দুর্নীতির কারনে পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন না করায় বাঙ্গালি জাতি হিসেবে বিশ্বের কাছে আমরা লজ্জিত হলাম।
পদ্মা সেতু :বিশ্বব্যাংককে বাংলাদেশের 'না'
নাটকের যবনিকাপাত
বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে দীর্ঘ টানাপড়েন শেষে অর্থায়নের অনুরোধ ফিরিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে এ বিষয়ে দেওয়া চিঠিটি আমলে নিয়েছে বিশ্বব্যাংক। গতকাল শুক্রবার বিশ্বব্যাংকের এক বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়। এর মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতু নিয়ে ঘটনাবহুল নাটকের যবনিকাপাত ঘটল। তবে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের অনুরোধ বাংলাদেশ প্রত্যাহার করে নিলেও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী_ এডিবি, জাইকা ও আইডিবির কাছে তাদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে সরকার। কিন্তু এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) গত রাতে এক বিবৃতিতে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। তারা বলেছে, বিশ্বব্যাংক না থাকায় বাধ্যবাধকতার কারণেই তারা অর্থায়ন করতে পারছে না। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংককে বাদ দিয়ে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়নের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সরকার গতকাল বিকেলে এক বিবৃতিতে বলেছে, বিশ্বব্যাংকের সহায়তা ছাড়াই পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হবে। বাংলাদেশ সরকার পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা আর চাইছে না। তবে পদ্মা সেতু নিয়ে 'দুর্নীতির ষড়যন্ত্রে'র তদন্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে। সরকারের ওই বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণের জন্য সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, বিশ্বব্যাংকের সহায়তা ছাড়াই এ প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে। প্রয়োজনে প্রকল্পের ব্যয় কমানোর জন্য শুধু সড়ক সংযোগ সেতু নির্মাণ করা হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচি এবং পদক্ষেপ নিয়ে সব উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে আলোচনার জন্য সত্বর তাদের ঢাকায় আসার আহ্বান জানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রধানের কাছে লেখা দুই পৃষ্ঠার ওই চিঠিতে পদ্মা সেতু বিষয়ে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণ এবং এই সেতু নির্মাণে আর কালক্ষেপণ করা সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করা হয়। পদ্মা সেতু নির্মাণে বিকল্প অর্থায়নের ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী রবি-সোমবারের মধ্যে সংসদে বিবৃতি দেবেন। সরকারের পক্ষ
থেকে বৃহস্পতিবার পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের প্রধানের কাছে একটি চিঠি লেখা হয়। ওই চিঠির
পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বব্যাংক তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে একটি বিবৃতি দেয়। দুই অনুচ্ছেদের এ বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার বিশ্বব্যাংককে জানিয়েছে, তারা পদ্মা সেতুর জন্য অর্থায়নের অনুরোধ প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের এ অনুরোধ গ্রহণ করেছে বিশ্বব্যাংক। পাশাপাশি বিবৃতিতে এ কথা উল্লেখ করা হয়েছে, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির পূর্ণ ও নিরপেক্ষ তদন্ত শেষ করার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) উৎসাহ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এর আগে গত বুধবার বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম ওয়াশিংটনে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষভাবে অপরাধ তদন্তের নিশ্চয়তার শর্ত পূরণ না হলে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয় বিবেচনা করবে না সংস্থাটি। এর দু'দিন পর বিশ্বব্যাংককে তাদের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল বাংলাদেশ সরকার।
এদিকে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, বিকল্প উৎস হিসেবে মালয়েশিয়া, চীন ও ভারত পদ্মা সেতু নির্মাণে আগ্রহ দেখিয়েছে। ফেব্রুয়ারির মধ্যেই অর্থায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। শুক্রবার সকালে গাজীপুরে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন মন্ত্রী। শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংকের সরে যাওয়াটা ঠিক হয়নি। এর ফলে পদ্মা সেতু নির্মাণের অগ্রগতি থমকে গেল। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সরকারের এ সিদ্ধান্ত অবিবেচক হিসেবে মন্তব্য করেছে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন গতকাল সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন।
সরকারের নীতিনির্ধারক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা সেতুতে অর্থায়নের বিষয়ে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাংককে আলটিমেটাম দিয়েছিলেন। এর আগে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে জবাব চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সূত্র জানায়, আলটিমেটাম শেষ হওয়ার দু'দিন আগে অর্থমন্ত্রীকে ডেকে পাঠান প্রধানমন্ত্রী। সঙ্গে ছিলেন যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সেতু বিভাগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকেই বিশ্বব্যাংক থেকে অর্থ না নেওয়া এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান জানিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রধানের কাছে একটি চিঠি পাঠানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বৃহস্পতিবার ইআরডি থেকে চিঠিটি পাঠানো হয়।
