somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"ভয়েস ওভার আইপি উন্মুক্ত করে দিনঃ জাকারিয়া স্বপন" দৈনিক প্রথম আলো থেকে সংগৃহীত

২৭ শে মার্চ, ২০১০ সকাল ১০:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নিচের লেখাটি ২৬শে মার্চে প্রকাশিত। কিন্তু লেখক ভয়েস ওভার আইপির বাণিজ্যিক দিকটা আরো পরিস্কার করে লিখতে পারতেন।


"গত মাসে ভয়েস ওভার আইপির ওপর লেখা একটি বই প্রকাশ করেছে সিসকো সিস্টেম। আমার সঙ্গে বইটির সম্পর্ক হচ্ছে, এর তিনজন লেখকের একজন আমি। বইটিতে ভয়েস ওভার আইপি, ভিডিও ওভার আইপি, কোলাবোরেশন, ভবিষ্যতের যোগাযোগব্যবস্থা কেমন হবে, কোনদিকে এগোচ্ছে প্রযুক্তি ইতাদি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ইংরেজিতে লেখা বইটি বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাওয়া যাচ্ছে। একটি বিষয় এখানে উল্লেখ না করলেই নয় যে এই পৃথিবীতে সিসকো হলো ভয়েস ওভার আইপির লিডার। বইটি নিয়ে যখন প্রশংসা শুনতে শুরু করছি, তখন স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের ভালোলাগা কাজ করে। কিন্তু কয়েক দিন ধরে এটাই আমার জন্য বিড়ম্বনার বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোকজন আমাকে দাঁড় করিয়ে যে প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করছে, তার কিছু নমুনা এখানে দিচ্ছি: ‘এই, আমি তো ভাবতাম তোমার দেশ মিয়ানমার বা উত্তর কোরিয়ার চেয়ে ভালো!’, ‘তোমরা এখনো এটা নিয়ে পড়ে আছো!’, ‘তোমরা কি পেছনের দিকে হাঁটছো নাকি?’, ‘তোমরা একের পর এক ফোন কোম্পানি কীভাবে বন্ধ করে দিতে পারো!’ এমন আরও অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে যখন কয়েকটি টেলিফোন কোম্পানি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমার কাছে এর কোনো উত্তর থাকে না। মাথা নিচু করে থাকি।
সিসকোর মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠান প্রতিনিয়ত নজর রাখছে, সারা পৃথিবীতে প্রযুক্তি খাতে কী হচ্ছে। বিশেষ একটি দলই আছে, যারা পৃথিবীর এই খবরগুলো একত্র করে পোস্ট করে প্রতিদিন। বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের কোনো ঘটনাই বাইরের দেশের চোখ এড়িয়ে যায় না। এই ঘটনা খুবই নেতিবাচক একটি উদাহরণ তৈরি করল। এই দেশে যদি সত্যি সত্যি তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়া আনতে হয়, তাহলে সিসকো, মাইক্রোসফট, ইয়াহু, গুগল, ইন্টেল, অ্যাপল, এইচপি ইত্যাদি বড় বড় প্রতিষ্ঠানের ডেভেলপম্যান্ট অফিস বাংলাদেশে আনতে হবে। এগুলো আনতে পারলেই দেখা যাবে, একটা বিশাল ইতিবাচক পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। এখন এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের কেউ কেউ নিশ্চয়ই ভাবতে পারে, যে দেশ মুখের কথায় পাঁচটি ফোন কোম্পানি বন্ধ করে দিতে পারে, তারা না জানি আরও কত কিছুই পারে। ভিওআইপি নিয়ে যে সমস্যা দেখা দিয়েছে, ঠাণ্ডা মাথায় এর একটি সমাধান নিশ্চয়ই করা যেত।
আমরা মানি কিংবা না মানি, এটাই সত্যি যে এই পৃথিবীতে প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে আমেরিকা হলো সবচেয়ে এগিয়ে। যোগাযোগব্যবস্থা এবং নতুন নতুন উদ্ভাবনীতে এই দেশের জুড়ি নেই। এই দেশের অনেক সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তিতে এর আশপাশে আর কেউ নেই। তবে ভারত বেশ দ্রুত সামনে এগিয়ে আসছে বটে।
আমেরিকার সঙ্গে টেলিযোগাযোগব্যবস্থা পৃথিবীর সব দেশেরই ভালো। এমনও হয়েছে যে ঢাকা থেকে কলকাতার লাইন পাওয়া যাচ্ছে না; কিন্তু ঢাকা থেকে আমেরিকা হয়ে কলকাতায় কথা বলা যাচ্ছে। আমেরিকাকে ধরা হয় টেলিযোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু। সব দেশ এর সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেছে। সেই হিসাবে আমেরিকা থেকে যে দেশে কথা বলতে যত বেশি খরচ হয়, তাকে আমরা ধরে নিতে পারি তত বেশি পিছিয়ে পড়া দেশ। কিছু উদাহরণ দিলে বিষয়টি বোঝা যাবে।
