এই বস্নগের নিয়মিত পাঠক হলেও বস্নগার হওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে আমার অতি পরিচিত একজনকে ঘিরে জমে ওঠা বিতর্ক শেষ পর্যনত্দ মৌনতা ভাঙতে বাধ্য করলো আমাকে। জানি এই বস্নগ স্বাধীন, এখানে যে কেউ ইচ্ছেমত যা খুশি লিখতে পারে। তবে তার অর্থ নিশ্চয়ই এই নয় যে আমরা যারা এই বস্নগের পাঠক, তারাও সব কিছু মেনে নেবো নিরবে।
বিতর্কের বিষয়টা হলো বাংলা ভাষার নবতর ব্যবহার নিয়ে। গত কিছুদিন ধরে লৰ্য করছি মি. ব্রাত্য রাইসু এবং আরো কয়েকজন এক ধরনের কথ্য ভাষাকে বাংলা ভাষার রূপ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সেই ভাষায় কারা কথা বলে? আমার পড়াশোনা এবং জানাশোনার দৌড় যতদূর, তাতে করে শাহবাগের আঁতেল সম্প্রদায়ের জনাকয়েক পথভ্রষ্ট তরম্নণ ছাড়া কেউ না। তারাও কি ওই আড্ডার বাইরে, নিজেদের ব্যক্তিগত বা ঘরোয়া জীবনে ওই ভাষা ব্যবহার করেন? আমার বিশ্বাস হয় না।
তবে কেন লেখায় ওই ভাষার ব্যবহার? কারণটা আর কিছু নয়, নিজেকে মহাজ্ঞানী মহাজন হিসেবে জাহির করার আঁতলামি। অবাক হয়ে লৰ্য করছি এই অপচেষ্টাকেই আবার বাংলা ভাষার বিরাট উপকার হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টাও হচ্ছে এই বস্নগে। কারা করছেন? তাঁদের কেউ মিস্টার রাইসুর নতুন চাকরিস্থলে চাকরিপ্রার্থী, কেউ উঠতি লেখক-আঁতেল হিসেবে তাঁর অনুগ্রহপ্রার্থী। মিস্টার রাইসুর কাছে আমার একটি বিনীত প্রশ্ন, বুকে হাত দিয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করম্নন তো, আপনি যদি প্রথম আলোর মত একটি বড় কাগজের সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্বে না থাকতেন, তাহলে কেউ কি আপনার এই এক্সপেরিমেন্ট মেনে নিত?
না, নিত না। যে প্রথম আলো সারা দেশের মানুষকে প্রমিত বাংলা ভাষা শেখানোর মিশন নিয়ে ভাষা প্রতিযোগের আয়োজন করে, তাদের পৰে এটা বড়ই বেমানান। তাই আমি বলবো, আপনি আপনার পদের অপব্যবহার করে, এক রকম জোর করেই এই ভাষাকে চালু করার চেষ্টা করেছেন। আপনাদের মতো লোকেরা, যাঁরা নিজ গোষ্ঠীর বাইরের কাউকে লেখক বলে গণ্যই করেন না, এমনকি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে পর্যনত্দ কটুক্তি করতে দ্বিধা করেন না, তাঁরা যতদিন এই ধরনের পদে থাকবেন, ততদিন বাংলা ভাষার সর্বনাশের পথটা প্রশসত্দ হতেই থাকবে। কারণ আপনাদের কাগজে লেখা ছাপতে হলে এই ভাষাকে মেনে নিতে হবে, করতে হবে চাটুকারিতা_ আর সেটা করলেই স্বীকৃতি পাওয়া যাবে লেখক-আঁতেল হিসেবে।
আমার এই লেখা পড়ে যদি কেউ মনে করেন আমি ভাষাকে স্থবির-নিশ্চল বলে মনে করি তাহলে ভুল করবেন। আমি জানি, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো লোকেরা কথ্য ভাষাকে লেখার রূপ দেয়া নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন বলেই আমরা পেয়েছি এমন সমৃদ্ধ একটি গদ্যভাষা। কিন্তু সেই পরিবর্তনটা হয়ে যায় কালের প্রবাহে, আপনা-আপনি। রবীন্দ্রনাথ কিংবা শরৎচন্দ্রের যে গদ্যভাষা, তার সঙ্গে আজকের প্রমিত বাংলা গদ্যের অনেক অমিল। কিন্তু এই অমিলটা কালের পরিক্রমায় ঘটেছে বলেই সেটা দৃষ্টিকটু নয়। আপনাদেরটা দৃষ্টিকটু।
