শ্রাবণের অশান্ত আকাশ, বৃষ্টি পড়ছে অঝর ধারায়। সামনে আমার বিস্তৃত সবুজ এক প্রান্তর। সেখানে বসে আছি, চুপচাপ বসে থেকে বৃষ্টিতে ভিজছি। কোথাও কেউ নেই, কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সবাই। পকেট থেকে ছোট্ট একটা চিরকুট বের করলাম আমি। তারপর চিরকুটটা মেলে ধরলাম চোখের সামনে।
তাতে লেখা- “হিমু সাহেব, আপনাকে একটা কথা বলবো। নয়ন নামের একজন আমাকে ভালোবাসতো, আর সে আপনার মধ্যেই বাস করে। আপনি তার দ্বিতীয় সত্ত্বা। নয়ন মনে হয় হারিয়ে গেছে। আপনার কাছে একটাই অনুরোধ যে, কোনোদিন যদি তার সাথে আপনার দেখা হয়, তবে তাকে বলবেন যে, অর্থি বলতে কেউ একজন তাকে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু এখন আর বাসে না। তবে যদি কখনো সে তার আপন রূপে ফিরে আসে, তাহলে অর্থি তাকে দূরে সরাতে পারবে না।”
সৃষ্টিকর্তা পরম মমতা নিয়ে মানুষ সৃষ্টি করেছেন, করছেন এখনো। নয়নও একজন মানুষ। অন্য সবার মতো তারও দুটি হাত আছে, দুটি চোখ আছে, দুটি পা আছে, আছে একটি মাথাও। অর্থিও একজন মানুষ, ঠিক নয়নের মতোই একজন মানুষ তিনি। নয়ন কথা রেখেছিল, অর্থি তার দেয়া কথা রাখেননি। নয়নকে ফিরিয়ে দেবার কোনো কারণ ছিল না তার, কিন্তু তারপরও কেন যেন অর্থি ফিরিয়ে দেন তাকে। নয়নের পবিত্র ভালোবাসা হেরে যায় অর্থির অহংকারবোধের কাছে। খালি হাতে ফিরে আসে নয়ন, বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় তার- অর্থি তাকে কখনোই ভালোবাসেনি। অর্থি নয়নের পবিত্র ভালোবাসাটাকে নিয়ে একটু মজা করেছেন, স্রেফ একটা মানুষের জীবনকে নিয়ে একটু মজা করেছেন তিনি! বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকে নয়ন, দাঁড়িয়ে থাকে নির্বাক হয়ে। নয়ন চেয়েছিল শুধু একজনকে, অর্থিকে। কিন্তু অর্থি যে আসলে কাকে চেয়েছিলেন, সেটা এখনো বোধগম্য হয় না নয়নের। আমার মনে হয় সেটা বুঝতে পারেন না অর্থি নিজেও।
অঝর ধারায় বৃষ্টি পড়েই চলেছে। সে বৃষ্টি জলে ভিজে যাচ্ছে সবুজ ঘাসগুলো, ভিজে যাচ্ছি আমি, আর ভিজে যাচ্ছে আমার হাতে ধরা ছোট্ট চিরকুটটি। যেটার এখন আর কোনো প্রয়োজনই নেই। হঠাৎ নয়নের চোখের দিকে তাকালাম আমি। মুহূর্তখানেকের জন্য হতবাক হয়ে গেলাম। ভিজে যাচ্ছে নয়ন, ভিজে যাচ্ছে তার চোখ দুটোও। নয়নের চোখের জল আর বৃষ্টির জল একাকার হয়ে মিশে যাচ্ছে যেন! আকাশটা কাঁদছে আজ, কাঁদছে নয়নও! আমি চুপচাপ বসে থেকে দুজনের কান্না দেখছি।
অতঃপর একদিন-
কিছুটা পথ গিয়েই থমকে দাঁড়ালেন লোকটি, তারপর আরও কিছুটা এগিয়ে গেলেন সামনের দিকে, এবং স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন সেখানেই। মনের ভিতর প্রচন্ড একটা কষ্ট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন লোকটি। বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিলেন, যেন কতদিন তিনি বুক ভরে শ্বাস নিতে পারেননি! মনের ভেতর কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়েই আকাশের দিকে তাকালেন তিনি। মুহূর্তখানেকের