গানগুলোর মাঝে যেখানে জেমস এর নীরব হাহাকার, প্রেমের আকুতি,অন্যায়ের প্রতিবাদ সব কিছু ফুটে উঠেছে । ৯২ সালে জেমস ভালোবেসে বিয়ে করেন মডেল ও অভিনেত্রী রথি কে বিয়ে করেন এবং ২০০১ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়ে যায় পরবর্তীকে বেনজীর কে বিয়ে করেন। 'জেল থেকে বলছি' নিয়ে আসা জেমস ও ফিলিংস আবার ঝলসানি দিয়ে ওঠে। সেটা ১৯৯৩ সাল। আবার জানান দেন জেমস আছে।



অডিও বাজারে বড় ধরনের একটা ঝাকুনি দিয়ে 'জেল থেকে বলছি' নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের নিকট ভ্যারিয়েশন ইমেজ তৈরী করে ফেলে। এই সময়টাকে অডিওবাজারের চরম সফল যুগ বলা হয়। সঙ্গীতবোদ্ধারা তাই বলে কেননা একই সাথে শীর্ষ আরো দুই শিল্পীর গান তখন দেশ মাতিয়ে রেখেছে। “জেল থেকে বলছি’ এক ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর করুন অনুভুতি ও আর্তনাদ জেমসকে নন মেটালিক আবেগী ধারার গায়ক হিসেবে পরিচিতি পেতে সহায়তা করে। ১৯৯৫ সালে জেমসের দ্বিতীয় একক বের হয় । 'পালাবে কোথায়' এলবামের প্রিয় আকাশী গানটি দিয়ে জেমস কে আরো রহস্যময় করে তোলে।
আমার আকাশী
ফ্রান্কফুটের বইমেলায়
নতুন বইয়ের গন্ধে মনে পড়েছে তোমায়
ফ্লোরেন্সে সিসটাইন চ্যাপেলের-
মিকেলাঞ্জেলোর
মহান সৃষ্টির -’পিয়েতা’র সামনে দাঁড়িয়ে
তোমাকে মনে পড়েছে



সেই বছরে প্রিন্স মাহমুদের প্রথম ব্যান্ড মিক্সড অ্যালবাম 'শক্তি' তে দুটি গান করেন। জেমস বাংলা ব্যান্ড জগতে নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই জেমস এক উন্মাদনার নাম হয়ে ওঠে। কনসার্টে উন্মাদনা শুরু জেমস থেকেই। জেমস যখন দেশের সঙ্গীতবাজারে আলোচিত নাম সেই সময় তার ভয়াবহ কিছু সমালোচক তৈরি হয়। বিরোধীতা করতে শুরু করে জেমসের গায়কীর ধরনকে। ৯৬ সালে সেই সব সমালোচকদের মুখে ছুঁড়ে মারেন 'মান্নান মিয়ার তিতাস মলম' অথবা কবি শামসুর রাহমানের 'সুন্দরীতমা আমার'। সুন্দরীতমা গানটি কবি শামসুর রাহমানের কবিতা থেকে করা গান যা জেমস অনুমতি নিয়ে করেন। 'আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেবো' তখন পাড়া মহল্লায় বড় ছোট সকলের মুখে।



জেমস যে শুধু জেমস এই দুর্লভ সত্য প্রতিষ্ঠিত করেন 'দুঃখিনী দুঃখ করোনা' । এই এলবাম এতটাই শ্রোতাপ্রিয়তা পায় যে ব্যান্ড বলতে যাদের নাক ছিটকে যেত সেই মুরব্বীরাও মনোযোগ দিয়ে শুনলেন দুঃখিনী দুঃখ করোনা। প্রেমিক প্রেমিকাদের মনে জেমস স্থান করে নেয়, স্থান করে নেয় পাড়ার রকের আড্ডাবাজদের মনে। অনেকেই বলেন এই এলবামের 'যদি কখনও ভুল হয়ে যায়' গানটি জেমস এর সর্বকালের সেরা একটি গান কেননা এই গানে জেমস এর আবেগ এতোটাই ভয়াবহ ছিল যে কোন মানুষ এর চোখে জল আনতে বাধ্য করতো।