এই দৃষ্টিকটু প্রচেষ্টা দেখে আমার একটি পুরনো কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। পাকিসত্দান আমলে একবার এ রকমই জোর করে বাংলা ভাষাকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। বেশি বেশি করে আরবি-ফার্সি শব্দ ঢুকিয়ে দিয়ে, এমনকি বাংলাকে আরবি হরফে লেখার প্রসত্দাব পর্যনত্দ করে। সেই প্রচেষ্টা কিন্তু সফল হয়নি। আমি বিশ্বাস করি, আপনাদের এই প্রচেষ্টাও তেমন করেই ইতিহাসের আসত্দাকুঁড়েই নিৰিপ্ত হবে।
সেই সঙ্গে নিৰিপ্ত হবে মিস্টার রাইসুর নতুন কর্মস্থলের অবিমৃশ্যকারী প্রচেষ্টাও। শুনতে পাই তারা নাকি বাংলা ভাষাকে কম্পিউটার ফ্রেন্ডলি করার চেষ্টা করছেন। সেটা খুবই ভালো কথা, কিন্তু তার জন্য পুরো ভাষাটাকেই যুক্তিহীনভাবে বদলে দিতে হবে কেন? দুই বাংলার খ্যাতিমান ভাষাবিশারদদের প্রচেষ্টায় বাংলা বানানের একটি প্রমিত রূপ দাঁড় করানোর উদ্যোগ অনেকদিন ধরেই চলছে। সুখের বিষয়, এখন অল্প কয়েকটি বিদেশি শব্দের বানান বাদ দিলে এ নিয়ে দুই বাংলার বানানরীতিতে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি আর ওপারের পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমিসহ অন্যান্যদের প্রচেষ্টায় এই অসাধ্য সাধনের পরও কেউ যদি নতুন করে কোনো বানানরীতি চালু করার চেষ্টা করেন, তাঁকে অবশ্যই যুক্তি দেখাতে হবে। ব্রিটেনকে বৃটেন, খ্রিস্টাব্দকে খৃষ্টাব্দ, লিগকে লীগ এক সময় লেখা হতো, এখন একটা যুক্তির ভিত্তিতে স্থির করা হয়েছে ব্রিটেন, খ্রিস্টাব্দ, লিগ ইত্যাদি বানান ব্যবহার করা হবে। কেবল কম্পিউটারের সঙ্গে বন্ধুত্বস্থাপনের নামে এই সব বানানের ৰেত্রে প্রাচীনযুগে ফিরে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। আর যদি কম্পিউটার ফ্রেন্ডলি করাই উদ্দেশ্য হয়, তবে কেন লীগ লেখা? এই যন্ত্রটিতে বাংলা লেখার ৰেত্রে তো যতদূর জানি দীর্ঘ ঈ কার এর চেয়ে হ্রস্ব ই কার লেখাই সহজতর! যে শব্দগুলোর কথা বললাম, সেগুলো তো তবু পুরনো রীতিতে লেখা হচ্ছে, তবে যায়যায়দিনে কৃকেট বানানটি দেখে হাসবো কি কাঁদবো বুঝে উঠতে পারি না।
তার চেয়েও বড় নির্বুদ্ধিতার প্রমাণ, লেখার মধ্যে ইচ্ছেমত ইংরেজি শব্দের প্রয়োগ। বাহুল্য প্রয়োগই বলা উচিত। হাসপাতাল না লিখে হসপিটাল, বিশ্ববিদ্যালয় না লিখে ইউনিভার্সিটি লিখলে তবু তার পিছনে যুক্তি দাঁড় করানো যায়। কিন্তু মন্দিরের স্থলে টেম্পল লিখবার যুক্তিটা কী? সে দিন একটি লেখায় পড়লাম, শ্রী লংকার বুড্ডিস্টরা ফুল মুন উপলৰে টেম্পল-এ যায় প্রার্থনা করতে। এটা কোন ভাষা? এর নাম বাংলা? শ্রীলংকা, বৌদ্ধ, পুর্ণিমা আর মন্দির এর মতো চমৎকার, বহুল প্রচলিত বাংলা শব্দগুলো কী দোষ করলো? এই প্রচেষ্টা আমাদের সেই পাকিসত্দানি যুগের কথাই মনে করিয়ে দেয় না কি? আশা করি আপনারা সেই ইতিহাস ভুলে যান নি। ভুলে গিয়ে থাকলে আবার মনে করম্নন, বোধোদয় ঘটবে। অন্যদের জ্ঞান দেয়ার (যায়যায়দিনে প্রেস নোটস নামের একটা বিভাগে অন্য কাগজগুলো তাদের দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রায়ই যেমন দেয়া হয়) তাহলে নিজেদের মুখটা আগে আয়নায় দেখতে ইচ্ছে করবে হয়তো।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


