somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রাজাকারের জবানবন্দি (চলবে)

০৭ ই নভেম্বর, ২০০৭ সকাল ১০:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

৪র্থ পর্ব

আও বলতেই আমি তার পিছু রওয়ানা দিলাম। পাশের রুমে নিয়ে গেল আমাকে। এই বাড়ীতে দুটি মাত্র রুম। প্রথমটিতে ইকবাল হুজুর বসেন কিন্তু মালপত্রে ভর্তি। একটা টেবিল আর দুটা চেয়ার কোন রকমে জায়গা হয়ছে। আর বাকী রুম বড় ছোট অনেক সুটকেস আর বাক্স পেটরা দিয়ে ভর্তি। আর এই রুমে অনেকগুলো কাঠের বাক্স একটার উপর আর একটা সিলিং পর্যন্ত রাখা। একপাশে অনেকগুলো দড়ি, লোহার শিকল, চাপাতি ইত্যাদি একপাশে রাখা।আর এক পাশে অনেকগুলো বন্দুক ওয়ালের সাথে খাড়া করে রাখা আছে। আশেক আমাকে বলল, একটা বন্দুক উঠাও। আমার জীবনে এই প্রথম বন্দুক দেখলাম। ভয়ে হাতে নিচ্ছিনা। আশেক বলল, ইয়ে লডেড নেহি। খালি। ইয়ে হ্যায় থ্রি নট থ্রি। বহুত কাম হুতা হ্যায়। মানুষের শরীরে যেদিকে গুলি ঢুকে তা দেখা যায়না কিন্তু যেদিকে বের হয় সেদিকে বড় একটা মাংশের খন্ড নিয়ে বের হয়। কুচ পরওয়া নেহি, লও। আমি হাতে নিলাম। সে আমাকে একে একে দেখিয়ে দিল কিভাবে গুলি ভরতে হয়, কিভাবে গুলি ছুড়তে হয়। কিছুক্ষনের মাঝে এটা শিখে ফেললাম। তারপর সে আমাকে একটা খালি জায়গায় নিয়ে গেল। একটা বড় দালানের পেছনে ওয়ালে একটা মরা গাছের গুড়ি দাড় করানো আছে। সে আমাকে ওটা লক্ষ করে গুলি ছুড়তে বলল। আমি ভয়ে পারলাম না। তারপর সে নিজে গুলি ছুড়ে আমাকে দেখিয়ে দিল। আমি শুরু করলাম। একটা পর একটা ছুড়ে নিশানা ঠিক করতে লাগলাম। দুদিনের মধ্যে আমি পাকা হয়ে গেলাম।

