somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নুপী লান বা নারী বিদ্রোহ-এর অন্তর্নিহিত বক্তব্য

২৮ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

## নুপী লান বা নারী বিদ্রোহ-এর অন্তর্নিহিত বক্তব্য ##
পয়লা কিস্তি



১৮৯১ সালের ২৫ এপ্রিল খোংজোম তীরে ইঙ্গ-মনিপুরি যে যুদ্ধ হয় তাতে পরাজিত হয় মনিপুর বাহিনী এবং এর তৃতীয় দিনেই অর্থাৎ ২৭ শে এপ্রিল তারিখে মনিপুর রাজ্য পুরোপুরিভাবে বৃটিশ শাসনের অন্তর্গত হয়। মহারাজ কুলচন্দ্র সিংহ ২০০ অনুচরসহ চীনদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্ট করেন। কিন্তু কতিপয় সহযোগীর বিশ্বাসঘাতকতায় বন্দী হন বৃটিশদের হাতে। অচিরেই ধরা পড়েন বীর টিকেন্দ্রজিৎ এবং থাঙ্গাল জেনারেলকে বৃটেনের মহারানীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অপরাধে বিচার করে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয় যা ১৮৯১ সালের ১৩ই আগষ্ট তারিখে প্রকাশ্য জনসমক্ষে পোলো গ্রাউন্ডে কার্যকর করা হয়। এর আগে ভিন্ন ভিন্ন অভিযোগে এন. সুবেদার, কাজাও সিংহ এবং জেনারেল থাঙ্গালকেও ফাঁসি দেয়া হয়। আবার অনেককে দেয়া হয় নির্বাসন। এভাবেই স্বাধীন মনিপুরের একচ্ছত্র শাসনক্ষমতা দখল করে নেয় বৃটিশ সরকার।

মনিপুর বৃটিশ শাসনের অধীন হলেও বৃটিশ শাসিত ভারতের সাথে একীভূত হয়নি বরং স্বতন্ত্র মর্যাদা নিয়ে তার অবস্থান অক্ষুন্ন রাখে। কিন্তু মনিপুরের শাসনব্যবস্থা বৃটিশ সরকারের প্রত্যক্ষ নির্দেশ-আদেশের মাধ্যমে পরিচালিত হতে থাকে। মাত্র ৫ বছর বয়সী রাজপুত্র চূড়াচান্দ'কে রাজসিংহাসনে বসানো হয়। মনিপুরি প্রজাবৃন্দ এসময় নানা সমস্যাদির মুখোমুখি হতে থাকে।

১৮৯১ সালের ২১ আগষ্ট, বৃটিশ সরকার মনিপুর শাসনের ক্ষেত্রে কিছু নীতিমালা ঘোষণা করে কিন্তু মনিপুরি প্রজাবৃন্দ তা প্রত্যাখ্যান করে। ফলে বৃটিশরা মনিপুরি সৈন্যদের উপযুক্ত অস্ত্র-শস্ত্র না দিয়ে আলাদা করে রাখে এবং বৃটিশ সৈন্যদের আজ্ঞাবাহী করে রাখে। মনিপুরি সৈন্যদের 'খুজুমা' থেকে 'কোহিমা' পর্যন্ত দীর্ঘ ৭২ মাইল রাস্তায় বিনা পারিশ্রমিকে বৃটিশ সৈন্যদের রেশন বহন করার কাজে নিয়োজিত করে। শুধু তাই নয়, নানাবিধ কায়িক শ্রমে মনিপুরিদের নিয়োজিত করে। যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে মনিপুরিদের কাছ থেকে ২,৫০,০০০ টাকা আদায় করে। এমনকি মনিপুরি প্রজাদের উপর মাথাপিছু সমতলে ২ টাকা এবং পাহাড়ে ৩ টাকা করে ট্যাক্স ধার্য করে। আর এর ফলে মনিপুরী প্রজাবৃন্দ নিজেদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বলে ভাবতে শুরু করে এবং একটা ক্ষোভ ক্রমশ: দানা বেঁধে উঠতে থাকে।

