সময়টা সম্ভবত বসন্তের কোন পূর্ণিমা রাত ছিল,
আকাশে উজ্জ্বল চাঁদ আর তারারা ঝিকিমিকি জ্বলছিলো, তখন আমি সদ্য ক্লাস নাইনে পড়া টগবগে কিশোর। আমাদের বাড়ির পাশেই মনি আপুদের বারান্দার কিনারে লাগানো গোলাপ আর হাসনাহেনা ফুলের বাগান, পূর্নিমার জ্বলসানো চাঁদের আলো, সাথে হাস্নার গন্ধে ভিন্নরকম এক পরিবেশ। আমার সাথে শুইয়ে ছিলো মামাতো ভাই মুকসেদ সে আমার সমবয়সী। আজ থেকে দশ বছর আগের সেই পূর্ণিমা রাতের কথা বলছি।
উজ্জ্বল আকাশ ছোটছোট মেঘের ভেলারা খেলা করে চলেছে চাঁদ আর তারাদের সাথে, রাত তখন কত বাজে আমার মনে নাই, সম্ভবত দুই কি আড়াইটা হবে। শশীকে একটা তাজা গোলাপ দিবো সকালে, মনি আপুর গাছ থেকে তুলে এনে গ্লাসভর্তি পানিতে ডাটা ডুবিয়ে রাখবো ভাবলাম। সকালবেলা তাজা গোলাপ নিয়ে শশীর হাতে দিবো, উচাটন মনে কিছুক্ষনের মধ্যেই মনি আপুদের উঠানে গিয়ে উপস্থিত হলাম। হাসনাহেনা ফুলের গন্ধে উঠান মোঁ মোঁ করছে, আর একটু এগুলেই হাস্না গাছ তারপরেই গোলাপগাছের ঝাঁড়।
চাঁদের আলোয় সম্মুখে তাকাতেই গা'টা শিরশির করে উঠলো, যা দেখলাম তার জন্য মোটেই আমি প্রস্তুত ছিলামনা। হাসনাহেনা ফুল গাছটি ধরে কালোর উপর সাদা পাথরক্ষচিত জামা পরীহিতা এক কিশোরী দাঁড়িয়ে, হাত দুইটা হাস্না ফুলের উপর প্রসারিত করে আমার দিকে পিছন পিরে দাঁড়িয়ে আছে, জামার পাথর গুলো থেকে চাঁদের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। হাটু অবধি লম্বা চুলে ঢাকা, স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আলোর মত তার উজ্বল তর্জনিদ্বয়। হতবিহ্বল হয়ে আমি দাঁড়িয়ে রইলাম, মনি আপুরাতো এ বাড়িতেই থাকেনা,শুধুমাত্র ফারুক ভাই ভিতরে থাকে পাহারা দেওয়ার জন্য। দিনের বেলায় মনি আফু আসে মাঝেমধ্যে গাছগুলো পরিচর্যা করে আবার পিরে যায় তাদের পুরান বাড়িতে, তাহলে মেয়েটি কে?
একমুহূর্ত দেরি না করে আমি আবার ফিরে আসলাম ঘরে, পরদিন মামাতো ভাই মুকসেদ চলে গেলে আমাকে এ-ঘরে একাই শুতে হলো। এখন থেকে একাই থাকতে হবে, আর গতকাল রাতের ঘটনা আমি কারো সাথেই শেয়ার করিনি, প্রয়োজন বোধও করিনা, এটা আমার সাথে ঘটে যাওয়া একান্তই পারসোনাল ব্যপার, দেখি সামনের দিকে কি হয়। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো সিলিংয়ের উপর থেকে কিসের যেন বড়সড় একটা শব্দ হলো, চুপচাপ শুয়ে রইলাম। একটুপর বাহির থেকে মেয়েলি কন্ঠে কে যেন আমার নাম ধরে ডাকলো 'শুভ্র আমি, ব্যস। উত্তরের জানালা খুলে দেখি আমাদের বেতগাছের পাশে গতকাল রাতের দেখা কিশোরী দাঁড়িয়ে, আজ তার গায়ে সাদা জামা মুখটাও স্পষ্ট আজ, মৃদুহাসি ছড়িয়ে আছে পুরো মুখমণ্ডলে। সে হাসছে ঠিক লিওনার্দো দ্য ভ্যান্সির আঁকা চিত্রের মোনালিসার মত। শব্দহীন সে হাসি, চোখের ইশারায় আমাকে যেন ডাকছে, ভয় এবং একধরনের ভিন্নরকম অনুভূতি সারা শরীরে বয়ে গেল মুহুর্তেই। আমি জানালার কপাট বন্ধ করে দিলাম, আর অনেকটাই ক্লিয়ার হয়ে গেলাম কিশোরীটা সত্যিকারে আসলে কি?
