somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অতঃপর একদিন......

০৮ ই জুলাই, ২০০৭ বিকাল ৫:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শ্রাবণের অশান্ত আকাশ, বৃষ্টি পড়ছে অঝর ধারায়। সামনে আমার বিস্তৃত সবুজ এক প্রান্তর। সেখানে বসে আছি, চুপচাপ বসে থেকে বৃষ্টিতে ভিজছি। কোথাও কেউ নেই, কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সবাই। পকেট থেকে ছোট্ট একটা চিরকুট বের করলাম আমি। তারপর চিরকুটটা মেলে ধরলাম চোখের সামনে।
তাতে লেখা- “হিমু সাহেব, আপনাকে একটা কথা বলবো। নয়ন নামের একজন আমাকে ভালোবাসতো, আর সে আপনার মধ্যেই বাস করে। আপনি তার দ্বিতীয় সত্ত্বা। নয়ন মনে হয় হারিয়ে গেছে। আপনার কাছে একটাই অনুরোধ যে, কোনোদিন যদি তার সাথে আপনার দেখা হয়, তবে তাকে বলবেন যে, অর্থি বলতে কেউ একজন তাকে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু এখন আর বাসে না। তবে যদি কখনো সে তার আপন রূপে ফিরে আসে, তাহলে অর্থি তাকে দূরে সরাতে পারবে না।”
সৃষ্টিকর্তা পরম মমতা নিয়ে মানুষ সৃষ্টি করেছেন, করছেন এখনো। নয়নও একজন মানুষ। অন্য সবার মতো তারও দুটি হাত আছে, দুটি চোখ আছে, দুটি পা আছে, আছে একটি মাথাও। অর্থিও একজন মানুষ, ঠিক নয়নের মতোই একজন মানুষ তিনি। নয়ন কথা রেখেছিল, অর্থি তার দেয়া কথা রাখেননি। নয়নকে ফিরিয়ে দেবার কোনো কারণ ছিল না তার, কিন্তু তারপরও কেন যেন অর্থি ফিরিয়ে দেন তাকে। নয়নের পবিত্র ভালোবাসা হেরে যায় অর্থির অহংকারবোধের কাছে। খালি হাতে ফিরে আসে নয়ন, বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় তার- অর্থি তাকে কখনোই ভালোবাসেনি। অর্থি নয়নের পবিত্র ভালোবাসাটাকে নিয়ে একটু মজা করেছেন, স্রেফ একটা মানুষের জীবনকে নিয়ে একটু মজা করেছেন তিনি! বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকে নয়ন, দাঁড়িয়ে থাকে নির্বাক হয়ে। নয়ন চেয়েছিল শুধু একজনকে, অর্থিকে। কিন্তু অর্থি যে আসলে কাকে চেয়েছিলেন, সেটা এখনো বোধগম্য হয় না নয়নের। আমার মনে হয় সেটা বুঝতে পারেন না অর্থি নিজেও।
অঝর ধারায় বৃষ্টি পড়েই চলেছে। সে বৃষ্টি জলে ভিজে যাচ্ছে সবুজ ঘাসগুলো, ভিজে যাচ্ছি আমি, আর ভিজে যাচ্ছে আমার হাতে ধরা ছোট্ট চিরকুটটি। যেটার এখন আর কোনো প্রয়োজনই নেই। হঠাৎ নয়নের চোখের দিকে তাকালাম আমি। মুহূর্তখানেকের জন্য হতবাক হয়ে গেলাম। ভিজে যাচ্ছে নয়ন, ভিজে যাচ্ছে তার চোখ দুটোও। নয়নের চোখের জল আর বৃষ্টির জল একাকার হয়ে মিশে যাচ্ছে যেন! আকাশটা কাঁদছে আজ, কাঁদছে নয়নও! আমি চুপচাপ বসে থেকে দুজনের কান্না দেখছি।