মনিপুরি প্রজাবৃন্দ সবচেয়ে বেশী সমস্যার সম্মুখীন হন যখন বৃটিশ সরকার মনিপুরে 'ফ্রি ট্রেড পলিসি' চালু করে। এর আওতায় মনিপুর থেকে বছরে ৩৫,০০০ মণ চাল রপ্তানী করা হয়। ফলে মনিপুরে চালের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। ক্ষুব্ধ মনিপুরিরা ১৯০৪ সালের ৬ই জুলাই তারিখে খাইরম্বন্দ বাজারের ২৮টি দোকানঘর পুড়িয়ে দেয়। ঐ মাসেরই ১৫ তারিখে Captain Nattal এবং Dulop এর বাংলো বাড়ী রাতের অন্ধকারে পুড়িয়ে দেয়। ৪ঠা আগষ্টে আবার আরেকটি বাংলোতে আগুন লাগানো হয়। এভাবেই বৃটিশ শাসনে বিক্ষুব্ধ মনিপুরি প্রজাবৃন্দ হিংসাত্মক প্রতিরোধের পথ বেছে নেয়। আর বৃটিশ সরকারও আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিদেরকে বন্দী করার উদ্যোগ নেয়।

তাছাড়া আগুনে ভস্মীভূত বাংলোগুলো নিজ খরচে নির্মাণ করে দেয়ার জন্যে ইম্ফাল শহরের মনিপুরী প্রজাদের উপর মি. ম্যাক্সওয়েল হুকুমনামা জারি করেন ৩০শে সেপ্টেম্বর। এই আদেশে মনিপুরিদের ক্ষোভ আরো বেড়ে যায়। শগোলবন্দ এলাকার জনৈক চীংচাবা নাতেক সিংহ ম্যাক্সওয়েল সাহেবের এই অন্যায় আদেশ রহিত করার জন্য আবেদন জানান। কিন্তু ম্যাক্সওয়েল তার আবেদনে সাড়া নি দিলে তাৎক্ষণিক মূহুর্তে প্রায় ৫০০০ লোকের এক বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ 'বিচারালয়' প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হয় এবং ঐ সমাবেশে বৃটিশ সরকারের ঐ আদেশ নাকচ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৃটিশ সৈনরা সমাবেশ ভেঙ্গে দেয় এবং নেতৃস্থানীয় ৬ জনকে বন্দী করে। তারা হলেন-
১. মেঘজিৎ সিংহ (৫৬)
২. থাংকোকপা সিংহ (৫০)
৩. মুতুম সিংহ (৬১)
৪. কালা সিংহ (৫৬)
৫. সেনাচাওবা সিংহ (৩৭) ও
৬. দেবেন্দ্র সিংহ (৩১)।
তারা সবাই ছিলেন রাজপরিবারের সদস্য এবং তাদেরকে বিচারের পর মনিপুরের বাইরে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বৃটিশ সরকারের এই দমন পীড়নে ক্ষুব্ধ সাধারণ মনিপুরিরা শেষ পর্যন্ত বাধ্যতামূলক বিনা পারিশ্রমিকে অগ্নিদগ্ধ বাংলোগুলো পুননির্মাণ করে দিতে বাধ্য হয়।

বৃটিশ বাহিনীর এই ক্রমাগত অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মনিপুরি নারীরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। এই আন্দোলন সেপ্টেম্বরের ৩ তারিখ থেকে শুরু হয়ে বেশ কয়েকদিন চলে। আন্দোলনের তীব্রতা বেড়ে গেলে বৃটিশরা মনিপুরের বাইরে থেকে সৈন্য আমদানী করে মনিপুরে সেনাসংখ্যা বাড়িয়ে দেয়। এই নারী জাগরণে মূখ্য ভূমিকা পালন করে-
১. ইরেংবম সনাজাওবী দেবী
২. লৈশাংথেম খাথবী
৩. লৈমাপোকপম থবলি এবং
৪. লাইশ্রম জুবতি দেবী।

