গল্প
চাকরির বিবরন
মানুষ যতদিন বেঁেচ থাকে এবং সুস্থ থাকে ততদিন কিছু না কিছু একটা করতে হয়। হোক সেটা পরের কাজ বা নিজের কাজ। বেতন কম বেশি যাই হোক একটা কিছু না করলে চলে না। কেউ সংসারের খরচ যোগায়, কেউ টাকা দিয়ে আনন্দ ভোগ করে। যাদের টাকার প্রয়োজন খুব বেশি নেই তারা বেতন ছাড়াই সমাজের কিছৃু জনহিতকর কাজ করে থাকে। বৃদ্ব বয়সে সময় কাটানোর জন্য কেউ কেউ বিনোদনমূলক কিছু কাজে সময় কাটায়, কেউ আড্ডা দিয়ে বেড়ায়, কেউ অলস দিন পার করে। তবে বেকার মানুষের সামাজিক মর্যাদা বেশিদিন থাকে না। সমাজে তাদের মূল্য কমে যায়। তাই সমাজে চলতে হলে একটা কিছু করা চাই। হোক তা প্রয়োজনের বা অপ্রয়োজনের। মোট কথা সময় কাটানোর জন্য একটা কিছু করতেই হবে।
আমিও সময় কাটাবার জন্য এই কাজটা করি। অন্তত কেউ বেকার বলতে পারবেনা। বেকার থেকে দেখেছি, তা সুখের নয়। তাই কাজ নিয়েছি। যাকে বলে লিভ-ইন মানে যেখানে কাজ সেখানেই বসবাস। তাও আবার লিভ-ইন-কাপল মানে স্বামীস্ত্রী দুজন। থাকা খাওয়া ফ্রি। তাতে মালিকের অনেক সুবিধা। যখনই প্রয়োজন, দিনে বা রাতে চব্বিশ ঘন্টা, তখনই কর্মচারি হাজির। আমরা স্বামীস্ত্রী দুজনই এই কাজটা নিয়েছি। মালিকের চাহিদা তাই। আমার কাজ হল মালিকের কাছাকাছি হাজির থাকা। তার আদেশ পালন করা, তার সমস্ত কাজকর্ম সন্তুষজনকভাবে সমাধা করা। মোট কথা ভদ্রলোককে খুশি রাখা। আমার স্ত্রীর কাজ হল রান্নাবান্না এবং ঘরের অন্যান্য কাজ করা। আমরা দুজন চাকরি রক্ষার জন্য ভদ্রলোকের চাহিদা অনুযায়ী দিন রাত কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তুু মাঝে মাঝে মনে হয় কাজটা বোধ হয় আর পারছি না। ছেড়ে দিলে কি করব তা ভেবে ছাড়তে পারছি না।
প্রথম দিকে ভদ্রলোককে ঠিক বুঝতে পারিনি। খুব বেশি ফাই ফরমাস করতেন না। যতই দিন যাচ্ছে তার হাবভাব, আচার আচরন, চলাফেরার ভাব ভঙ্গি সব বদলে যাচ্ছে। দিনে রাতে যখন তখন ডাক পড়ে। দিনে দিনে নতুন কর্ম যোগ হচ্ছে, আমাদের কাজও বাড়ছে।
প্রায় প্রতিদিন আমার ঘুম ভাঙে দরজার আওয়াজে। ভদ্রলোক ঘুম থেকে উঠেই আমার ঘরে চলে আসেন। এসে দরজাটা এমন জোড়ে ধাক্কা দিয়ে খোলেন আওয়াজে আমার ঘুম ভেঙে যায়। ভাবখানা এই, এখনও ঘুমিয়ে আছ? একথা তার চাহনিতেই বুঝা যায়, কিছু বলতে হয়না। তার না-বলা কথাই অনেক কিছু বলে দেয়। তখন উঠে বসতে হয়। তিনি কোন কথা না বলে, আসলে তিনি খুব একটা কথা বলেন না, কম্পিউটারের সামনে একটাই চেয়ার, তাতে বসবেন। কম্পিউটার আমার রুমে। কারন আর কোথাও রাখার জায়গা নেই। ভদ্রলোক থাকেন আমার পাশের রুমে। কম্পিউটারে বসা মানে তিনি এখন ভিডিউ দেখবেন। তার পছন্দের ভিডিও। এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এ দিয়ে দিনের শুরু। আমাকে এখন সক ঠিকঠাক করে ভিডিও ছবি চালু করে দিয়ে পাশে দাড়োয়ানের মত দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। পরবর্তি আদেশের অপেক্ষায়।