অতঃপর একদিন-

কিছুটা পথ গিয়েই থমকে দাঁড়ালেন লোকটি, তারপর আরও কিছুটা এগিয়ে গেলেন সামনের দিকে, এবং স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন সেখানেই। মনের ভিতর প্রচন্ড একটা কষ্ট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন লোকটি। বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিলেন, যেন কতদিন তিনি বুক ভরে শ্বাস নিতে পারেননি! মনের ভেতর কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়েই আকাশের দিকে তাকালেন তিনি। মুহূর্তখানেকের জন্য একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন সেদিকেই। অপূর্ব শরতের সুনীল আকাশ, সেখানে ভেসে বেড়াচ্ছে অজস্র সাদা-শুভ্র মেঘের দল। কোথায় যেন ভেসে যাচ্ছে সেগুলো, ভেসে যাচ্ছে দূরে কোথাও, চলে যাচ্ছে গন্তব্যহীন গন্তব্যে। চোখদুটো ছল ছল করে উঠলো লোকটির। তার জীবনটাও যে আজ এমনই, নেই কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য, নেই কোনো নিজস্ব ঠিকানাও। জীবনের গন্তব্যটা যে তিনি হারিয়ে ফেলেছেন অনেক আগেই! বুকের ভেতরে জমে থাকা নীল কষ্টগুলোকে তিনি মিশিয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন ওই নীল আকাশটার সাথে। ধীরে ধীরে আকাশটা আরও নীল হতে লাগলো, নীল কষ্টগুলো ধীরে ধীরে নীল আকাশটার সাথে মিশে যাচ্ছে যেন! মানুষের কষ্টগুলোকে বুকে ধারন করার জন্যই বোধয় আকাশটা এতো বিশাল, আর নীল কষ্টগুলো বুকে নিয়েই সে এতো বেশী নীল। মাথাটা নিচু করে ফেললেন লোকটি। চোখের জল লুকানোর জন্যই বোধয় মাথাটা নিচু করলেন তিনি, মাথাটা নিচু করলেন লজ্জায়। পরণেই কী যেন ভেবে মাথাটা উঁচু করলেন লোকটি। না, লজ্জা পাবার তো কোনো কারণ নেই তার। শুধু তিনিই কাঁদেন না, ওই বিশাল নীল আকাশটাও কাঁদে এক সময়। সেও কাঁদে প্রচন্ড দুঃখে। আর সে কান্নার জল আমাদের কাছে ধরা দেয় বৃষ্টি হয়ে। সে বৃষ্টি জলে আমরা ভিজে যাই, ভিজে যায় আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীটা। সে জল ধুয়ে নিয়ে যায় আমাদের ভিতরের কষ্টগুলোকে, ছুঁয়ে যায় আমাদের অন্তরটাকে। লোকটি আবারো তার মাথাটা নিচু করে ফেললেন। এবার তিনি লজ্জায় তার মাথাটা নিচু করেননি, মাথাটা নিচু করে ফেলেছেন অপরিসীম কৃতজ্ঞতায়। হাতদিয়ে চোখের জল মুছলেন তিনি, আবারো চোখতুলে তাকালেন সেই আকাশের দিকেই। এবার লোকটির চোখে জল নেই। তার চোখে-মুখে খেলা করছে অপূর্ব হাসির ঝিলিক, চিকচিক করছে তার চোখ দুটি। এবার মুখ খুললেন লোকটি, চিৎকার করে বলতে লাগলেন, “স্রষ্টা, খুব আশা নিয়ে তো তুমি মানুষ সৃষ্টি করেছিলে। তাকে আবার সৃষ্টি করেছ সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে। দুটো হাত দিয়েছ তার, দুটো চোখ দিয়েছ তাকে, মাথাও দিয়েছ একটি। তার বুকের ভিতরে আবার একটি হৃৎপিন্ড দিয়েছ, যেটাতে নাকি ভালোবাসা থাকে, মমতা থাকে, থাকে মনুষ্যত্ববোধ। কিন্তু আমিতো কিছুই দেখছি না। মানুষের মানবতাবোধটা কোথায়, তুমি কী একটু বলে দিতে পারবে?” কিছুণ চুপ করে রইলেন লোকটি, তারপর বিড়বিড় করে বললেন, “ও, বুঝেছি! তুমি মানুষ সৃষ্টি করেছ। কিন্তু প্রাণীও যে সৃষ্টি করেছ তুমি, এটা ভুলে গিয়েছিলাম আমি। মানুষের হৃৎপিন্ড দিয়েছ, কিন্তু তাতে মনুষ্যত্ববোধটা না থাকলে সে মানুষটা মরে যায়, সেটা জানো? তখন থেকে যায় শুধু প্রাণীটা। আর সেই প্রাণীটা বেঁচে থাকে ওই হৃৎপিন্ডের জোরেই!”


নীলপদ্ম বিহীন একজন হিমু
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুলাই, ২০০৭ বিকাল ৫:২৯
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নিউইয়র্কের ডায়েরী ২: এভাবেই জীবন কেটে যাচ্ছে জীবনের নিয়মে

লিখেছেন কাছের-মানুষ, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:৩৯


লং আইল্যান্ডের একটি রাসবেরি ফার্মে গত সপ্তাহে

এক লোক একটা মাছি মারার জন্য পেপার গোল করে তাড়া করছে। মাছিটি উড়ে গিয়ে দেয়ালে বসল। লোকটা যেই মারতে যাবে, মাছিটি হাতজোড় করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

হোমিওপ্যাথি হচ্ছে একটি ধাপ্পাবাজ কিবিরাজি চিকিৎসা পদ্ধতি এর বৈজ্ঞানিক কোন ভিত্তি নেই

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১:০৪



হোমিওপ্যাথি যে একটি ভাঁতাবাজি চিকিৎসা পদ্ধতি তা আমি আগেও জানতাম কিন্তু আমি কখনো এর বিরুদ্ধে কথা বলিনি বা কোথাও কিছু লিখিনি- তবে আজ কি মনে করে চ্যাটজিপিটির কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ ভ্রম

লিখেছেন সামিয়া, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৩



চোখ বন্ধ করলেই আমি ধোঁয়া দেখি। ঘন, ধূসর ধোঁয়া। যেন কেউ ভেজা কাঠ জ্বালিয়েছে। তার সঙ্গে মিশে থাকে পোড়া কাপড়ের গন্ধ। কখনও মনে হয় প্লাস্টিক, কখনও মনে হয় পুরোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড় আমি ভালোবাসি

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:৪৩

পাহাড় আমি ভালোবাসি
...........................................



চললাম তবে তোমার সাথে,
হাতটি রেখে হাত বাড়াতে।
পিছুটানের বাঁধন ছিঁড়ে,
হারাবো ওই মেঘের ভিড়ে।

পাহাড় চূড়ায় রোদের হাসি,
শুনছো ! তোমায় ভালোবাসি।
চলবে নদী আপন বেগে,
নতুন কোনো আশার মেঘে।

ইচ্ছেগুলো পাক না ডানা,
আজকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ সম্পদ কি?

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২১



এই মুহুর্তে আমি গাজীপুর যাচ্ছি।
সময় সকাল দশটা। রবিবার। রাস্তায় জ্যাম যেতে অনেক সময় লাগবে। লাগুক। সমস্যা নেই, হাতে অনেক সময় আছে। আজ আমার কোনো কাজ নেই। বউ বাচ্চা বাসায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×