পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তামাক চাষের ধুম পড়েছে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায়। বাঘাইছড়ির তিনটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পাঁচ শতাধিক তামাকচুল্লি নির্মাণ করা হয়েছে। এখন চলছে সংরক্ষিত বন থেকে কাঠ এনে তামাক পাতা শুকানোর প্রস্তুতি। এতে ১০ লাখ মণ কাঠ (লাকড়ি) পোড়ানো হবে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শিজক, কাচালং ও মাচালং সংরক্ষিত তিনটি বনাঞ্চল থেকে প্রতিদিন তামাকচুল্লির জন্য হাজার হাজার মণ কাঠ আনা হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ছয় চাকার ট্রাক্টর দিয়ে এসব কাঠ সরবরাহ করছেন। এতে সংরক্ষিত বন হুমকির মুখে পড়ছে। এমনিতেই তামাক চাষের ফলে সংরক্ষিত বনের পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। তার ওপর তামাকচুল্লির কালো ধোঁয়ায় গোটা উপজেলার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠবে বলে এলাকাবাসী আশঙ্কা করছে। ওই ধোঁয়া সিগারেটের ধোঁয়ার চেয়ে বেশি ঝাঁজালো বলে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তামাক চাষের আগ্রাসনে এলাকায় শাকসবজি চাষও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। তামাক চাষ বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় খাদ্যশস্য উত্পাদন ১০ গুণ কমেছে। ফলে শাকসবজির দাম বেড়ে গেছে। উপজেলায় যেসব জমিতে বিভিন্ন ফসলের আবাদ হতো, সেসব জমিতে এখন তামাক চাষ হচ্ছে।
বিভিন্ন তামাক উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রতিবছর কৃষকদের বেশি টাকার প্রলোভন দেখিয়ে তামাক চাষে আগ্রহী করে তুলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চাষিদের বীজ, সার ও কীটনাশক সরবরাহ করছেন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ ছাড়া উত্পাদিত তামাক কিনে নেওয়ার নিশ্চয়তা তো আছেই। এমন প্রলোভনে পড়ে তামাক আবাদের দিকে চাষিরা বেশি মাত্রায় ঝুঁকে পড়েছেন।
বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলা সদর, মারিশ্যা, মাস্টারপাড়া, মাদ্রাসাপাড়া, বাঘাইছড়ি গ্রাম, বটতলী, উলুছড়ি, লাল্যাঘোনা ছড়া, তুলাবান, শিলকাটা ছড়া, ঢেবাছড়ি, দুরছড়ি, খেদারমারা, পাবলাখালী, রুপকারী বগবান, করেঙ্গাতলী, বাঘাইহাট, শিজক, কচুছড়ি, মোরঘোনাছড়া, সারোয়াতলী মহিষপয্যা, খাগড়াছড়ি, আমতলী ও মাহিল্যা এলাকার অধিকাংশ কৃষক তামাক চাষ করছেন। যেসব এলাকায় তামাক চাষ হচ্ছে সেসব এলাকা সংরক্ষিত বনের ভেতরে বলে জানা গেছে।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছর মাত্র ৬০০ একর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। এ বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার একর। প্রতি তিন একর জমিতে একটি তামাকচুল্লি লাগে। একটি চুল্লিতে তামাক পাতা শুকানোর জন্য দুই হাজার মণ কাঠ প্রয়োজন।
তামাকচাষি মো. ইউনুস বলেন, ‘তামাক চাষে লাভ বেশি। আমি রবিশস্যের বদলে তামাক চাষ করছি। কারণ, তামাক চাষে চার গুণ বেশি লাভ হয়।’ দেশের প্রতিষ্ঠিত একটি তামাকজাত পণ্য উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানের উপজেলা ব্যবস্থাপক মো. হারুনুর রশিদ জানান, তাঁদের আওতায় দেড় শতাধিক তামাকচুল্লি রয়েছে। যেসব কাঠ লাগবে, সেগুলো কিনে দিচ্ছেন তাঁরা।’
উপজেলা বিট কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন জানান, বাঘাইছড়িতে সংরক্ষিত বনের ভেতর পাঁচ শতাধিক তামাকচুল্লি তৈরি করা হয়েছে। প্রতি চুল্লিতে দুই হাজার মণ কাঠ পোড়ানো হবে। সেসব কাঠ সংরক্ষিত বন থেকে আনা হচ্ছে। নিরাপত্তার কারণে বনের ভেতর যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আমিনুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা অনেক চেষ্টা করেও কৃষকদের ফেরাতে পারছি না। একাধিকবার উদ্বুদ্ধকরণ সভাও করেছি। তামাক চাষ এখন পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। চাষাবাদের জমিগুলো হুমকিতে পড়েছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ এস এম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘তামাকচুল্লিতে যে কাঠ পোড়ানো হবে সেগুলো নিজস্ব বাগান ও ডালপালা বলে আমাকে বলা হয়েছে। বড় কাঠ হলে আমরা ধরব।’ ১০ লাখ মণ লাকড়ি ডালপালা থেকে জোগাড় করা সম্ভব—এমন প্রশ্নের জবাবে ইউএনও জানান, তামাকচুল্লিগুলোতে শিগগিরই অভিযান চালানো হবে।
বিশ্বাস না হলে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