কম্পিউটার দিয়ে দিনের কাজ শুরু হয়। তিনি ঘন্টাখানেক ভিডিও দেখবেন। না, কোন অদ্ভুদ ভিডিও ছবি নয়, তার নিজের ছবি। অতীতে তিনি কোথায় কি করেছেন, কোন কোন পার্টিতে গিয়েছিলেন, সাথে আর কে ছিল, কখন কোথায় কি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন, কোন মাঠে তিনি কি খেলায় অংশ নিয়েছিলেন, কত লোক হাততালি দিয়েছিল, তার অতীতের এসব ভিডিও। ভিডিও দেখা শেষ করতে চান না। এক সময় আমাকে মনে করিয়ে দিতে হয় এখন তার নাস্তার সময় হয়েছে। অনিচ্ছাকৃতভাবে তিনি খাবার টেবিলে আসেন। মনে হয় এটা একটা বিরক্তিকর কাজ। তিনি দয়া করে খাবার টেবিলে বসেন। তার সামনে কয়েক পদের নাস্তা দেয়া হয়। তিনি তাকিয়ে দেখেন। দয়া করে কোন একটা আইটেম হাতে নেন। একটু মুখে দিয়ে পরিক্ষা করেন। ইচ্ছে হলে একটু খাবেন, অথবা এদিক সেদিক ছড়িয়ে ফেলেন। আমি অনুনয় করে অন্যান্য আইটেম হাতে দিতে গেলে তিনি সরিয়ে দেন। আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করি কিছু খাওয়ানোর জন্য। তাকে খুশি করার জন্য শেষ পর্যন্ত তার মুখে তোলে দিই। তিনি একটু খেয়ে বন্ধ করে দেন। মুখ ফিরিয়ে নেন, হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে আমার মুখে দিতে চেষ্টা করেন। তার মানে তিনি আর খাবেন না। এবার আমাকে খেতে হবে। এভাবেই নাস্তার পালা শেষ হয়।
তারপর তিনি তার জুতা জোড়া নিয়ে আসবেন। জুতা আনা মানে আমাকে বুঝতে হবে তিনি এখন বাইরে বেড়াতে যাবেন। বাইরে যাবার প্রস্তুতি শেষ হলে তিনি দরজার দিকে চলে যান। আমাকে দরজা খোলে দিতে হবে। তিনি দরজার বাইরে গিয়েই খুশিতে নেচে উঠেন। দেখলে মনে হয় এই মাত্র তিনি জেলখানা থেকে ছাড়া পেয়েছেন। একটা মনকাড়া হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকান। তারপর সোজা চলতে থাকেন ইলেভেটরের দিকে। তার প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র হাতে নিয়ে আমি পিছু পিছু চলি। ইলেভেটরের কাছে গিয়ে খুব তাড়াতাড়ি বোতাম টিপে দেন। এ কাজটা তিনি সব সময় স্বতস্ফুর্তভাবে করেন। তিনি এখন নীচে যাবেন, তাই নীচের বোতামটাই টিপেন। অবশ্য কোন কোন সময় উপরে নীচে দুদিকের বোতামই টিপে দেন।
লবিতে এসে নামলেই বুঝা যাবে তিনি কোনদিকে তসরিফ নেবেন। বাইরে পায়ে হাটবেন নাকি গাড়ীতে ঘুরবেন। গাড়ী রাখা আছে বেইসমেন্টে। যদি গাড়ীতে ঘুরতে চান তাহলে আবার বেইসমেন্টের ইলেভেটরে উঠতে হবে। তিনি লবিতে নেমেই বেইসমেন্টের ইলেভেটরের বোতাম টিপে দেন। খুব তাড়াতাড়ি। তার মানে তিনি গাড়ীতে ঘুরবেন। আমি লবিতে একটু দাড়াই বাইরের দিকটা একটু দেখতে চেষ্টা করি। অপেক্ষা করি ভদ্রলোকের ইশারার জন্য। তিনি আমাকে দুদিকে ধরে আমার শরীরটাকে বেইসমেন্টের ইলেভেটরের দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে ধাক্কা দেন। এখন আমাকে বুঝতে হবে তিনি গাড়ীতে যাবেন, আমাকে এখন ড্রাইভারের কাজ করতে হবে।