যেমন আমেরিকা থেকে ইউরোপের অনেক দেশে বিনা পয়সায় কথা বলা যায়। এর অর্থ হলো, এরা যোগাযোগব্যবস্থাকে এতই সহজ করে ফেলেছে যে নিজেদের আমেরিকার পাশাপাশি নিয়ে এসেছে। এরা যোগাযোগব্যবস্থা থেকে পয়সা বানানোর চেষ্টা করছে না; বরং এটাকে ব্যবহার করে অন্যান্য ক্ষেত্র থেকে মুনাফা করছে। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার অন্যান্য বিষয়কে প্রাধান্য দিচ্ছে। একটি দেশে বিদ্যুত্, পানি যেমন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়; টেলিযোগাযোগও তেমনি। এটাকে যত সহজ করা যায়, ততই মানুষের জন্য মঙ্গল। আমেরিকা থেকে আফ্রিকার দেশগুলোতে কলচার্জ খুব বেশি। এর অর্থ হলো, এরা তথ্যপ্রযুক্তিতে এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এখন আমেরিকা থেকে ভারতে একটি ফিক্সড বিল দিয়ে যত খুশি কথা বলা যায়। কারণ ভারত এই প্রযুক্তিকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। আমরা এখনো সেই পুরোনো বেড়াজালে আটকা পড়ে আছি। কিছুতেই আমরা এই বন্ধন থেকে যেন মুক্ত হতে পারছি না।
পৃথিবীর যাবতীয় দেশ যখন ভয়েস ওভার আইপি উন্মুক্ত করে দিয়ে দেশকে সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, সেখানে আমরা কেন বারবার এটাকে পুঁজি করে পুরো দেশকে জিম্মি করে রাখছি? কার সুবিধার জন্য?
বিএনপি সরকার তার পুরো সময় এটাকে নিজেদের ব্যবসার কাজে ব্যয় করল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে এই সেবার লাইসেন্স দিল। এখন শুনছি এই সরকার আরও কিছু লাইসেন্স দেবে। কিন্তু জনগণের দাবি যদি হয় সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়া, তাহলে সমস্যাটা কোথায়! যখনই সরকার এটার ওপর বাড়তি কোনো ট্যারিফ রাখবে না, তখনই বিদেশ থেকে কথা বলার খরচ অনেক কমে যাবে। তখন আর কাউকে এটা নিয়ে চোর-পুলিশ খেলতে হবে না। এই সমস্যার চীরতরে একটা সমাধান হয়ে যেতে পারে।
সরকারের দিক থেকে বলা হয় যে সরকার রাজস্ব হারাবে। এখনো কি সরকার সঠিক রাজস্ব পাচ্ছে? এনবিআর যেমন যেকোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে কর আদায় করে, এটাও তাই। কয়েকটি দেশ ছাড়া পৃথিবীর সব দেশ এটাকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এটাকে এভাবে বেঁধে রাখা যায় না। যে জিনিস বেঁধে রাখা যায় না, সেটাকে বাঁধতে গেলেই যত বিপত্তি।
আমাদের দেশের তরুণ গোষ্ঠীর কাজের তেমন একটু সুযোগ নেই। লাখ লাখ ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আসছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে এই লাখ লাখ তরুণের কাজের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া যায়। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই জটিল প্রযুক্তি তারা পেটের ক্ষুধার তাড়নায় ঠিকই শিখে ফেলেছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা যে প্রযুক্তি শিখতে পারে, এটাই কি তার বড় প্রমাণ নয়?
আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলে দেশের মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। কিন্তু এখন যা হচ্ছে, সেটা অনেক ক্ষেত্রে তিন ফুট উঠে দুই ফুট নিচে নেমে যাওয়া। মাঝে মাঝে মনে হয় চার ফুট নিচেও নেমে যাচ্ছি। এই ভয়েস ওভার আইপি আমাদের সবার মুখে কালি মেখে দিয়েছে। জিজিটাল বাংলাদেশ বিষয়ে যাঁরা প্রধানন্ত্রীকে পরামর্শ দিচ্ছেন, যাঁরা এর স্বপ্নদ্রষ্টা, তাঁদের চিন্তাটা প্রশংসনীয়। কিন্তু বাস্তবায়নে আরও পরিপক্ব হওয়া জরুরি। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ, আপনি দয়া করে তাঁদের ডেকে, এটাকে উন্মুক্ত করার প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করুন। এটি আমাদের ওপর একটি রাহুর মতো ভর করে বসে আছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ, আপনি দেশকে সেই রাহুর হাত থেকে মুক্ত করার উদ্যোগ নিন।
সিলিকন ভ্যালি, যুক্তরাষ্ট্র
জাকারিয়া স্বপন: তথ্যপ্রযুক্তিবিদ।
[email protected]"
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×