সে অনেকদিন আগের কথা। প্রাইভেট রিকশা করে প্রতিদিন স্কুলে যেতাম ঠিক সাড়ে আটটা নাগাদ। সেই বন্দরবাজার পার হয়ে কালীঘাটে সুরমা নদীর প্রায় কোল ঘেষে শতবর্ষ পুরনো বিদ্যাপীঠ সিলেট পাইলট স্কুলে। শহরের প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ ট্রফিক পয়েন্ট- আম্বরখানা, চৌহাট্টা, জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার হয়েই রিকশায় করে পৌছতে হয় প্রতিদিনের গন্তব্যে। একা একজন প্যাসেন্জার রিকশায় দেখলে অনেকেই হাত বাড়িয়ে ইশারায় জানতে চাইতো শেয়ারে তাকেও নেয়া যাবে কিনা। সকালের ব্যস্ত সময়ে খালি রিকশা পাওয়া আসলেই এক ঝামেলা। যদিও প্রাইভেট রিকশায় বাড়তি কাউকে তোলা একেবারেই নিষেধ ছিলো, আমাদের ড্রাইভার তবুও মাঝে মাঝে আমার কাছে অনুমতি চাইতো অন্য কাউকে নেবে কিনা। মাত্র এক দুই টাকা বাড়তি রোজগারের তাগিদ দেখে আমিও প্রায়ই সায় দিতাম বেচারার আকুতিতে। আর লোকজনের সাথে কথা বলতে বলতে যেতে আমারও বিশেষ খারাপ লাগতো না। (অপরিচিত কারো সাথে চলাফেরার ভয়, সংকোচ, দ্বিধা কিংবা সন্দেহ তখনও আমদের নির্ঝন্ঝাট সিলেটী নাগরিক পরিবেশকে বিষময় করে তোলেনি)। তো এমনি এক সকালে আম্বরখানা থেকে আমার সহযাত্রী হতে রিকশায় উঠলেন এক পক্ককেশ, শশ্রূমন্ডিত, পরহেজগার টাইপ বৃদ্ধ। উঠেই শুরু হলো আমার বিস্তারিত খোজখবর, অতঃপর গল্পসল্প। একসময় কি একটা প্রসংগ মনে পড়ায় বৃদ্ধ হঠাত জানতে চাইলেন-
: তে বাবাজী ইস্কুলো ফড়াশুনা ঠিকমতো অয়নি আইজকাইল?
: জি, আমরাতো ঠিকমতো ফড়ি।
: আমিনু হুনি ইস্কুল-কলেজো আইজকাইল ফড়াশুনার তাকি ফলিটিক্সউ বেশী অয়। হুরু হুরু হুরুতাইনতে হালি মারামারি আর উষ্ঠাউষ্ঠী করইন নিযোরার মাঝে।
: ইতা কলেজো বেশী অয়, ইস্কুলো অতোতা নায়।
: তে তুমি কুন ফার্টি করোরে বাবা? হাসিনানি?
: জি না।
: খালেদা?
: জি না চাচা। আমি ইতা কুনোতাত থাকিনা। দরকার কিতা।
: মাশোয়াল্লাহ! ইতা তাকি দুরই থাকিওরে বাবা। দেখবায় বউত বড় অইবায় জীবনে। আমার তো এক বাত্যিউযা আছে হালি আছেউ অতা লইয়া। মারামারি আর গালাগালি। জিগাইলে কিতা কয় জানোনি? কয় ' হয় মারতাম কি মরতাম!'। আমি কই ' হেই বেটা, তুই ই আরেক বেটির ফার্টির লাগি মরিযিতে নি? তুই মরলে তারা তো ছুংগাও ফুড়াইতো নায়। খানোখা জীবন নাশ কররে। ইতা বাদ দিলারে বাবা। চাচার হুরুত্তা মুরুত্তা নাই, যা আছে হখলতা তো তোর। একখান কথা রাখ- তুই বেবসা টেবসা কর, ফয়শা যা লাগে ফাইবেনে। '
আমি চুপ করে শুনতে থাকি বৃদ্ধের কথা।
: তে কইলাম কি মরলাম আরকি রে বাবা। আমারে ফারলে হুরইনদি বাইড়ায়! কয় 'ফালাও তোমার বেবসা-টেবসা। লন্ডন যাইমুগী দুইদিন বাদে। এখন কিছু ফলিটিক্সো থাকলে, ফরে ফয়শা রুজী করি লন্ডন থাকি আইয়া এমপি, মিনিস্টার অইযিমু।' আমার সুনার ছান্দর বাতিজা, অউ বুদ্ধি লইয়া আছইন হারাদিন। ফারলামনা ফিরাইতাম।
বৃদ্ধের কথায় আবেগ টের পাই স্পষ্ট।
:একটা হুরুত্তা দিছইন না আল্লায়, বাতিজারে বুকো করিয়া রাখতাম ছাই কিন্তু তার বুকো তো আমি নায়!
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর হঠাত্ বলে উঠেন,
: এই দুই খানকী আমার বাত্যিউযারে খাইলো¬! আমার সব শেষ করিলিলো। তুমি দেখিওরেবা আল্লা। মরবার আগে আল্লায় যেনো আমারে তারার শেষ দেখাইয়া মারইন।
আমি চুপ করেই থাকলাম।
অন্যমনষ্ক বৃদ্ধ নেমে গেলেন পরের ট্রফিক পয়েন্টে, তার গন্তব্যে। দরকার নাই বলার পরেও জোর করে আমার ভাড়াটাও গুজে দিলেন রিকশাওয়ালার হাতে। একপা এগিয়ে আবার কি মনে করে ফিরে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বল্লেন, 'অনেক বড় হও'।
আমার প্রিয় সিলেট নগরী আজ অনেক বদলে গেছে। কীন ব্রীজে আরও মরচে পড়েছে, সুরমায় জেগেছে চর। সেই বৃদ্ধ আজ আর নেই জানি। তবুও মনে মনে ভাবি, বৃদ্ধের স্বপ্নের সেই দিন কি আসলেই কোনোদিন আসবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