জন্য একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন সেদিকেই। অপূর্ব শরতের সুনীল আকাশ, সেখানে ভেসে বেড়াচ্ছে অজস্র সাদা-শুভ্র মেঘের দল। কোথায় যেন ভেসে যাচ্ছে সেগুলো, ভেসে যাচ্ছে দূরে কোথাও, চলে যাচ্ছে গন্তব্যহীন গন্তব্যে। চোখদুটো ছল ছল করে উঠলো লোকটির। তার জীবনটাও যে আজ এমনই, নেই কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য, নেই কোনো নিজস্ব ঠিকানাও। জীবনের গন্তব্যটা যে তিনি হারিয়ে ফেলেছেন অনেক আগেই! বুকের ভেতরে জমে থাকা নীল কষ্টগুলোকে তিনি মিশিয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন ওই নীল আকাশটার সাথে। ধীরে ধীরে আকাশটা আরও নীল হতে লাগলো, নীল কষ্টগুলো ধীরে ধীরে নীল আকাশটার সাথে মিশে যাচ্ছে যেন! মানুষের কষ্টগুলোকে বুকে ধারন করার জন্যই বোধয় আকাশটা এতো বিশাল, আর নীল কষ্টগুলো বুকে নিয়েই সে এতো বেশী নীল। মাথাটা নিচু করে ফেললেন লোকটি। চোখের জল লুকানোর জন্যই বোধয় মাথাটা নিচু করলেন তিনি, মাথাটা নিচু করলেন লজ্জায়। পরণেই কী যেন ভেবে মাথাটা উঁচু করলেন লোকটি। না, লজ্জা পাবার তো কোনো কারণ নেই তার। শুধু তিনিই কাঁদেন না, ওই বিশাল নীল আকাশটাও কাঁদে এক সময়। সেও কাঁদে প্রচন্ড দুঃখে। আর সে কান্নার জল আমাদের কাছে ধরা দেয় বৃষ্টি হয়ে। সে বৃষ্টি জলে আমরা ভিজে যাই, ভিজে যায় আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীটা। সে জল ধুয়ে নিয়ে যায় আমাদের ভিতরের কষ্টগুলোকে, ছুঁয়ে যায় আমাদের অন্তরটাকে। লোকটি আবারো তার মাথাটা নিচু করে ফেললেন। এবার তিনি লজ্জায় তার মাথাটা নিচু করেননি, মাথাটা নিচু করে ফেলেছেন অপরিসীম কৃতজ্ঞতায়। হাতদিয়ে চোখের জল মুছলেন তিনি, আবারো চোখতুলে তাকালেন সেই আকাশের দিকেই। এবার লোকটির চোখে জল নেই। তার চোখে-মুখে খেলা করছে অপূর্ব হাসির ঝিলিক, চিকচিক করছে তার চোখ দুটি। এবার মুখ খুললেন লোকটি, চিৎকার করে বলতে লাগলেন, “স্রষ্টা, খুব আশা নিয়ে তো তুমি মানুষ সৃষ্টি করেছিলে। তাকে আবার সৃষ্টি করেছ সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে। দুটো হাত দিয়েছ তার, দুটো চোখ দিয়েছ তাকে, মাথাও দিয়েছ একটি। তার বুকের ভিতরে আবার একটি হৃৎপিন্ড দিয়েছ, যেটাতে নাকি ভালোবাসা থাকে, মমতা থাকে, থাকে মনুষ্যত্ববোধ। কিন্তু আমিতো কিছুই দেখছি না। মানুষের মানবতাবোধটা কোথায়, তুমি কী একটু বলে দিতে পারবে?” কিছুণ চুপ করে রইলেন লোকটি, তারপর বিড়বিড় করে বললেন, “ও, বুঝেছি! তুমি মানুষ সৃষ্টি করেছ। কিন্তু প্রাণীও যে সৃষ্টি করেছ তুমি, এটা ভুলে গিয়েছিলাম আমি। মানুষের হৃৎপিন্ড দিয়েছ, কিন্তু তাতে মনুষ্যত্ববোধটা না থাকলে সে মানুষটা মরে যায়, সেটা জানো? তখন থেকে যায় শুধু প্রাণীটা। আর সেই প্রাণীটা বেঁচে থাকে ওই হৃৎপিন্ডের জোরেই!”
নীলপদ্ম বিহীন একজন হিমু
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুলাই, ২০০৭ বিকাল ৫:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




