somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফারিস উদেহ : ইথারে ইথারে ভাসে পাথরের কণ্ঠস্বর

১৩ ই ডিসেম্বর, ২০১৭ সন্ধ্যা ৬:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আজ যদিও ৮ নভেম্বর নয়, তবু এই ছবিটা আবার দেখা দরকার । একটা ছেলে ট্যাংকের বিরুদ্ধে পাথর হাতে দাঁড়িয়েছে । ছুঁড়েছেও । তারপর শহিদ হয়ে গেছে ।

সন্দেহ নেই, একটা পাথর ট্যাংক প্রতিরোধ করার ক্ষমতা রাখে না । একটু হাস্যকরই মনে হয় । তবু এটা প্রতিরোধের একটা স্টাইল ।

যেমন— গত সোমবার (১১ ডিসেম্বর) ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ৫৬ জন সাংসদ ব্রাসেলসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কাছে ১২ মিলিয়ন ইউরো ফেরত চেয়েছে । এই ১২ মিলিয়ন ইউরো ইউরোপীয় ইউনিয়ন ফিলিস্তিনের স্কুল-কিন্ডারগার্টেনসহ নানা স্থাপনার কাজে ব্যয় করেছিল, যা ইসরায়েলি সৈন্যরা ধ্বংস করে দিয়েছে । তাই তারা টাকাটা ইসরায়েলের কাছে ফেরত চেয়েছে । এমনকি পার্লামেন্টের সদস্যরা গত শুক্রবার ইসরায়েলি পত্রিকা হার্টেজে একটি বড় বিজ্ঞাপন দিয়েছে— ‘মিস্টার নেতানিয়াহু, ব্রাসেলসে শুভাগমন, কিন্তু অনুগ্রহ করে আপনার দেনার কথা ভুলবেন না ।’

দারুণ । এটা প্রতিরোধের নতুন স্টাইল । আমার মনে হয়, এই স্টাইলটা ফারিস উদেহ-এর স্টাইলের একটা প্রতিফলন মাত্র । ফারিস ট্যাংকের সামনে পাথর হাতে দাঁড়াতে পেরেছিলো বলেই এখন পৃথিবী জানতে চাইছে যে, এই পাথরটা কেনো তার হাতে? এটা কি শিশুদের স্কুলের ছাদ ধ্বসে পড়া পাথর? না হয় শিশুর হাতে বই না হয়ে পাথর কেনো?

তবে ফারিস উদেহ-এর জন্মটা এমন ডিসেম্বরেই হয়েছিলো । ১৯৮৫ সালে । সে-হিসেবে আমার থেকে ছ’সাত মাসের বড় সে । এবং ২০০০ সালের ৮ নভেম্বর ইসরায়েলি সৈন্যরা তাকে গুলি করে না মারলে সে ৩১ বছরের একটা জোয়ান ছেলে হতো । অন্য ফিলিস্তিনি বন্ধুদের মতো তার সাথেও আমার বন্ধুত্ব হতো হয়তো । একটা নারীর সাথে তার প্রেম-পরিণয় হতে পারতো । আমার ছেলের মতো হয়তো সে-ও তার সন্তানের নাম রাখতো ওসমান ফারিস । হতে পারতো ।

জানা যায়— ফারিস গাজা সিটির জায়তুন এলাকায় মা-বাবা ও আট ভাইবোন নিয়ে থাকতো । আপনার কী মনে হয়, তাদের পরিবারের একজনও এখন বেঁচে আছেন? ২০০০ সালের পর থেকে ১৭ বছর । এর মধ্যে গুলি খেয়েছেন প্যালেস্টাইন কমান্ডার খলিল ওয়াজির (২১ এপ্রিল ১৯৮৮), গানশিপ হামলায় মারা গেছেন হামাসের প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আহমদ ইয়াসিন (২২ মার্চ ২০০৪), বিষক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাত (১১ নভেম্বর ২০০৪) । ১৭ বছরে গাজার ৪ লাখ অধিবাসীর অন্তত ৫০ হাজার কি শহিদ হন নি? সুতরাং খুব হিসেব করে বলবেন, উদেহ পরিবারের কেউ কি বেঁচে আছেন?


শুনেছি— উদেহ ডানপিটে ও সাহসী কিশোর ছিলো । একবার নাকি এক ভবনের ছাদ থেকে ৮ ফিট দূরত্বের আরেকটি দোতলা ভবনের ছাদে লাফিয়ে পড়েছিলো সে । মরে নি । এমনকি যে-ট্যাংকের সামনে সেদিন সে পাথর হাতে দাঁড়িয়েছে আর এসোসিয়েটেড প্রেসের (AP) ফটোসাংবাদিক লরেন্ট রিবরস তার ছবি তুলেছে, সে-ট্যাংকটাও তাকে মারে নি । ১০ দিনে পরে ইসরায়েলি সৈন্যরা তাকে গুলি করে মেরেছে । কেনো গুলি করে মারতে হলো, এই প্রশ্নের উত্তর ইসরায়েল জানে । কেননা, ট্যাংকে পাথর পিষে ফেলা যায়, কিন্তু পাথর হাতে একটা কিশোরকে পিষে ফেলা সহজ নয় । তার চেয়ে দূর থেকে ‘আত্মরক্ষার খাতিরে গুলি করতে বাধ্য হওয়া’ সহজ ।

সে-বছর সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শুরু হয় । জানা গেলো— উদেহ স্কুলে আসে না । হেডমাস্টার বাসায় নালিশ করলেন । বাবা প্রথমে শাসালেন । তারপর হাত পা বেঁধে ছাদে রেখে এলেন । মা চুপি চুপি গিয়ে তাকে রাতের খাবার খাওয়ালেন । কিন্তু ফারিস সুযোগ পেয়ে পালিয়ে গেলো । খুঁজতে গিয়ে মা দেখলেন সে ইন্তিফাদা মিছিলের প্রথম সারিতে । একেবারে ইসরায়েলি সেনাদের মুখোমুখী । কেনো? ১৪ বছরেই কি ছেলেটা বীর হয়ে গেছে? সে বীরত্বের বোঝেটা কী?

