আপনার পরিবার প্র্যাকটিসিং মুসলিম হোক, গাফিল মুসলিম হোক অথবা মডারেট মুসলিম, নিশ্চয়ই পুরো জীবনে তাদের মুখে হাজারবার শুনেছেন যে আজকালকার প্রজন্মটাই খারাপ? কিয়ামত সন্নিকটে তাই যুবকরা সব গোল্লায় যাচ্ছে?
আসলে কী তাই?
তাহলে চলুন দেখি ইতিহাস কি বলে!
খ্রিষ্টপূর্ব ৪৭০-৩৯৯ সালের গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস তাঁর যুগের যুবকদের সম্পর্কে বলেছিলেন-
"তারা শুধু ভালবাসে বিলাসিতা আর জাঁকজমক। অন্যদিকে তাদের আছে শুধু বদভ্যাস, কর্তৃত্ব চাওয়ার প্রবণতা, বড়দের অসম্মান এবং কাজের জায়গায় অকাজ করার স্বভাব"
১১০০ শতকের আরেক সন্ন্যাসী ও চিন্তাবিদ সিই পিটার তার যুগের যুবক যুবতীদের নিয়ে বলেন-
"পৃথিবী একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। যুবকেরা মনে করছে তারা সবই জানে, কিন্তু আসলে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে এবং যুবতীরা অসভ্য ও অরুচিকর পোশাক ও আচরণ আয়ত্ব করছে"। [১]
তাহলে বুঝলেন তো? আমরা একাই খারাপ নাহ, আসলে যুগে যুগে যত যুবক যুবতী এসেছে পৃথিবীতে, সবাই-ই তার সমাজ ও পরিবারের কাছে প্রচুর গাল-মন্দ শুনেছে আর কি!
আসুন এবার কয়েকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে যাচাই করি যে আমাদের নবীজি (সা.) তাঁর সময়কার যুবকদের কীভাবে মূল্যায়ন করেছেন-
ক. মাত্র ১৭ বছর বয়সের উসামা বিন জায়েদ (রা) কে তিনি মুসলিম সৈন্যদলের নেতা নির্বাচন করেন। উমার বিন খাত্তাব (রা) ও হযরত আবু বকর (রা) এর মত প্রখ্যাত সাহাবীগণ এই যুবকের নেতৃত্বে জিহাদ করেন।
খ. মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা) কে তিনি ২৭ বছর বয়সে ইয়েমেন এর গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করেন। এর পূর্বেই মক্কা বিজয়ের সময়ে মুয়াজ (রা) ছিলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা) এর বিশ্বস্ত ডেপুটি।
গ. মহানবী (সা) এর ওফাতকালে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) এর বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। অথচ এই বালকের সাথেই খলিফা উমার (রা.) পরামর্শ করেন কুরআন সংকলন এর সময়ে। [২]
এভাবেই আল্লাহর রাসূল (সা) সর্বদা যুবকদেরকে তাদের বয়স হিসেবে নয়, বরং যোগ্যতা অনুসারে অত্যধিক দায়িত্বসম্পন্ন কাজ দিয়েছেন। যুদ্ধক্ষেত্রেও তিনি এ যুবকদের হত্যা করতে বারণ করতেন কারণ যুবকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী ছিলেন।
নবীজি বলে গিয়েছেন ৭ জন মর্যাদাবান ব্যক্তি আরশে আজিমের ছায়ায় আশ্রয় পাবেন হাশরের ময়দানে, তার মধ্যে ১ জন ব্যক্তি হল যিনি তার যৌবন কাটিয়েছেন আল্লাহর রাস্তায়। [৩]
সুবহানআল্লাহ!
আচ্ছা, ইতিহাস এর যুবক তো দেখলেন,
এবার আসুন ছদ্মনাম দিয়ে আমার নিজের কয়েকজন বন্ধুর জীবনের গল্প শোনাই আপনাদের-
আমার ক্লাসমেট তৌফিক । রমজান মাসে সে ৫ ওয়াক্ত সালাত আদায় করার পাশাপাশি ৩০ দিন মসজিদে গিয়ে খতম তারাবীহ আদায় করে এবং আমার জানামতে সব রকমের পাপ থেকে নিজেকে বিরক্ত রাখে, মাশআল্লাহ।
দুঃখের বিষয় কী জানেন?
বাকি ১১ মাস তাকে নামাজ পড়তে দেখা যায় নাহ। দিনরাত হেভিমেটাল গান শোনার পাশাপাশি দিনে ১৫/১৬ টা সিগারেট আর মাসে কয়েকবার মদ খাওয়া চলে রুটিন মেনে।
আমার ছোটবেলার আরেক বন্ধু ইবনুল । এই ছেলেটার কুরআন তিলওয়াত শুনলে আপনি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকবেন। তাকে কোন বড় মাপের তিলওয়াত প্রতিযোগিতায় পাঠিয়ে দিলে, সেখান থেকে সে জিতে আসার সামর্থ্য রাখে, আলহামদুলিল্লাহ।
সমস্যা কোথায় শুনবেন নাহ?
এই ছেলেটাও ভারসিটিতে ক্লাস শুরু করে নামাজ আর কুরআন ছেড়ে দিয়েছে পুরোদমে। তার সাথে প্রতিদিন ১০/১২ টা সিগারেট আর মাঝেমধ্যে অন্যান্য নেশাও করতে দ্বিধা করে না এখন।
আজকে "নষ্ট ছেলে-মেয়ে" যাদের বলছি আমরা, তারা প্রত্যেকেই হয়তো এরকমভাবে যেকোন উপায়ে ইসলামের সাথে সংযুক্ত ছিল, শুধুমাত্র উপযুক্ত পরিবেশ, একটুখানি সদুপদেশ আর স্ট্রাকচারড গাইডলাইনের অভাবে তারা হারামে লিপ্ত হয়ে আছে।
এই যে ২২/২৩ বছরের ছেলেগুলো আজকে ইসলামের পথ থেকে সরে বিভ্রান্ত হয়ে হারাম কাজে সময় কাটাচ্ছে, এটার জন্য কী আমাদের সমাজ দায়ী নাহ?