এর কয়েকদিন পর আমরা ঘুরতে গেলাম পদ্মা নদীর পাড়ে, দিনের বেলা আমার এক বন্ধু সুমনের বোনের বাড়িতে কাটালাম, পদ্মার কিনারেই আপাদের গ্রাম। আমাদের প্লান অনুযায়ী, রাত দশটার পর পদ্মার কুল ধরে নৌকা চলবে টানা দু-ঘন্টা, জোছনার আলোয় পদ্মার ঢেউগুলি কেমন করে একটার পর একটা আচড়ে পড়ে সেইগুলি দেখা এবং ভিন্নভাবে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করা। তো ঠিক এভাবেই চলছিলো সবকিছু, নৌকার মাঝি রফিক ভাই গান ধরলো, একটানা গেয়েই চলেছেন আর বৈঠা চালাচ্ছেন ধীরগতিতে!
আমায় ভাসাইলিরে,
আমায় ডুবাইলিরে.....
অকুল দরিয়ার বুঝি কুল নাই..রে........
আমার পাশেই বসা আরিফ হঠাৎ চিৎকার করে বলল রফিক ভাই ঐটা কি? আমরা সবাই লক্ষ্য করলাম আমাদের হাত বিশেক দুরেই ফুটবল আকৃতির একটা সাদা গোলক উড়ছে, নৌকার পিছন পিছন লক্ষ্যকরে গোলকটি আমাদের সাথেই এগিয়ে আসছে। সবার গা' চমচম করে উঠলো, তবে আমি মোটেই ভয় পেলামনা, কারন আমার বুঝতে দেরি হয়নি সে কে? রফিক মাঝি সবাকে উদ্দেশ্যে বলল কেউ ভয় পাবেননা এটা পরী! এরা চাঁদের আলোয় এমন ঘুরতে ভালোবাসে। এই বয়সে আমি কয়েকবার দেখেছি, কিছুক্ষন পর গোলকটি উড়ে ঠিক আমার হাতের কাছাকাছি এসে পেটে গেলো, আর সেই গোলক থেকে একটা পরী উড়ে হারিয়ে গেলো। সবাই ভয়ে জড়সড় হয়ে নৌকার মধ্যখানে বসে রইলো।
টানা দুই ঘন্টা নৌকা চলবার পর, ছোটখাটো একটা চরে গিয়ে ভিড়লো। রফিক মাঝি বলল তোমাদের পিকনিকের আয়োজনটা এখানেই করো, খুব সুন্দর এবং মোটামুটি নিরাপদ এই চরটি। চরজুড়ে শুধুমাত্র উলো-চন গাছে ভরা, আমি অনেকটা হেটে দেখলাম মাঝেমাঝে কিছু ভুট্টাগাছের আবাদ, চর দখলের জন্য আশপাশের লোকেরা ধীরেধীরে এইগুলা চাষাবাদ আরম্ভ করেছে। আমাদেরও খুব পছন্দ হলো যায়গাটা, ইয়াকুব আর নজরুল খিঁচুড়ি রান্নার আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়লো, ততক্ষনে আমরা কিছু শুকনো ডালপালা জোগার করে আগুন জ্বালিয়ে দিলাম।
সবাই যখন একসাথে চাঁদের আলোয় খিঁচুড়ি খেতে বসলাম, আমার চোখ তখন কাঁশফুলের দিকে। দখিনের মৃদু বাতাসে কাঁশফুল গাছগুলো দোলে পড়ে উত্তরে। পদ্মার ঢেউয়ের মতই যেন এই কাঁশবন ঢেউ খেলে যাচ্ছে, আমাদের থেকে সামান্যতম দূরে সেই কিশোরী কাঁশবনে দাঁড়িয়ে আছে, আমাদের দেখছে সে। এখন আর ভয় লাগেনা, গা চমচম করেনা, এখন শুধু আমিই দেখতে পাই অন্যদের বললে তারা দেখেনা।