বেইসমেন্টে নেমে তিনি আগে আগে যাবেন গাড়ীর দিকে। গাড়ীর কাছে গিয়েই তিনি আমার পকেটের দিকে হাত বাড়াবেন। তার মানে তিনি এখন গাড়ীর চাবি নিবেন। আমি কোন কথা না বাড়িয়ে দিয়ে দেই। তিনি খুলতে চেষ্টা করেন। আমি সাহায্য করি। গাড়ীর দরজা খোলার পরই তিনি চাবি নিয়ে ড্রাইভারের সিটে বসবেন। ষ্টিয়ারিং থেকে শুরু করে সবকটা নব ঘুরিয়ে দেখবেন সব ঠিক আছে কিনা। না তিনি ড্রাইভ করবেন না। গাড়ী ঠিক আছে কিনা দেখলেন। তারপর আমার হাতে চাবি দিয়ে তিনি চলে যাবেন তার নির্দিষ্ট আসনে। আসনে বসেই তিনি বেল্ট বাধায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এটা ভদ্রলোকের নিত্যদিনের কাজ।
আমি গাড়ী চালাব। তিনি নিবিষ্ট মনে পথের দুদিকে তাকিয়ে দেখবেন। প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে তিনি পুলকিত হন। কোথায় কোথায় গেলে তিনি খুশি হন তা আমার জানা হয়ে গেছে। কোন কোন পার্ক তার সব চেনা হয়ে গেছে। লেকের পারে গেলে তিনি বেশি খুশি হন। ওখানে তার অনেক বন্ধু আছে। যাবার আগে তিনি তার বন্ধুদের জন্য খাবার নিয়ে যান। পাউরুটি বা বিস্কুট। লেকের পাড়ে গাড়ী থামতেই তিনি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিবেন। তার মানে রুটি দাও। আমি তাড়াতাড়ি তার হাতে রুটির প্যাকেট খুলে একটা একটা করে রুটি দেই। তিনি গাড়ী থেকে নামতেই তার বন্ধুরা সব এসে জড়ো হয়। তারাও জানে বন্ধু এসেছে খাবার নিয়ে। মুহুর্তে শত শত এসে জমা হয়। প্রথমেই চলে আসে গাঙচিল। তারা কোথা থেকে যে খবর পায় কে জানে! তারপর দলবেধে, লাইন ধরে আসে অনেক রকমের হাঁস। পাতি হাঁস থেকে শুরু করে রাজহাঁস, সুইয়ান ইত্যাদি ছোট বড় অনেক রকমের হাঁস। ভদ্রলোক রুটি হাতে নিয়ে একটু একটু করে ছিড়ে বন্ধুদের দিবেন, তারা সবাই ভদ্রলোকে চারপাশে কিলবিল করতে থাকে, খাবার নিয়ে টানাটানি হৈচৈ শুরু হয়। বেশিরভাগ সময় দেখা যায় ভদ্রলোক রুটি ছিড়ে দেবার আগেই তার হাত থেকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেছে। তখন ভদ্রলোক খিল খিল করে হেসে ওঠেন। খুব মজা পান। আবার কোন কোন সময় দেখা যায় ভদ্রলোক বন্ধুদের ছিড়ে ছিড়ে দিচ্ছেন আবার নিজেও খাচ্ছেন। এক সময় খাবার শেষ হয়ে যায়। হাঁসের দল পানিতে নেমে যায়। তখন তিনিও হাঁসের সাথে পানিতে নেমে যেতে চান। আমাকে তখন তাকে থামিয়ে দিতে হয়। অনেকক্ষন থাকবেন এখানে। তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমার বলার কিছু নেই। তবে খাবারের সময় হলে ডাক্তারের আদেশে মনে করিয়ে দেয়া আমার কাজ। যদিও তিনি খুব বিরক্ত হন খাওয়ার কথা বললে। ভাবখানা এমন করেন যেন খাওয়া জিনিষটা কোন প্রয়োজনীয় কাজ নয়। না খেয়ে যতক্ষন থাকা যায় ততক্ষনই আরাম। কিন্তু ধমক উপেক্ষা করেও আমাকে আমার কর্তব্য পালন করতে হয়। খাবারের সময় অনেকটা কায়দা করে ঘরে ফিরতে হয়। আবার খাবার টেবিল। সেই জ্বালাতন। তিনি এটা খাবেন না, ওটা খুব বেশি চিবোতে হয়, এটা একবার নাড়ে, ওটা ঠেলে দেয়, কম চিবোতে হয় বলে তিনি দুধ পছন্দ করেন। এভাবে শেষ হয় দুপুরের খাবার।
