আপনি কি চান আপনার মেয়ে স্কুলে পড়ুক, উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হোক, নিজের পায়ে দাঁড়াক, যাতে ভবিষ্যতে কোন কারনে ওর স্বামীর বিপদ হলে, স্বামীর সাথে কোন কারনে বনিবনা না হলে, ডিভোর্স হলে কিংবা সে যদি বিধবা হয়, তখন যেন সে অন্যের দাক্ষিণ্যের আশায় বসে না থাকে? না। আমরা কেউই চাইনা আমাদের বাচ্চারা অন্যের মুখাপেক্ষী হোক, সে ছেলে হোক কিংবা মেয়ে। তাই শুধুমাত্র সন্তানদের ভবিষ্যৎ একটু স্বাচ্ছন্দময় করতেই আমরা সারাজীবন খেটে মরি। একটা টাকা খরচের আগে চিন্তা করি যদি জমাই, তাহলে সেটা আমার বাচ্চার কতটা কাজে আসবে। ঠিক বলেছি?
তাহলে জেনে রাখুন, তালেবানদের মতে, মেয়েদের শিক্ষার কোন প্রয়োজন নেই। মেয়েদের স্কুল ওরা বন্ধ করে দেয়। যে মেয়ে ওদের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে স্কুলে পড়তে চায়, ওরা পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক দূরত্ব থেকে সেই মেয়ের মাথায় গুলি চালায়। মালালা ইউসুফের কাহিনীতো এটাই ছিল, তাই না? মেয়েটি নিজের এক ভাষণে বলেছিল, কিভাবে তাঁর বাবা মা ভয়ে আতঙ্কে আয়াতুল কুরসী পড়তেন। কাদের ভয়ে? তালেবানদের। কখন না জানি এসে গুলি করে গোটা পরিবারকে হত্যা করে। কি আফসোস! "মুসলিমদের" ভয়ে মুসলিমদের রবের কাছে "আয়াতুল কুরসী" পাঠ করে সাহায্য প্রার্থনা! এরচেয়ে লজ্জাজনক আর কি হতে পারে? আপনারা বলছেন এতে ইসলামের জয় হয়েছে? জ্বিনা, এরচেয়ে বড় পরাজয় আর কিছুতেই হতে পারেনা।
২০১৪ সালে পেশোয়ারের এক স্কুলে এই তালেবানরাই গুলি করে হত্যা করেছিল কমসে কম দেড়শো শিশু। আল্লাহর কসম! সেদিনও আমি কেঁদেছিলাম, আজও সেই ঘটনা লিখার সময়ে আমার চোখ জ্বালা করছে। আমরা মুসলিমরা শিশুদের ফেরেস্তার সাথে তুলনা করি, আমরা বেহেস্তের ফুল বিবেচনা করি। আমাদের নবীজির (সঃ) সুন্নত শিশুদের প্রতি সর্বদা সদাচরণ করা। ওদের বিদ্যালয়কে তাই আমরা ধরে নেই বেহেস্তের বাগানের এক টুকরা। সেই বেহেস্তের বাগানে সেদিন নরকের দ্বার খুলে দিয়েছিল একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী। দোজখ থেকে ভেসে আসা হাওয়ায় মুহূর্তেই ঝরে পড়েছিল বেহেস্তের ফুল! তছনছ হয়ে গিয়েছিল সাজানো বাগান। আপনাদের কি ধারণা, ফিরদৌসে বসে আমাদের নবী মুহাম্মদ (সঃ), এবং তাঁর পূর্বসূরিরা, পিতা ইব্রাহিম (আঃ), মুসা (আঃ), ঈসা (আঃ), নূহ (আঃ), আদম (আঃ) প্রমুখদের একজনও খুশি হয়েছিলেন? জানিনা সেদিন বেহেস্তে কথোপকথন হয়েছিল কিনা, কিন্তু তিন লাখেরও বেশি নবী রাসূল থেকে যদি একজনও আমাদের নবীকে (সঃ) জিজ্ঞেস করে থাকেন, "তোমার উম্মত তোমার নাম ভাঙিয়ে এ কি করে বসলো?" আমাদের নবীজির সম্মানটা কোথায় ছিল সেদিন?
কুরআনের আয়াত আছে, কেয়ামতের দিন জীবিত কবর দেয়া শিশুদের ডেকে প্রশ্ন করা হবে কোন অপরাধে তাঁদের হত্যা করা হয়েছিল, তখন ওদের খুনিরা কি জবাব দিবে?