ধীরেধীরে আমিও এই অচেনা পরী কিশোরীর প্রতি দুর্বলতা অনুভব করতে লাগলাম, এভাবে নানা লুকোচুরির মাঝে কেটে গেলো দুটি বছর। একেরপর এক ঘটনা ঘটতে থাকে আমার সাথে সবগুলোই আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়, এখন আমি কলেজ পড়ুয়া প্রথম বর্ষের ছাত্র, অনেকটাই প্রাপ্তবয়স্ক। অনেক কিছুই আমি গোপন করতে শিখে গেছি, কাউকেই এখন আর বুঝতে দেইনা। কিন্তু আব্বা-মা এনিয়ে অস্থির হয়ে পড়লো। ইদানীং ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনার মাঝে একটি ঘটনা হলো, আমার মেজু আপুর বাড়িতে- চাদের উপর ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে আমি বসে ছিলাম, সাথে ছিলো আমার বন্ধু রাসেদের দেওয়া গিটার, তিমির অন্ধকারে খুব একাকীত্ব অনুভব করছিলাম তখন টুংটাং গিটারের সুরে নজরুলের সেই গানটি ধরলাম_
......
হারানো হিয়ার নিকুঞ্জে পথে
কুড়াই ঝরাফুল একেলা আমি!
তুমি কেন হায় আসিলে হেতায়
সুখের স্বরগ হইতে নামি......
চারিদিকে মোর উড়িছে কেবল
শুকনো পাতার মলিন ফুলদল,
বৃথাই সেথা হায় তব আঁখিজল
ছিটাও অবিরল দিবসযামী।।
হারানো হিয়ার নিকুঞ্জে পথে
কুড়াই ঝরাফুল একেলা আমি.....
চোখ বন্ধ করেই আমি গান করছিলাম, হঠাৎ চাদ জুড়ে হাসনাহেনা ফুলের ঘ্রাণে সুসোভিত হয়ে উঠলো, অবাক হয়ে চোখ খুললাম আপুদের তো হাসনা বাগান নাই তাহলে কোথা থেকে আসছে এই সুগন্ধি আমার প্রিয় ফুলের? চাদের দক্ষিণকোণ তখন ফকফকে জোসনার আলোর মত পরিস্কার হয়ে উঠলো, সেই কিশোরী দাঁড়িয়ে আছে হাতে আজ উজ্জ্বল কি একটা বাক্স! আমাকে লক্ষ্যকরে জিজ্ঞেস করলো এত করুণ সুরে গাও কেন শুভ্র? আমি আর থাকতে পারলাম না, স্বশরীরে তোমার সাথে দেখা করতে চলে আসলাম, ধীরেধীরে আমার কাছে এসে শীতল পাটির উপর বসলো! গাও শুভ্র বাকি টুকুও গাও।
আমি আবারো গান শুরু করলাম..
এলে অবেলায় পথিক বেভুল
বিধিছে কাঁটা নাহি যবে ফুল,
কি দিয়া করি বরণ ও চরণ
নিভিছে জীবন জীবনস্বামী।।
হারানো হিয়ার নিকুঞ্জে পথে
কুড়াই ঝরাফুল একেলা আমি...
