somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঘুণপোকাময় ভালোবাসা এবং চড়ুইএর সংসার

১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ সন্ধ্যা ৬:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



রোজ রোজই চড়ুইগুলো আলোচনায় মজে। ওদের আলোচনার উন্মাদনায় ঝাঁঝিয়ে ওঠে মন। মাঝরাতে যখন অন্ধকারের একাকীত্বতা ঘিরে ধরে চড়ুইগুলোকে খুব তীব্রভাবে অনুভব করি। আমি ছোটোখাটো মানুষের একটি ঘর যার আয়তনের তুলনায় বইয়ের সংখ্যা একটু বেশীই বেশী। তাই অনেক আপন হওয়া সত্ত্বেও বাধ্য হয়েই পছন্দকে অগ্রাহ্য করে বয়স আর প্রয়োজনের ক্রম সাজিয়ে বইগুলোকে বেল্কুনির ওপরে ঠাঁই দিয়েছিলাম। বছরেরও বেশী সময় ধরে ওদের বাস ওখানে।
সবুজ প্রকৃতি সাথে প্রিয় আর অত্যন্ত আপন কিছু নিমগাছের চিরল চিরল পাতা ভেদ করে আসা দক্ষিণা বাতাসের স্নিগ্ধতায় মুখরিত থাকে ছোট্ট বেলকুনির পরিবেশ। পূর্ব আর দক্ষিণ দিকের জানালা ছাপিয়ে ছন্দময় বাতাস ছোট্ট এই কক্ষেও কেমন যেন এক শান্তির মূর্ছনা ছড়িয়ে দেয়। অত্যন্ত স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় ডাকতে থাকা কাকগুলো দুষ্টুমিতে দুলতে থাকে নিমগাছের ডালে ডালে। পরিবেশ বুঝে ভোরের সূর্য আর পূর্ণিমার চাঁদ প্রথমেই এই বেলকুনি আর আপন এই কক্ষে উঁকি দেয়। পর্দাবিহীন জানালা আমার। মাঝরাতে তীব্র চাঁদের আলো আমার ঘুমকাতুরে চোখ ভিজিয়ে দিয়ে আমাকে শূণ্য মহাবিশ্বের পূর্ণ আনন্দে স্নান করিয়ে দেবার সুযোগ থেকে যেন বঞ্চিত না হয় এবং ভোরের সূর্যের মিষ্টি কিরণের আশীর্বাদ হতে আমার তিন আঙুলে ছোটোখাটো কপালটি যেন বঞ্চিত না হয় সেকারণেই পর্দার ব্যবহার থেকে বিরত থাকা।
মোটের উপর বলতে গেলে ইট পাথরে খোদাইকৃত এই বিল্ডিং এ সুষ্ঠু প্রাকৃতিক স্বাদের কোনো অভাবই হয়না কখনো। আর সেই সুযোগেই রীতিমতো আঁখড়া গেঁড়ে বসেছে কিছু চড়ুইপাখি। কয়েক বছরে যেমন করে বেড়ে উঠতে উঠতে আমার ভার্সিটি জীবনের অবসান ঘটল, তাদের সংসারও ছেলে-মেয়ে-নাতি-নাতনী নিয়ে বিশাল আকার ধারণ করলো। তারা বেল্কুনির উপরে আমার সাজানো বইয়ের সেই তাকে তাকে সুবিশাল এক রাজ্য গড়ে তুলেল। রাজা-প্রজাসহ তারা এতোই বেশী জনসংখ্যায় যে তারা নিজেদের অবশ্যই অনেক শক্তিশালী মনে করে।এর প্রমাণ পাওয়া যায়, আমি যখন জানালার পাশে শুয়ে-বসে পড়াশুনা করি মাঝে মাঝেই তারা কখনো একা কখনো সদলবলে এসে জানালার গ্রীলে ভর করে বসে। আমি প্রায়ই চিন্তায় পড়ে যাই যে, ওরা আমাকে দেখছে নাকি আমি ওদের! আবার, নিজেদের মাঝে কি সব আবোল-তাবোল বলাবলি শুরু করে দেয়। নিজেকে তখন এলিয়েন মনে হয়! অবশেষে আমিই চোখ নামিয়ে ফেলি হার মেনে।
বছরতিনেক আগে, খুব জরুরী একটি বই নামাতে গিয়ে একবার ডিমে হাত পড়াতে রাগে দুইদিন বাসায় ফেরেনি চড়ুই। খুব মন খারাপ হয়েছিল আর অপরাধী লাগছিল মনে মনে। বারবারই মনে হচ্ছিল আমি ওদের বাসা ভেঙ্গে দিলাম কিনা আর ওদের ফিরে আসা কামনা করতে লাগলাম গভীরভাবে।
অবশেষে ফিরে এলো। আমি আর কোনোদিন কিছু বলিনি ওদের।
আর এতো বছরে সেই সুযোগে বিশাল বংশ বিস্তার করে সুন্দর এক সংসার হয়েছে চড়ুইদের। কত যত্নে আর আদরে মা চড়ুই তার বাচ্চাকে ঠোঁটে তুলে খাবার খাওয়ায়! কত ভালোবাসাময় এই চড়ুই সংসার! অন্যের ঘরে নিজেদের কেমন সুন্দর আশ্রয় খুঁজে নিয়ে সব একসাথে সুখে বসবাস করছে। রোদবৃষ্টি, ঝড়-ঝঞ্ঝায়ও কতো নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ থাকে একে অন্যের প্রতি খড়-কুটো দিয়ে বানানো এই সংসারে।
এবছর যখন প্রচন্ড শীত পড়ল তখন শুধু কম্বল দিয়ে আর ঠান্ডাকে নিজের কাছে আসতে বাঁধা দিতে পারছিলামনা। এদিকে বেল্কুনির উপরে শিমুল তুলোর দুটি সিঙ্গেল লেপ একসাথে জোড়া বেঁধে রাখা হয়েছিল অনেকদিন আগে। ভাবলাম এবার ওগুলোর সঠিক ব্যবহার করতে হবে। তাই বেল্কুনিতে উঠে গেলাম। পাশেই ছিল ওদের বাসা তাই অতি সাবধানে হাত দিলাম। কিন্তু হঠাৎ দেখি কিছু বাচ্চা চড়ুই চেঁচাতে লাগল। ওমা! এ কী কান্ড! শীতে তারা স্থান বদল করে লেপের মাঝে এসেছে! আমি যতো এগোই ততোই তারা গলা উঁচিয়ে চেঁচানোর মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়।
বুঝলাম, নিজেদের আর পুরো সংসারটিকে রক্ষার জন্যই তাদের এই চিৎকার ,আহাজারি। কি জানি কি বলছিল ওরা। পশুপাখির ভাষা বুঝলে হয়ত প্রতিটা কথা বুঝতে পারতাম। তবে, টিকে থাকতে দেবার আকুতি সেখানে অবশ্যই ছিল। আমি সেই আকুতিতে ব্যর্থ হয়ে খালি হাতে নেমে এলাম।