বৃটিশ সরকার নির্যাতনের পথ বেছে নেয়, অনেক নারী নেত্রীই সরকারী বাহিনীর নিষ্ঠুর নির্যাতনে আহত হয়। তবু মনিপুরি নারীদের গড়ে ওঠা আন্দোলন ক্রমশ: তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠার পর সরকারী শাসন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অবশেষে বাধ্য হয়ে বৃটিশ সরকার তাদের আদেশ প্রত্যাহার করে নেয়। আর এভাবেই মনিপুরি নারীদের আন্দোলন প্রাথমিক বিজয় অর্জন করে। মনিপুরি ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব সৃষ্টিকারী এই আন্দোলন প্রথম 'নুপী লান' বা মনিপুরি নারী বিদ্রোহ নামে পরিচিতি লাভ করে।

(চলবে ক্রমশ:...)
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ৮:৪০
৯টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাকে উদ্দীপ্ত করে

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৯ শে নভেম্বর, ২০২২ রাত ১২:৩৯

বৃক্ষরা মরে যায়, মাটিতে মজে যায়
বিশাল ফসিল
আজকের গান, আজকের কবিতা
হারিয়ে যাবে নিশ্চিত একদিন
যতটুকু ভালোবাসো আজকের দুপুরে
কিংবা বেসেছ গতকাল রাতে
এর কোনো সাক্ষী রেখেছ কি, অথবা চিহ্ন?
হয়ত ভুলে যাবে সবই আগামী প্রভাতে

তুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সব পুরুষ খারাপ হয় না... কিছু কিছু পুরুষ অতুলনীয় ভাবেও ভালো হয়;

লিখেছেন কৃষ্ণচূড়া লাল রঙ, ২৯ শে নভেম্বর, ২০২২ রাত ২:০১

সব পুরুষ অজুহাত দেখিয়ে ছেড়ে চলে যায় না... কিছু কিছু পুরুষ ছেড়ে যাওয়ার হাজারটা যৌক্তিক কারণ থাকার পরেও পরম যত্নে ভালোবেসে আগলে রেখে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত হাতটি শক্ত করে ধরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বপ্নে তুমি

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৯ শে নভেম্বর, ২০২২ সকাল ৮:৪৭

চলে যাবার একশ সাতাশি দিন পর,
আজই প্রথম তুমি আমায় দেখতে এলে!
আমার ডান বাহুটা শক্ত করে ধরে,
হাসিমুখে তুমি কাকে কি যেন বলছিলে
আমার ছেলেবেলা নিয়ে!

তোমার স্নেহের স্পর্শ পেয়ে-
ধন্য হ’লাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

হলুদ বসন্তে ফিরে এসো নেইমার

লিখেছেন সেলিম আনোয়ার, ২৯ শে নভেম্বর, ২০২২ দুপুর ১২:৫৯


হলুদ বসন্ত নেমেছে যেন

শীতের মাঝেই যেন হলুদ বসন্ত নেমেছে
—এক ঝাক হলুদিয়া পাখি, তপ্ত মরুর বুকে
মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাই চেয়ে থাকি
যেন আরেক বসন্ত নামে
লিওনার্দো দা ভিঞ্চির শিল্প সম্ভার যেন
সাম্বার... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি অসভ্য জাতির আড্ডার গল্প!

লিখেছেন শেরজা তপন, ২৯ শে নভেম্বর, ২০২২ বিকাল ৪:২৯


(নিন্মোক্ত আলোচনার বিষয়বস্তু কাল্পনাপ্রসুত হতে পারে)
চারবন্ধু বসে আড্ডা দিচ্ছে মোড়ের চায়ের দোকানের পাশেই গুটি কতক চেয়ার পেতে। বেশ কয়েক বছর বাদে চার বন্ধু একখানে দেখা করার সুযোগ পেয়েছে। এর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×