দেখলাম পরীর দুগাল বেয়ে অঝোরে বারিধারা বইতে লাগলো, পরীরা কাঁদতে জানে জীবনের প্রথম দেখলাম। শুভ্র কি চাও আমার কাছে আজ এই নিশুতিরাতে? আমি বললাম তেমন কিছুইনা, আর চাইবোই'বা কোন অধিকারে?
শুভ্র আমি যদি আর পরীপুরিতে না যাইতে চাই, সারাজীবন তোমার সাথে থাকতে চাই, রাখবে আমায়? আমি শুধু মাথা ঝাকিয়ে হু বলে সায় দিলাম। হাতের বাক্স থেকে নিল পাথরের একটা আংটি বের করে আমার আংগুলে পড়িয়ে দিয়ে বললো আমার নাম ছালেহা পরী, যখন তোমার প্রয়োজন হবে শুধু এই আংটিখানাতে আদর করে হালকা মুছে দিও, দেখবে আমি তোমার সম্মুখে হাজির। এখন আমি যাই শুভ্র, চোখ বন্ধ করো, আমি বললাম না আমি দেখবো তোমরা কেমনে পাখা দিয়ে উড়ে যাও, ছালেহা বলল দেখার অনেক সময় পাবে এখনো তুমি দেখার জন্য উপযোক্ত সাহসী হওনি, চোখ বন্ধ করার পর আমি আর খুলতে পারলাম না, মধ্যরাতে জ্ঞান পিরে দেখি মেজু আপুদের খাটের উপোর শোয়া, বাড়ি থেকে মা এসেছে খবর পেয়ে, আরো অনেক আত্মীয় স্বজন, কবিরাজ ইসু মামা আমাকে জিজ্ঞেস করছেন আচ্ছা শুভ্র তোর সাথে কি ঘটেছিলো খুলে বল, শয়তানটা কি তোর কোন ক্ষতি করেছে? শয়তান শব্দ শুনায় আমার গায়ে জালা অনুভব করলাম। ওরা চেষ্টা করলো আমার হাতের আংটি খুলতে, কিন্তু ব্যর্থ হলো। বাড়ির অন্যন্য মেয়েরা কানাকানি করছে আহ! এত সুন্দর নীল পাথর খোদাই করা আংটি জীবনেও দেখেনি। আমার ভগ্নিপতির ছোটবোন খাদিজা বলল বেয়াই আমার কত ভাগ্যবান পরীর দেয়া অমুল্য আংটি পড়ে আছে। ওর খুব হিংসে হচ্ছিলো বোধহয়, কারন খাদিজা আমাকে খুব পছন্দ করতো পুর্ব থেকেই এটা আর জানা ছিলো।
খুব দ্রুততম গতীতে সময় যেন আজকাল বয়ে যায়, মা আমাকে নজরে রাখে সবসময়। বাড়ির কাছারি থেকে এখন আমার শোয়ার স্থান হলো মায়ের রুমের পাশেই। বাড়ির কাছারি ঘরের পাশে আমিও কৌতূহল বশত একটা হাসনাহেনা ফুলের গাছ রোপন করলাম, ইদানীং ছালেহা মনি আপুদের বাড়ি ছেড়ে আমার হাস্না গাছ আর কাছারি ঘরটাকেই তার আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে নিয়েছি। মা কিছুটা আঁচ করতে পেরে আমাকে বড়ঘরে শোয়ার ব্যবস্থা করলো।
কিন্তু আমি পড়লাম বড় বেকাদায়, কলেজে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়ে আংটিটা হারিয়ে পেলেছি। আংটিটা আমার একটা উপকার করতো এটা হাতে নিয়ে মাঠে নামলে যতটা ইচ্ছে ছক্কা হাকিয়ে দর্শকের মন জয় করতে পারতাম। ফাইনালি আংটির অভাবে আমার কলেজ টুর্নামেন্টে লাকসাম পাইলোট স্কুলের সাথে ফাইনাল খেলায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে রানার্সআপ হলাম, এ নিয়ে ছাত্রছাত্রী এবং স্যার'রা আমার প্রতি ক্ষুব্দ আমি নাকি পাতানো ম্যাচ খেলেছি। স্কুল মাঠের আনাছে কানাছে কোথাও খুজে পেলামনা আংটিটা, শেষতক বাড়িতে আনমনে হাসহেনা ফুল গাছের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম।
