somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থা : হারানো আন্তরিকতার শুক্রবার

৩১ শে অক্টোবর, ২০২৫ বিকাল ৪:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



এক সময় বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ ছিল এক অমলিন আন্তরিকতার চিত্রপট।
সেই সমাজের প্রতিটি দিন, প্রতিটি উৎসব, প্রতিটি শুক্রবার ছিল পরস্পরের সঙ্গে মিশে থাকার আনন্দময় বন্ধন। শুক্রবারের সকাল মানেই ছিল হাসি-খুশির পরিবেশ—পরিবারের সবাই ঘরে থাকে, আত্মীয়স্বজন বেড়াতে আসে, আর ঘরে ঘরে তৈরি হয় নানা মুখরোচক খাবারের আয়োজন। মায়ের হাতে পিঠা, বোনের হাতে সেমাই, পুকুরে একসঙ্গে জাল ফেলা—সব মিলিয়ে শুক্রবার ছিল গ্রামীণ জীবনের এক পরম আনন্দদিন।

পুকুরে হাতজাল ফেলার সেই দৃশ্য আজও স্মৃতিতে ভাসে—যার পুকুরে অংশীদারিত্ব ছিল, সে আনন্দ ভাগাভাগি করতো অংশীদার নয় এমন প্রতিবেশীর সঙ্গে। কারণ, উদ্দেশ্য ছিল মাছ ধরা নয়, আনন্দ ধরা। সবাই মিলে হাসত, খেত, গল্প করত। সেই আন্তরিকতার ছোঁয়ায় পুরো পাড়া যেন উৎসবের আবহে ভরে যেত। বিকেলে ছোটরা মাঠে খেলতে যেত, বড়রা উৎসাহ দিত। কেউ আবার মৌসুম অনুযায়ী আয়োজন করতো ছোটখাটো পিকনিক বা ঘরোয়া মিলনমেলা।

আমাদের ছোটবেলায় শুক্রবার মানে শুধু বিশ্রাম নয়—মানুষে মানুষে সম্পর্কের পুনরুজ্জীবন। আমি নিজে অপেক্ষা করতাম দৈনিক পত্রিকার জন্য; শুক্রবারে থাকতো বিশেষ সাহিত্যপাতা। কাঙ্ক্ষিত সেই পত্রিকা হাতে পাওয়া মানেই ছিল যেন “সাত রাজার ধন” পাওয়া।

কিন্তু সময় বদলেছে, বদলে গেছে শুক্রবারের রূপও। এখনকার শুক্রবারে গ্রামের আকাশে আর সেই হাসির ধ্বনি ভেসে আসে না।
পরিবারে নেই মিলনমেলা, পাড়ায় নেই একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির পরিবেশ। বরং দেখা যায়—শুক্রবার মানেই এখন সালিশ-বিচারের দিন, জায়গা-জমি মাপজোকের হিসাব, কিংবা পীর-দরবেশের নামে মাইকের কর্কশ আওয়াজে গ্রামজুড়ে শব্দ দূষণ। কোথাও কোথাও জুমার নামাজ শেষে শুরু হয় কলহ-বিবাদ, দ্বন্দ্ব আর বিশৃঙ্খলা।

এই পরিবর্তন কেবল সময়ের নয়—এটা আমাদের মূল্যবোধেরও অবক্ষয়। যেখানে একসময় ভালোবাসা, সহানুভূতি ও সম্মান ছিল সমাজের চালিকাশক্তি, আজ সেখানে জায়গা নিয়েছে সন্দেহ, বিভাজন ও আত্মকেন্দ্রিকতা।
গ্রামীণ সমাজের মানুষ এখন আর একে অপরের সুখে-দুঃখে ছুটে আসে না, বরং প্রতিযোগিতা করে নিজেদের আধিপত্য প্রমাণে।

আজকের শুক্রবার তাই আনন্দের নয়—বরং এক ধরনের উদ্বেগের নাম।
যে দিনটিতে আগে গ্রামের প্রতিটি ঘরে বাজতো হাসির সুর, এখন সেখানে শোনা যায় বিবাদের শব্দ।

তবুও আশার আলো নিভে যায়নি পুরোপুরি। এখনো কিছু গ্রামে, কিছু পরিবারে সেই পুরোনো দিনের ঐক্য আর আন্তরিকতা টিকে আছে। প্রয়োজন কেবল সেই পুরোনো মূল্যবোধকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা—যেখানে শুক্রবার আবার হয়ে উঠবে মিলনের দিন, নয় বিচ্ছেদের প্রতীক।
গ্রামীণ সমাজব্যবস্থার প্রাণ ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও মানবিক বন্ধন। আজ সেই প্রাণশক্তি যেন নিঃশেষ হতে বসেছে। সময় এসেছে নতুনভাবে ভাবার—আমরা কি সত্যিই উন্নতির পথে, নাকি হারাচ্ছি আমাদের মমতার শিকড়?
যেদিন আবার শুক্রবারে মানুষের মুখে ফিরবে হাসি, সেদিনই আমরা ফিরে পাবো আমাদের হারানো গ্রামীণ সমাজের সত্যিকারের রূপ।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৫ বিকাল ৪:১৯
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

স্বর্গময়

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১৫ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৫৩


ওরা জান্নাত দেখে না
পুড়তে পুড়েই তো ছাই-
কতখানি জান্নাত দেখো
ঘরের ভিতর আছি কি?
নাকি মাটিতে থাক ঘুম;
যতক্ষুণ আছো নিঃশ্বাস
ততক্ষুণ জান্নাত দেখো
পরিবারে কিংবা চারপাশ!
পরকাল কে দেখে শান্তিময়
এখানে রচনা করো স্বর্গময়;

১৫-৬-২৬ ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘র’-এর কৌশল, প্রভাব ও গুপ্তচরবৃত্তির প্রকৃতি , পর্ব ০১

লিখেছেন মেহেদী আনোয়ার, ১৫ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৭

'র'-এর গুপ্তচরবৃত্তির প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করার পূর্বে স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন ও তৎপরবর্তী পরিচালিত কয়েক ধরনের স্ট্র্যাটেজি ও বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতার বিবরণ দেয়া প্রয়োজন । ১৯৬৮ সালে 'র' গঠিত হয়েছিল মূলত বৈদেশিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনের গল্প- ১০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৫ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৫০



১। একজন মা (কোহিনূর) সারারাত ঘরের দরজা খুলে বসে থাকেন।
কারণ কেউ একজন এসে তাকে বস্তা ভরতি টাকা দিয়ে যাবে। গতকাল রাতের কথা। আমার বাসায় ফিরতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৬ জুনের বিশ্বকাপ কড়চা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:২৩

দারুণ একটা ম্যাচ হয়ে গেলো একটু আগে। মিসর দারুণ খেলেছে আজ। সালাহ নেমে যাওয়ার পরে তাদের খেলার ধার বেশ বেড়ে গিয়েছিলো বলে মনে হলো! কিন্তু, বেলজিয়ামের ফরোয়ার্ডদের পাসিং আর ড্রিবলিং... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমন্ত্রন পত্র থাকলে ভিসার দরকার কী! আপনি জানেন আমি কে?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৬ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০০



ভারত বাংলাদেশের কোনো একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানাতে চাইলে সেই আমন্ত্রণপত্র ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠাবে। সেখান থেকে আমন্ত্রণপত্র যাবে সেই রাজনৈতিক ব্যক্তির ডিপার্টমেন্টে, তারপর তার কাছে। এরপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×