
২০০১ইং সাল।আমার এস.এস.সি. পরীক্ষা।তখনো মোবাইল ফোনের প্রচলন এমনভাবে শুরু হয়নি।সকালে রেডি হয়ে অপেক্ষা করছি কখন আব্বু ফোন করবে তারপর বাসা থেকে বের হব।প্রায় পৌনে নয়টায় ল্যান্ড ফোনে আব্বু ফোন করল।আমাকে অনেক আদর দিয়ে সাহস দিয়ে কথা বলল।এবার বাসা থেকে বের হবার পালা।কথা ছিল আমি আর আম্মু যাব।কিন্তু দেখলাম আমার ছোট ফুফু তার ছোট ছেলেকে নিয়ে রেডি হয়ে আছে আমাদের সাথে যাবে।বাসা থেকে পরীক্ষা কেন্দ্র কিছুটা দূরের পথ।আম্মু ফুফুকে বলল এত ছোট বাচ্চা নিয়ে তোমার আর যাওয়ার দরকার নাই।আমার ফুফুর এক কথা - কি বলেন ভাবী!আমার ভাইয়ার মেয়ের পরীক্ষা আর আমি যাব না! দাদীমার কাছেও এটা স্বাভাবিক।যাক না!ঘরে তো টেনশনে অস্হির থাকবে তারচেয়ে বরং সাথেই যাক।বড় সবাইকে সালাম করে কিছুক্ষণ দাদীমার বুকে মুখ গুঁজে রাখলাম।সাহস,শক্তি,দোয়া আর ভালবাসা প্রাণ ভরে নিয়ে রওনা হলাম।
বাসার গলি থেকে বের হতেই দেখি মসজিদের সামনে আমার ছোট চাচা। চাচাকে জড়িয়ে ধরলাম।আহ্লাদ কিনা জানিনা আমরা ছোটবেলা থেকে এভাবেই শিখেছি।বড়দের দেখলেই হয় সালাম করা,না হয় সালাম দেওয়া আর মামা,চাচা,ফুফুদের মত আপনজনদের দেখামাত্র সালামের পাশাপাশি জড়িয়ে ধরেছি।ছোটচাচাও নাকি আমার সাথে যাবে জন্য দাঁড়িয়ে আছে।রিক্সায় উঠতে হবে বড় চাচার বাসার সামনে থেকে।
সেখানেও দেখলাম গেইটের সামনে বড় কাকী আর বড় আপা (চাচাতো বোন) দাঁড়ানো।এক দৌড়ে গিয়ে বড় কাকীকে সালাম করলাম।বুকে টেনে নিয়ে কাকী আদর করে দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে দিল।কিভাবে পরীক্ষা দেব,কোন দিকে বেশি খেয়াল রাখতে হবে এইসব একগাদা উপদেশ দিয়ে বড় আপাও ঘোষণা করল সেও নাকি আমার সাথে যাবে।
আমি আর আম্মু এক রিক্সায়,ছোট ফুফু - বড় আপা এক রিক্সায় আর ছোট চাচা আরেক রিক্সায় এভাবে আনন্দ শোভাযাত্রায় শুরু হল আমার পরীক্ষা যাত্রা।মজার ব্যাপার হল মাঝ রাস্তায় আমার চাচার রিক্সা থামিয়ে আমার সেজ ফুফা উঠল হাতে কোকাকোলা আর চিপ্সের প্যাকেট নিয়ে কারণ এগুলো আমার খুব প্রিয়।আর কেন্দ্রে গিয়ে দেখলাম আমার ইরা আম্মু (মেজ ফুফু) ছোট্ট ইভানকে কোলে নিয়ে আগে থেকেই সেখানে দাঁড়িয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।আমাকে দেখামাত্রই ইরা আম্মু জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল - 'মিথী রে.. তুই কবে এত বড় হইলি আমার মা... ইস্ রে কত আদরের বাচ্চা আর বাপটা আজকে দেশে নাই! '
ইতিমধ্যেই চারপাশের লোকজন আমাদের দিকে ফিরে ফিরে দেখছে।আমার কিছু বান্ধবী তো অবস্হা দেখে দুষ্টুমিভরা চোখে আমাকে দেখছে আর মিটমিট করে হাসছে। এদিকে লজ্জায় যে আমার কি অবস্হা,কি বলব!আমার সাথে এত মানুষ আর তাদের অস্হিরতা দেখে আমার এক ফ্রেন্ড হাসতে হাসতে বলেই ফেললো - অবস্হা যা বানাইসোস, মানুষ তো ভাববো বংশে তুই প্রথম এস.এস.সি পরীক্ষার্থী।
আমিও বেশ মজা পেলাম এমন কথায়।আমার চাচা আর ফুফা রোল নাম্বার মিলিয়ে সিট প্ল্যান দেখে এসে আমাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে ভেতরে পাঠালো।
আহারে... কি মধুময়,কত মায়াভরা সেসব স্মৃতি!দাদীমা এখন আর বেঁচে নেই।বড় কাকীও অসুস্হ।সেজ ফুফারতো শারীরিক অবস্হা আরো খারাপ!উনাদের কিছু হয়ে গেলে (আল্লাহ্ না করুক) কোথায় পাব এত এত ভালবাসা!
ছোট ছোট পরিবারের ভিড়ে যৌথ পরিবার এখন প্রায় বিলীন।আপনজনের ভালবাসার অভাবে অনেকক্ষত্রেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বাচ্চাদের রঙিন শৈশব,কৈশর।কোথায় পাবে আমাদের সন্তানেরা এত ভালবাসা!!!
(বি.দ্র.: লেখাটি এর আগে ফেইসবুকের একটি গ্রুপে প্রকাশিত হয়েছিল।)
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে নভেম্বর, ২০১৭ রাত ৯:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