এই শিশুগুলোর কি অপরাধ ছিল জানেন? ওদের একমাত্র অপরাধ, ওরা মিলিটারি স্কুলে পড়ে, অনেকের পিতামাতাই পাকিস্তান আর্মিতে কর্মরত এবং সন্ত্রাসবিরোধী তথা তালেবানদের জঙ্গিবাদবিরোধী অপারেশনের সাথে যুক্ত ছিল। সশস্ত্র সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধের সাহস নেই, তাই নিষ্পাপ, নিরীহ, বেহেস্তের ফুল হত্যা করে ওরা নিজেদের সাহসের পরিচয় দিয়েছিল এবং মরে গিয়ে শাহাদাতের দরজা আশা করেছিল! ওরা যদি দাবি করে থাকে নিষ্পাপ শিশু হত্যা ইসলাম ধর্মের শিক্ষা, তবে ওদের "ইসলাম ধর্মানুযায়ী" আমরা সবাই কাফের, মুনাফেক এবং নাস্তিক। মানে হচ্ছে, আমাদের সবাইকেই ওরা হত্যা করতে পারবে।
অবশ্য আপনি যদি তালেবান সমর্থক হয়ে থাকেন, মানে এই শিশু হত্যাকারীদের জন্য আপনার দরদ উথলে উঠে, তাহলে ভিন্ন কথা। আপনি সাচ্চা মুসলমান!
যে বাঙালি এখন আফগানিস্তানে তালেবানদের বিজয়কে ইসলামের বিজয় বলছে, সে আমাকে উত্তর দিক এসবকে কোন এঙ্গেল থেকে ইসলামিক বলে মনে হয়? ও নিজে কি পারবে তালেবান রাষ্ট্রে বাস করতে? বাড়িতে কোন টেলিভিশন থাকবে না, নিজের মেয়েকে স্কুলে পাঠাতে পারবে না, স্ত্রী নিজের ইচ্ছা মতন বাইরে বেরুতে পারবে না, ওদের মতের বিরুদ্ধে কিছু বললে "কাফির/মুরতাদ" ইত্যাদি ট্যাগ দিয়ে হত্যা করবে, প্রচার করা হবে, "ওরা মুসলমানদের মারে না" - এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে কিছু ছাগল সেটা বিশ্বাস করে প্রচারও করবে। ক্রিকেটার রশিদ খানের আঁকুতি কাউকে স্পর্শ করছে না? ওরা ঘোষণা দিবে "ক্রিকেট হারাম!" অমনি এশিয়ার ক্রিকেটে অন্যতম পরাশক্তি হয়ে ওঠার সম্ভাবনাময় দলটি আর খেলতে পারবে না। ক্রিকেটাররা বিদ্রোহ করলে ওদের হত্যা করা হবে, এবং বাঙালি তখনও "আলহামদুলিল্লাহ, তালেবান জিন্দাবাদ" বলতে বলতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ম্যাচের খোঁজখবর নিবে। কেউ কেউ প্রচার করবে "রশিদ খান বেয়াদব ছিল, আমাদের তাচ্ছিল্য করতো, উচিৎ শিক্ষা হয়েছে।"
ভাইরে, বুদ্ধি বিবেক, বিবেচনা এইগুলি কোথায় রাখেন আপনারা? জীবনেও কোন আফগানের সাথে কথা বলেছেন? শুনেছেন ওদের কাউকে বলতে ওরা কেমন সুখে আছে? খুশিতে এত গদগদ হলে কেন আপনি বাংলাদেশে পড়ে আছেন, কেন পরিবার সহ আফগানিস্তান যাচ্ছেন না? আমরা নিজেদের বেলায় ষোলো আনা সেয়ানা, অন্যের বেলাতেই খাঁটি মুমিন মুসলমান!
আফগানদের জন্য মায়া হয়। সোভিয়েতদের লোভী দৃষ্টি পড়ায় আমেরিকা তৈরী করলো আলকায়দা-তালেবানদের। তারপরে দেখলো নিজের পোষা সাপ নিজেকেই কামড়ে বসলো। নাইন ইলেভেনের ঘটনায় সিংহভাগ সৌদি নাগরিক জড়িত থাকার পরেও "বিন লাদেন কাজটা করেছে" অভিযোগে আক্রমন করলো নিরীহ আফগান নাগরিকদের উপর। মরলো লাখে লাখে সিভিলিয়ান। বিন লাদেনকে পাওয়া গেল কোথায়? পাকিস্তানে! মাঝে দিয়ে একটি দেশ বোমায় ঝাঁঝরা করে দেয়া হলো। প্রচুর পরিবার ধ্বংস হলো, প্রচুর শিশু এতিম হলো, প্রচুর নারী বিধবা।
তারপরে জনতার ট্যাক্সের দুই তিন ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করে এবং অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে (আমেরিকান এবং আফগান উভয়ই) শুধু জেদের বশেই দেশটাতে বসে রইলো আমেরিকা। দেখাতে যে আমাদের শক্তি আছে, পারলে আমাদের খেদাও!