লেইস ফিতা লেইস অ্যালবামটি ব্যানারে সর্বশেষ এলবাম । এই এলবামের 'সিনায় সিনায় লাগে টান' গানটা শ্রোতাদের হৃদয়ের খুব গভীরে পৌঁছেছে। সেই সময়ের সেরা সব গীতিকার- লতিফুল ইসলাম শিবলি,বাপ্পি খান,দেহলভি, আনন্দ,তরুন, মারজুক রাসেল, গোলাম মোরশেদ, প্রিন্স মাহমুদ ও জুয়েল-বাবুদের জেমস এর জন্য আলাদা ভাবে গান লিখতে হত। কেননা জেমসের গানট শুধুমাত্র সুর নির্ভর নয় তারচেয়ে বহুগুন বেশি কথা নির্ভর।


জেমসের কিছু গান যেগুলো না উল্লেখ করলেই নয়। প্রিন্স মাহমুদের সুর ও সঙ্গীতের মিক্সড অ্যালবাম এর 'বাংলাদেশ' (পিয়ানো), তাজমহল গড় (পিয়ানো), 'জানালা ভরা আকাশ' (শক্তি), 'আমি ও আঁধার' (শক্তি),'শেষ দেখা ' (শেষ দেখা), 'মা' (এখনও দু চোখে বন্যা), 'ফুল নিবে না অস্রু নিবে' (দেয়াল), 'মন আমার পাথরের দেয়াল তো নয়' (দেয়াল), 'কিছু ভুল ছিল তোমার" ( দাগ থেকে যায়)' নিষ্পাপ আমি' (স্রোত), স্যার (দীর্ঘশ্বাস) আত্মহত্যা পাপ (যন্ত্রনা), দহন এলবাম । জুয়েল বাবুর সুর ও সঙ্গীতে 'ওরে দেখে যারে তুই' (মেয়ে), 'পদ্ম পাতার জল' (ও আমার প্রেম), 'আরও কিছুক্ষণ রবে কি বন্ধু' (নিরবতা), সাদা কালো (নীরবতা), 'কিছুটা আশা তুমি রেখো” (নীরবতা), 'বর্ষা আমার চোখের প্রিয় ঋতু (সন্ধি), 'যত দূরে যাও বন্ধু আমার' (তারকা মেলা), লাকি আখন্দ এর সুর ও সঙ্গীতে 'লিখতে পারি না কোন গান' (বিতৃষ্ণা জীবনে আমার),'ভালবেসে চলে যেও না' (বিতৃষ্ণা জীবনে আমার), শফিক তুহিনের সুর ও কথায় শুন্য করে বুক, বৈশাখী ঝড়ে (সারেগামা) সহ আরও অনেক অনবদ্য অসাধারণ সব গান আজো সে যুগের এবং এ যুগের শ্রোতাদের মুখে মুখে ফিরে।

লতিফুল ইসলাম শিবলি,বাপ্পি খান, আসাদ দেহলভি, আনন্দ, তরুন, মারজুক রাসেল, গোলাম মোরশেদ লায়ন, প্রিন্স মাহমুদ ও জুয়েল-বাবু জেমস এর জন্য আলাদা ভাবে গান লিখতেন। যে গানের কথাগুলো ছিল একটার চেয়ে আরেকটা অসাধারণ সব কথায় ভরপুর যা একবার শুনে মন ভরতো না। আসাদ দেহলভীর সাথে সম্পর্কের টানাপড়েন পরে বিচ্ছেদ এই অভাব বুঝতে দেননি প্রিন্স মাহমুদ। আফসোসের ব্যাপার গোলাম মোরশেদ লায়ন এখন সঙ্গীত থেকেই দূরে।


'জেমস' বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে অন্য দেশেরও একটি প্রিয় গায়ক রুপে পরিচিত হয়েছেন। ২০০৬ সালে ভারতের বিখ্যাত ও জনপ্রিয় প্রযোজক, পরিচালক মহেশ ভাট এর 'গ্যাংস্টার' ছবিতে 'ভিগি ভিগি' গান দিয়ে হয়েছেন ভারতের কোটি জনতার প্রিয় শিল্পী। এরপর একই প্রযোজকের 'ওহ লামহে' 'মেট্রো' ছবিতেও কণ্ঠ দিয়ে চমকে দিয়েছেন পুরো ভারতকে। সর্বশেষ ওয়ার্নিং সিনেমায় টাইটেল সং 'বেভাসি' ধারাবাহিকতা ঠিক রাখার সাথে নিজের জনপ্রিয়তাকেও উর্ধ্বমুখি করছেন।