কিছুদিন পর আমার ইন্টার ফাইনাল এক্সাম ঘনিয়ে আসলো, এটা নিয়েও খুব চিন্তিত। ইংলিশ গ্রামারে আমি খুবই দুর্বল। আংটিটা থাকলে অন্তত একটা ভরসা ছিলো, তাও হারিয়ে পেললাম তবে একটা ভরসা ছিলো মনে, ছালেহা বলেছিলো তিনবার আংটি হারিয়ে গেলো সে খুজে দিবে। হোসেনপুর গোদামনি দিঘির পাড়ে গিয়ে জাফর আর কিবরিয়ার সাথে বসে ছিলাম,মনে মনে একটাই চিন্তা কবে ছালেহার সাথে দেখা হবে! এভাবে সন্ধ্যা অবধি তাদের সাথে আডডা দিয়ে পিরলাম মাগরিবের পরে। মা বকাবকি শুরু করলো তোকে বললামনা মাগরিবের নামাজের আগেই বাড়ি পিরতে ইদানীং তোর সাথে যা ঘটে চলেছে তা সম্পুর্ন ভৌতিক ব্যপার।
ইন্টারমিডিয়েট টেস্ট পরিক্ষার পরে মামাদের বাড়িতে গেলাম, সাথে একগাধা বইপুস্তক। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি কিছু উপন্যাসের বইও। তার মাঝে সমরেশ মজুমদারের ( মনের মত মন) বইটি ফেভারিট। মামাদের দক্ষিণ কুলে বিশাল বাগান, তার মাঝে মুকসেদ একটা বাশের মাচা তৈরি করে গরমে সেখানে আড্ডা জমায়। রাত দশটা নাগাদ খাবার ডাক পড়লো, তাদের যৌথ পরিবার, সবাই একসাথে খেতে বসে, খাবার টেবিলে হঠাৎ আসমা(মামাতো বোন) আমাকে প্রশ্ন করে বসলো। ক... ? শুভ্র ভাই আজকাল শুনি পরীর সাথে ঘুরে বেড়াও! প্রেম-টেম করো নাকি পরিরা কিন্তু ধোকাবাজ হয়, একদিন দেখবেন পাখি উড়াল দিয়ে চলে গেছে পরীস্থানে। তখন কিন্তু চেকা খাই আমার ভাইটা বেকা হয়ে যাবেন।
খাওয়াদাওয়ার পর আমি গিয়ে মাচায় বসলাম, মুকসেদ বললো রাত এখন প্রায় বারোটা বাজ্বে আমি ঘুমাতে গেলাম, দরজার নিছে বেং দেওয়া থাকবে তুই গিয়ে ঘুমাইচ। রাত্র ১টার দিকে নানাদের নারিকেল গাছের ডগায় উজ্জ্বল তারার মত জ্বলে উঠলো, আমি যেন হাপ ছেড়ে বাচলাম। নিশ্চই এটা ছালেহা হবে, আজ তাহলে সত্যি আংটিটার একটা দফারফা হবে। আজ সত্যিই ছালেহা ডানা সহ উড়ে নিছে নিমে এলো, পরীর ডানা এত সুন্দর কারুকার্যময় হয় আগে জানা ছিলোনা। প্রজাতির ডানার মত ছোট দুটি ডানা, মনে হলো পুরো ডানা জুড়ে কে যেন রেশমি সুতোর জাল বুনে দিয়েছে। আমি কোন প্রকার ভনিতা না করেই জিজ্ঞেস করলাম আমার আংটির কি খবর? ছালেহা বলল আংটি তুমি খেলার মাঠে পেলে এসেছো আমি সেখান থেকে কুড়িয়ে আনলাম। আংটি পেতে হলে আমার একটা আবদার আছে বলো দিবে কি? আমি বললাম ঊনকবির কিইবা এমন আছে যা দিয়া তোমাকে মুগ্ধ করবো?
