somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চায়ের কাপ

১২ ই জুন, ২০১৮ রাত ১১:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দেড়টার ঠিক আগে আগে একজন মধ্যবয়স্ক লোক আমাদের ক্লাশে ঢুকলেন। দেড়টা মানে টিফিন পিরিয়ড। স্কুল লাইফে আমরা টিফিন পিরিয়ডকে দেড়টাই বলতাম। এমন না যে ঠিক দেড়টার সময়ই টিফিন হতো। কিন্তু কেন জানি এটাই চলে এসেছে যুগ যুগ ধরে। সে যাগ্‌গে, যা বলছিলাম — ক্লাশ নিচ্ছিলেন লাভলী আপা। ফাইভের বিজ্ঞান ক্লাশ। একটু পরেই দেড়টা তাই আমাদের মনোযোগ ক্লাশের পড়ার চেয়ে স্কুলের মাঠে ঘন্টি বাজানো আইসক্রিমওয়ালার দিকেই বেশি। অপেক্ষা করছি কখন দেড়টার ঘন্টা বাজবে আর আমরা হুড়মুড় করে বের হবো ক্লাশ থেকে। এমন সময় ক্লাশে অপরিচিত একজনের উপস্থিতিতে কিছুটা বিরক্তই হলাম আমরা। নিশ্চই টিও অফিস থেকে এসেছে। হঠাৎ হঠাৎই টিও অফিস থেকে লোক আসে। পড়াশোনা কেমন হচ্ছে, স্যাররা ঠিকমত ক্লাশ নেন কিনা, কি পড়াচ্ছেন, সবার ইউনিফর্ম আছে কিনা, কাপড় পরিষ্কার কিনা, নখ ছোট কিনা, চুল ছোট কিনা ইত্যাকার নানান বিষয় লক্ষ্য করেন। শুধু তাই না দাঁড়া করিয়ে পড়াও ধরেন। কিন্তু একটা বিষয় গোলমেলে, টিও অফিস থেকে লোক আসলে আগের দিন স্যাররা বলে দেন। ফলে আমরা প্রিপারেশন নিয়ে আসি। গোসল করে চুলে তেল দিয়ে আঁচড়িয়ে পরিষ্কার ইউনিফর্ম পড়ে স্কুলে আসি। সেই সাথে নামতা এবং কিছু ট্রান্সলেশনও মুখস্থ করে আসি যেন ধরলে বলতে পারি। কিন্তু বিনা নোটিশে ক্লাশে চলে আসা লোকটা কে?

রোগা-পাতলা লোকটার চেহারা মলিন। নীল দিয়ে ধোয়া সাদা শার্ট ইন করে পড়েছেন। কিন্তু পায়ে স্যান্ডেল। হাতে একটা মোটা ডায়রী। লাভলী আপা পরিচয় করিয়ে দিলেন — ইনি একজন কবি, তোমাদের কবিতা শোনাবেন।

লোকটা নিজের নাম পরিচয় বললেন যদিও নামটা এখন আর মনে নেই। এরপর তিনি ডায়রী খুলে একে একে অনেকগুলো ছড়া ও কবিতা আমাদের শোনালেন। প্রথম ছড়াটার নাম ছিল ‌‘চায়ের কাপ’। একটি চায়ের কাপের আত্মজীবনী ছন্দে ছন্দে চমৎকার একটা ছড়ায় বর্ণনা করলেন। আমার খুব পছন্দ হলো। ছড়ার ছন্দটা এখনো মনে পড়ে শুধু কথাগুলো মনে নেই।

অনেক্ষণ ধরে ছড়া ও কবিতা শুনিয়ে তিনি ক্লাশ থেকে বের হয়ে গেলেন এবং ফোরের ক্লাশে ঢুকলেন। এক এক করে সবগুলো ক্লাশে হয়তো যাবেন। উনি যাওয়ার পর লাভলী আপা আমাদের বললেন — এই যে এতক্ষণ উনি তোমাদের ছড়া কবিতা শোনালেন এটা এমনি এমনি না। লোকটা খুব দরীদ্র। তোমরা যে যা পারো দিয়ে ওনাকে সাহায্য করো।

কথাটা শোনার পর কেমন জানি লাগছিল। কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিলামনা এতো চমৎকার ছড়া কবিতা যিনি লেখেন তাকে কেন স্কুলে স্কুলে ঘুরে কবিতা শুনিয়ে নিজের অন্ন জোগাড় করতে হয়? সেই প্রশ্নের জবাব কখনো পাইনি।