আশেকের মত আরও অনেক আসে আর যায়। সবাই বিহারী। একমাত্র বাঙালি আমি। তারা আমাকে তাদের পোষাক দিল। লম্বা পাকিস্তানি শেলোয়ার পায়জামা, একটা পাকিস্তানি কারুকার্যখচিত টুপি। আর একটা রাইফেল। আশেক বলল, আভি পিস্তল কা শর্ট হ্যায়। রাইফেল ছে আচ্ছা কাম চলতা হ্যায়। রাইফেল কাধে নিয়েই আমার মনে হল আমি একজন মহা ক্ষমতাশালি সম্রাট হয়ে গেলাম। পৃথিবীটা এখন আমার হাতের মুঠোয়। যা ইচ্ছা তাই করতে পারি। আমাকে আর বাঙালি বলে চেনাই যায়না। তাছাড়া ঢাকা শহরে আমার কেউ নেই। আমাকে চেনার কোন প্রশ্নই আসেনা।
আশেক নিয়ে গেল পাশে আর একটা বাড়ীতে। বাড়ীর গেটে গিয়েই ভেতর থেকে মানুষের চিতকার শুনলাম। মাগো! বাবাগো! বাচাও! বাচাও! ভেতরে ঢুকে দেখলাম বেশ বড় বাড়ী। অনেকগুলো রুম। এখানে আরও অনেক রাজাকার যার যার কাজে ব্যস্ত। যে রুম থেকে চিতকার আসছে সে রুমে নিয়ে গেলনা। আশেক কয়েকজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। আসলাম, ইসমাইল, সেলিম, পারভেজ, আসফাক এবং আরও কয়েকজন। আশেক বলল এই মকান আমাদের টর্চারের সেন্টার। যারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কথা বলে বা কাজ করে তাদের ধরে এনে এখানে শাস্তি দিই। আমরা না পারলে কেম্পে পাঠিয়ে দেই। ভেতরের রুমে এখন কিছু বাঙালকো শাস্তি চলছে। এখন আমরা অপারেশনে যাব। বলে সে একজনকে ডাক দিল, এই গুড্ডু, চল মেরা সাথ। গুড্ডুর সাথে আর একজন এল নাম গুরগন। আমরা চারজন রওয়ানা দিলাম। বেশ কিছুদূর এসে একটা বড় বাড়ীর গেটে দাড়াল আশেক। আশেক এখানকার লোক। সব চিনে। বিশেষ করে ইলেকশনের সময় কারা আওয়ামীলীগের পক্ষে কথা বলেছে সে সব চিনে রেখেছে। তার মত আরও অনেক স্থানীয় বিহারী আছে যারা এসব খবর রাখে। তারাই এই রাজাকারের সমস্ত কাজ চালিয়ে নিচ্ছে। গেটে দাড়িয়ে আশেক ধাক্কা দিল। একবার দুবার দেবার পরও কেই খুলেনি। গুরগনকে ইশারা করতেই সে এক লাথি দিয়ে দরজা ভেঙ্গে ফেলল। গুরগনের দেহটার কোন বিশদ ব্যাখ্যা না দিয়ে শুধু বলব একটা ছোট খাটো দৈত্য। এক লাথিতেই দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল সবাই। না, বাড়ীতে কোন মানুষ নেই। একবারে শুনশান। নিস্তব্দ।
আশেকের পিছু পিছু চললাম। একতলার সব কয়টা ঘর তন্ন তন্ন করে খুজল। কিছু কাপড়চোপড় আর আসবাবপত্র ছাড়া কিছুই নাই। উপর তলায় গিয়ে দেখলাম তিনটা রুম। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। আশেক দরজায় ধাক্কা দিল। খুলেনি। তারপর গুরগনের দিকে তাকাতেই দিল লাথি। দরজা খুলে পড়ে গেল।