ছালেহা বলল আজ এই নিশুতিরাতে একটা রোমান্টিক গান শুনাও তোমার খালি গলায়। তাও আবার নজরুল গীতি হতে হবে। অনেক ভেবেচিন্তে নজরুলের সেই গানটি ধরলাম।
...
.হলুদ গাঁদার ফুল, রাঙা পলাশ ফুল
এনে দে এনে দে নইলে রাঁধব না, বাঁধব না চুল।
হলুদ গাঁদার ফুল, রাঙা পলাশ ফুল
এনে দে এনে দে নইলে রাঁধব না, বাঁধব না চুল।
কুস্মী-রঙ শাড়ি, চুড়ি বেলোয়ারি
কুস্মী-রঙ শাড়ি, চুড়ি বেলোয়ারি
কিনে দে হাট থেকে, এনে দে মাঠ থেকে
কিনে দে হাট থেকে, এনে দে মাঠ থেকে
বাবলা ফুল, আমের মুকুল, নইলে রাঁধব না, বাঁধব না চুল।
হলুদ গাঁদার ফুল, রাঙা পলাশ ফুল
এনে দে এনে দে নইলে রাঁধব না, বাঁধব না চুল...
বাহ বাহ বাহ, অনেক সুন্দর গাইছো আমি মুগ্ধ,
এই নাও তোমার আংটি, মনে আছেতো?আর দুইবার হারিয়ে গেলে কিন্তু আমি আর খুঁজে দিবোনা...
সবাই যখন প্রাইভেট,কোচিং আর সাজেশন নিয়ে ব্যস্ত, আমি তখন ছালেহার সাথে বিন্দাস ঘুরে বেড়াই পাহাড়, বনবাদাড় আর জোসনা রাতে পদ্মার কুলে কুলে। এদিকে শশী প্রায়ই চিঠি পাঠাচ্ছে কলেজে যাবার জন্য অথবা তার সাথে যেন একান্তে সাক্ষাৎ করি। শশী আমার প্রথম প্রেম প্রথম ভালোলাগার মানুষ, স্বহস্তে লিখা প্রেমপত্র একমাত্র শশীই পেয়েছে আমার থেকে। চিঠিটাতে লেগে ছিলো আমার অনেক আবেগ, উচ্ছাস, অনুভূতি আর একধরনের আনন্দ মিশ্রিত ভয়। দুঃখের ব্যপার টানা তিনবছরেও সেই প্রেমপত্রের কোন উত্তর পাইনি হ্যা অথবা না সূচক, কোনটাই না।
ছালেহা আমাকে প্রায়ই একটা দ্বীপে ঘুরতে নিয়ে যেত, সেই দ্বীপে পাহাড় আছে, ঝর্ণা আছে। আছে নাম নাজানা কত বাহারি ফুল ও ফলের সমাহার। একদিন জিজ্ঞেস করলাম ছালেহা এই দ্বীপটার নাম কি? সে বলেছিলো এটার নাম শুভ্রদ্বীপ, এটি একান্তই তোমার দ্বীপ, বন্ধুত্বের উপহার হিসেবে তোমাকে এটা দিলাম। শভ্রদ্বীপে কোন জনমানব নাই আছে শুধু পাখি আর মৌমাছি। ছালেহা বলে এই দ্বীপে তার কত পরিশ্রমের কথা,কত কি করেছে এটাকে সাঁজাতে৷ পরিস্থান থেকে লুকিয়ে অনেক ফুলের গাছ এনেছে আমাকে মুগ্ধ করতে। সদ্য পাহাড় আর ঝর্ণাটাও নাকি পরিস্থান থেকে উড়িয়ে এনেছে তার বান্ধবীরা সহ। ছালেহার অনেকগুলা পরী বান্ধবীও আছে, নীল পরী, চন্দ্রপরী, হলুদ পরী আরো অনেকেই। একদিন আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিবে। হয়তো