প্রত্যেক বাড়ীতে ঘর সাজাবার কমবেশি জিনিষ থাকে। থাকে প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় অনেক কিছু। বিশেষ করে ক্রোকারিজ। কেউ রাখে সু-কেইসে সাজিয়ে, কেউ কোন তাকে। ঘরের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য মেচিং করে সাজানে হয। ভদ্রলোক সৌন্দর্যের পূজারী। তিনি সমস্ত ঘর তন্ন তন্ন করে দেখবেন। সাজানো ঠিক আছে কিনা। যেখানেই দেখেন মেচিং ঠিক হয়নি সেখানেই ঝামেলা করেন। কোন কথা না বলে, যে জিনিষটা ঠিকভাবে সাজানো হয়নি, তা ফেলে দিবেন। কাউকে কিছুৃ বলবেন না। ভাঙ্গার জিনিষ হলে ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায়, আর না ভাংগার হলে ছিটকে পড়ে। তার মানে এই জিনিষটা যথাস্থানে রাখা হয়নি অথবা মেচিং হয়নি। এভাবে তিনি সমস্থ ঘর পরিদর্শন করেন। যখন যা ইচ্ছে তা ভাঙেন। প্রতিদিন একএকটা ভাঙতে ভাঙতে এখন আর বেশি জিনিষ চোখে পড়ে না। এসব করে এক সময় ক্লান্ত হয়ে কোথাও বসে পড়েন। এক সময় নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়েন।
তিনি যখন ঘুমিয়ে পড়েন তখন আমার হাতে একটু সময় হয়। আমিও একটু বিশ্রাম নিয়ে নিই। কিন্তু আমার কান খাড়া রাখতে হয়, কখন ভদ্রলোকের ঘুম ভাঙ্গবে এবং তার প্রয়োজন কি হবে। চাওয়ার সাথে সাথেই সরবরাহ করতে হয়। তা না হলে হুলুস্থুল কান্ড বাধিয়ে দেন।
তিনি ঘন্টাদুয়েক ঘুমাবেন। ঘুম ভেক্সে তিনি আমাকে পাশে দেখলে একটা মুচকী হাসি দেন। তার মানে তিনি খুশি। আমার দিকে বাকা চোখে একবার তাকাবে, তার তাকানোই কথা বলে, মনে হবে তিনি বলছেন, তাহলে তুমি আমার পাশেই আছ। চিৎকার দিতে হবেনা। আমি এসব বুঝে ফেলেছি। তাই আগে থেকেই সাবধান থাকি। ধমক দেবার সুযোগ দিই না।
ঘুম থেকে উঠে তিনি সামান্য কিছু খাবেন। তারপর জুতা জোড়া নিয়ে আসবেন। তার মানে তিনি বাইরে যাবেন সান্ধ্য ভ্রমনে। খেলার পোষাক, দুতা এগিয়ে দিতে হবে। মাঝে মাঝে আমার স্ত্রীও আমাদের সাথে বাইরে বেড়াতে যান। তারও ইচ্ছে হয় বাইরে যাবার। সেদিন আমার স্ত্রীও প্রস্তুত হল আমাদের সাথে বাইরে যাবার জন্য। আমার স্ত্রীকে দেখে ভদ্রলোক চোখ লাল করে তার দিকে তাকালেন। তারপর রান্নাঘরে ঠেলে দিয়ে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে চললেন। তার মানে আমার স্ত্রীর কাজ হল রান্না করা, সে থাকবে রান্না ঘরে, সে কেন আমাদের সাথে বাইরে যাবে। আমার স্ত্রী বেজার হয়ে বসে রইল।
বেশিরভাগ সময় ভদ্রলোক বাসার সামনে মাঠে যাবেন। মাঠে তার কি কি প্রয়োজন হবে তা আমার জানা। কয়েক রকমের বল থাকবে। ফুটবল (ছোট বড় দুটা) টেনিস বল ইত্যাদি। তিনি কোন্ বল খেলবেন মাঠের অবস্থার উপর নির্ভর করে। মাঠে গিয়ে দেখা গেল অন্য কেউ আর এক রকমের বল দিয়ে খেলছে। তিনি তখন তার নিজের বল দিয়ে খেলবেন না। অন্যের বলটাই তিনি হস্তগত করতে ব্যাকুল হয়ে পড়েন। তখন আমাকে খেলা শুরু করতে হয়, বুঝাতে হয় আমাদের বলটাই সুন্দর।
