somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আরেকটা মেয়ের চড় খাওয়া ভিডিও

১৯ শে ডিসেম্বর, ২০১৪ ভোর ৬:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঢাকা শহরের এখনকার হরতালে গাড়ি, বাস নির্বিঘ্নে চলাচল করে। মাঝে মাঝে দুই একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনায় গাড়ী ভাংচুর হয়। তবে সেটাও শতাংশে এতই নগন্য যে ইগনোরেবল।
একদিন মৌচাক মার্কেটের সামনে পিকেটাররা পুলিশের অনুপস্থিতিতে হঠাৎ ক্ষেপে গিয়ে একটা বেবি ট্যাক্সি উল্টে ফেলল। এইটা দেখে মাঠের মধ্যে ক্রিকেট খেলা বাদ দিয়ে সেই ছেলের দল দৌড়ে এসে বেবি ট্যাক্সিতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব নিয়ে আবার মাঠে গিয়ে খেলতে শুরু করে দিল। নিজের চোখে দেখা।
মতিঝিলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে দিয়ে গাড়ি চড়ে যাচ্ছি। হঠাৎ রাস্তার জনতা ক্ষেপে উঠলো। সমানে গাড়ির কাঁচ ভাঙ্গার শব্দ শোনা যাচ্ছে। ঘটনা কী? স্টকের দাম পড়ে গেছে, তাই গাড়ি ভাংচুর হচ্ছে।
আমার বন্ধু ভাল ড্রাইভার ছিল। হলিউড স্টাইলে গাড়ি ঘুরিয়ে, ভিড় ঠেলে সে নিজের গাড়িকে অক্ষত অবস্থায় বের করে আনতে পেরেছিল। তারপর বলল, "আল্লাহ বাঁচাইছে!"
আমার বন্ধুর কাছে তাঁর প্রথম ভালবাসা ছিল তাঁর গাড়ি। একটা স্ক্র্যাচও যদি পড়তো, তাহলেও বন্ধু সেখানেই মারা যেত।
তাই আমিও বললাম, "আল্লাহ বাঁচাইছেন!"
একবার আমার উপর একদল ছেলে আক্রমণ করেছিল। "কিশোর রাজনৈতিক প্রতিহিংসা সাথে প্রেম বিষয়ক জেলাসি" নিয়ে এক ছেলে কয়েকটা বখাটে তরুণকে দিয়ে আমার উপর আক্রমণ করেছিল। মৌচাক মার্কেটের মতন একটি ব্যস্ত এলাকায় আটটা ছেলে মিলে দুইজনকে (আমার সাথে আরেকজনও ছিল, ঘটনার শিকার বেচারা) আক্রমণ করেছে, একটা মানুষও এগিয়ে এলো না সাহায্যের জন্য।
বিশ্বজিতের ঘটনা সবাই জানেন। ছয়জন মিলে একটা তরুণ যুবককে কুপিয়ে হত্যা করলো, কেউ কিছু বলল না। পঞ্চাশজন মিলে শুধু হেঁটে গেলেই ঐ ছয় খুনীর পদপিষ্ট হয়ে পরপারে চলে যাবার কথা। বিশজন মিলে স্রেফ ধমক দিলেই সন্ত্রাসীদের অস্ত্র ফেলে দেয়ার কথা। কেউ এগিয়ে এলো না! অথচ গাড়ি ভাংচুরের সময়ে কেন জানি বাঙ্গালির অভাব হয়না।
কিছুদিন আগে এক নারীকে ছিনতাই কারীরা টেনে হেঁচরে নিয়ে গেছে বহুদূর। সেই নারী কী এখনও বেঁচে আছেন কিনা জানিনা। অথচ একটা মানুষও এগিয়ে এলো না গাড়িটা থামাতে। ইচ্ছা করলেই সমবেত জনতা গাড়ি থামিয়ে বদমাইশগুলোকে বের করে এনে গাড়ির পেছনে দড়ি দিয়ে বেঁধে ঢাকা শহরে হেঁচড়ে হিচড়ে চক্কর দিতে পারতো।
গতকাল এক আপু আমাকে একটা ভিডিও ক্লিপ দেখালেন। একদল ছেলে এক মেয়ের রিকশা থামিয়ে ঠাশ ঠাশ করে চড় মারছে মেয়েটিকে। কিছুদিন আগে এক স্কুল পড়ুয়া ছেলে এই কাজটি করেছিল। এবারের ছেলেটি যুবক। কিছুদিন পরে হয়তো বেরুবে কোন মধ্য বয়ষ্ক পুরুষ কোন নারীকে চড় থাপ্পড় মারছে।
ভিডিওতে এও দেখা গেল যে কেউই মেয়েটির সাহায্যে এগিয়ে এলো না।
এখন কেউ কেউ মুখ বাঁকিয়ে বলতে পারেন, "রাস্তাটা নির্জন ছিল।"
দেড় কোটি মানুষের ঢাকা শহরে 'নির্জন রাস্তার' অস্তিত্ব আছে বলে আমি বিশ্বাস করিনা। আসল কথা, আমাদের বর্তমান প্রজন্মের বীরত্বের দৌড় ঐ নিরীহ গাড়ি ভাংচুর করা পর্যন্তই। আসল কাজের সময়েই আমরা সটকে পড়ি, অথবা লুকিয়ে লুকিয়ে ভিডিও করি। ফেসবুকে শেয়ার করি।
এখন আসি নিজের জীবনের একটা ঘটনায়।
আমি এবং আমার অতি কাছের এক বন্ধু একবার ধানমন্ডি এলাকায় আড্ডা দিচ্ছিলাম। আমরা তখন মাত্রই ঢাকা শহরে পড়তে এসেছি। আগে বহুবার আসা যাওয়ার ফলে আমার বেশ কিছু বন্ধু (ফুপাতো ভাই তারেকের থ্রুতে, যদিও সবাই স্কুল পড়ুয়া) থাকলেও বন্ধুর জন্য শহর একেবারেই নতুন।