হিন্দি ছবির প্লে-ব্যাকে ধারাবাহিক সাফল্যের পর এবার জেমস ফিরছেন হিন্দি অডিও এ্যালবামের মধ্য দিয়ে। এরই মধ্যে মুম্বাই স্টুডিওতে রেকর্ড করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন নিজের জনপ্রিয় গানগুলোর হিন্দি ভার্সন, যা অনেক দিন ধরেই করার কথা চলছিল। যে গানের তালিকায় থাকছে মা, মীরা বাই, তেরো নদী সাত সমুদ্দুর, দুখিনির দুঃখ, যেদিন বন্ধু, জেল থেকে বলছিসহ জনপ্রিয় ১০টি গান। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী আগস্টে সনি এন্টারটেইনমেন্ট থেকে এ এ্যালবামটি প্রকাশের পূর্ণ সম্ভাবনার কথা জানান আত্মকেন্দ্রিক মৃদুভাষী জেমস।

এই পোস্টটি লিখতে যাদের সহায়তা নিতে হয়েছে, আমার বড়ভাই, মেজ ভাই, ব্লগার কবি ও কাব্য ও অন্যান্যরা। কৃতজ্ঞ।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুন, ২০১৩ দুপুর ১২:০২
৫৪টি মন্তব্য ৫২টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মাটির কাছে যেতেই..

লিখেছেন নতুন নকিব, ২৩ শে মে, ২০২৪ সকাল ৮:৫৬

মাটির কাছে
যেতেই..


ছবি কৃতজ্ঞতাঃ https://pixabay.com/

ঠিক যেন
খা খা রোদ্দুর চারদিকে
চৈত্রের দাবদাহ দাবানলে
জ্বলে জ্বলে অঙ্গার ছাই ভস্ম
গোটা প্রান্তর
বন্ধ স্তব্ধ
পাখিদের আনাগোনাও

স্বপ্নবোনা মন আজ
উদাস মরুভূমি
মরা নদীর মত
স্রোতহীন নিস্তেজ-
আজ আর স্বপ্ন... ...বাকিটুকু পড়ুন

টাকা ভাংতি করার মেশিন দরকার

লিখেছেন সায়েমুজজ্জামান, ২৩ শে মে, ২০২৪ সকাল ৯:১০

চলুন আজকে একটা সমস্যার কথা বলি৷ একটা সময় মানুষের মধ্যে আন্তরিকতা ছিল৷ চাইলেই টাকা ভাংতি পাওয়া যেতো৷ এখন কেউ টাকা ভাংতি দিতে চায়না৷ কারো হাতে অনেক খুচরা টাকা দেখছেন৷ তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেলা ব‌য়ে যায়

লিখেছেন বাকপ্রবাস, ২৩ শে মে, ২০২৪ সকাল ১১:৩০


সূর্যটা বল‌ছে সকাল
অথছ আমার সন্ধ্যা
টের পেলামনা ক‌বে কখন
ফু‌টে‌ছে রজনীগন্ধ্যা।

বাতা‌সে ক‌বে মি‌লি‌য়ে গে‌ছে
গোলাপ গোলাপ গন্ধ
ছু‌টে‌ছি কেবল ছু‌টে‌ছি কোথায়?
পথ হা‌রি‌য়ে অন্ধ।

সূর্যটা কাল উঠ‌বে আবার
আবা‌রো হ‌বে সকাল
পাকা চু‌ল ধবল সকলি
দেখ‌ছি... ...বাকিটুকু পড়ুন

পর্ণআসক্ত সেকুলার ঢাবি অধ্যাপকের কি আর হিজাব পছন্দ হবে!

লিখেছেন প্রকৌশলী মোঃ সাদ্দাম হোসেন, ২৩ শে মে, ২০২৪ দুপুর ২:২৭



ইন্দোনেশিয়ায় জাকার্তায় অনুষ্ঠিত একটা প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক জিতেছে বাংলাদেশি নারীদের একটা রোবোটিক্স টিম। এই খবর শেয়ার করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপিকা। সেখানে কমেন্ট করে বসেছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকজন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আত্মস্মৃতি: কাঁটালতা উঠবে ঘরের দ্বারগুলায়

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ২৩ শে মে, ২০২৪ রাত ৮:১৪


কাঁটালতা উঠবে ঘরের দ্বারগুলায়
আমার বাবা-কাকারা সর্বমোট সাত ভাই, আর ফুফু দুইজন। সবমিলিয়ে নয়জন। একজন নাকি জন্মের পর মারা গিয়েছেন। এ কথা বলাই বাহুল্য যে, আমার পিতামহ কামেল লোক ছিলেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×