তালেবানরা খেদাতে পারলো না, কিন্তু টুকটাক হামলায় মানুষ মরলো প্রচুর। আবারও, সৈন্যের বদলে সিভিলিয়ান বেশি। পঙ্গুত্ব নিল লাখে লাখে মানুষ।
অবশেষে আমেরিকার বোধ ফিরলো। সেখানে আগামী একশো বছর বসে থাকলেও ঘোড়ার আন্ডাটাও ফলবে না এইটা বুঝতে বিশ বছর কেটে গেল। আর টাকা ও প্রাণ নষ্ট করে লাভ নেই, তাই ফিরে আসার সিদ্ধান্ত হলো।
এখন দেখা গেল যেই লাউ সেই কদুই রয়ে গেল। আমেরিকানরা এখনও ঠিকঠাক মতন দেশটা ছাড়ে নাই, এরই মাঝে গোটা দেশ দখলে নিয়ে নিয়েছে তালেবানরা। মার্কিনি ডলার ও ট্রেনিং প্রাপ্ত সেনাবাহিনী মোটামুটি বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করেছে। কোটি কোটি ডলার পেয়ে দুর্নীতি করে আসছিল পুতুল সরকার, অবস্থা বেগতিক দেখতেই জনগণকে অন্ধকারে ফেলে চম্পট দিয়েছেন রাষ্ট্রপ্রধান। আহারে!
আফগানরা নিজেদের দেশ কিভাবে চালাবে, কাদের দিয়ে চালাবে, সেটা তাঁদের নিজেদের ব্যাপার। বাইরের কোন দেশের মাতবরি করার কোনই অধিকার নাই। ওরা যদি পছন্দ করে কোন জঙ্গি আল্লাহর নাম ভাঙ্গিয়ে ওদের উপর শাসন করে, তাহলে সেটা তাঁদের সিদ্ধান্ত। ওরা যদি চায় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, সেটা তাঁদের ব্যাপার। কিন্তু এক জালিম শেষে অন্য জালিম এসে দখল নিবে, তারপরে আবার পুরানো জালিম ফিরে আসবে এবং ওরা প্রাণভয়ে অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকবে, এ দৃশ্য সহ্য করা মুস্কিল। ব্যক্তিগতভাবে কিছু আফগানকে চিনি বলেই ওদের অসহায়ত্ব বুকে বিঁধছে। তালেবান বিজয়ে উল্লাস করার কিছু নেই। কয়টা আফগানকে তালেবানদের আগমনে ফেসবুকে হাসিমুখে স্ট্যাটাস দিতে দেখছেন? উল্টো দেখা যাচ্ছে বিমানে উঠার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে তাঁরা। অনেকেই বর্ডার পেরিয়ে পাশের দেশে আশ্রয় নিবেন। আপাতত সেটা হচ্ছেনা কারন পাকিস্তান ও ইরান সীমানা বন্ধ করে রেখেছে। দেশজুড়ে চলছে লুটপাট, নিরাপত্তা এবং খাদ্য সংকট। হাজারে হাজারে আফগান বাড়ি ঘর ছেড়ে এখন রাস্তায়, কিন্তু সব আনন্দ, সব স্ট্যাটাসদানকারী ও সমর্থক বাংলাদেশের নাগরিক! কারন এদের দৃষ্টিতে এটি "ইসলামের জয়!" মজার কথা হলো, এদের অর্ধেকও স্বপরিবারে আফগানিস্তানে গিয়ে থাকতে রাজি হবেনা। কত অদ্ভুত ও বিচিত্র এ আচরণ! এটা মুনাফেকি না হলে কোনটাকে মুনাফেকি বলে?
জাতি হিসেবে আফগানরা খুবই আলাভোলা, খুবই সহজ সরল, নিরীহ একটি জাতি। ওদের সাথে কথা বললেই বুঝতে পারবেন জীবনের কোন জটিল প্যাঁচ তাঁদের মাথায় খেলে না। ওরা নিজেদের জীবন নিয়েই ব্যস্ত, ভেড়ার মাংস-পোলাও আর চা খেতে পারলে তাঁদের সুখের কোন সীমা থাকেনা। আল্লাহ এই চমৎকার মানুষগুলোর সহায় হোন, তিনিই তাঁদের শান্তি দিন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