আমাদের সামনের রাস্তা দিয়ে একটি তরুণী রিকশায় চেপে চলে গেল। রিকশায় মেয়ে দেখলে তরুণেরা এমনিতেই উঁকি ঝুঁকি দেয়। তরুণীরাও তরুণদের দিকে একই আগ্রহে তাকান।
আমাদের চোখাচোখি হলো। তারপর আমরাও চোখ সরিয়ে নিলাম, মেয়েটিও হয়তো তাই করলো, চোখ সরিয়ে নেয়ায় দেখা হয়নি।
একটু সামনে যেতেই মোটর সাইকেলে করে দুইজন ছেলে রিকশা ব্লক করে তরুণীর দিকে এগিয়ে গেল। ছেলেগুলোর চলার ভঙ্গি ভাল ঠেকলো না। আমরা তাকিয়ে রইলাম।
ছেলে দুইটা এমনভাবে কথা বলছিল, বোঝাই যাচ্ছিল মেয়েটির সাহায্য প্রয়োজন।
আমরা দুইজন এগিয়ে গেলাম।
"কোন সমস্যা?"
আমার প্রশ্নে ছেলেদের একজন উত্তর দিল "আপনার কী? আপনে ফুটেন!"
আমি তখন ছেলেটাকে একবার দেখে নিলাম। আধুনিক পাংকু পোলাপান যেমন হয় আর কি। সন্ত্রাসী ফন্ত্রাসী কিছু না। এদের দৌড় মুখ পর্যন্তই। খুব বিশ্রী বিশ্রী গালাগালি করবে, এবং বলবে, "চিনোস আমারে?"
আমি এবং ইকবাল তখন এমন ভাব নিলাম যেন আমরাও এলাকার বিরাট রংবাজ।
আমাদের চেহারাও আমাদের সাহায্য করলো। গাল ছিল গাঁজাখোরদের মতন ভাঙ্গা। ডালখোরদের মতন শরীর ছিল চিকন। নিয়মিত বেয়ামের ফলে হাতের রগ থাকতো ফোলাফোলা এবং পেটা হাতের মাসল। গেটআপ ছিল বঙ্গ থেকে কেনা ফেডেড ব্যাগি জিন্স, এবং গেঞ্জির উপরে শার্টের সব কটা বোতাম খোলা।
বডি ল্যাংগুয়েজ এমন করলাম যেন ওরা মনে করে আমাদের কোমরে "মেশিন" গোজা আছে। প্রয়োজনে বের করতে সময় লাগবে না।
আমি ছেলেটির দিকে তাকিয়ে 'এলাকার বড় ভাইদের' মতন বললাম, "তোমারেতো জিগাই নাই, তুমি কথা কইতাছো ক্যান?" এরপর মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বললাম, "কোন সমস্যা?"
আমাদের এই কনফিডেন্ট গলার স্বরে কাজ হলো। ছেলে দুইটা মোটামুটি ভরকে গেল।
যদিও আমাদের দুইজনেরই বুক ভয়ে দরাস দরাস করছে। জানিনা ছেলে দুইটার ব্যাকগ্রাউন্ড কী! স্থানীয় ছেলে হলে আমাদের খবর আছে। আর ওদের কাছেও যদি কোন 'মেশিন' থাকে তাইলেতো কথাই নাই!
কিন্তু চেহারায় এমন ভাব ধরে রাখলাম যেন তাদের পেটানোর জন্য আমাদের হাত নিশপিশ করছে।
এবারে মেয়েটাও একটু সাহস পেল। বলল, "ওরা আমার সাথে জোর করার চেষ্টা করছে।"
আমার সাথের বন্ধু রিকশাওয়ালাকে বলল, "সোজা টাইনা চইলা যাও। কোন থামাথামি নাই। আর পিছন ফিরাও দেখবা না। যাও!"
যে ছেলেটি বাইক চালাচ্ছিল সে ইনিয়ে বিনিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, আমি গিয়ে এক লাথি দিয়ে স্ট্যান্ডে রাখা বাইক রাস্তায় ফেলে দিলাম। তারপর তার কাছে এসে তার বুক পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে এনে একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে কামড়ে ধরলাম। তবে ধরালাম না। ধরালেই বুঝে যেতে পারে আমি ধূমপান করিনা।
অ্যাকশনে কাজ হলো, ওরা একটাও শব্দ করলো না।
রিকশা গলির মোড়ে হারিয়ে গেল। আমি একটা ছেলের গালে মৃদু চাপড় দিয়ে বললাম, "আর যেন কখনই এমন করতে না শুনি। ভাল হয়া চলবা, ঠিক আছে?"
ছেলেটা কিছু বলল না।
আমরা আস্তে আস্তে সরে এলাম। আমাদের বুক তখন উত্তেজনায় লাফাচ্ছে। এই ধরণের কাজ জীবনেও করিনি। ওরা যদি ফোন করে ওদের কাউকে ডাকে আমরা তখনই শেষ। তবু মুখে ভাব নিলাম যেন কালা জাহাঙ্গীরকে ডাকতে আমাদের ফোন করাও লাগবে না, এমনিতেই হাজির হয়ে যাবে।
ছেলেগুলো সরে যেতেই আমরাও বাসে চেপে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করলাম।
মোরাল অফ দ্য স্টোরি: চোখের সামনে অন্যায় হতে দেখলে আপনি আওয়াজ তুলুন। যে অপরাধ করছে, সে এমনিতেই অপরাধবোধের কারণেই দূর্বল থাকবে। আপনাকে শুধু সবল হতে হবে।
আপনিই পারেন একটা মেয়েকে একটা বেজন্মার চড় খাওয়া ভিডিও বন্ধ করতে। আপনাকে শুধু একটু সাহস করে দাঁড়িয়ে গেলেই চলবে।
৭টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রম্য: পর্নের সেকাল একাল!