প্রতিদিন টিফিনের জন্য বাসা থেকে দুই টাকা করে পেতাম। বেশির ভাগ সময় আমি বাসায় এসে ভাত খেয়ে আবার স্কুলে যেতাম। মাঝে মধ্যে বাসায় না এলে বন্ধুরা মিলে হোটেলে আখনি কিংবা হালুয়া খেতাম। সেই দিন আমার টিফিনের দুই টাকা ওই কবিকে দিয়েছিলাম।
এরপর আরও দুয়েকবার সেই কবিকে দেখেছি, চৌমুহনীতে কোন জনসভায় এক ফাঁকে মঞ্চে উঠে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করতে। এখন লোকটা কোথায় আছে কেমন আছে জানিনা। জানিনা বেঁচে আছে কিনা। তবে চা খাওয়ার সময় হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে যায় সেই ছন্দে ছন্দে পড়া ছড়াটা। বহু বছর পার হয়ে গেছে কিন্তু এখনো শৈশবের সেই লোকটার মলিন চেহারা স্পষ্ট চোখে ভাসে।

আমার যদি একটা টাইম মেশিন থাকতো তাহলে সেই দিনটায় চলে যেতাম এবং লোকটাকে বলতাম — আপনার কবিতাগুলো অনেক সুন্দর। ছড়াগুলো আরও বেশি সুন্দর। আপনার ডায়রীটা আমাকে দেবেন? আমি আপনার একটা বই বের করে দিব। এরপর থেকে আপনি ডায়রীর বদলে একটা ব্যাগে করে আপনার বইগুলো নিয়ে স্কুলে স্কুলে যাবেন। আমার বিশ্বাস আপনার একটা বইও ফেরত আসবে না।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জুন, ২০১৮ রাত ১১:১১
৫টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সামহোয়্যারইন ব্লগ কেন বন্ধ?

লিখেছেন জাহিদ হাসান, ১৩ ই অক্টোবর, ২০১৯ সকাল ১১:৩১

গত আগষ্ট মাসের ৫ তারিখে একটা পোস্ট করেছিলাম। ততদিন পর্যন্ত এই সামু ব্লগে আমি আমার ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট লাইন দিয়ে অনায়াসে ঢুকতে পারতাম। কিন্তু এর পর থেকেই এই সাইটে ঢুকতে গেলেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

উপরের অর্ডার আসলে তা মানা ছাড়া উপায় নাই: অমিত সাহা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ১৩ ই অক্টোবর, ২০১৯ দুপুর ২:৩২

অত্যন্ত মেধাবী একটি ছেলে (আবরার) বুয়েটে গিয়েছিল ইঞ্জিনিয়ার হবে বলে। কিন্তু তার সহপাঠীরাই তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে।

এই মামলার অন্যতম প্রধান আসামি অমিত সাহা যুগান্তরকে বলেন, বুয়েটের ট্র্যাডিশনই এটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আবরাব একজন শিক্ষিত বুয়েটিয়ান হয়েও কিউবিক ফুট/সেকেন্ড মাপ না বুঝে ফেক নিউজে গা ভাসাইছিল।

লিখেছেন হাসান কালবৈশাখী, ১৩ ই অক্টোবর, ২০১৯ দুপুর ২:৫১


ফেনী নদি। বাংলাদেশ অংশ থেকে তোলা।

একজন শিক্ষিত মেধাবী বুয়েটিয়ান হয়েও কোন স্টাডি নেই, বাঁশের কেল্লা টাইপ পেইজ থেকে জ্ঞান আরোহন।
আবরাব একজন শিক্ষিত বুয়েটিয়ান হয়েও কিউবিক ফুট/সেকেন্ড মাপ না বুঝে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অতি ভক্তি খন্দকার মোশতাকের লক্ষ্মণ...

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ১৩ ই অক্টোবর, ২০১৯ বিকাল ৩:৩৭



১. বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হওয়াতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছাত্র/ছাত্রী ও অভিভাবকের প্রাথমিক বিজয় হয়েছে। তবে মিঁও মিঁও গ্রুপ এখনও আশা ছাড়ছে না এটা চালু রাখার। এদিকে এই মিঁও মিঁও গ্রুপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাহাবী হবো-হৃদয়ে দাগ কাটে যে ঘটনা

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ১৩ ই অক্টোবর, ২০১৯ বিকাল ৪:০৮



এই বিশ্ব সংসারে প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ, পলকে পলকে ঘটে যাচ্ছে কত শত ঘটনা। কিন্তু কিছু কিছু ঘটনা হৃদয়ে দাগ কেটে যায়। এমনই একটি ঘটনা ঘনেছিল ইংল্যান্ডে।

ঘটনাটি ছোট কিন্তু এর প্রভাব... ...বাকিটুকু পড়ুন

×