এদিকে পদ্মা সেতু থেকে বিশ্বব্যাংক নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে 'দুর্ভাগ্যজনক' বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো পদ্মা সেতু প্রকল্পে স্বল্প সুদে ১২০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার কথা ছিল বিশ্বব্যাংকের। দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে গত বছরের ২৯ জুন পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঋণচুক্তি বাতিল করে দেয় সংস্থাটি। পরে সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর শর্ত সাপেক্ষে গত সেপ্টেম্বরে আবার ফেরত আসে বিশ্বব্যাংক। তখন শর্ত দেওয়া হয়, নিরপেক্ষ তদন্তে দুদককে সহায়তা করতে বিশেষজ্ঞ দল পাঠাবে বিশ্বব্যাংক। সেই স্বাধীন দলটির পর্যবেক্ষণ-প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে অর্থায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বিশ্বব্যাংক।
এরই মধ্যে বিশ্বব্যাংকের নিযুক্ত আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল দু'বার বাংলাদেশ ঘুরে গেছে। প্যানেল প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনার পর ১৭ ডিসেম্বর দুদক পদ্মা সেতুর দুর্নীতি নিয়ে মামলা করেছে। প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন (এফআইআর) থেকে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের নাম বাদ দেওয়া হয়। সর্বশেষ বিশেষজ্ঞ প্যানেল আবুল হোসেনকে বাদ দেওয়ায় দুদকের নিরপেক্ষ তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে এ বছরের ৬ জানুয়ারি দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের কাছে একটি চিঠি লিখে। ইতিমধ্যে প্যানেলের ওই চিঠির জবাব দিয়েছে দুদক।
২৯০ কোটি ডলার ব্যয়ে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পদ্মা সেতু প্রকল্পে ১২০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা বিশ্বব্যাংকের। এ ছাড়া এডিবি ৬১ কোটি ৫০ লাখ, জাইকা ৪০ কোটি এবং আইডিবি ১৪ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি দেয়। জানা গেছে, সরকার ইতিমধ্যে বিকল্প অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এ জন্য কোন অর্থবছরে কত টাকা দরকার হবে, তা জানাতে সেতু বিভাগকে নির্দেশ দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আগামী সপ্তাহের মধ্যে বিকল্প উৎস সম্পর্কে অবহিত করবেন অর্থমন্ত্রী।
পেছনে ফিরে দেখা :দুর্নীতির অভিযোগে গত বছরের ২৯ জুন পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঋণচুক্তি বাতিল করে দেয় বিশ্বব্যাংক। এর পর থেকে সংস্থাটিকে ফেরাতে সরকারের নানা উদ্যোগ চলতে থাকে। বিশ্বব্যাংকের শর্ত মেনে তাদের উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগে পদত্যাগ করেন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন; সেতু বিভাগের সচিব মোশাররফ হোসেন ভঁূইয়া যান ছুটিতে। দুদকের তদন্ত কার্যক্রমে বিশ্বব্যাংকের দেওয়া প্যানেল বিশেষজ্ঞ নিয়োগে সম্মত হয় সরকার। বাদ ছিল মসিউর রহমানকে ছুটিতে পাঠানো। আলোচনার একপর্যায়ে ড. মসিউর ছাড়াই সমঝোতার প্রস্তাব করলে বিশ্বব্যাংক তা নাকচ করে দেয়। সংস্থাটি স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ঋণ পেতে হলে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ইন্টেগ্রিটি অ্যাডভাইজার ড. মসিউর রহমানকেও ছুটিতে পাঠাতে হবে। তাদের শেষ শর্ত পূরণের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানকে ছুটিতে পাঠায় সরকার। এসব শর্ত পূরণ করার পরই আবার ফেরত আসে বিশ্বব্যাংক।
সরকারের বিবৃতি :পদ্মা সেতু প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থান নিয়ে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অতিরিক্ত সচিব আরাস্তু খান স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ছাড়াই পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে।
পদ্মা সেতুর সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে সরকারের অবস্থান জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'বিশ্বব্যাংকের আজকের (১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, তারা পদ্মা সেতুর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের নতুন উদ্যোগ সম্পর্কে অবহিত হয়েছে।' তারা আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশ সরকার পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা আর চাইছে না এবং পদ্মা সেতুর তদন্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার কিছুদিন আগে থেকেই বলেছে, তারা ২০১৩ সালের জানুয়ারির মধ্যে পদ্মা সেতুর অর্থায়নে বিশ্বব্যাংকের প্রত্যাবর্তন আশা করছিল এবং জানুয়ারিতেই এ বিষয়ে বিকল্প সিদ্ধান্ত নিতে সরকার বদ্ধপরিকর। সে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার গতকাল বিশ্বব্যাংককে জানিয়ে দেয়, তারা পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ এখনই শুরু করতে চায় এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ছাড়াই কাজটি শুরু করতে হচ্ছে।
এতে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের বিবেচনায় পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের পুনর্বিবেচনা ছিল বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক এবং সরকার প্রথম থেকেই যা বলছে তা তারই প্রত্যয়ন। সরকার প্রথম থেকেই বলছে যে বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতি বিষয়ক অভিযোগ তারা যথাযথভাবেই বিবেচনা করছে। অভিযোগের পক্ষে প্রমাণের অভাবে ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত এফআইআর পেশ করার মতো অবস্থা ছিল না। বিশ্বব্যাংক পরবর্তীকালে নভেম্বর মাসে অতিরিক্ত প্রমাণ সরবরাহ করলে দুর্নীতি দমন কমিশন কিছু অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে এফআইআর পেশ করে। এই এফআইআরে তারা আরও কয়েকজন অভিযুক্ত সম্বন্ধে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানায়। বাংলাদেশ সরকার মনে করে, এ পদক্ষেপটি যথাযথ এবং এর ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করা সমীচীন হতো। এ ক্ষেত্রে দেখা গেল যে বাংলাদেশ সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচি বিশ্বব্যাংকের সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য নয়। বিশ্বব্যাংকের সময়সূচি অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ অনিশ্চিত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