তার মা ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন— সে টিভি ক্যামেরা দেখলে দূরে থাকতো । কারণ হয়তো টিভিতে তার বাবা তাকে দেখে ফেলবে । এমনকি তাকে বলেছি, ঠিক আছে, তুমি যদি পাথর ছুঁড়তেই চাও তাহলে আড়ালে থেকে ছোঁড়ো । তুমি কেনো একেবারে সামনে চলে যাও, যেখানে বড়রাও যায় না? ফারিস উত্তর দিয়েছে, আমি এসব ভয় পাই না ।

ওকে, বুঝলাম সে ভয় পায় না । কিন্তু সে ইন্তিফাদায় যোগ দিলো কেনো? মাতৃভূমি হানাদার মুক্ত করতে? মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিলো তার? যা আজকাল হরহামেশাই আওড়ানো হয় । মাত্র ১৪ বছর বয়স । এই বয়স চেতনার না । সুকান্তের কবিতার ১৮ বছরও হয় নি তার । জানা গেছে— ১৭ বছর বয়সী তার কাজিন সাদিকে ইসরায়েলি সৈন্যরা হত্যা করে । এবং সেদিনই উদেহ সাদির খুনের বদলা নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছে।

যদিও উদেহ নেই ১৭ বছর হয়ে গেছে এবং ২০০০ সালের ২৯ অক্টোবর ট্যাঙ্কের সামনে থেকে উদেহের ছবি তুলে এপির সাংবাদিক বিখ্যাতও হয়েছে, কিন্তু একটা নিষ্প্রাণ পাথরকে যেভাবে প্রাণ দিয়েছে, তা বেঁচে থাকবে আরও হয়তো ১৭ শ’ বছর কিংবা আরও বহুদিন । শুধু পাথরকে নয়, অজস্র মানুষের পাথর-বিবেকেও প্রাণ এনে দিয়েছে ফারিস ।

আজ যে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ৫৬ জন সদস্য ইসরায়েলের কাছে ধ্বসের পড়া পাথরের মূল্য ফেরত চেয়েছে, এটাই ফারিস-স্টাইল । খুনের বদলা নিতে গিয়ে দেখিয়েছে সে— বদলা নেওয়ার, বদলা চাওয়ার আরও বহু রীতি আছে, যা সশস্ত্র যুদ্ধের চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে । বুঝিয়েছে— বোমার আঘাতে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার পরও একটি পাথরকে যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে তা বোমার চেয়েও বুমেরাং হতে পারে ।


সূত্র ও ছবি :
১. ওয়াশিংটন রিপোর্ট অন মিডলইস্ট অ্যাফেয়ার, লিংক : http://bit.ly/2C5iZ4k
২. আন্তন লা গার্দিয়া রচিত ‘ওয়ার উইদাউট এন্ড’, পৃষ্ঠা ২৬৪
৩. ওয়াশিংটন পোস্ট, লিংক : http://wapo.st/2B4mCcR
৪. দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, লিংক : http://nyti.ms/2C3SwEm
৫. দৈনিক প্রথম আলো, লিংক : http://bit.ly/2kZeXq6
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ডিসেম্বর, ২০১৭ সন্ধ্যা ৬:৩৩
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৫ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৭


আজ দেশজুড়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। ২৪ -এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিভ্ন্নি সময়ে বহু নিরীহ প্রাণ অকালে ঝরেছে। আবু সাঈদ, মুগ্ধ ছাড়াও নাম জানা-অজানা হাজারো ব্যাক্তি তাদের প্রাণ হারিয়েছেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

তেহরানের ছায়া কি এখন ঢাকা সেনানিবাসে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:০১


সোমবার সকালে জলসিঁড়িতে একটা অনুষ্ঠান হলো। ফিতা কাটা, ফুলের তোড়া, বক্তৃতা, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, স্বাভাবিক একটা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যা যা থাকে সবই ছিল। সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান নিজে হাজির, পাশে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাতিঘর (Lighthouse)

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:৪৬



বাতিঘর (Lighthouse)

বাতিঘর নিয়ে সেই ছোট্টবেলা থেকেই আমার অনেক কৌতুহল ছিল। কেন ঐ বয়সেই বাতিঘর নিয়ে আমার এতটা আগ্রহ ছিল, তার কারণ আজও খুঁজে পাই না। অথচ আমি নিজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

"‘৫ই আগস্ট সবার জন্য ভালো হয়েছে’- একটি বক্তব্যের রাজনৈতিক পাঠ"

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:৪৯



"‘৫ই আগস্ট সবার জন্য ভালো হয়েছে’- একটি বক্তব্যের রাজনৈতিক পাঠ"

"৫ই আগস্ট সবার জন্য ভালো হয়েছে। শেখ হাসিনার প্রয়োজন ছিল বিশ্রাম। আওয়ামী লীগের দরকার ছিল শুদ্ধিকরণ। অন্যান্য দলগুলোরও... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে বিষয়ে মজিবর ও হাসিনা এক বিন্দুও ভুল করেনি!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:২৫


বাংলাদেশের ইতিহাসে মজিবরের শেষ শাসন কাল ও হাসিনার শেষ শাসন কাল দুটি ভিন্ন সময়ে হলেও গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত মিল বহন করে। নির্বাচনী বৈধতার নিরিখে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের সংগে ২০১৪, ২০১৮... ...বাকিটুকু পড়ুন

×