পরিস্থিতি অনুকুলে থাকলে আমাকে পরিস্থানেও নিবে। সমস্যা হচ্ছে ছালেহার আম্মাই হচ্ছে পরিস্থানের রানী। উনার নাম সাবিহা পরী। মানব সন্তানদের সাথে না মিশতে ছালেহাকে বারবার নিষেধ করে পৃথিবীতে বেড়াতে পাঠিয়েছে। অথচ ছালেহা এখানে এসে প্রথম বন্ধুত্বটাই আমার সাথে করে পেললো, এবং আমাকে নিয়ে নাকি তার আরো অনেক স্বপ্ন আছে সেগুলো আমাকে বলেনা।
ছালেহাকে বহুদিন বলেছি আমাকে যেন সজ্ঞানে একদিন পঙ্কিরাজ ঘোড়ায় করে উড়িয়ে নিয়ে আসে শভ্রদ্বীপে। সে যতবারই আমাকে এখানে আনে হয় ঘুমন্ত অবস্থায় অথবা বলে চোখ বন্ধ করতে। খুব ইচ্ছে করে চোখমেলে আকাশে উড়ে বেড়াবো, দেখবো বিশ্বজগত আপন চোখ মেলে। আম নাকি আজো উপযুক্ত হইনি পরীদের অদ্ভুতুড়ে ব্যপার গুলো স্বচক্ষে অবলোকন করার জন্য। ছালেহা আমাকে জিজ্ঞেস করলো, পরিক্ষায় তোমার রেজাল্ট কতটুকু ভালো চাও, আমি বললাম মধ্যম পন্থায় পাশ করলেই আমি হ্যাপি। তেমন বড়ধরণের বিশেষ কোন চাহিদা আমার নাই। শুধুমাত্র ইংলিশ ২য় পত্রটা টেনেটুনে পাশ করাই দিও বাকি গুলা আমি নিজেই পারবো।
ছালেহা বলে এজন্যই তোমাকে আমার এত ভালো লাগে তোমার ভিতরে বড়ধরণের কোন লোভ লালসা দেখিনি কখনো। অথচ তুমি যা চাইবে আমার কাছে, তাহাই দিতে আমি প্রস্তুত।
দেখতে দেখতে আমার পরিক্ষার দিন আসলো, বাংলা প্রথম পত্র খুব ভালোভাবেই সম্পুর্ন করলাম।
রাতে ছালেহা একবার জিজ্ঞেস করেছিলো পরিক্ষা কেমন হয়েছে, আমি বললাম ভালোই। ইংরেজি ২য় পত্র এক্সাম আমি মাত্র ১৫ নাম্বারের আনসার করে খাতা জমা দিয়ে বাড়িতে চলে আসলাম। রাত ঠিক বারোটা নাগাদ ছালেহা আমার সেই অপুর্নাঙ্গ খাতাটি নিয়ে হাজির। বলল এবার তুমি গ্রামার খুলে যত ইচ্ছে লেখো, ফজরের আগে আমাকে দিও কাগজটি আবার বোর্ডে গিয়ে যথাস্থানে রেখে আসতে হবে। আমি মাত্র ৬০ নাম্বারের উত্তর লিখে ছালেহা নামক হল গার্ডের কাছে জমা দিলাম, ছালেহা অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে বলল তুমি অন্তত ৮০ মার্কস করো? আমি বললাম বিশেষ চাহিদা আমার নাই টেনেটুনে পাশ করলেই হলো। অসমাপ্ত ঃ
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে এপ্রিল, ২০২১ ভোর ৫:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