আমাদের সমাজ কী তাদেরকে বকাঝকা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য আর অপমান করা ছাড়া কোন অবদান রেখেছে আদৌ?
অথচ ইমাম আলি ইবনে আবু তালিব (রা) বলেছেন,
"নিশ্চয়ই যুবকদের অন্তর অনাবাদী জমির ন্যায়, তাতে যা আবাদ করা হবে, সেটিই শস্যরূপে বেড়ে উঠবে" [৪]
লেখক আরিফ আজাদের বই পড়েছেন নিশ্চয়ই?
এই তরুণটির শাণিত লেখনীতে কতশত যুবক আল্লাহর পথে ফিরে এসেছেন তার কোন হিসাব নেই।
তিনি বেশ চমৎকারভাবে যুবকদের হারাম ও ফিতনা থেকে সরে এসে, অল্প বয়সে বিবাহ করে দ্বীনের প্রতি মনোযোগী হতে আহবান করেন।
আমি এবং আমার এক বন্ধু একদিন আলোচনার খাতিরে হিসাব করে দেখলাম, আল্লাহর এই বান্দাটি বাংলাদেশ নামক একটি অভাগা রাষ্ট্রের সমাজব্যবস্থায় জন্ম নেয়ার কারণে, স্বয়ং "আরিফ আজাদ" হয়েও নিজে বিয়ে করতে ২৮টি বছর সময় নিয়েছেন!
(যদিও এটি তার নিতান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হতে পারে, আমি একটি উদাহরণ হিসেবে পেশ করলাম)
যাইহোক,
এই "প্রযুক্তিতে গা ভাসানো" আর "নষ্ট হয়ে উচ্ছন্নে যাওয়া" যুবকদের জন্য সমাজ থেকে যেহেতু উল্লেখযোগ্য কোন সহযোগিতা আসছে নাহ, সবশেষে আমরা নিজেরা নিজেদেরকে কীভাবে আল্লাহর পথে অটল রেখে, ঈমান মজবুত করতে পারি সেটি নিয়ে একটু কথা বলি-
ক. আত্মসংযমঃ
আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন,
"আর যে নিজের রবের সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে এবং কু প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখে তার একমাত্র আবাসস্থল হলো জান্নাত" [৫]
সুতরাং, আমাদের চিন্তা ও কাজকে নিয়ন্ত্রণে রেখে সংযত থেকে আল্লাহকে ভয় করাই আমাদের জন্য সমাধান। আমাদের এই আচরণে অনুপ্রাণিত হয়েই হয়তো আমাদের আশে পাশের যুবকগণ সংযমের পথে আসবেন।
খ. দৃষ্টি অবনত রাখাঃ
হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেন, "চোখের যিনাহ হলো এমন কিছুর উপর দৃষ্টিপাত করা, যার দিকে তাকানো বৈধ নয়" [৬]
সুতরাং, দুনিয়াবি ফিতনা থেকে সমাজ কিংবা পরিবার আপনাকে বাঁচানোর কোন উদ্যোগ না নিলেও, আপনাকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে বিবাহ না দিলেও, আপনার কাজ দৃষ্টিকে অবনত রাখা।
গ. Peer-Pressure কে "না" বলাঃ
সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি থেকে প্রতিনিয়ত হারামকে হালাল হিসেবে গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করা হলেও দ্বীনের পথে অবিচল থাকতে হবে। কারণ পবিত্র কুরআনে এরশাদ করা হয়েছে-
"এটাই জান্নাত, তোমাদেরকে যার অধিকারী করা হয়েছে তোমাদের কর্মের ফলস্বরূপ" [৭]
ঘ. পরিবর্তন এর দূত হয়ে ওঠাঃ
আল্লাহ তা'আলা বলেন, "তিনিই তোমাদেরকে যমীনের খলীফা বানিয়েছেন এবং যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন সে সম্বন্ধে পরীক্ষার উদ্দেশ্যে তোমাদের কিছু সংখ্যকের উপর মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। নিশ্চয় আপনার রব দ্রুত শাস্তিপ্রদানকারী এবং নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল,দয়াময়" [৮]
সুতরাং, সমাজ কবে পরিবর্তন হবে সেই আশায় না থেকে নিজেই সমাজ পরিবর্তন এর চাবি হাতে তুলে নিতে হবে ও পজিটিভ এ্যাটিটুড দিয়ে আশেপাশের মানুষকে ইসলামের পথে আকৃষ্ট করতে হবে।
আপনার দাওয়াতের উসিলায় একজন যুবক হিদায়াতপ্রাপ্ত হলে, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ইনশাআল্লাহ আপনি সমাজ পরিবর্তন এ ভূমিকা রাখার সওয়াব পাবেন।
মহান আল্লাহ সবাইকে তাদের সৎকাজের প্রতিদান দিয়ে পুরষ্কৃত করবেন, ইন শা আল্লাহ।
রেফারেন্স -
[১] aboutislam.net
[২] aboutislam.net
[৩] রিয়াদুস সালেহীন, হাদিস নং ৩৭৬
[৪] তুহাফুল উক্বুল, পৃষ্ঠা নং-৭০
[৫] সূরা আন নাজিয়াত-৭৯ঃ৪০-৪১
[৬] বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ
[৭] সূরা যুখরুফঃ ৭২
[৮] সূরা আন'আম-৬ঃ১৬৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