হঠাৎ মনে হল, টিকে থাকবার ক্ষমতা যদিও মানুষের বেশী কিন্তু এর অধিকার মানুষের চেয়ে এই চড়ুইদেরই বেশী। মানুষ যা পারেনা, ওরা তা পারে। চড়ুই এর ঘরে জন্ম নিয়ে ওরা কিন্তু চড়ুই-ই হয়ে উঠছে অথচ মানুষের ঘরে জন্ম নিলেই মানুষ হয়ে উঠছেনা। মানুষ হবার গ্যারান্টি নেই যেন!

আধুনিক গোলোক ধাঁধাঁময় মরিচীকার প্রতিই বেশী লালায়িত এই সমাজের মানুষেরা। ইট-পাথর আর অত্যাধুনিক সাজসজ্জাময় ঘর বানাতে মানুষ এতো বেশী মোহিত যে , এসব মোহের ভীড়ে পড়ে কখন তাদের মনের ঘর বিলীন হয়ে যাচ্ছে সেদিকে যেন কোনো খেয়ালই নেই। অথচ, এই ঘরেই সুখ নামক শুকপক্ষীর বাস! অতি আধুনিক মরীচিকাময় চাহিদাগুলো যেন ঘুণপোকা! ঘুণ ধরিয়ে দিচ্ছে এই ঘরে। তাই, অতি সহজেই চিতার মতো জ্বলে ওঠে যেকোনো সময়।
আজ মানুষের ঘরে ঘর তুলে সংসার গড়ে চড়ুই আর মানুষ নিজের ঘরে বাস করে সংসার ভাঙ্গে, বিচ্ছেদ হানে। আজকাল মানুষের মনে, দেহে, ভালবাসায়, চিন্তা, চেতনায়ও ধরেছে ঘুণপোকা। অসামাজিক কাজগুলো সামাজিক মর্যাদায় অধিষ্টিত হচ্ছে। আর যা কিছু প্রকৃত সামাজিক তা নিতান্তই অসামাজিক। সামাজিক সুরুচিপূর্ণ কাজ নেহাতই সেকেলে। আজ আমার সমাজ কতোইনা আধুনিক। একটি একদিনের ভালোবাসা দিবসে কতো জুটি তাদের ভালবাসা অন্যদের সামনে জাহির করবার জন্য প্রকাশ্যে চুমু আদান-প্রদানের উৎসব আয়োজন করছে। আর বছরের অন্য তিনশত চৌষট্টি দিন খুব একান্তেই ভাঙনের গানে অবেলার রোদ পোহাচ্ছে। সেকালে নাকি প্রকাশ ছিল কম, বন্ধন ছিল বেশী। যোগাযোগের মাধ্যম ছিল সীমিত, পারস্পরিক টান ছিল হাজার বছর দেখতে না পাওয়ার অস্থির উন্মাদনায় ভরা। অবশ্য, এসব এখন খুব সেকেলে।
আর এসব নিয়ে কথা বলার আমি কে? হ্যাঁ, তাই এবার চড়ুই প্রসংগ।
চড়ুই কতো দূর হতে খাবার এনে বাচ্চাকে খাওয়ায়। এতো ছোট্ট একটি পাখি হওয়া স্বত্বেও কতো যত্নে বড় করে তুলছে সন্তানদের। আর, মানুষের ঘরে শিশু কাঁদে, রাস্তায় পড়ে থাকে অনাদরে, অনাহারে। আবার, হাজার ভোগবিলাসিতার মাঝে থেকেও কেঁদে ওঠে শিশুমন। আধুনিক, সব অতি আধুনিক- মা-বাবা এবং তাদের ভালবাসা, পরিবার এবং তাদের বন্ধন। এসব মনুষ্য ছাঁচে গড়া বাবা-মা বেশী ভালো খাবারের সন্ধানে গিয়ে নিজেরাই একসময় হারিয়ে যায়। তাদের আর বাবা-মা হয়ে ওঠা হয়না।
-তাই, মানুষের ঘরে টিকে থাকে শুধুই চড়ুয়েরই সংসার। মানুষের ঘরে হয়না মানুষের সংসার। আমি তাই শীত নিবারণের অন্য উপায় খোঁজ করলাম। চড়ুই পরিবারকে শান্তিতে বসবাস করবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করলামনা আর। কারণ, যে সংসার এই ঘরে আমি-আপনি-আমরা গড়তে পারিনা, সে সংসার ওরা গড়েছে। তাদের সংসার ভাঙার অধিকার আমার নেই। আজ থেকে এ ঘর চড়ুই এর ই।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~ কথা কিছু কিছু কাল্পনিক ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~ সমস্যা ছাড়ছেনা পিছু- মানসিক ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