ভেতরে একজন বৃদ্ধা খাটের উপর বসে কাপছে। তার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছেনা। আশেক জিজ্ঞেস করল, সোনা দানা ক্যায় হ্যায় সব লও বড্ডি! বৃদ্ধা হাত দিয়ে একটা আলমারি দেখিয়ে দিল। গুড্ডু খুলল। খুব বেশি টাকা পয়সা পাওয়া গেলনা। তবে দামী কিছু মেডেল পাওয়া গেল। তারপর বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে আশে জিজ্ঞেস করল, আও কেয়া হ্যায়।
আর কিছু .. বৃদ্ধা একবারে চুপ হয়ে গেল।
গুরগন বৃদ্ধাকে টান দিয়ে নীচে ফেলে পা দিয়ে চেপে ধরে বলল - বাতাও! সবকুচ বাতাও! বৃদ্ধা কোন কথাই বলতে পারলনা। তারপর আশেকের কোমড়ে গোজা পিস্তলটা একবার আওয়াজ হল। বৃদ্ধ একবার শুধু একটু নড়ে উঠল। তারপর নিথর।
তারপর পাশের রুমে গেল। তেমনি ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। গুরগন ভাঙল। ভেতরে দশ বছরের এক সুন্দর নাদুসনুদুস ছেলেকে আকড়ে ধরে তার মা কাপছে। মা ও ছেলের এমন রূপ আমি কখনও দেখিনি। যেমন মায়ের রূপ তেমনি ছেলের। হঠাৎ আমার হল এখন তো আমার ট্রেনিং চলছে। মন দুর্বল হলে চলবেনা। বলা হয়েছে আমরা এখন দেশ রক্ষার জন্য শত্র“র বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত। এসময় দয়ামায়া থাকতে পারবেনা। দেশ রক্ষার জন্য সবকিছুই জায়েজ। পাশে বাড়ীর মালিক পুরুষটি থর থর করে কাপছে। আশেক এক টান দিয়ে ছেলেটিকে তার মার কোল থেকে ছিনিয়ে এনে সার্টের কলার ধরে বলল, বহুত আচ্ছা লেড়কা! বহুত খবছুরুত! পিস্তলটা লোকটার দিকে ধরে জিজ্ঞেস করল, টাকা পয়সা কোথায় বের কর।
লোকটা তাড়াতাড়ি ঘরের এক কোন থেকে তার ষ্টিলের আলমারিতে রাখা টাকার বান্ডেল এনে ছিল। বলল, তোমাদের যা লাগে সব নিয়ে যাও। আমাদের জানে মেরোনা।
মহিলার দিকে পিস্তল উঠিয়ে আশেক বলল, ছোনা দানা কিদার হ্যায়? সব লও। মহিলা কাপতে কাপতে রান্নাঘরের দিকে গেল। গুড্ডু পেছনে গেল। মহিলা ফিরে এল একটা বাক্স নিয়ে। আশেকের হাতে তোলে দিয়ে বলল, সব নিয়ে যাও। আমার ছেলেকে ছেড়ে দাও।
আশেক বলল, ঠিক হ্যায় সবকুচ লেয়গা। গুরগুন ইয়ে আদমী আওর ইয়ে লেড়কে কো দোসড়া কামড়ে মে লে যাও আওর অপারেশন খতম করো। আমাদের বলল বাহার যাও। আমরা সবাই পাশের রুমে এলাম। আশেক দরজা বন্ধ করে দিল। মাঝে মাঝে দুএকবার মহিলার কান্না ভেসে এল। পাশের রুমে এসে গুরগন প্রথমে লোকটিকে বন্দুকের বাট দিয়ে মাথায় বারি দিল। লোকটি পরে গেল। সাথে সাথে ছেলেটি চিৎকার করে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরতে গেল। গুড্ডু তাকেও একটা বারি দিয়ে মাথা ফাটিয়ে দিল। তারপর বেয়নেটের আঘাতে আঘাতে তাদেরকে শেষ করল। শেষ হবার পরও পরিক্ষা করে দেখল আসলে মরেছে কিনা।
আশেক দরজা খুলল। গুরগনকে বলল,আভি তুম যাও। গুরগন ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। এখন আর কোন কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম না। আর একটা রুমে এখনও আমরা যাইনি। আশেক দরজা ধাক্কা দিয়ে দেখল। খোলা। ভেতরে ঢুকল। কোন মানুষ নেই। আমরা তন্ন তন্ন করে সোনাদান খুজতে লাগলাম। বিশেস কিছুই পাওয়া গেলনা। একটা সুটকেস, খুব ভাড়ি মনে হল। আশেক খুলে দেখতে বলল। গুড্ডু বেয়নেট দিয়ে খুলল। কিছু কাপড়চোপড়, নীচে কিছু দামী বাসনকোসন। রুম থেকে বের হয়ে আসছি এমন সময় গড্ডু বলল, ইদার এক আদমী হ্যায়। খাটের নীচে লুকিয়ে আছে লোকটি। খাটের নীচ থেকে টেনে বের করল গুড্ডু। একটি চৌদ্দ পনের বছরের ছেলে। কি রূপ ছেলেটির। এরই দেশের শত্র“, মক্তিবাহিনীতে যায়। এদেরকে রাখা যায়না। আশেক তাকে কিছুই জিজ্ঞেস করলনা। সোজা গুলি করে দিল।
এসময় গুরগন বের হয়ে এসে গড্ডুকে বলল। গুড্ডু গেল। কয়েক মিনিট পর গড্ডু এসে আমাকে বলল। আমি গিয়ে দেখলাম মহিলা বোধ হয় জিবীত নেই। নাকে হাত দিয়ে দেখলাম। শ্বাস আছে। মরে নাই। আমার ট্রেনিং শেষ করতে হবে।

(৪র্থ পর্বই চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই নভেম্বর, ২০০৭ সকাল ১০:০৮
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×