লিখেছেন গেছো দাদা, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৬

গুরুত্বপূর্ণ একটা টপিক নিয়ে অনেকদিন ধরে লিখব লিখব করছিলাম। সময় হচ্ছিল না। আজ এই গভীর রাতে মনে হলো, লিখেই ফেলি। কেন মনে হলো, সে আলাপে আর না যাই। টপিক হলো:... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশভাগ এবং ধর্ম- অধর্ম

লিখেছেন রাজীব নুর, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৪



শীতের শেষে সমস্ত গাছের পাতা ঝরে পড়ে।
তখন পাতা ছাড়া গাছ একদম রুগ্ন মনে হয়। শুকনো পাতা দিয়ে মাটির পথ ঢেকে যায়। সেই পথ দিয়ে কোনো পথিক হেটে গেলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিরো থেকে হিরো (মহাজগৎ সংক্রান্ত) - পর্ব-১

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫০




কোন কিছুর অস্তিত্ববিহীন অসীম শূন্যে উদ্ভব ঘটেছে সকল বস্তু ও শক্তি উপাদানের। তাতে কোন স্থান না থাকায় উক্ত বস্তু ও শক্তি উপাদান সমূহ একে অপরের স্থান হয়েছে। সুতরাং... ...বাকিটুকু পড়ুন

শব্দের শক্তি, ভাষার মাধুর্য....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:৫২

এমিরেটস, কাতার এয়ার লাইন্স ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট রিক্রুটমেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে গ্রুপ ডিসকাশন। গ্রুপ ডিসকাশনের সারমর্ম হচ্ছে—৬-৮ জন কয়েকটি গ্রুপে একটি নির্দিষ্ট টপিক নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবে। নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

উচ্চবংশীয় ছাগল!

লিখেছেন রাজীব নুর, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:০৯



এককালে কেবল ঘড়িতেই বাজতো টিক টিক- টিক টিক;
বারবেলায় এসে দেখছি টিক টিক বলে কিছু নেই আর ঠিক ঠিক!
বরং 'টিকটক'- এ আকণ্ঠ বুদ হয়ে আছে আবালবৃদ্ধবনিতা!
মানুষের লম্ফঝম্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

×