***সবাইকে এক দাঁড়িপাল্লায় মাপলে চলবেনা। মানব-বন্ধন, ভালবাসা এতোকিছুর মাঝে আজও টিকে আছে,থাকবে। আর কখনো যদি এমন দিন চলে আসে যখন ভালোবাসা-বন্ধনের সকল অণু-পরমাণু ছিটকে ছিটকে ক্রমেই দূর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে তখন বুঝতে হবে পৃথিবীর আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে এসেছে। তাই, সালাম যাদের জন্য এখনো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যায়নি।***
ভালোবাসা ভালো থাকুক।মনুষত্ব টিকে থাকুক।
সবাইকে ফাল্গুনের শুভেচ্ছা.।.।.।.।.
ছবিঃ অ্যামাজান এবং গুগল

সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৪:৪৫
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের হ্যালোইন উদযাপন

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩


আজ ছিল হ্যালোইন। এই উৎসব ফসল কাটার মৌসুমের শেষ ও শীতের শুরু - এই উপলক্ষে হলেও বছরের এ সময়ে কানাডায় ঠান্ডা পড়ে যায়। তবে আজ আবহাওয়া ছিল ভালো। সারাদিন রোদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৫



সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

ফরাসি ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি বাক্য- Cherchez la femme। অর্থাৎ, ‘সেই মেয়েটিকে খোঁজ’।

ফরাসি লেখক আলেকজান্ডার ডুমা (Alexandre Dumas) ১৮৫৪ সালে তাঁর উপন্যাস Les Mohicans de Paris-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৩



তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে-

বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যু এখন রহস্যের আরেক নাম। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জুনিয়র বন্ধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

দারিদ্র্য কি মানুষকে মহান করে তোলে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪৬


হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশের শেষ জনপ্রিয় লেখক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন গুণী লেখক ও নাট্যনির্মাতা। হুমায়ূন আহমেদ সমুদ্রবিলাস নামে একটি নাটক নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে একজন শিক্ষক ছিলেন, নাম চ্যালেঞ্জার। তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

DNA — ঈশ্বর এবং প্রশ্ন ?

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:১২



১. ক্ষুধা
পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ছিল, বাড়ছিল মানুষের খাদ্যচাহিদা; কিন্তু সীমিত জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে সেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠছিল।
মানুষ নির্বাচিত প্রজনন ও বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে এমন ব্রয়লার মুরগির জাত তৈরি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×