হঠাৎ দেখা গেল তিনি বল ফেলে দিয়ে অন্য দিকে রওয়ানা দিয়েছেন। তার মানে বল খেলা শেষ। তবে এখন তিনি কি খেলা খেলবেন বুঝা যাবে না। শুধু উনার সাথে চলা। তিনি মাঠ পেরিয়ে রাজপথে চলে যাবেন। গাড়ীঘোড়ার তোয়াক্কা করেন না। তখন তাকে থামিয়ে দেয়া আমার কর্তব্য। থামাতে গেলে তিনি রেগে আগুন হয়ে যান। আমাকে ধমক, চিৎকার দিতে থাকেন। তখন অনেক কৌশলে অন্যদিকে তার দৃষ্টি ফেরাতে হয়। অথবা তিনি বল ফেলে দিয়ে হঠাৎ একদিকে দৌড় দিলেন। কি উদ্দেশ্য কিছু বুঝার উপায় নেই। বেশিরভাগ নজর থাকে ব্যস্থ রাস্তার দিকে। তখন আমাকেও দৌড় দিতে হয়। তার সাথে দৌড়ে পেরে উঠিনা। হাপিয়ে উঠি। তখনই ইচ্ছে হয় চাকরিটা ছেড়ে দেই। এক সময় ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে ঘরে ফিরি।
ঘরে এসেই তিনি চলে যাবেন কম্পিউটারের সামনে। চেয়ারে বসে পড়বেন। তার মানে এখন উনার ভিডিও ছাড়তে হবে। তিনি ভিডিও দেখবেন আর তার অতীতকে স্মরন করবেন। দেখবেন আর হাসবেন, কখনও খিল খিল করে, কখনও আপন মনে কিছু বলবেন।
রাত নটার দিকে উনাকে স্মরন করিয়ে দিতে হবে এবার তার নৈশভোজের সময় হয়েছে। অতএব উঠতে হবে। তিনি বেজার মুখে টেবিলে আসবেন। এটা সেটা একটু মুখে দিবেন, তারপর সহজ খাবার একটু দুধ খেয়ে গুমানোর প্রস্তুতি নেবেন।
রাতের ঘুম নিয়ে যত গোল বাধে। তিনি ঘুমিয়ে সময় নষ্ট করতে চান না। তার কাছে সময়ের দাম আছে। হয় ভিডিও দেখবেন নয়ত তো ঘরের জিনিষপত্র পরিক্ষা করার নামে তছনছ করবেন, ভাঙবেন বা ছুড়ে ফেলবেন। আমাকে তখন কৌশলে বিছানার দিকে ফেরাতে হয়। সে কৌশলটা হল গান বা কবিতা বলা। তিনি তা পছন্দ করেন। কবিতা বা গান শুনতে শুনতে তিনি এক সময় ঘুমিয়ে পড়েন। মাঝে মাঝে তিনি কবিতা পছন্দ করেন না। তখন বাধ্য হয়ে আমাকে গান গাইতে হয়। পাঠক বিশ্বাস করুন, জীবনে আমি গান গাইনি। এমন কি বাথরুমেও নয়। এহেন আমাকে গান গাইতে হয় প্রায় প্রতিরাতে। এই গানের বিনিময়ে ভদ্রলোক অবশ্য আমাকে কিছু বাড়তি পারিশ্রমিক দেন। তা হলো তিনি আমার গলা জড়িয়ে ধরে, গালে একটা গভীর চুমো দিয়ে বলেন, আই লাভ ইউ। মাফ করবেন, বলতে ভুলে গেছি সকালে যখন তিনি আমার ঘুম ভাঙান তখনও ঠিক এমনিভাবে গলা জড়িয়ে ধরে, একটা চুমো দিয়ে বলেন, আই লাভ ইউ। আমি তখন নিস্তেজ হয়ে পড়ি। তার মুখের লালা আমার গালে লেগে থাকে। আমি মুছার চেষ্টা করি না। আমার মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত সুখ আনন্দ এক সাথে জড়ো হয়ে ভদ্রলোকের মুখের ওই লালা হয়ে আমার গালে এসে তিলক চিহ্ন একেঁ দিয়েছে। তার বিনিময়ে আমি সবকিছু উজাড় করে দিতে রাজি।
ভদ্রলোকের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেই। তার নাম জেইন, বয়স ২০ মাস, বাংলা শব্দ তিনি যা জানেন তা হলো, দুদু, মামি, খাও, দুতা, বল, ওকে, নো, ইয়া, দোদ্দেই (দৌড় দেই) আর ইংরেজি জানে আই লাভ ইউ। যা আমি তাকে বলি, তাই সে শিখেছে। তিনি আমার একমাত্র নাতী। এই হল আমার প্রতিদিনের ডিউটি।
এই চাকরির উপকারিতা:
যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদের জন্য এ ধরনের চাকরি একটা মহৌষধ। বিশ্বাস না হলে পরিক্ষা প্রার্থনীয়।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই নভেম্বর, ২০০৯ রাত ১:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


